বিশ্বে যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, ঠিক তখন সংস্কারবাদীরা চিন্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে কীভাবে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়। যেখানে প্রযুক্তি প্রগতি একই সঙ্গে চালনা শক্তি এবং বাধা হিসেবে গণ্য হচ্ছে, সেখানে এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে প্রযুক্তির শিক্ষাগুলোর বাস্তবিক প্রয়োগ হতে পারে সবচেয়ে ভালো পথ। নীতিনির্ধারক, স্টার্ট আপসের অবশ্যই বিকল্প পথের খোঁজ করতে হবে এবং সেটাই গ্রহণ করতে হবে, যা কার্যকর এবং পরিহার করতে হবে, যা অকার্যকর।
যে বিশ্বে উদারতা, ঐক্যবদ্ধতা ও অন্তর্ভুক্তিতার মানসিকতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই পেন্ডুলাম আজ আবার বিভক্তি, জাতীয়তাবাদ এবং সংঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব আজ অনেকভাবেই ভাঙনের শিকার। উচ্চাকাঙ্ক্ষী বহুপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি বিফল হয়েছে মুখ্য অংশীদারদের সটকে পড়ার কারণে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্বনেতারা করেছিলেন সে আলোও নিভে গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আগের যেকোনো সময়ের থেকে সক্রিয় হয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের একটা জাতিগত আন্দোলনের নামে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে এবং এমন সংকটময় সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জাতিগত মেধাস্বার্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। তার এই লিগ্যাসি কঠোরভাবে চাপিয়ে দিয়েছেন।
বিশ্বায়নের কয়েক দশকে এই বিশ্ব বিভিন্ন আঙ্গিকে অগ্রসরতাকে উপভোগ করেছে। এর মধ্যে আছে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় অভূতপূর্ব উন্নতি এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আয়বৈষম্যের অবনমন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে ভাঙন শুধুই নিষ্ফলা পরিসংখ্যান নয়। বরং এটি একটি বিষণ্ন প্রতিক্রিয়া, যা অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে একটি অপশক্তি প্রবাহ করছে। এর মাঝে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে, কিন্তু একটা সুযোগও আছে, যা একই সঙ্গে একটি বিশ্বকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রগতির দিকে ধাবিত করতে পারে।
অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক চালিকার নিচের দিকের ইন্টিগ্রেশনগুলো অনেক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে একটি বিপ্লব ঘটে গেছে, যা বিশ্বের মানুষগুলোকে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ করেছে; একজন মানুষের সঙ্গে তার সম্প্রদায়, কর্মী ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করেছে। এটা একই সঙ্গে আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে, যা আগে কখনো আমরা উপভোগ করিনি। তবুও মানুষের আরো স্বাধীনতা উপভোগের অদম্য ইচ্ছা, নিজের এবং নিজের সম্প্রদায়ের জন্য উন্নত জীবন ব্যবস্থা উপভোগের বাসনা এতটুকুও কমেনি।
একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধাচরণ করছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলো সবসময় তাদের তথাকথিত পরিচয়কেই সুরক্ষা দিতে চেয়েছে এবং পরিবর্তনের ধারাকে হয় ধীরগতির করেছে আর না হয় পেছনে ধাবিত করেছে, কিন্তু কখনই গ্রহণ করেনি। তবে কিছু রাজনীতিকের জন্য বিষয়টা অনেকটা সহজ কথায়, রাজনৈতিক ব্যবস্থা সবসময় তাদের বিরুদ্ধে জবরদস্ত এক পন্থা, যাদের কোনো ক্ষমতা বা প্রভাব নেই। কিন্তু এই ব্যবস্থাকেই একটি অজানা শক্তি এসে অনেক বেশি কঠিন করার চেষ্টা করছে, যা অতীতে অনেক বেশি সহজ-সরল ছিল।
অবশ্যই আমাদের এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের অসাম্য তৈরি করেছে এবং সেই অসামান্য সাফল্য অসামান্য সততার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। গত কয়েক দশকের প্রবৃদ্ধি একটি উন্নয়ন অংশীদার গোষ্ঠীর অধিকার পূর্ববর্তী অংশীদার গোষ্ঠীর ওপর প্রতিষ্ঠা করেছে, যা উত্থান পর্বে তাদের সম্পদ বিনিয়োগ করার পরিবর্তে কুক্ষিগত করতে শিখিয়েছে। উন্মুক্ত বাণিজ্য কর্মসংস্থানের পুরো হালচিত্র পরিবর্তন করেছে রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরে। আর গত কয়েক দশকের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ঢেউ বিদ্যমান অর্থ ও সমাজ কাঠামোকে আন্দোলিত করেছে কয়েক গুণ বেশি।
এমন অবস্থায় কেউ কেউ সমস্যার সমাধান করেছে কিন্তু সেটাও ভুল প্রেসক্রিপশনে। জাতীয় পর্যায়ে সর্বাধিক প্রযুক্তি ও অর্থগত প্রগতি সার্বক্ষণিক তদারকির বাইরে থাকতে পারে স্টার্টআপ। অথচ এই নতুন ধারা যেকোনো দেশ বা অংশীদারদের থেকেও বড় ও সেখানে স্বার্থপরতা কিংবা সংকীর্ণতার কোনো স্থান থাকতে পারে না। কিন্তু এমনটা ঘটছে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সময়ে নীতিকে অবশ্যই এই নতুন ধারাকে গণ্য করতে হবে, যা এই বিশ্বপটকে পরিবর্তন করছে। সরকার, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা নাগরিক সমাজের সামনে অন্য কোনো উপায় নেই সহযোগিতার নতুন ধারাকে মেনে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা ছাড়া।
একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলার সূত্র মানুষ এখন ভালোভাবে জানে। শিক্ষায় বিনিয়োগ করা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবাহকে সহজতর করতে বাধাগুলোকে প্রতিহত করা এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করার মতো বিষয়গুলো অতি পরিচিত। কিছু দেশের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ অথবা মজুরির নিশ্চয়তা। কোনো দেশের হয়তো ন্যূনতম মজুরি নিশ্চয়তা এবং লিঙ্গবৈষম্যের ব্যবধান কমানো। সরকার, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে এবং নাগরিকদের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, তারা সর্বজনীন কল্যাণকর একটি কাজ করছে।
আধুনিক অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল, এমতাবস্থায় কার্যকরণ কী হতে পারে সেটা আগে অনুমান করা সম্ভব নয়। সঠিক সময়ে রিঅ্যাক্ট না করা একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠানকে অনেকটা অমূল্যায়ন করা। নীতিনির্ধারকদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে কখন কোন কাজটা করতে হবে। তাদের গৃহীত নীতিকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, নীতিটি আসলেই কাজ করেছে অথবা করেনি।
এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো আসলে একটি সৃজনশীল এবং প্রক্রিয়াশীল অর্থনীতিকে নির্দিষ্ট করে, যেখানে অনেক স্টার্ট আপ প্রস্তুত থাকে না এবং সম্ভাবনা থাকলেও যখন সাফল্য আসার কথা, তখন আর টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু তারাই বিচক্ষণ, যারা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে এবং তাদের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।
উপরন্তু প্রযুক্তি আমাদের সব অংশীদারদের মধ্যে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক একটি গোষ্ঠী গঠন করতে শেখায়, যারা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সাহস রাখে। দীর্ঘস্থায়ী অনির্দেশ্য পরিস্থিতিতে নেতাদের অবশ্যই টিকে থাকার পথ খুঁজে বের করাসহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া এবং প্রতিনিয়ত খাপ খাইয়ে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
একটি ভঙ্গুর বিশ্বে নেতৃত্ব অনেকটা চলমান বৈসাদৃশ্যের ওপারে সাম্য ও সৌহার্দের ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে দেখা। সেটার জন্য অবশ্যই ভালো কাজ করে বিফল হওয়ার ঝুঁকি নেয়ার মনোবল থাকতে হবে। সামনে কোনো উপায় নেই এবং আমাদের এই ঝুঁকি নিতে হবে। পেন্ডুলাম কখনই আমাদের স্বপ্নের পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দেবে না এবং সেটার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।
লেখক: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান
ভাষান্তর: হাসান রাহফি






