প্রবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতিসহ সব প্রধান সামষ্টিক-অর্থনৈতিক সূচক ইঙ্গিত দেয় যে, ২০১৭ সাল ছিল এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সর্বোত্তম বছর। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিও যে কারো প্রত্যাশার বাইরে ব্যাপকতর, সময়োপযোগী ও সমন্বিত প্রবৃদ্ধি উপভোগ করছে। এখন প্রশ্ন হলো, এ শক্তিশালী নৈপুণ্য ২০১৮ সালে বজায় থাকবে কিনা।
আলোচ্য প্রশ্নের উত্তর অবশ্য নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে আর্থিক, রাজস্ব, বাণিজ্যসহ সম্পর্কিত নীতিগুলোর ওপর। এখনো এটা অনুমান করা কঠিন যে, ২০১৮ সালে কী ধরনের নীতি প্রস্তাব আসবে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধানরা তুলনামূলকভাবে নতুন। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে জার্মানির নেতারা এখনো জোটবদ্ধ (কোয়ালিশন) সরকার গঠন করতে পারেননি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ার নির্বাহী অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অধিকন্তু আর্জেন্টিনা, সৌদি আরব ও ব্রাজিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সংঘটিত প্রধান পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃশ্যপট আরো তমসাচ্ছন্ন করেছে।
সার্বিক এ নিরাশাজনক চিত্রেও এখনো আমাদের সর্বোত্তম আশা করা উচিত। প্রথমত. আমাদের আশা রাখা উচিত যে, ২০১৮ সালে সময়োপযোগী (সিনক্রোনাইজড) বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কেবল ৪ শতাংশের নিচে অব্যাহত থাকবে, যেমনটা অক্টোবরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রাক্কলন করেছে। প্রবৃদ্ধি কেবল আয় বাড়ায় না, ব্যাংকিং খাতেও কুঋণের মতো অস্বস্তিদায়ক সমস্যা তৈরি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি ১৯৬৩ সালের অক্টোবরের এক ভাষণে তার প্রস্তাবিত করপোরেট ও ব্যক্তিগত করহ্রাসের বিষয়টি তুলে ধরে যেমনটি বলেছিলেন, ‘পানির একটি ঊর্ধ্বমুখী স্রোত সব নৌকাকে উপরে তোলে।’ বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা এ রকম।
আমি অনুমান করি যে, বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার (রিকভারি) অব্যাহত থাকবে, তবে সামান্য এদিক ওদিক হয়ে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। দুটি স্পষ্ট ঝুঁকিতে আমাদের নজর রাখা জরুরি। এর একটি ইউরোপ, যেখানে চক্রাকার ঊর্ধ্বগতি বন্ধ হবে এবং অন্যটি মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে উত্তেজনা আবারো ছড়াবে।
দ্বিতীয়ত. আমরা আশা করি যে, নতুন প্রধান জেরোমি ‘জে’ পাওয়েলের স্থিত হাতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ফেডারেল ফান্ড হার বাড়িয়ে এবং স্ফীত স্থিতিপত্র সংকোচনের মাধ্যমে মুদ্রানীতি স্বাভাবিকীকরণ অব্যাহত রাখবে। আমরা আরো আশা করব যে, অন্য প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই নীতি অনুসরণ করবে।
এক্ষেত্রে আমি অনুমান করি যে, প্রয়োজনের চেয়ে অধিক ধীরে প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতিগুলো স্বাভাবিক রাখা অব্যাহত রাখবে। এখানে বড় ঝুঁকি হলো, নতুন নেতৃত্বের অধীনে ফেডের মাধ্যমে বাজারগুলো নিরীক্ষিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ অনুমানের চেয়ে মূল্যস্ফীতি দ্রুতগতিতে বাড়লে সমস্যা তৈরি হবে।
তৃতীয়ত. আমরা আশা রাখি যে, রিপাবলিকান ট্যাক্স প্যাকেজ কার্যকর হলে সেটি বিনিয়োগ, পণ্য উৎপাদন, উৎপাদনীলতা এবং আগামী দশকজুড়ে মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। এখানে আমি ধারণা করি যে, আইনটি পাস হবে এবং কোনো অ্যাকশন না নেয়া সময়ের তুলনায় পরবর্তী কয়েক বছরে আপেক্ষিকভাবে বিনিয়োগ বাড়বে।
সত্যি বলতে কি, বিদ্যমান দমিত পর্যায় থেকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে কিনা, সেটি নির্ভর করবে কেবল করপোরেট করহার নয়; অন্য অনেক অনুঘটকের ওপরও। তবে আশা করা যেতে পারে যে, কর প্যাকেজ এখনো পণ্য উৎপাদন, উৎপাদনশীলতা এবং মজুরি চাঙ্গা করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন যদি নয়, কখন। যদি ২০১৮ বা ২০২০ নির্বাচনগুলোর আগে আলোচ্য আইনের পুরোপুরি প্রভাব অনুভূত হয়, সেটি রাজনৈতিকভাবে ভয়াবহ হবে। বড় বিপদ হলো, এর সুফল বিলম্বিত হবে এবং ডেমোক্র্যাটরা পুনরায় ক্ষমতায় এলে এর প্রধান ধারাগুলোর পরিবর্তন হবে।
চতুর্থত. আমরা আশা করব যে, সর্বত্র সরকারি পেনশন এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় নিয়ে সরকারগুলোকে বড় ধরনের সংকটের বিষয়টি উপস্থাপন করা শুরু করতে হবে, যেটি কয়েক দশকজুড়ে বাড়ছে। সামাজিক কর্মসূচিগুলো ব্যয়বহুল হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তারা (সরকারগুলো) প্রতিরক্ষার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়ে সরকারি ব্যয় কমিয়েছে, কমাচ্ছে; এটি এমনকি উচ্চপ্রবৃদ্ধি-দমনকারী করারোপে অধিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সুনির্দিষ্টভাবে ইউরোপকে অবশ্যই এর চক্রাকার প্রতিক্ষেপের সাময়িক বিরতি থেকে আত্মপ্রসাদে যেতে দেয়া উচিত নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক সদস্য রাষ্ট্রের এখনো তাদের সরকারি ঋণ কমাতে হবে এবং ইউরো অঞ্চলকে এর ‘জম্বি (দেউলিয়াপ্রায়) ব্যাংক’ সংকট সমাধানের প্রয়োজন পড়বে। এর বাইরেও ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাখোঁ যে ধরনের কাঠামোগত শ্রমবাজার সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছেন, সেটিকে স্বাগত জানাতে হবে।
দুর্ভাগ্যবশত আমি ভয় পাচ্ছি যে, কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রগতি অসংহত, বিক্ষিপ্ত হবে। এক্ষেত্রে বিপদ হলো, বিভিন্ন দেশে যুবকদের উচ্চ বেকারত্বের হার মোকাবেলায় ধীর প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত মজুরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না। আরেকটি ঝুঁকি হলো, সংস্কার প্রচেষ্টা এমন এক প্রবল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া উসকে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর হবে।
পঞ্চমত. আমরা আশা করব যে, ইউরো অঞ্চল মুদ্রা সংকট এড়াতে পারবে। এটি প্রধানত নির্ভর করবে জার্মান চ্যান্সেলার অ্যাঙ্গেলা মেরকেল একটি জোটবদ্ধ সরকার গঠন এবং ইউরোপের প্রধান অর্থনীতির দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারছেন কিনা, তার ওপর।
ষষ্ঠত. আমাদের প্রত্যাশা করা উচিত যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য একটি যুক্তিসঙ্গত ব্রেক্সিট ডিলে রাজি হতে পারে, যা চমত্কার বাণিজ্য সম্পর্কগুলো অক্ষুণ্ন বা বজায় রাখবে। এক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হলো, স্থানীয় বাণিজ্যে পতন অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৃহত্তর ক্ষতি সাধন করতে পারে। ইউরোপের বাইরে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মধ্যে উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (নাফটা) বিষয়ে চলা আলোচনাগুলো এমন এক ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যা মহাদেশীয় বাণিজ্যে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সাধারণত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে (ম্যানুফ্যাকচারিং) শ্রমিকদের সাহায্যের বোধগম্য আগ্রহের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন একটি লস-লস ট্রেড ডিসপিউট (বাণিজ্য বিবাদ) শুরু করতে পারে।
সপ্তমত. আমরা আশা রাখি যে, নতুন নীতি টার্গেটকারী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সব অংশীদারের প্রতিযোগী ও ন্যায্য উদ্বেগে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখবে। একদিকে সুনির্দিষ্ট ইন্টারনেট কোম্পানির বাজার শক্তির কেন্দ্রীভবন বিশেষ করে অনলাইন কনটেন্ট ও বণ্টন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর নতুন প্রযুক্তির প্রভাব, আইন প্রয়োগ এবং জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিপুল অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারে।
অতি নিয়ন্ত্রণ বা খুব কম নিয়ন্ত্রণের একটি দৃশ্য কল্পনা করা সহজ। একই সঙ্গে প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৃহৎ মাত্রায় জনগণের প্রতিক্রিয়া কল্পনা করাও সহজ; বিশেষ করে যদি দুর্বল আত্ম-নজরদারি কিংবা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রত্যাখ্যানের কারণে কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
এখানে আমি অনুমান করি, একটি যথোপযুক্ত নীতি ভারসাম্য অর্জন কয়েক বছর সময় নেবে। যদি ভবিষ্যৎ কিছু ঘটনা একটি আবেগিক জিনে আঘাত হানে, তবে জনগণের মনের ভাব নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে আমি সংশয় ব্যক্ত করি যে, প্রতিযোগিতা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন আদৌ আসন্ন নিয়ন্ত্রণ বিধিগুলো টিকিয়ে রাখবে কিনা।
চূড়ান্তভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমরা আশা করি যে, সর্বত্র সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ হবে, সংঘাত দমন হবে, গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ মোমেন্টাম ফিরে পাবে এবং গণপরিসরে বৃহত্তর ভব্যতা এবং আন্তরিক সংলাপ ফিরে আসবে। এমন হলে নিঃসন্দেহে ২০১৮ সাল হবে একটি ভালো বছর।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এবং হোভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির






