আগামী বছরটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে— প্রতি ডিসেম্বরে এমন ঘোষণা দেয়া যেন গতানুগতিক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলটির বছর বছর একই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ায় প্যাটার্নটা পরিচিত হয়ে উঠেছে: ইউরোপের ১২ মাস কাটবে উত্তাল বিশৃঙ্খলায়, এমন কিছু ঘটনা ঘটবে, যার জন্য এটি মোটেই প্রস্তুত থাকবে না, তড়িঘড়ি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে নেয়া হবে স্বল্পস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং গভীরের কাঠামোগত ইস্যুগুলো সমাধানের বাইরে থেকে যাবে। এরপর নতুন বছর আসবে এবং আবার সংকট তৈরি হবে, ফের ইইউ স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবেলা প্রক্রিয়ায় আটকা পড়বে। এখন প্রশ্ন হলো, ইইউর পক্ষে ২০১৮ সালে কি এ বৃত্ত ভাঙা সম্ভব হবে?
এর উত্তর হলো, হয়তো পারবে। প্রায় এক দশক ধরে চলা নিরন্তর নাটকের (আর্থিক বিপর্যয়, এরপর ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা ও ক্রাইমিয়া দখল, অভিবাসন সংকট, ব্রেক্সিট ভোট এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও নির্বাচিত ব্যক্তির ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা) পর ইউরোপ ২০১৮ সালে প্রবেশ করছে অনেকটা স্থিতিশীল অবস্থা নিয়ে।
ইউরোপের সীমান্তগুলোয় এখন কোনো সংকট ঝুলছে না, এমনকি ফ্যাকাসে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক আউটলুকও স্থিতিশীল রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০১৭ সালে ইউরোপের সবচেয়ে বড় তিন অর্থনীতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এগুলোয় নতুন করে কোনো জনসমর্থিত বিদ্রোহ তৈরি হয়নি। ফ্রান্সে এখন রয়েছে ‘প্রো-ইউরোপীয় প্রেসিডেন্ট’ ইমানুয়েল মাখোঁ, জার্মানিতে প্রো-ইউরোপীয় মহাজোটের উত্থান ঘটছে এবং অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিভক্তি থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ নেতৃত্ব একটি ‘ডিভোর্স বিলে’ ইইউ অংশীদারদের সঙ্গে একমত হতে পেরেছে (এ বিল চলমান মধ্যস্থতায় একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে)। ইতালি একমাত্র বৃহৎ ইইউ দেশ, যার নির্বাচন ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাজনীতিকে ছাপিয়ে নীতি তৈরিতে জোর দেয়ার জন্য ইউরোপের হাতে এখন সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সুযোগ রয়েছে ওইসব সংস্কার আনার, যা আরো সমৃদ্ধিশালী, নিরাপদ ও প্রগতিশীল আগামীর জন্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন। ইইউর হাতে নষ্ট করার মতো সময় একদম নেই। কারণ ২০১৯ সাল যে একটি জটিল বছর হতে যাচ্ছে, তা এখন থেকে অনুমেয়, কেননা এ বছর রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন, নতুন ইউরোপিয়ান কমিশনের নিয়োগ এবং ব্রেক্সিট চুক্তির জন্য ডেডলাইন।
বিভিন্ন খাতে উন্নতি করার জন্য এখন ইউরোপের হাতে ১২ মাস রয়েছে। এ খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে সাধারণ প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি ঐক্য, শেনজেন সংস্কার ও ব্যাংকিং ঐক্য। তবে আগামী এক বছরের জন্য তিনটি জায়গায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— একটি অভ্যন্তরীণ, একটি অঞ্চলিক ও একটি বৈশ্বিক।
প্রথম যে জায়গাটিতে উন্নতি দরকার তা হলো, একটি একক ডিজিটাল মার্কেট প্রতিষ্ঠা। ২০১৫ সালে ইইউ চালু করেছিল ‘ডিজিটাল সিঙ্গেল মার্কেট স্ট্র্যাটেজি’, যার উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের ডিজিটাল খাতকে একটি উড়ন্ত সূচনা দেয়া। এরপর থেকে এ খাতে কিছু উন্নতি হয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যে রোমিং চার্জ নিত, তা বাদ দেয়া, এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে দারুণ জনপ্রিয় একটি উদ্যোগ।
কিন্তু এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যা ইউরোপের কোম্পানিগুলোকে বড় হতে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে এবং শিল্প জায়ান্টদের দখল করা বাজারে মুখোমুখি দাঁড়াতে সহায়তা করবে, তা তৈরি করতে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। এবং যেহেতু ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-ক্লদ ইয়ুংকারের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালে, তাই ২০১৮ সালই হবে এ কাজ করার সঠিক সময়।
দ্বিতীয় জায়গাটা হলো আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক। অভিবাসন সংকট দেখিয়ে দিয়েছে এ দুই মহাদেশের ভবিষ্যৎ কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এখন পর্যন্ত ইউরোপের আফ্রিকা নীতি কতখানি অকার্যকর। আফ্রিকা নিয়ে মনোভাব পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়ার এবং তা ভাঙার রেকর্ড রয়েছে ইউরোপের।
ভালো সংবাদ হলো, মনোভাবের পরিবর্তন আসার এবং উৎপাদনশীল ও ফলাফলভিত্তিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা হয়তো অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে এবং এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এ খেলায় ইউরোপের কিছু স্বার্থ ভালোভাবে জড়িয়ে গেছে: এটি যদি আফ্রিকায় শাসন স্থিতিশীল রাখা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য কাজ না করে, তবে এর ওপর আভিবাসন চাপ বাড়তেই থাকবে এবং একসময় চরমে পৌঁছাবে। আর প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরার্থপরতার চেয়ে নিজ স্বার্থ অনেক বেশি শক্তিশালী অনুপ্রেরণাদায়ী হয়ে কাজ করে।
এক্ষেত্রে সফলতার জন্য প্রয়োজন পড়বে অতীতের পিতৃত্ববাদ বা কর্তৃত্ববাদ থেকে ইউরোপের সরে আসা এবং সমান সহযোগিতার দিকে এগিয়ে চলা। অভিবাসন স্রোত থামাতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান বাদ দিতে হবে এবং এমন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা এ স্রোতের মূল কারণগুলোর (যার অন্যতম ও সবচেয়ে মৌলিক— দুর্বল শাসনব্যবস্থা) সমাধান করবে। এক্ষেত্রে আফ্রিকা ও ইউরোপকে অবশ্যই একসঙ্গে ও সমানভাবে কাজ করতে হবে।
ইইউ-আফ্রিকান ইউনিয়ন সম্মেলনে একটি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। উপরে যেভাবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে, তা শুরু করার একটি ইঙ্গিত এ পরিকল্পনায় পাওয়া যায়। এ পরিকল্পনায়
সাহায্য নয়, বরং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এর বেশির ভাগই দেয়া হবে গ্যারান্টি বিধানের মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন হলো, নিজ প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সময়, প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই মহাদেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারকরণ ও সত্যিকারভাবে শাসন ব্যবস্থা সংস্কারে ইউরোপ চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত কিনা।
তৃতীয় জায়গাটা হলো, জলবায়ু নীতি ক্ষেত্র। জলবায়ু নীতিতে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে নিজের ভূমিকা পুনরুদ্ধারে ইউরোপকে অবশ্যই ২০১৮ সালে উন্নতি করতে হবে। ম্যাকরণের সদ্য শেষ হওয়া ‘ক্লাইমেট জাম্বুরি’ বৃহত্তর বৈশ্বিক জলবায়ু নেতৃত্বের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে এমন একটি সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে, বিশেষ করে পরিবেশগত বিষয়গুলোয়।
যুক্তরাষ্ট্র যে শূন্যতা তৈরি করেছে, ইউরোপের উচিত
তা পূর্ণ করা। প্যারিস চুক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম তৈরি পর্যায়ে রয়েছে, তাই বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য এখনই ইউরোপকে দ্রুত সাড়া দিতে হবে। বিশেষ করে, ওইসব ভুল আমলে নিতে হবে, যেগুলোর জন্য ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন বিপর্যস্ত হতে বাধ্য হয়েছিল। বিভিন্ন জোট গঠনে ইইউ’র নমনীয় হওয়া উচিত।
২০১৮ সাল পুরোটাই ইউরোপের জন্য তুলনামূলকভাবে একটি শান্ত বছর হবে, যা ইউরোপকে দেবে গভীরতর ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি সাধনের দুর্লভ সুযোগ। অবশ্যই এ সুযোগ কোনোভাবেই হেলায় নষ্ট করা যাবে না।
লেখক: সাবেক স্প্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ও সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক
ভাষান্তর: সাঈদ সরকার






