কেমন চলছে দেশের বীমা খাত?

আমি মনে করি বীমা খাত মোটামুটি ভালোই চলছে। কারণ স্বাধীনতার পরে অনেক দিন পার হলো, এ খাতের দিকে মালিক, বোর্ড, সরকার কেউই তেমন নজর দেয়নি। এখানে দুটি সেক্টর। একটি হলো লাইফ, আরেকটা হলো নন-লাইফ।

এ দেশের জনগণ বীমা শিল্পের ওপর তেমন আস্থাশীল নয়। আমরা যখন সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিই, তখন আমরা কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়মের মধ্যে কাজ করি। মানুষের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে তার মৃত্যুর দাবি দেব। মানুষের টাকা সময়মতো লাভসহ ফেরত দেব। মানুষকে বীমা শিল্পে তাদের সার্ভিস দেব। এটি হলো আমার আদর্শ। 

কোম্পানির পরিচালকরা পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করলে ও  এমডি সে কাজে বাধা দিলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

এ কথাটা ঠিক না। এমডিকে নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। আইডিআরএ মানে আমি বলব সরকার। আমরা সুপারিশ করি। আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া তাকে বহিষ্কার করতে পারব না, নিয়োগ বাতিল করতে পারব না। এছাড়া একজন এমডি আইডিআরএ বা সরকারের কাছে অভিযোগ করলে আমার ডিরেক্টরশিপ, আমার চেয়ারম্যানশিপ থাকবে না। আমি মনে করি, এমডি ও ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী হলে পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা পাবে।

আপনার দৃষ্টিতে বীমা খাতে মূল সমস্যা আস্থার সংকট?

অবশ্যই। একজন লোক আমার কাছে প্রিমিয়াম দেয়। আমার কাছে কেন দেয়? সে দেয় তার মৃত্যু হলে নিয়মমাফিক তার ক্লেইম পাবে। বলতে দ্বিধা নেই, কিছু কোম্পানির এমডি কোম্পানিগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চালাচ্ছেন। তারা যে খরচ করছেন, এ খরচের ফলে কোম্পানির টাকা জমছে না। আবার কিছু কোম্পানির টাকা জমছে। সে হিসাবে বলতে দ্বিধা নেই মেটলাইফ, আস্থা লাইফ, এলআইসি কোম্পানিগুলো কীভাবে চলছে, আমাদের তাদের থেকে জানতে হবে। তারা কীভাবে চলছে, কীভাবে চলে লাভবান হচ্ছে, তারা কিন্তু সার্ভিস দিচ্ছে মানুষের।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি কোম্পানির মালিক, বোর্ড, এমডিসহ বড় বড় কর্মকর্তা বড় বড় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন বলে আমরা দেখতে পেয়েছি। আপনি কি মনে করেন, এতে এ খাতের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে?

যারা এমন অন্যায় কাজ করেন, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে এক-দুই কিংবা পাঁচটি অন্যায় করতে পারে। অবশিষ্ট কোম্পানি কিন্তু অন্যায় করেনি।

সম্প্রতি কিছু ঘটনা ঘটছে, যেগুলো নিয়ে মামলা হয়েছে। যেহেতু বিষয়গুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আমি বলব এ খাতের সঙ্গে জড়িত সরকার, আইডিআরএসহ সব পক্ষই—সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের বীমা খাত এগিয়ে নিতে কিংবা উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে বীমার পরিধি বাড়াতে আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে কী করণীয় বলে মনে করছেন?

আসলে এ কাজে জড়িত ম্যানেজিং ডিরেক্টর আর ম্যানেজমেন্টকে সঠিক ও সত্ভাবে প্রকৃত বীমা আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। শুধু মালিক কিংবা বোর্ডকে দোষ দিয়ে হবে না। এমডিদেরও সঠিক পথে এগিয়ে আসতে হবে। এমডি যদি বিশ্বে খাতটি যেভাবে চলছে সেই আলোকে আমাদের দেশে পরিচালনার চেষ্টা করেন, তাহলে বীমা খাত এগিয়ে যাবে।

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে আইডিআরএ খুবই দুর্বল। তাদের জনবল কম। আবার তাদের আইনের বিধিবিধান এখনো পুরোপুরি হয়নি। আর আইডিআরএর কাজ নিয়ে নানা কথা রয়েছে। সর্বোপরি যথার্থ আইন, আইডিআরএকে শক্তিশালী ও এমডির নেতৃত্বে কর্মচারীদের সততার সঙ্গে প্রকৃত আইন মানার মধ্য দিয়ে বীমা খাত এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কাউন্সিলের মতো আইডিআরএকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে অন্যান্য আর্থিক খাতের মতো বীমা খাতে করপোরেট সুশাসন নেই। আপনি যেহেতু নিজেই একটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার, তাই এ বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

করপোরেট সুশাসন বিষয়টি প্রয়োজন। কিন্তু আইডিআরএ শক্তিশালী না হলে করপোরেট সুশাসন কীভাবে গড়ে উঠবে? আমার যদি এমডির প্রতি আস্থা না থাকে, বোর্ড যদি খেয়াল না করে এমডি কোটি কোটি টাকা অপচয় করলেন, তাহলে এ কোম্পানি অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হবে। তাই বোর্ডের প্রয়োজন। মাঝে মাঝে বোর্ডও অন্যায় কাজ করতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বোর্ডের যথার্থ পদক্ষেপেই এমডি কাজ করেন।

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত