গত সপ্তাহের কথা। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ যেকোনো মুহূর্তে সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ কেমন হতে পারে, সেটি নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছিলেন দুই দেশের সর্বোচ্চ নেতারা। এর মধ্যে কম্বোডিয়ায় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে ছিল দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের হাতে।
ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হুন সেনের অফিসিয়াল পেজ থেকে কম্বোডিয়ার সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার একটি বৈঠকের ছবি প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, বড় একটি টেবিলের এক প্রান্তে বসে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন হুন সেন। পাশেই কফির কাপ। হুন সেনের সামনে মেলে ধরা একটি বিস্তৃত মানচিত্র। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ে তাকে ব্রিফ করছেন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা।
ছবিটি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। কারণ সাবেক গেরিলা নেতা হুন সেন এখন আর আনুষ্ঠানিকভাবে কম্বোডিয়ার সরকারপ্রধান নন। প্রায় চার দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৩ সালে বড় ছেলে হুন মানেতের হাতে প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়ভার তুলে দিয়েছেন তিনি। এর পর থেকে কম্বোডিয়ার সিনেটের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন হুন সেন। তবে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের দায়িত্বে না থাকলেও খেমার জাতিগোষ্ঠীর রাজনীতিতে এখনো মুকুটহীন অধিপতি হিসেবে বিবেচিত তিনি।
সংশ্লিষ্ট তিনটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘাত চলাকালে নিজের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ভূমিকা রেখেছেন হুন সেন। পাঁচ দিনের এ সংঘাতে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কম্বোডিয়ায় এখনো হুন সেনই সবচেয়ে প্রভাবশালী।
গত শুক্রবার কম্বোডিয়া থেকে থাইল্যান্ডের দিকে গোলাবর্ষণ করা হয়। এসব গোলা আঘাত হানে থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী কয়েকটি বেসামরিক এলাকায়। এর জন্য হুন সেনকেই দায়ী করছে থাই সেনাবাহিনী। হুন সেনের নামের সঙ্গে সম্মানসূচক পদবী ব্যবহার করে তাদের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা মনে করছি সামদেক আক্কা মোহা সেনা পাদেই তেকো হুন সেনের নেতৃত্বে কম্বোডিয়ান সরকারই ভয়াবহ এসব আক্রমণের জন্য দায়ী।’
দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৭২ বছর বয়সী হুন সেনের ফেসবুক পেইজ থেকে একের পর এক পোস্ট শেয়ার করা হয়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব পোস্টের লক্ষ্য ছিল কম্বোডিয়ার জনগণকে তার পেছনে ঐক্যবদ্ধ করা এবং থাইল্যান্ডের সমালোচনা করা।
ওই পেইজ থেকে শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখা যায়, প্রায় এক ডজন ব্যক্তির সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্স কলে কথা বলছেন হুন সেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাও ছিল। আরেকটি ছবিতে তাকে থাই সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন পোশাকে দেখা যায়।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কম্বোডিয়াভিত্তিক এক কূটনৈতিক রয়টার্সকে জানান, ‘তিনি (হুন সেন) যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, ইউনিফর্ম পরা বা সেনা মোতায়েনের নির্দেশনা দেয়ার সময় তোলা ছবি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি যেভাবে দৃশ্যমান করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে, গোটা সীমান্ত সংঘর্ষের বিষয়ে আমাকে এটিই অবাক করেছে সবচেয়ে বেশি।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কম্বোডিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা লিম মেনঘুর বলেন, ‘হুন সেন মূলত ফ্রন্টলাইনে সৈন্যদের জন্য প্রধান লজিস্টিকস কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সব সময় পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রেখেছেন।’
তবে কম্বোডিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত গোটা বিষয়টিতে পিতার সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির স্নাতক এ চারতারা জেনারেল সংঘাতের পুরো সময় জুড়ে খুব একটা সামনে আসেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খুব একটা সরব ছিলেন না তিনি। বরং মালেয়শিয়ার মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হলে সেখানে যোগ দিতে দ্রুততার সঙ্গে ছুটে যান তিনি।
হুন সেন ও তার পরিবাররকে নিয়ে গ্রন্থ রচয়িতা পেনভিত্তিক লেখক চায় সোফাল বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এখনো কম্বোডিয়ার ক্ষমতাসীন দল পিপলস পার্টির প্রেসিডেন্ট। সে জায়গা থেকে সরকারকে তিনি নির্দেশনা দিতেই পারেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে পার্টির নীতি ও পার্টি প্রেসিডেন্টকে মেনে চলতেই হবে।’










