এ খবর তেল নিয়ে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এ পথ পুরোপুরি নিরাপদ করতে এত দীর্ঘ সময় লাগলে তা জ্বালানি তেলের বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরো অনেকটা সময় চড়া থাকতে পারে।

ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক গোপন ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে ২০টি বা তারও বেশি মাইন পেতে রেখেছে। এর মধ্যে কিছু জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পেন্টাগন মনে করছে, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, সমুদ্রের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে তারা ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাইন থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো কিংবা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চুক্তি নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এ অবস্থায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে দুই দেশই। এ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব জিইয়ে রাখতে জাহাজ চলাচল এক রকম বন্ধ রেখেছে ইরান। গত দুদিনে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি ও আটকের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে আদায় করা টোলের অর্থ পাওয়ার কথাও জানিয়েছে দেশটি। শুধু তা-ই নয়, আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল ও ক্লাউড অবকাঠামোর একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এ পথ দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগের মূল কেবলগুলো গেছে। এটিকে অঞ্চলটির ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর এক প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নৌ অবরোধে ৩১টি জাহাজের দিক বদল করতে বা বন্দরে ফিরতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এশিয়ার বিভিন্ন জলসীমায় অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার আটক করেছে তাদের সামরিক বাহিনী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানকে সহায়তা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহকারী জাহাজগুলোর পথ রুদ্ধ করতে এবং অবৈধ নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে বিশ্বব্যাপী অভিযান অব্যাহত থাকবে। তারা (ইরান) যেখানেই থাকুক, কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আন্তর্জাতিক জলসীমাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা পার পাবে না। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনকারী যেকোনো নৌযান দেখলেই গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ পরিস্থিতিকে ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ বলে উল্লেখ করেছে। সহজ ভাষায়, এটি হলো আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে নিজের শর্ত মানতে বাধ্য করার একটি কৌশল। হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুদেশের নেয়া পদক্ষেপগুলো এদিকেই ইঙ্গিত করছে। এখানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে। আর নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অভিযানের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে দিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের লক্ষ্য, এ অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরানের উৎপাদিত তেল রফতানি ব্যাহত হবে এবং মজুদের জায়গাও কমে আসবে। এর মধ্য দিয়ে ইরান সরকারের প্রধান আয়ের উৎসে সরাসরি আঘাত করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির (এফডিডি) গবেষকদের মতে, হরমুজ তেহরানের জন্য কোনো গেম চেঞ্জিং হাতিয়ার নয়, বরং এটি তাদের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, আগামী রোববারের মধ্যে ইরানের তেল মজুদের সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে। ফলে ইরানকে তেল উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে। এ অবস্থায় জোরপূর্বক উৎপাদন স্থগিত রাখা হলে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ লাখ ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘রিয়েল ক্লিয়ার ডিফেন্স’ নামের ওয়েবসাইটে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ল্যান্স বি গর্ডন লিখেছেন, মজুদের জায়গা না থাকায় ইরান যদি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও আয় স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে।

মার্কিন অবরোধের মধ্যেও তেল রফতানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা জানিয়েছে, গত ১৩ থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এ চালানগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ করা এলাকা পার হতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্তের খবরে বিশ্ববাজারে বেড়েছে তেলের দাম। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৩ ডলারের (৭৬ দশমিক ৩৫ পাউন্ড) কাছাকাছি অবস্থান করছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে তেলের বাজারদর ৯৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।