গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এটি এ উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশের সমান। শুক্রবার ইসরায়েলের পত্রিকা হারেৎজের একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিহত ফিলিস্তিনিদের এ সংখ্যা হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। এ মন্ত্রণালয় বলেছে, গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
এদিকে রয়টার্স জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এক সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস গাজায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সহায়তা কার্যক্রমকে অনিরাপদ বলে উল্লেখ করেছেন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এটি মানুষ হত্যা করছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রায় এক লাখ নিহত হওয়ার খবর জানিয়ে হারেৎজ লিখেছে, হামলায় সরাসরি নিহত হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ পরোক্ষ কারণেও প্রাণ হারিয়েছে। যেমন অনাহার, ঠাণ্ডা ও রোগে ভুগে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ইসরায়েলি মুখপাত্র, সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা অতিরঞ্জিত বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এ তালিকা নির্ভরযোগ্য তো বটেই; বরং বাস্তবতার তুলনায় অনেকটাই কম।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের হোলোওয়ে কলেজের অর্থনীতিবিদ ও সহিংস সংঘাতে মৃত্যুর বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাটের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে গবেষণায় গাজার প্রায় ১০ হাজার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে দুই হাজার পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। এর ভিত্তিতে জানা গেছে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় প্রায় ৭৫ হাজার ২০০ মানুষের সহিংস মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়।
জরিপ অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৬ শতাংশই নারী ও ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। হারেৎজ বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করলে এ সংখ্যা ব্যতিক্রমী। অধ্যাপক স্পাগাট বলেন, এ তথ্য গাজা যুদ্ধকে ‘একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করে। তিনি আরো বলেন, সিরিয়া, ইউক্রেন ও সুদানে যুদ্ধে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা গাজার তুলনায় হয়তো বেশি। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও যোদ্ধাদের মৃত্যুর হার এবং জনসংখ্যা অনুপাতে মৃত্যুর হারে গাজা সম্ভবত শীর্ষে।
গবেষণার তথ্য বলছে, গাজায় সহিংস মৃত্যুর শিকার নারী ও শিশুদের অনুপাত প্রায় সব সাম্প্রতিক সংঘাতের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। কসোভোতে এ হার ছিল ২০ শতাংশ, উত্তর ইথিওপিয়ায় ৯, সিরিয়ায় ২০ ও সুদানে ২৩ শতাংশ।
অধ্যাপক স্পাগাট বলেন, ‘আমার ধারণা, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ এরই মধ্যে নিহত হয়েছে। একুশ শতকে মৃত্যুর এমন হার আর কোনো সংঘাতে দেখা যায়নি।’
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল গাজায় নিষ্ঠুরতম সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক মহল বারবারই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি এক সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে: ট্রাম্প
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এক সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে। হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে শুক্রবার কঙ্গো-রুয়ান্ডা চুক্তি উদযাপনের এক অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে সংঘর্ষে লিপ্ত ইসরায়েল ও হামাসকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে চেষ্টা করে যাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার মনে হয় শিগগিরই যুদ্ধবিরতি হতে যাচ্ছে। এটার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে মাত্রই কথা হলো। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই একটি যুদ্ধবিরতি পেতে যাচ্ছি বলে আমরা মনে করছি।’
কাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তা বলেননি তিনি। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার যে প্রায় প্রতিদিনই কথা হতো তা তিনি আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কার্যালয় এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তারা বলেছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের বাইরে বলার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে রয়টার্স ওয়াশিংটনের ইসরায়েলি দূতাবাসে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তারা কিছু বলেনি।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সহায়তা কার্যক্রম মানুষ হত্যা করছে: গুতেরেস
গাজায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সহায়তা কার্যক্রমকে অনিরাপদ বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস। সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সোজাসাপ্টা মূল্যায়নে শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, এটি মানুষ হত্যা করছে। রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র চায়, জাতিসংঘ যেন নতুন বিতর্কিত এ সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে কাজ করে। কিন্তু জাতিসংঘ এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং এ বিতরণ পদ্ধতিকে সহায়তার সামরিকীকরণ ও বাস্তুচ্যুতি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ এনেছে।
সাংবাদিকদের গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন মানবিক প্রচেষ্টা বর্তমানে ‘শ্বাসরুদ্ধ’ অবস্থায় রয়েছে। সহায়তা কর্মীরাও অনাহারে ভুগছেন এবং দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের সহায়তায় প্রবেশ ও বিতরণে সম্মতি ও সহযোগিতা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ কেবল নিজেদের ও পরিবারের জন্য খাবারের খোঁজ করতে গিয়ে মারা যাচ্ছে। খাদ্য খোঁজার চেষ্টা কখনই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না।
এখনই সময় গাজায় একটি রাজনৈতিক সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজে বের করার।
ইসরায়েল গত ১৯ মে ১১ সপ্তাহের সহায়তা অবরোধ তুলে নেয় এবং সীমিত জাতিসংঘ সহায়তা আবার চালু হয়। জাতিসংঘ বলছে, এর পর থেকে মার্কিন সমর্থিত সহায়তা কার্যক্রম এবং জাতিসংঘের ত্রাণ নিতে গিয়ে চারশর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
এ সহায়তা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি নিরাপত্তা ও লজিস্টিক কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংস্থাটি ২৬ মে গাজায় কার্যক্রম শুরু করে। এখন পর্যন্ত তারা ৪৮ মিলিয়নের বেশি খাবারের প্যাকেট বিতরণ করেছে বলে দাবি করেছে।










