নড়াইল জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে আমি ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট যোগদান করি। শুরু থেকেই মহাসড়কে চাঁদাবাজি, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, চাঞ্চল্যকর সব মামলার রহস্য উদঘাটন, সাইবার ক্রাইমসহ নানা বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। অপরাধ নির্মূলে শুরু হয় যুদ্ধ। সম্প্রীতি রক্ষা ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় গণ্যমান্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করি। সবার সহযোগিতায় অল্প সময়ের মধ্যেই জেলার সড়কগুলোকে চাঁদাবাজমুক্ত করি। শুধু চাঁদাবাজি বন্ধই নয়, বেশ কয়েকটি মাদকবিরোধী অভিযানের পর জেলার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরাও গা-ঢাকা দিয়েছে।

দীর্ঘদিন নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ লেগেই থাকত। বিশেষ করে ঈদের সময় তিনটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত মানুষ। 

আমি যোগদানের পর অনেকাংশে কমেছে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব। গত ঈদে নড়াইল জেলায় কোনো এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। চুরি-ডাকাতির ঘটনা এখন নেই বললেই চলে। পুলিশের এসব কাজে স্বস্তি প্রকাশ করেছে নড়াইলের ব্যবসায়ী, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।

মহাসড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে চাঁদা তোলা অপরাধ। যখনই বিষয়টি আমার কানে এসেছে তখনই,  এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছি। নড়াইলের কোথাও সড়কে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা তুলতে দেয়া হবে না। জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সরকার আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটি সঠিকভাবে পালন করতে চাই। নড়াইল জেলাকে মাদকমুক্ত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। চাঁদাবাজমুক্ত সড়ক হওয়ায় চালকসহ ভুক্তভোগীরা খুশি। এবার পুরো জেলা মাদকমুক্ত করতে চাই।

একটা সময় ছিল, যখন ঢাকা-ভাঙ্গা-বেনাপোল মহাসড়কের নড়াইল অংশের ভাদুলিডাঙ্গা এলাকায় পৌরসভার টোলের নামে গাড়িপ্রতি ৫০-৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলত প্রভাবশালীরা। বাস, ট্রাক, পিকআপসহ প্রতিটি গাড়িচালককে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হতো। চাঁদা তোলার নেপথ্যে ছিল স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। অনেক গাড়িচালক চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত চাঁদা আদায়কারীরা। যোগদানের পর বিষয়টি আমার নজরে আসে। তখনই চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রথম অবস্থায় কয়েকজনকে আটক করা হয়। পুলিশের শক্ত অবস্থানে চাঁদা তোলা বন্ধ করে দেয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

নড়াইল জেলায় অপরাধের ধরন একটু ভিন্ন। তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরেও হত্যার ঘটনা ঘটে। যে সমস্যাটা আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে সেটি হলো কোনো ঘটনা ঘটলে আইনের কাছে বিচার না চেয়ে প্রতিহিংসায় জড়ায়। প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি ও এলাকায় লুটপাট করে। পুলিশের নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে এটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে চাই। থানাকে জনবান্ধব করায় সে অবস্থা থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছি। জেলার সব থানা ও পুলিশ ফাঁড়িকে জনগণের আস্থার আশ্রয়স্থল করে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি, সফলও হয়েছি।

পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ সব থানায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ চেয়ার প্রতীকী হলেও নতুন প্রজন্ম যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করে, সে কারণে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠায় পর্যায়ক্রমে ইউনিয়নভিত্তিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবিষয়ক মিটিং ও সুধী সমাবেশ করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। এছাড়া সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী ও পুরুষ সদস্যদের পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

নড়াইল সদর থানার এক গৃহবধূকে গলা কেটে ও পুড়িয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং তদন্তে আমার সহায়তার কারণে মামলার রহস্য উদঘাটনসহ মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে মূল আসামিকে সহযোগীসহ গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। 

নড়াইলে যোগদানের পর থেকে সেবাগ্রহীতাদের থানামুখীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। যার ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে থানাগুলো সেবাগ্রহীতাদের কাছে সেবাকেন্দ্রে পরিগণিত হয়েছে। পুলিশের সক্ষমতা, পেশাদারত্ব ও উৎকর্ষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল ফরেনসিক প্রশিক্ষণ, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনবিষয়ক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও উন্নয়ন কোর্সসহ শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে পুলিশ লাইন্সে নিয়মিত নানামুখী প্রশিক্ষণ এবং ক্রীড়া ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।