গত বছর এশিয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সবচেয়ে মর্মঘাতী চোটটি ছিল বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের ঘোষণাটি। মুহূর্তের ব্যবধানে একসময়ের অন্যতম মুক্ত বাণিজ্যের ভূমি হিসেবে পরিচিত আমেরিকা নিজে কক্ষচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাকে নিরবধি এক দিশাহারা অবস্থার দিকে ছুড়ে দিল।

টিপিপি চুক্তিকে অগ্রাহ্য বা অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করার ফলে শুধু যে বাণিজ্য উদারীকরণের অগ্রগতি থমকে গেল তা নয়, স্বয়ং বিশ্ব মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ম ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর পুরোটাই প্রশ্নবিদ্ধ হলো।

রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রগুলোয় অর্থনীতির গভীর এমনকি অবধারিত প্রভাবগুলো বোঝার জন্য আপনার মার্ক্সবাদী হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে অনুভূত হতে শুরু করেছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে চীনের নেয়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া এ অঞ্চলগুলো সর্বসম্মতিক্রমে উপসংহারে পৌঁছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে অপ্রাসঙ্গিকতার উদ্রেক ঘটাচ্ছে।

এটা ঠিক যে, আমেরিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সিলিকন ভ্যালি এখনো বিস্ময়কর সব উদ্ভাবনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাণিজ্য ব্যবস্থার ধরন, বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক মূলধন প্রবাহের প্রকৃতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের যে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে, সেখানে যুদ্ধোত্তর এশিয়ার ওপর প্রতিনিধিত্বকারী দেশ হিসেবে আমেরিকার হদিস আমরা পাই না।

টিপিপি ত্যাগ ছিল প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি। তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই যা বাস্তবায়ন হয়। এর মাধ্যমে ২০১৬ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেশটির রাজনৈতিক শ্রেণীর সমষ্টিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন ঘটে। ব্যর্থতার প্রক্রিয়াগুলো এখনো অব্যাহত। কারণ আমেরিকান নেতৃত্ব কখনো এমন একজনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেনি।

নিজ দেশে ট্রাম্প প্রশাসন তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বুলি আওড়াচ্ছে। আর বাইরে তারা ‘অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ অঞ্চলের একটি অসম্পূর্ণ ধারণা চাপিয়ে দিতে শুরু করেছে। মার্কিন এ মাতব্বরির ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতাগুলো কতটা দোদুল্যমান অবস্থায় শূন্যে ভাসতে থাকবে, আমরা তা এখনো জানি না।

এটি যদি পৃথক দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হয়ে থাকে, তাহলে মার্কিন বাণিজ্যবিষয়ক কূটনীতির যেকোনো পর্যবেক্ষক আমাদের বলে দিতে পারবেন যে, দশকজুড়ে আমরা এমন এক সন্ধি স্থাপন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যার তুলনামূলক ফলাফল খুব নগণ্য হিসেবেই পরিলক্ষিত হবে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলগুলো তাদের অংশে এরই মধ্যে দুটি অসম্ভাব্য উৎস সন্ধান করতে শুরু করেছে, যারা বাণিজ্য উদারীকরণের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। উৎস দুটির একটি চীন, অন্যটি জাপান।

এর মধ্যে টিপিপি ইলেভেন তৈরির মাধ্যমে জাপান টিপিপি চুক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে একমাত্র আমেরিকা ব্যতীত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও আমেরিকা চাইলে পরবর্তীতে তাদের যোগদানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। নভেম্বরে ভিয়েতনামের দা নাংয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক করপোরেশন (এপিইসি) সামিটে কানাডার আপত্তি সত্ত্বেও এ চুক্তির মূল নীতি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও সামিটে ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন। আর চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের অবস্থানকে স্পষ্ট করার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই আর মার্কিন নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত নয়। সর্বাঙ্গীণ ও প্রগতিশীল ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি বাণিজ্য শর্তাবলির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ১১টি দেশের মধ্যে উদার বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

আমরা শুধু এতটুকু আশা করতে পারি যে, ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান— ভবিষ্যতে আমেরিকা পরিচালনার দায়িত্বে যে দলই থাকুক না কেন, তারা যেন তাদের অবস্থানকে স্পষ্ট করে এবং জাপানের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে একটি চুক্তিকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগী হয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে তত্পর হয়।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যে নেতৃত্বের অন্যতম বিস্ময়কর উৎসটির নাম চীন। কয়েক বছর আগে দেশটি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) এর মাধ্যমে তার কার্যক্রম শুরু করে। যদিও এটি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী চুক্তিকে ইঙ্গিত করে না। এটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে রাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে মোট ১৬টি দেশের অংশগ্রহণে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়।

এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতও প্যাসিফিক আঞ্চলের বাণিজ্য উদারীকরণকে আরো এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এপিইসির সদস্য হওয়ার পরও নরেন্দ্র মোদির সরকার এখনো তার রাজনৈতিক মূলধনকে কাজে লাগাতে পারছে না, বরং এককভাবে নিজের জন্য একটি বাণিজ্য উদারীকরণ এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন, কিন্তু দিল্লির কাছে মার্কেন্টালিজম বা বণিকবাদ এখনো জীবন্ত ও স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের ফল, বিশেষ করে টিপিপি ও আরসিইপি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে আমেরিকা দিনে দিনে একটি অসম্পূর্ণ মহাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। যদিও তারা এখনো ভীতিকর সামরিক অভিনেতা হিসেবে পরিচিত, বিশেষ করে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা, যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান বাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিবেচনায় আমেরিকা এখানো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এটি এ অঞ্চলের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন প্রসঙ্গে, যা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।

তবে ওয়াশিংটন ডিসির কিছুসংখ্যক ব্যক্তি মনে করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র এ প্যাটার্নটি দশকব্যাপী ধরে রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু আমরা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমেরিকা এশিয়ার সঙ্গে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক পুনঃসংযোগ সৃষ্টি না করবে, ততক্ষণ অবস্থার অবনতি ঘটবে। বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল অঞ্চল এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্যই বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ।

সুনির্দিষ্টভাবে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি— চীন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা (অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর এশিয়ার চার দেশ) কীভাবে এ পতনের প্রতি সাড়া দেবে তা লক্ষণীয়। তবে যারা নিবিড়ভাবে এ অঞ্চলগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন, তারা একমত হবেন যে, চীনের কৌশলগত কক্ষপথের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অর্থবহভাবে এগোতে শুরু করেছে।

পরিশেষে বলতে পারি, প্রশাসনিকভাবে এশিয়াকে অগ্রাহ্য করে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে এগিয়ে থাকার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তার পরিণতি হিসেবে আমেরিকার অবস্থান সবার নিচে নেমে যাবে।

 

লেখক: অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী, এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সভাপতি

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস