আধুনিক পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও জীবিকা সহজীকরণে বীমা কোম্পানি এবং তাদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন পলিসির ভূমিকা অপরিহার্য। ইকোনমিক কাউন্সিল অব কানাডার মতে, আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ-যাবৎকালে যত ধরনের উদ্ভাবন ঘটেছে, তার মধ্যে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কর্তৃক ঝুঁকি বহন অন্যতম। সে অর্থে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি হলো ঝুঁকি বহনকারী প্রতিষ্ঠান। ঝুঁকি বহনের বিনিময়ে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তার কাস্টমারদের কাছ থেকে পলিসি প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। ঝুঁকি বহনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ঝুঁকি বহনের নানা নিয়মকানুন ও পদ্ধতি আয়ত্ত করে। সার্বিক বিবেচনায় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ঝুঁকি বহনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বলা যায়।

প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি বহনের নিমিত্তে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মতো এ রকম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা আছে কি? এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ-বোধক এবং ইতিবাচক। মানুষের জীবনের অতি অসাধারণ কার্যকলাপ তো বটেই, অতিসাধারণ ক্রিয়াকলাপের দিকে লক্ষ করলেও বোঝা যায় মানুষ কতটা ঝুঁকি নিয়ে দিনাতিপাত করে। মানুষের সাধারণ ও দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্যে তার অতিভোরে ঘুম থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠা, প্রাতরাশে খাবারদাবার গ্রহণ, কাজে গমন, পরিবহনে ওঠানামা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গমনাগমন, পাঠদান, পাঠগ্রহণ, ক্রয়ক্ষমতার নিরিখ নির্ধারণ, হাসপাতালে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো, ওষুধ ক্রয় ইত্যাদি কাজ, যা কিনা আমাদের অজান্তেই প্রতিনিয়ত ঘটে এবং এসব কাজে আমরা নিয়োজিত। তুলনামূলক কম ঘটে কিন্তু প্রয়োজনীয় বটে, এমন কাজের মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি-রফতানি, বিনোদন, ভ্রমণ—সে স্থল, জল, আকাশ যে পথেই হোক না কেন—যুদ্ধ, বিগ্রহ, খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টি, ফসলহানি, ব্যবসায় লোকসান এরূপ নানা কাজে ঝুঁকি বিদ্যমান। আবার জীবন-জীবিকার অনুষঙ্গ হিসেবে পরিবহন, জলবায়ু, ব্যাংক, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, আর্থিক ও মূলধনি বাজার এবং প্রতিষ্ঠান সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি রয়েছে। নানা অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যকলাপ যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা, বাটপারি, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে দুর্ঘটনা, মৃত্যু ইত্যাদি কার্যকলাপে অবর্ণনীয় দুর্দশার পাশাপাশি ঝুঁকি তো রয়েছেই। পক্ষান্তরে কিছু আকাঙ্ক্ষিত ক্রিয়াকলাপ, যেমন ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদীক্ষা, দেশ-বিদেশ গমন, বয়ঃপ্রাপ্তি, জন্মদিন ও বিয়ে, বিনিয়োগ—এমন নানা বিষয়ে বীমা কোম্পানি অংশগ্রহণ করে এবং জনজীবন সহজ করে। 

সেবা প্রদানের নিরিখে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত বীমা সেবাগুলোকে নানা ভাগে ভাগ করা যায়। অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমাণ দেশ ও জাতিগুলোয় বীমা কোম্পানি সাধারণত জীবন বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সম্পদ ও ক্ষয়ক্ষতি বীমা—এ কয়েকটি ভাগে বীমা সেবা দেয়। এর বাইরেও বেশ কয়েক ধরনের বীমা সেবার কথা উল্লেখ করা যায়, যেমন দায় ও অপারগতা, দীর্ঘমেয়াদি সেবা, মনোলাইন বীমা, নৌ-বীমা, বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ বীমা ইত্যাদি। প্রচলিত ঘরানায় বীমা সেবা প্রদানে সাধারণত দুই ধরনের সেবার কথা বলা হয়। যেমন জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা। কিন্তু উন্নত বিশ্বে জনগণ এবং নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার কারণে বীমা সেবার প্রচলন হয়েছে। উল্লিখিত বীমা সেবা বা পলিসির পাশাপাশি শস্য বীমা, জলবায়ু বীমা ইত্যাদি নতুন সংযোজন। 

উন্নত বিশ্বে জীবন বীমা সেবার আওতায় বেশ কয়েক ধরনের বীমা পলিসি বা বীমা সেবা দেয়া হয়। যেমন টার্ম ইন্স্যুরেন্স, স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল জীবন বীমা, ‘সেকেন্ড টু ডাই’ তথা জীবনযাপনে টিকে থাকার নিমিত্তে বিভিন্ন ধরনের বীমা সেবা। স্বাস্থ্য বীমার আওতায় উন্নত দেশগুলোয় সেবাগ্রহীতার যেকোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি বীমার আওতায় সেবার যোগ্য। ওইসব দেশে জনস্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় বিধায় প্রচলিত বীমা কোম্পানির আদলে নানা ধরনের হেলথ মেইনটেন্যান্স অর্গানাইজেশন (এইচএমও) ও পয়েন্ট অব সার্ভিস অর্গানাইজেশন (পিপিএস) গড়ে উঠেছে। সেসব দেশে শুধু মানুষের দাঁতের বীমা সেবা দেয়ার জন্যও গড়ে উঠেছে বিশেষায়িত বীমা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষয়ক্ষতিবিষয়ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পক্ষের দায়বিষয়ক বীমা সেবা, ‘ছত্রি বা আমব্রেলা’ বীমা সেবা, অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিষেবা, যেমন বয়স্ক এবং বিশেষ প্রয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় যাদের জীবন নির্বাহ করতে হয়, তাদের জন্যও বীমা নিশ্চিতকরণের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি গড়ে উঠেছে।

উন্নত দেশে তো বটেই, গতানুগতিক ধারার দেশেও বিভিন্ন বিনিয়োগমুখী বীমা ব্যবস্থা বেশ জনপ্রিয়। অন্যতম জনপ্রিয় বিনিয়োগ পলিসি হলো, নিশ্চিত বিনিয়োগ চুক্তি বীমা বা গ্যারান্টেড ইনভেস্টমেন্ট কন্ট্রাক্ট (জিআইসি)। এ ধরনের জিআইসি পলিসি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদের জন্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি জিআইসি পলিসিহোল্ডারকে প্রদত্ত প্রিমিয়ামের বিপরীতে আর্থিক বিনিময়ের নিশ্চয়তা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এককালীন অথবা কিস্তিতে প্রিমিয়াম প্রদানের বিনিময়ে বীমা কোম্পানি জিআইসি পলিসিতে বিনিয়োগকারীকে ভবিষ্যৎ মূল্যের নিশ্চয়তা দেয়। সেক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি একটি পূর্বনির্ধারিত সুদহার (বীমা ব্যবসায় যা ক্রেডিটিং রেট বলে পরিচিত) প্রাক্কলন করে। পলিসিগ্রহীতার সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে অর্থপ্রাপ্তিতে তেমন কোনো ঝুঁকিই থাকে না। এক ধরনের ঝুঁকি থাকে বটে, যেমন বীমা কোম্পানির দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অথবা ব্যবসা গুটিয়ে ফেললে প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

উন্নত দেশগুলোয় তথাকথিত বৃত্তি বীমা বা ‘অ্যানুইটি পলিসি’ বেশ জনপ্রিয়। বলা বাহুল্য, এটিও এক ধরনের বিনিয়োগ বীমা। অগ্রাধিকারমূলক কর ব্যবস্থাপনার আওতায় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবস্থাপক সহজেই এ ধরনের বীমাগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সুবিধা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় এবং সে অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা দেয়। সমাজের অনেক মানুষ বিশেষত যারা নির্ভরশীল ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, তাদের কাছে এ ধরনের বৃত্তিমূলক বীমা খুবই জনপ্রিয়। এ অর্থে এ ধরনের পলিসি জনসেবামূলকও বটে।

‘মনোলাইন ইন্স্যুরেন্স পলিসি’ যেকোনো দেশের আর্থিক ও মূলধন বাজার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ধরনের বীমা পলিসির ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মনোলাইন বীমা পদ্ধতির উদ্ভব ঘটে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। আমেরিকায় ১৯৭১ সালে আম্বাক ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ এবং ১৯৭৩ সালে মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন বা এমবিআইএ সর্বপ্রথম এ ধরনের বীমা চালু করে। মনোলাইন বীমা পলিসির আওতায় বিশেষত মূলধন বাজারে প্রবেশের নিমিত্তে যেসব কোম্পানি বাজারে বন্ড চালু করে, তারা বিশেষ সুবিধা পায়। সহজ করে বলতে গেলে, বন্ড বা ঋণপত্র ইস্যুকারী কোম্পানি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে কোনো কারণে তারা তাদের ইস্যুকৃত বন্ডে বিনিয়োগকারীদের সুদ কিংবা আসল অর্থ পরিশোধে অপারগ হলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তাদের পক্ষে বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য দায় মেটাবে। বিনিময়ে বন্ড ইস্যুকারী কোম্পানি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে প্রিমিয়াম দেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় বড় কোম্পানি তাদের মূলধনস্বল্পতা মেটানোর জন্য বাজারে বন্ড বা ঋণপত্র ইস্যু করে এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক অপারগতা ঝুঁকি মেটানোর চুক্তি থাকায় জনসাধারণের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। হালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন মিউনিসিপ্যাল বন্ড, কোলেটারাল লোন অবলিগেশন বা সিএলও, কোলেটারাল ডেট অবলিগেশন বা সিডিও ইত্যাদি বন্ড বা ঋণপত্র মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই পছন্দের বিনিয়োগ। এসব বিনিয়োগ জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কর্তৃক মনোলাইন বীমা পলিসির নিশ্চয়তা। বলা বাহুল্য, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের মালিকানাধীন বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে অ্যাস্যুরেন্স ২০০৭ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে সাব প্রাইম লোন ক্রাইসিসের সময়ে মনোলাইন পলিসি নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে বন্ড ইস্যুয়ারদের বড় আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশের অনেক বীমা কোম্পানি ও বীমা ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেটের এ ধরনের দৃষ্টান্ত অনুকরণ করতে পারেন।

জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থবিত্তে এগিয়ে থাকা দেশগুলোয় ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণ একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। হোক সে জীবন বীমা অথবা সাধারণ বীমা, একটি সভ্য দেশে মানুষ কোনো না কোনো বীমা পলিসির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। জাপানে যেমন জাপানিজ নাগরিকদের পাশাপাশি সে দেশে বসবাসরত বিদেশীদের জন্যও বীমা পলিসি বাধ্যতামূলক। স্বাস্থ্য বীমা কেউ যদি গ্রহণ না করেন, তাকে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো ও হাসপাতাল খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তুলনামূলক কম খরচে বীমা পলিসি গ্রহণকারী ব্যক্তি স্বাস্থ্যসেবা ভোগ করেন। উল্লেখ্য, ওইসব দেশে বীমা পলিসি গ্রহণকারী নিট লাভের অংশীদার। বিষয়টি এ রকম যে বীমা পলিসির জন্য কোনো নাগরিক যে অর্থ দেন, বিনিময়ে তার চেয়ে ঢের বেশি সেবা পান। সেজন্য তারা নিয়মিত ডাক্তার দেখান, হাসপাতাল যান, ওষুধ কেনেন এবং সব পরিচর্যায় তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, হাসপাতাল ও তার সেবাসংশ্লিষ্ট সরবরাহ শিল্প সবসময়ই মুনাফামুখী থাকে। এভাবে ইন্স্যুরেন্স পলিসি ও তার সুদক্ষ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট নানা খাত ভালো ব্যবসা করে এবং মুনাফা অর্জন করে, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশ ও জাতীয় উন্নয়নে সম্যক ভূমিকা পালন করে।

উন্নত দেশগুলোয় নাগরিকরা যেখানে ইন্স্যুরেন্স ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর কথা ভাবতেই পারেন না, সেখানে অনেক দেশ আছে যেখানে মোটর ইন্স্যুরেন্স আবার বাধ্যতামূলকও নয়। অনেক অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় অনেকে। একজন ব্যক্তি মারা গেলেও নিঃস্ব হয়ে পথে বসে মৃত ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল পরিবার। এক্ষেত্রে জীবন বীমা ও মোটর বীমা যৌথ ভূমিকা পালন করতে পারত। উদ্ভূত দুর্ঘটনা এড়ানো না গেলেও দুর্ঘটনাকবলিত মৃত বা অঙ্গহানি হওয়া ব্যক্তি এবং তার পরিবার সহজেই বীমা পলিসির আওতায় ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। অন্যদিকে দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন বীমার আওতায় থাকলে সেসব যানবাহনের মালিকপক্ষেরও ন্যূনতম সান্ত্বনার একটি জায়গা থাকত।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, অনেক উন্নত দেশেই যেখানে শতভাগ নাগরিক বীমা পলিসির আওতায়, সেখানে বাংলাদেশের চিত্রটি শুধুই হতাশার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলওর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওডব্লিউআইডি কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে কানাডা, জাপান, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি ওইসিডি বা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে ১০০ শতাংশ নাগরিক ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাভুক্ত ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ বীমা সেবা পেত। তবে এশিয়ার অনেক দেশ এমনকি বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারতেও এ হার তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ওই সময়ে পাকিস্তানে প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ ইন্স্যুরেন্স সেবা পেলেও ভারতে তা ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যতিক্রম ছিল শ্রীলংকা, যাদের ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাধীন জনসংখ্যা প্রায় শতভাগ।

বিস্তারিত আলোচনা ও সার্বিক বিবেচনায় এটা অনস্বীকার্য যে বীমা পলিসির মাধ্যমে একটি দেশের জনগণের জীবন-জীবিকা, পরিসম্পদ ও স্বাস্থ্যসেবার মানদণ্ড পরিমাপ করা যায়। কোনো দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও তার অগ্রগতি অর্জন এবং তা ধরে রাখার জন্য সর্বস্তরে বীমা সেবা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এ দেশে বর্তমানে জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে প্রায় ৭৮টি বীমা কোম্পানি বীমা সেবা দিয়ে আসছে। হাতেগোনা কিছু বীমা কোম্পানি ব্যবসায়িক দিক থেকে সফল হলেও অনেক কোম্পানির অবস্থা খুব বেশি সুখকর নয়। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে বিভিন্ন বীমা পলিসি জনপ্রিয় করে তোলার জন্য একদিকে কোম্পানিগুলোকে নিত্যনতুন উদ্ভাবনী সেবা নিয়ে আসতে হবে, সেসব সেবা সবার কাছে খুব সহজে বোধগম্য করে তোলার জন্য ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়া দরকার, অন্যদিকে সরকার ও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে এগিয়ে আসতে হবে বীমা খাতে সুশাসন ও সুনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে। বীমা পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে আখেরে লাভবান হবেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি জনসাধারণ। জনস্বার্থেই বীমা খাতের সম্প্রসারণ হওয়া জরুরি।

 

ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক