চিত্রা, মধুমতী, নবগঙ্গা, আফরা, কাজলাসহ সাতটি নদীবেষ্টিত শতাধিক খাল ও কয়েকটি বড় বিলে সমৃদ্ধ নড়াইল জেলা। এ জেলার রয়েছে তেভাগা আন্দোলন ও নীল বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাস। দেশভাগের পর ভাষা আন্দোলন এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ানোর বীরত্বগাথাও রয়েছে নড়াইলবাসীর। ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের জেলা হিসেবে পরিচিত নড়াইলে আগমন ঘটেছে আধ্যাত্মিক সাধক, ফকির, দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকদের।
এ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন বর্তমান সময়ের অনেক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও ক্রীড়াবিদ। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, জারি সম্রাট মোসলেম উদ্দিন, চারণ কবি বিজয় সরকার, উপমহাদেশের বিখ্যাত সেতার বাদক রবিশঙ্কর, নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর, কথাসাহিত্যিক ড. নীহাররঞ্জন গুপ্ত, সুরকার কমল দাশ গুপ্ত, ক্রীড়াজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ও নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার জন্মস্থান এ জেলায়।
নড়াইলের নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত প্রচলিত। জনশ্রুতি আছে নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট নড়ি থেকে নড়াইল নামের উৎপত্তি। নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনামলে তার এক কর্মচারী মদনগোপাল দত্ত নৌকাযোগে সপরিবারে কিসমত কুড়িগ্রাম আসেন। এখানে তিনি কচুরির ধাপের ওপর ধ্যানরত অবস্থায় নড়িয়াল ফকিরকে দেখতে পান। মদনগোপাল দত্ত নত হয়ে তার আশীর্বাদ কামনা করেন। ফকির প্রীত হয়ে তাকে তার হাতের নড়ি (লাঠি) উপহার দেন এবং ওই এলাকা আবাদ করার নির্দেশ দেন। ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তিনি কুড়িগ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে ওই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হয়। নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট তাই নাম হয় নড়িয়াল। পরবর্তী সময়ে লোকমুখে বিকৃত হতে হতে নড়িয়াল থেকে নড়াইল নামের উৎপত্তি।
গবেষক এসএম রইস উদ্দীন আহমদের মতে, অবশ্য লড়েয়াল থেকে নড়াইলের উৎপত্তি। যারা শত্রুর বিরদ্ধে লড়াই করে স্থানীয় ভাষায় তাদের লড়ে বলে। হজরত খানজাহান আলীর সময়ে রাজ্যের সীমান্তে সীমান্ত প্রহরী নিয়োজিত ছিল। নড়াইল এলাকা নদী-নালা-খাল-বিলবেষ্টিত। তাই খাল কেটে রাজ্যের সীমান্তে পরিখা তৈরি করা হতো। খাল বা পরিখার পাশে চওড়া উঁচু আলের ওপর দাঁড়িয়ে লড়ে বা রক্ষী সেনারা পাহারা দিতেন। এভাবে লড়েয়াল থেকে লড়াল>নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে।
আরেকটি প্রচলিত মত, নড়াইল নামের উৎপত্তি মূলত নড়ানো থেকে। বাংলাদেশে অনেক স্থানের নামের সঙ্গে ‘ইল’ প্রত্যয় যুক্ত আছে; যেমন—টাঙ্গাইল, ঘাটাইল, বাসাইল, নান্দাইল ইত্যাদি। প্রত্যেকটি স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিংবদন্তি বা লোককাহিনী প্রচলিত। একটি বড় পাথর সরানোকে কেন্দ্র করে নড়াল বা নড়াইল নামের উৎপত্তি বলে মনে করেন কেউ কেউ। (তথ্যসূত্র: জাতীয় তথ্য বাতায়ন)
প্রায় সাড়ে সাত লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ৯৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নড়াইল মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ। জেলা হিসেবে আত্মমর্যাদা লাভের পর পরই অফুরন্ত সম্ভাবনার দুয়ার নিয়ে নড়াইল বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একসময় এ জেলাকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনগ্রসর জেলা হিসেবে অনুমান করা হলেও বর্তমান সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নড়াইলকে খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার কানেক্টিং হাবের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজীকরণ করতে বর্তমানে যশোর-নড়াইল-কালনা সড়ক, নড়াইল-কালিয়া, নড়াইল-মাগুরা, নড়াইল-ফুলতলা, লোহাগড়া-মহম্মদপুর সড়কের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। পদ্মা সেতু ও কালনা সেতু নির্মাণের ফলে নড়াইল জেলা এশিয়ান হাইওয়েতে প্রবেশ করে খুলনা বিভাগের উদীয়মান জেলা হিসেবে সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ হওয়ায় ঢাকা থেকে নড়াইলের দূরত্ব হয়েছে মাত্র ১২০ কিলোমিটার। বলা যায় রাজধানী থেকে সময়ের ব্যবধান হয়েছে মাত্র দুই-আড়াই ঘণ্টা।
অন্যদিকে এখান থেকে বেনাপোল স্থলবন্দরের দূরত্ব মাত্র ৭৪ কিলোমিটার, সময়ের ব্যবধান এক ঘণ্টা। নড়াইলের ওপর দিয়ে ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি নড়াইল সদর এবং লোহাগড়া উপজেলায় রেলস্টেশন নির্মাণ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ঢাকা-কলকাতা ট্রেন যাতায়াত এ জেলার ওপর দিয়েই হবে। সড়ক, নৌ ও রেলপথের উন্নয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় এবং অর্থ সাশ্রয় হবে, যা শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনপ্রাপ্তির পর এ সম্ভাবনা আরো দৃঢ় হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিনিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া বিসিক শিল্পনগরীর প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এরই মধ্যে শিল্পবান্ধব জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভের ফলে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এখানে শিল্প-কারখানা স্থাপন শুরু করেছে। অনেকেই শিল্প-কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।
কৃষি ক্ষেত্রে নড়াইল সমৃদ্ধ স্থানে থাকায় নিজস্ব চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষত নড়াইলে প্রচুর পাট ও গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়। কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে এখানে পাটকল ও মাছ সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব বাস্তবায়ন হলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ রফতানি আয়বর্ধক জেলা হিসেবে নড়াইল নবমাত্রায় রূপ পাবে এবং এ অঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আধুনিকায়নের ফলে নড়াইলের অন্য একটি সম্ভাবনা নতুন করে হাতছানি দিয়েছে, তা হলো পর্যটন শিল্পের বিকাশ। সংস্কৃতিসমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী নড়াইলে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য রয়েছে প্রাচীন মন্দির। জোয়ার ভাটার চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত নড়াইলের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রানী রাসমণি ও জমিদার গৌরী সেনের বাড়ি, সুলতান কমপ্লেক্স, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, বাঁধাঘাট, হাটবাড়িয়া জমিদারবাড়ি, নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের বাড়ি, নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি, কমল দাশ গুপ্তের বাড়ি, পণ্ডিত রবিশঙ্করের আদি নিবাস, ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির শ্বশুরবাড়ি, ঐতিহাসিক গোয়ালবাথান মসজিদ, সর্বমঙ্গলা কালীবাড়ী মন্দির। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। জাতীয় জাদুঘরে রাখা ঐতিহ্যবাহী খাটটি নড়াইল থেকে নেয়া।
আধুনিক বিনোদনের জন্য রয়েছে অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব, স্বপ্নবীথি পিকনিক স্পট, নিরিবিলি পিকনিক স্পট, চিত্রা রিসোর্ট ও নৌ-ভ্রমণের সুব্যবস্থা। নাগরিক জীবনের চাহিদা এবং সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে হাটবাড়িয়া জমিদারবাড়ি ডিসি পার্ক নির্মাণ, বাঁধাঘাট দৃষ্টিনন্দনকরণ, সুলতান ঘাট নির্মাণ, এসএম সুলতান কমপ্লেক্স আধুনিকায়নসহ জেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনা আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত ও বিশ্বমানের করার মাধ্যমে নড়াইলকে পর্যটন সম্ভাবনাময় জেলায় পরিণত করতে জেলা প্রশাসন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
অবকাঠামো উন্নয়ন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচার প্রচারণা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে জেলা প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট। এগুলো বাস্তবায়ন হলে নির্মল চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি পর্যটনকেন্দ্রিক এ উন্নয়ন হবে টেকসই উন্নয়ন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে নড়াইল জেলার রয়েছে বিশেষ অবদান। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা অধ্যুষিত জেলা এটি। প্রায় দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধা এ অঞ্চল থেকে যুদ্ধে অংশ নেন। দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠর একজন ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ নড়াইলের কৃতী সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানিবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে শাহাদতবরণকারীর সংখ্যাও একেবারে কম নয়। পাকিস্তানিহানাদার বাহিনী চিত্রা নদীর পাড়ে লঞ্চঘাটের পন্টুনের ওপর ২ হাজার ৮০০ নিরীহ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
রূপকল্প ২০৪১: উন্নত, সমৃদ্ধ ও জ্ঞাননির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে প্রত্যেক নাগরিকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আত্মোন্নয়নে জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নড়াইল জেলার সম্ভাবনাময় সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও দর্শনীয় স্থানগুলো আরো বিকশিত এবং নান্দনিক রূপ দেয়ার জন্য কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে দরকার সমাজের সবর্স্তরের সমন্বিত অংশগ্রহণ, সুচিন্তিত মতামত এবং কার্যকর ভূমিকা।





