যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা রাজ্যের অ্যানকোরেজে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একসময় রাশিয়ার অংশ থাকা এ অঞ্চলে দুই নেতার বৈঠকে প্রধান আলোচ্য ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈঠকে কোনো চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং পরবর্তী কোনো বৈঠকের ঘোষণাকেই সাফল্য হিসেবে দাবি করতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় উভয় নেতা আলাস্কায় পৌঁছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দিনব্যাপী এ বৈঠকে আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনের পাশাপাশি উঠেছে নতুন পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির প্রস্তাব। চুক্তি হলে ঠাণ্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দুই পরাশক্তির সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে বৈঠকটি চলতে পারে টানা ৭ ঘণ্টা।
বৈঠক ঘিরে সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন আলাস্কার দিকে। তবে শঙ্কাও কম নয়। ইউক্রেন ইস্যুতে উভয় দেশের মৌলিক অবস্থান অপরিবর্তিত, আর আঞ্চলিক মিত্রদের চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ন্যাটো মিত্ররা রাশিয়ার ওপর সর্বোচ্চ চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে, অপরদিকে মস্কো চাইছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে ছাড় দিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এ বৈঠক ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতির তাপমাত্রা মাপার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
আলাস্কার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একটি চুক্তি করতে প্রস্তুত রয়েছেন। একই সঙ্গে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আলাস্কার বৈঠক সফল হওয়ার ৭৫ ভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার ওপর নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি যুদ্ধ বন্ধে পুতিনকে আরো আগ্রহী করে তুলে থাকতে পারে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি প্রথম ২ মিনিট, ৩ মিনিট, ৪ মিনিট বা ৫ মিনিটের মধ্যেই বুঝে যাব আমাদের মধ্যে একটি ভালো বৈঠক হবে, নাকি খারাপ। যদি খারাপ বৈঠক হয়, তবে খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। আর যদি এটি ভালো বৈঠক হয়, তবে আমরা নিকট ভবিষ্যতে শান্তি অর্জন করতে যাচ্ছি।’
তবে আপাতত চুক্তি হচ্ছে না এমন ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প জানান, তিনি, পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি বৈঠক হবে। সেটি হবে চূড়ান্ত বৈঠক। দ্বিতীয় বৈঠকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কারণ ওই বৈঠকে তারা (রাশিয়া ও ইউক্রেন) চুক্তি করবে।
বৈঠকের আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রুশ সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে অবশ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি হবে কিনা তা নিয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। তবে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি পরমাণু অস্ত্র চুক্তি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, আলোচনায় কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানের পাশাপাশি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায়ও ভূমিকা রাখবে।
ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অবশ্য বৈঠকের ফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘বৈঠকের পর কোনো আনুষ্ঠানিক নথি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা নেই।’ যদিও পুতিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, দুই নেতা রাশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের অব্যবহৃত বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
পুতিনের সঙ্গে অ্যানকারেজে যাচ্ছে একটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল, যা ট্রাম্পের ব্যবসাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গিকে লক্ষ্য করেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পুতিন জানেন, ট্রাম্প দুনিয়াকে ব্যবসার চোখে দেখেন, তাই নিজের শর্তে শান্তিকে লাভজনক সুযোগ হিসেবে তুলে ধরতে চান।
কিছু রুশ কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পুতিন এ বৈঠকে ইউক্রেনের সংঘাত জেলেনস্কির কারণে দীর্ঘায়িত বলে তুলে ধরবেন। তিনি নিজেকে শান্তির পক্ষপাতী হিসেবে উপস্থাপন করবেন। সাবেক এক উচ্চপদস্থ রুশ কর্মকর্তা বলেছেন, পুতিনের কাছে ট্রাম্প এমন এক নেতা, যার সঙ্গে তিনি সব সময় চুক্তি করতে পারেন, যেমনটা তিনি তুরস্কের এরদোগান, চীনের শি জিনপিং কিংবা ভারতের নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে করতে পেরেছেন। পুতিন বৈঠকে অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রস্তাবও নিয়ে আসছেন বলে জানা গেছে। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পকে দেখাতে হবে যে সঠিক শর্তে তিনি শান্তিতে রাজি, আর সেই শর্তে থাকবে বিনিয়োগের সুযোগ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনই যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বা নিউ স্টার্ট চুক্তি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কৌশলগত অস্ত্রের ওপর আর কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈঠকে পারমাণবিক যুদ্ধ কখনো শুরু না করার নীতি পুনর্ব্যক্ত, নিউ স্টার্টের সীমা মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি, বিস্ফোরণধর্মী পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ, ট্যাকটিক্যাল অস্ত্রের সংখ্যা স্থিতিশীল রাখা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাহীন বিস্তার রোধের বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলাস্কার এ বৈঠক এক ধরনের কূটনৈতিক ‘জাম্প বল’। দুই পারমাণবিক পরাশক্তি নিজেদের স্বার্থে মাঠে নামছে, আর ইউক্রেন দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে কী সিদ্ধান্ত হয়।










