বরং আগামী দুই-তিন সপ্তাহ আরো কঠোর হামলার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি, যা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। ট্রাম্পের ভাষণের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ দশমিক ৩৪ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে।
হোয়াইট হাউজের ক্রস হলে দেয়া প্রায় ২০ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেয়া যায় না এবং সেটিই সামরিক অভিযানের প্রধান কারণ।’ তিনি দাবি করেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং ইরানি শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে আছে। শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি নিজের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। যদিও তার বেশকিছু দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল—এমন বক্তব্যের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। ফলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি দূর হয়নি।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এ ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব এখনো অনিশ্চিত। ইরানি শাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে কিনা কিংবা তা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেননি। বরং সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই-তিন সপ্তাহে অভিযান আরো জোরদার করা হতে পারে। ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে শান্তিচুক্তিতে না আসে, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান শেষ পর্যন্ত নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে এ জলপথ খুলে দেবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো ওই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যা পরিস্থিতির জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের ভাষণ যুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিলেও সংঘাতের শেষ কোথায় সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। বরং আরো কঠোর সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি অনিশ্চয়তার পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছেন, যা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণ শেষ হওয়ার পর পরই ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী টেলিগ্রামে জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করেছে। এ হুমকি প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির উপকণ্ঠে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের খবর জানিয়েছে শহরটির সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর। গতকাল সকালে আরব আমিরাত জানায়, খলিফা ইকোনমিক জোনস আবুধাবির (কেইজেডএডি) পাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ ঘটনায় ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কেউ হতাহত হননি। এছাড়া সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র গতকাল জানিয়েছেন, দেশটির আকাশসীমায় বেশকিছু ড্রোন, চারটি অজ্ঞাত আকাশযান এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে এসব ধ্বংস করা হয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দিকে আসছিল।
ইরানের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘গুরুত্বহীন’ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। সেই সঙ্গে তিনি দেশ দুটিকে আসন্ন ‘চরম, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক’ হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ইরানি অভিজাত বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সম্পর্কিত সংবাদ সংস্থা তাসনিম এবং দেশটির আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও সরঞ্জাম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে ‘অসম্পূর্ণ’ তথ্য রয়েছে। সেই সঙ্গে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে নিজেদের শুরু করা আগ্রাসনের জন্য অবশ্যই চরম মূল্য চোকাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানে ৩৩ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শহরের মেয়রের মুখপাত্র আব্দুলমোহর মোহাম্মদখানি। তিনি জানান, এসব বাড়িতে ছোটখাটো মেরামত যেমন ‘কাচ, দরজা ও জানালা ঠিক করা’ থেকে শুরু করে ‘বড় ধরনের পুনর্নির্মাণ বা সম্পূর্ণ সংস্কার’ করার দরকার হতে পারে। মুখপাত্র আরো জানান, হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়িতে নানা সমস্যা দেখা দেয়ায় ১ হাজার ৮৬৯টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। এছাড়া আরো প্রায় ১ হাজার ২৪৫টি পরিবারকে ২৩টি আবাসিক কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে শতাব্দী প্রাচীন একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। এ হামলায় পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রটি ১৯২০ সালে চালু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে হোসেইন কেরমানপুর একে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের শতাব্দী পুরনো স্তম্ভে হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া গতকাল ইরানের দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলার শিকার দুটি ইস্পাত কারখানা হলো ইরানের আহবাজ শহরে খুজেস্তান স্টিল কোম্পানি ও ইসাফাহান প্রদেশের মধ্যাঞ্চলের মোবারাকে স্টিল কোম্পানি। মোবারাকে স্টিল কোম্পানি বলেছে, হামলার পর তাদের উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। খুজেস্তান স্টিল কোম্পানির পরিচালন বিভাগের উপপ্রধান মেহরান পাকবিন বলেছেন, হামলার শিকার হয়ে বন্ধ হওয়া ইউনিটগুলোতে অন্তত ছয় মাস পুনরায় উৎপাদন শুরুর আশা করা যাচ্ছে না। হামলার ঘটনা ঘটেছে তেহরান থেকে কারাজ শহরের পথে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ সেতু’ হিসেবে পরিচিত একটি সেতুতে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে অবস্থিত ওই সেতুতে হামলায় অনেকে আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের সংবাদ সংস্থা ফারস।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চলমান অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ। এর মধ্যে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার ৩২০টির বেশি। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের বরাতে আরব নিউজ জানায়, পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ১২টি বড় গ্যাসবাহী জাহাজ ও ৫০টি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন হরমুজ দিয়ে অন্তত ১২০টি জাহাজ চলাচল করলেও গত দুইদিনে মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে বলে জানিয়েছে কেপলার। জাহাজ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণকারী সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত ৪৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। এসব জাহাজের বেশির ভাগই ইরান ও তার মিত্র দেশের।
এদিকে হরমুজ প্রণালি সচল করতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে যুক্তরাজ্য। রয়টার্স জানায়, সংকট মোকাবেলায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। এ বিষয়ে গতকালই একটি বৈঠক বসে যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্র এ বৈঠকে যোগ দিচ্ছে না বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামরিক উপায়ে সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব নয় এবং সংঘাতের তীব্রতা উভয় পক্ষের জন্যই অনুকূল নয়। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি। চীন আরো উল্লেখ করেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলাই হরমুজ প্রণালির অবরোধের মূল কারণ, যা ট্রাম্পের তেলের চলাচল নিয়ন্ত্রণের আহ্বানের পর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মাও নিং বলেন, হরমুজ প্রণালির নৌপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ সামরিক অভিযান। চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকায় রয়েছে।









