বাংলাদেশে
তৃতীয়বারের মতো
বীমা দিবস
পালিত হতে
যাচ্ছে। এবার
দিবসের প্রতিপাদ্য
হচ্ছে ‘বীমায়
সুরক্ষিত থাকলে
এগিয়ে যাব
সবাই মিলে’।
এরই মধ্যে
কভিড-১৯
মহামারীর আমরা
দুই বছর
পার করছি।
কভিডের মধ্যে
থেকে বীমা
দিবস উদযাপন
কেমন হবে
বলে মনে
করছেন?
আমি
মনে করি, দিবসটা বীমা শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই করোনার মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে বীমা দিবসে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনরা এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করবেন। ১ মার্চ (আজ) ৭৯টি বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের নিজস্ব উদ্যোগে শোভাযাত্রা বের করবেন। অফিসগুলোয় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রচারণার অংশ হিসেবে ট্রাক সুসজ্জিত করে শহরে প্রদক্ষিণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসবের মাধ্যমে বীমা সম্পর্কে মানুষের যে আস্থার সংকট, সেটা অনেকাংশে দূর হবে।
দেশের
বীমা শিল্পে
এখন পর্যন্ত
কী ধরনের
অগ্রগতি হয়েছে
বলে আপনি
মনে করেন?
বীমার
অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। তবে বর্তমান সরকারের যে বিভিন্ন উদ্যোগ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও আইডিআরের (বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) সমন্বয়ে প্রবাসীদের জন্য বীমা, শস্য বীমা, কৃষি বীমা, প্রতিবন্ধীদের জন্য বীমা—যা আজ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন—বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা এবং সর্বোপরি ব্যাংক ইন্টারেস্টসহ গৃহীত উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে আশা করছি বীমা শিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
এবারের
প্রতিপাদ্য বিষয়—‘বীমায়
সুরক্ষিত থাকলে
এগিয়ে যাব
সবাই মিলে’।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
কিছু বীমা
কোম্পানির বিরুদ্ধে
বীমা দাবি
পরিশোধ না
করার অভিযোগ
রয়েছে। যদি
এই হয়
অবস্থা তাহলে
গ্রাহকদের সুরক্ষা
মিলবে কীভাবে?
বীমা
দাবি পরিশোধ করাটা ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির জন্য একটি যুগান্তকারী বিষয়। ২০২০ সালের প্রথম থেকে কয়েক মাস বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব যখন ছিল করোনায় জর্জরিত, লকডাউনে সব ধরনের অফিস-আদালত বন্ধ ছিল, গাড়ির চাকাও ঘোরেনি, সে সময় আমরা ২০২০ সালে ১ লাখ ৮৮ হাজার গ্রাহককে তাদের এলাকায় গিয়ে ছোট ছোট উঠান বৈঠক করে ৭৯৯ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ করেছি। এভাবে দাবি পরিশোধ করার ফলে আমাদের গ্রাহক আরো বেড়ে গেছে। তাই ২০১৯ সালে কোনো করোনা না থাকা বছরের চেয়ে ২০২০ সালে আমরা ২০০ কোটি টাকারও বেশি প্রিমিয়াম আনতে সক্ষম হয়েছি। ২০১৯ সালে আমাদের প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ১ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা। গ্রাহকদের আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় এটা করা সম্ভব হয়েছে। ২০২১ সালেও দুই লাখ গ্রাহকের ৮৭২ কোটি টাকা দাবি পরিশোধ করেছি। এর বিপরীতে আমরা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছি ১ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু কোম্পানির দাবি পূরণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভালো কোম্পানিগুলোকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। তাই আমি বলব সরকার ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে আরো কঠোর নজরদারি করে এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ গ্রাহকের দাবি সময়মতো পরিশোধ করলে বীমা শিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
বীমা
শিল্পের অগ্রগতির
জন্য কোন
দিকটিতে আরো
নজর দেয়া
প্রয়োজন বলে
আপনি মনে
করেন?
বিগত
দিনে বীমা খাত পিছিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এক কোম্পানির দক্ষ কর্মীকে ছাড়পত্র ছাড়াই আরেক কোম্পানি বড় অফার দিয়ে নিয়ে যেত। এমনকি এক কোম্পানিতে দুর্নীতি করার পরও অন্য কোম্পানির বিশাল বিশাল দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া কিছু কোম্পানি ১০০ টাকা প্রিমিয়াম আনতে গিয়ে ১৫০ টাকা খরচ করেছে। যেকোনো লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রথম ১০ থেকে ১২ বছর প্রিমিয়াম গ্রহকদের কাছ থেকে নিয়ে আসে। সুতরাং অন্তত ১০ বছর আগে তার টাকা ফেরত দেয়া লাগছে না। ওই কোম্পানিগুলো যদি মনে করে, ১০ বছরে যা প্রিমিয়াম পেয়েছি, সব আমার টাকা, তারা যদি অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় করে ফেলে, সে কোম্পানি মেয়াদ শেষে গ্রাহকের দাবি কীভাবে পরিশোধ করবে! এ ধরনের কিছু কোম্পানির কারণে বাজারে কিছুটা অস্থিতিশীলতা রয়েছে। যেসব কোম্পানি বর্তমান দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা করছে, তাদের কঠোর হাতে নজরদারি করতে হবে। এজন্য সরকার ও আইডিআরকে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বর্তমানে
যে আইনি
কাঠামোর মাধ্যমে
বীমা খাত
পরিচালিত হচ্ছে,
সেখানে কোনো
ধরনের সংস্থার
প্রয়োজন রয়েছে
বলে মনে করেন?
বীমা
শিল্পের উন্নয়নে সরকার বর্তমানে যে যুগোপযোগী পরিকল্পনাগুলো হাতে নেয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে আমি মনে করি, বীমা খাত আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে। স্বাস্থ্য বীমা, গ্রুপ বীমা, ব্যাংক ইন্স্যুরেন্স এগুলো বাস্তবায়নে সরকার যেভাবে মনিটরিং করছে, তাই আশা করা যায় সামনে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল। তবে দেশের জিডিপিতে বীমার অবদান বাড়াতে হবে। ভারতে বীমা শিল্প জিডিপিতে ৪ শতাংশ অবদান রাখছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপিতে বীমা শিল্পের অবদান ৪ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সে তুলনায় অনেক পেছনে রয়েছি। এ বিষয়ে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরকে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
বীমা
খাতের সেবার
মান আন্তর্জাতিক
পর্যায়ে উন্নীত
করতে কী
করণীয়?
সেবার
মান আরো উন্নীত করতে হবে। বিশেষ করে জীবন বীমার সেবা ঠিকমতো দিলে মানুষ খুশি হয়। এ বীমা একদিকে যেমন মানুষের জীবন রক্ষা করে, অন্যদিকে তার সম্পদও সুরক্ষিত করে। তাই আমি বারবার জোর দিয়ে বলতে চাই, গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে। কোনো কোম্পানি যদি সময়মতো দাবি পরিশোধ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশে
বীমা খাতের
বর্তমান অবস্থা
ও ভবিষ্যৎ
নিয়ে আপনি
কতটুকু আশাবাদী?
১৯৮৫
সালে একমাত্র ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স বেসরকারি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ছিল। এরপর ১৯৮৬ সালে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ১৯৯০ সালে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি—এভাবে ধাপে ধাপে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৫টি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে। এসব লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে একটি মার্কেট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমাদের জনসংখ্যা, মাথাপিছু আয় ও শিক্ষার হার বেড়েছে। এজন্য আমি মনে করি, বীমা খাতের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেসবাহুল হক





