২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন উপায়ে শিল্পায়িত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণ মুদ্রানীতি প্রণয়ন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আগাম সতর্কতা নির্দেশনার (ফরোয়ার্ড গাইডেন্স) মাধ্যমে তারা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, একটি প্রলম্বিত সময়ের জন্য সুদহার কম থাকবে। এর অংশ হিসেবে নানা উদ্দেশ্য পূরণে তারা লং টার্ম রিফাইন্যান্সিং অপারেশনস (এলটিআরওএস), দ্য সিকিউরিটিজ মার্কেটস প্রোগ্রাম (এসএমবি) এবং কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের (কিউই) মতো বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।

অতি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ঋণাত্মক সুদহার এবং ইল্ড কার্ভ টার্গেটিং (ব্যাংক অব জাপানের চিন্তাপ্রসূত, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে যে ব্যাংকটি সবসময়ই শীর্ষে থেকেছে) নীতিও প্রবর্তন করেছে। কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার প্রত্যক্ষ বিনিময় হার নিশানার মতো অগতানুগতিক, কিন্তু সুপরিচিত নীতির আশ্রয় নিয়েছে।

তবে এখন আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, কেন এসব অগতানুগতিক বা অসাধারণ পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে এবং সেগুলো আদৌ কাজ করেছে কিনা; যদিও বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আপাতভাবে মুদ্রানীতি স্বাভাবিকীকরণের পথ খুঁজছে। ভবিষ্যতের দিকে দূরদৃষ্টি ফেলে আমাদের আরো প্রশ্ন করা উচিত, উল্লিখিত নীতিগুলো ধীরে ধীরে বাদ দিলে কী প্রভাব পড়বে এবং তাদের ব্যবহার আদৌ দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ বাড়াবে কিনা। এসব প্রশ্ন সুরাহা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা ভবিষ্যৎ সংকট উত্তরণে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবেন।

এটা কি প্রয়োজনীয় ছিল?

স্মরণ করা দরকার, ২০০৭-০৮ সালের আর্থিক সংকটে বাজারগুলো পরিষ্কারভাবে ভেঙে পড়ে। ঋণপ্রবাহ অনাদায়ী হওয়ার সঙ্গে এটি বোধগম্য ছিল যে, আর্থিক বাজার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে অনেক দূর যেতে হবে; সেক্ষেত্রে তাদের হয় যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধক-সমর্থিত সিকিউরিটি বাজার, না হয় ইউরোপে সার্বভৌম বন্ডবাজারে যেতে হবে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের দ্বিতীয় একটি কারণ ছিল, আর্থিক পণ্য বা দামের প্রভাব সামলানো। এটি অধিকতর সুবিধাজনক লক্ষ্য ছিল এ বাস্তবতায় যে, নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত কেবল অপ্রত্যক্ষভাবে দামগত প্রভাব মোকাবেলা করে, প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়। কিন্তু যখন নীতি সুদহার শূন্যের নিচে পৌঁছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বিচিত্রমুখী দীর্ঘমেয়াদি সিকিউরিটিজে দামের প্রভাব কমানো প্রয়োজনীয় মনে করেন। এমনকি এক্ষেত্রে প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণীতে বিস্তারের আশঙ্কায় তারা নির্দিষ্ট ধরনের সিকিউরিটি টার্গেটও করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের তৃতীয় কারণ ছিল, পছন্দসই মুদ্রানীতিগুলো সম্পর্কে অঙ্গীকারের সংকেত প্রদান। উদাহরণস্বরূপ, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সরকারি সিকিউরিটি কেনার ঘোষণা দেয়, তাহলে এর প্রায়োগিকতা ছিল এই যে, যখন কর্মসূচিটি ক্ষতিতে পড়ল, তখন আলোচ্য ব্যাংকটি মুদ্রানীতি কঠোর করেনি। তথাপি কর্মসূচিটির বর্ণিত উদ্দেশ্য বাদে এর অনুমিত প্রভাব ছিল দীর্ঘমেয়াদে নিম্ন সুদহারের (লো-ফর-লং) বার্তাবাহী।

সময়ে সময়ে আগ্রাসী কিংবা অভিনবমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এসব যুক্তি দিয়েছে। কিন্তু একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে আমি আর্থিক কর্তৃপক্ষগুলো কর্তৃক কম উল্লেখকৃত আরেকটি কারণ সংযোজন করব। আর সেটি হলো, তারা (কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো) নিজেদের মূল্যস্ফীতি টার্গেটিং ম্যান্ডেটের কয়েদি।

১৯৮০ ও ’৯০-এর দশকে যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতির জন্য টার্গেট ব্যান্ড নির্ধারণ শুরু করেছিল, তারা সত্যিই সর্বোচ্চ সীমায় নজর দিয়েছিল। কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা প্রত্যাশা করেছিলেন যে, মূল্যস্ফীতি টার্গেটিং ব্যবস্থার সমস্যা হবে নিম্ন সীমা এবং এজন্য তারা কমানের চেয়ে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী করার চেষ্টা চালাবেন। একটি ম্যান্ডেট দ্বারা এখন এমন এক ফাঁদে পড়েছেন, যেখানে আবশ্যিকভাবে তারা জানেন না কীভাবে তার উত্তরণ ঘটাবেন।

ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) দেড় দশক পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ সময়ে বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বিওজের কর্মকর্তাদের এই বলে খুশি হয়েছেন যে, ‘এটি খুবই সহজ। দেখা যাক তোমরা কীভাবে কর।’ তবে একই কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা যখন নিম্ন মূল্যস্ফীতির সমস্যায় পড়েছেন, তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন বিষয়গুলো আসলে অত সহজ নয়।

এর একটি কারণ এই যে, সত্যিই কেউ জানে না— কীভাবে নিম্ন মূল্যস্ফীতির জনপ্রত্যাশা হটাতে হয়; মনে হয় যা নিজেই নিম্ন মূল্যস্ফীতিতে আরো শক্তি জোগায়। এমনকি অর্থনীতিতে ‘হেলিকপ্টার মানি’ জোগানোর অপশনটিও ব্যর্থ হবে, যদি নিজের জায়গা থেকে মানুষ মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালিত প্রক্রিয়াটি বিকৃতমস্তিষ্কপ্রসূত, খারাপ। ভবিষ্যতের দিনগুলোর হিসাব চোকানোর ভয়ে ব্যয় করার পরিবর্তে মানুষ নিজেদের নগদ অর্থ নিছকই ম্যাট্রেসে ঠেসে দিতে বা সঞ্চয়ী হিসাবে জমাতে পারে।

এমন এক পরিবেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের সত্যিই উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদি তারা স্বীকার করেন যে, সংকট উত্তরণে ‘কোনো নীতি হাতিয়ার বাকি নেই’, তাহলে জনগণের মূল্যস্ফীতিজনিত প্রত্যাশার পতন ঘটবে। সেই হিসেবে সবসময় দাবি করতে হবে, তাদের হাতে আরো একটি মূল্যস্ফীতি-চাঙ্গাকারী বাজুকা আছে, বাজারে আগুন না ধরা পর্যন্ত যা তারা বের করবে না।

যদিও আমরা ঋণাত্মক মূল্যসংকোচনমূলক সর্পিলতা দেখিনি (যেটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা সবচেয়ে ভয় পান), তবু মূল্যস্ফীতি নাছাড়ভাবে খুব নিম্নে রয়ে গেছে। মুদ্রাসংক্রান্ত বা আর্থিক উদ্ভাবনের ওপর এভাবে অব্যাহতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বাজি ধরেছেন (নতুন আর্থিক হাতিয়ারগুলো তাত্ত্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি চাঙ্গা করতে পারে), এমনকি তাদের হাতিয়ারগুলোর অকার্যকারিতা ক্রমেই স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও।

এ যুক্তিমতে কিউ তার পরিক্রমা যখন শুরু করেছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই ঋণাত্মক সুদহারে যেতে হয়েছে। যখন ঋণাত্মক সুদহার অপর্যাপ্ত প্রমাণ হয়, তখন তাদের ইয়ল্ড-কার্ভ টার্গেটিংয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিটি ধাপে যখনই একটি নীতি হাতিয়ার অব্যাহতভাবে অকার্যকর প্রমাণ হবে, তাদের কিছু না কিছু নতুন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে তাদের আত্মসন্তুষ্ট মনে না হয়। নতুন কোনো বিকল্প জোগান না দেয়ার মানে তারা আশা ছেড়ে দিয়েছে এবং প্রত্যেকেরই তাই করা উচিত। সত্যিকার অর্থে যা তাদের ম্যান্ডেট অর্জনে গ্যারান্টি ব্যর্থতারই প্রমাণ দেবে।

এটা কি কাজ করেছে?

আমাদের দ্বিতীয় আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। সেটি হলো, অভিনবমূলক কোনো হাতিয়ার (ইনস্ট্রুমেন্ট) কি কাজ করেছে? অবশ্যই হ্যাঁ, বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে এসব নীতির কিছু বেশ কার্যকর হয়েছে। কারণ একজন গভীর পকেটের খেলোয়াড় সিকিউরিটিজ কিনতে এগিয়ে এসেছে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বাজারের বাইরে নিজেদের ভারিক্কি নিশ্চিত করেছে এবং বলেছে, ‘আমরা এখানে আসছি যেন নীতিগুলো কাজ করে, সেটা নিশ্চিতের জন্য।’ ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে সার্বভৌম ঋণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, যতক্ষণ না ২০১২ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভাপতি মারিও দ্রাঘি ঘোষণা করেন যে, ইউরোর মান ধরে রাখতে ইসিবি যা করার তাই-ই করবে। এ বিবৃতি একাই বাজারে জাদুকরী প্রভাব ফেলেছে।

তবে মূল্যস্ফীতি ম্যান্ডেট অর্জনে এসব হস্তক্ষেপ করা হলেও আমি বলব যে, অন্তত এখন পর্যন্ত সেগুলো কাজ করেনি। যুক্তরাজ্য ব্রেক্সিট-প্ররোচিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং তার অনুবর্তী মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেজন্য বাস্তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কার্যক্রমের কোনো কৃতিত্ব দেয়া যায় না। ফেড সম্ভবত প্রায় পিসিই (ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়) মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশে রাখার নিজ টার্গেটে বদ্ধপরিকর, কিন্তু কঠোর শ্রমবাজার সত্ত্বেও সেখানে তা অর্জনের লড়াই চলছে। অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয়ও বৃহত্তর চিহ্ন রয়ে গেছে।

অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা আমাদের বলবেন যে, তাদের টার্গেট অর্জিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং তাদের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতিজনিত প্রত্যাশা পতন প্রতিরোধ করেছে। সম্ভবত তা-ই সত্য। এটা সম্ভব যে, জাপান এবং আরো কিছু দেশে প্রত্যাশা নিম্নমুখী সর্পিলতা লাভ করেনি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বারবারই ইঙ্গিত দিয়েছে— তারা তাদের ম্যান্ডেটের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে এটিও সম্ভব যে, অন্য কারণে মূল্যস্ফীতি নিম্ন পর্যায়ে স্থিতিশীল থেকেছে।

দীর্ঘমেয়াদি সুদ হারে অগতানুগতিক নীতিগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে কিনা, সেটিও স্পষ্ট নয়। তাদের কাছে যে প্রমাণ আছে, সেটি মিশ্র। কিছু প্রভাব সংকীর্ণ সময়কাঠামো ও সংকীর্ণ হাতিয়ার (ইনস্ট্রুমেন্ট) শ্রেণীতে দেখানো যেতে পারে। তবে যত শিগগিরই আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রসারণ করবেন, তখন অগতানুগতিক নীতিগুলোর প্রভাব ঠাহর করা অনেক কঠিন হবে বৈকি। একটি উদাহরণ আমলে নেয়া যাক। যখন ফেড ইউএস ট্রেজারি বন্ড বেচে, তখন দেশটির কোষাগারের ওপর একটি প্রভাব পড়েছে। কিন্তু পুরো বন্ডের স্পেকট্রামের ওপর এর কোনো প্রভাব রয়েছে, সেটা বলা মুশকিল। আরো জটিল বিষয় হলো, প্রকৃত অর্থনীতিতে অগতানুগতিক নীতিগুলো এবং বিনিয়োগ বা ভোগের মধ্যকার সংযোগ প্রতিষ্ঠা সত্যিই দুরূহ।

মোটকথা, বাজার সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির সংকেত দেয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ বা অগতানুগতিক নীতিগুলোর একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব থাকবে বটে, তবে প্রকৃত কর্মকাণ্ডে সেগুলোর প্রভাব রয়ে গেছে অনিশ্চিত।

চলে যেতে দেয়া কি নিরাপদ?

নীতিগুলো যখন উল্টো হয়, তখন কী ঘটে? প্রত্যাশার ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, অনানুপাতিকভাবে সেগুলো সামনে ভারাক্রান্ত থাকে। আমরা বোধহয় এরই মধ্যে দেখেছি, যখন একটি কেন্দ্রীয় সংকেত পরিবর্তন করে, তখন কী ঘটে। ২০১৩ সালের ‘টেপার টেনট্রামের’ সময় একটি সাধারণ বোধ ছিল যে, ফেড কিউই নিঃশেষ ও সুদহার বাড়িয়ে বাজারে গোলযোগ সৃষ্টি এবং দ্রুত সুদহার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় চালিত করতে পারে।

এখন বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, কিন্তু এটা দেখা বাকি যে, আর্থিক সম্পদের দামের ওপর অগতানুগতিক নীতিগুলোর প্রভাব যদি বিপরীত হয়, তখন নীতিগুলোর কী হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেহেতু ২০১৮ সালে তাদের স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) সংকোচন শুরু করবে, সেহেতু দীর্ঘমেয়াদি বন্ডগুলো বাজার থেকে ফেরত আসবে এবং বাজারের অতিরিক্ত রিজার্ভ ধ্বংস হবে। বন্ড ইস্যুকারীদের অধিক ব্যক্তিক্রেতা খোঁজা প্রয়োজন হবে। তবে ব্যক্তিক্রেতাদের অধিক বন্ড কেনার অর্থও থাকতে হবে। যেহেতু এ সম্পদের অদল-বদল ঘটবে, তাই দীর্ঘমেয়াদি সুদহার কিছুটা বাড়তে পারে। বাজারগুলো যদি চূড়ান্ত স্টক সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়, তাহলে তাদের সেগুলো শুষে ফেলতে হবে; সেক্ষেত্রে সুদহার বৃদ্ধি বরং আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত হতে পারে।

এভাবে অনেক পরে ফেড স্থিতিপত্র সংকোচনের একটি পরিমিত ধারার প্রচারণা শুরু করেছে এবং মনে হচ্ছে বাজার এটাকে ভালোভাবে নিয়েছে। যে ইঙ্গিত রয়েছে তাতে যে কেউ আশা করে, ফেডের স্থিতিপত্র থেকে কার্যকরভাবে ছেঁটে ফেলা বন্ডগুলো বন্ড দামে কোনো তীক্ষ্ম পরিবর্তন ছাড়াই শোষিত (অ্যাবজর্ব) হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদহারে সময়ে সময়ে কেবল সামান্য বৃদ্ধি ঘটবে।

আরো একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, নিজেদের স্থিতিপত্র থেকে আদৌ বোঝা খালাস করা (অফলোড) উচিত কিনা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরেমি সি স্টেইন, রবিন গ্রিনউড এবং স্যামুয়েল জি. হ্যান্সন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র আপেক্ষিকভাবে বড় রাখা উচিত। কারণ এভাবে করে আর্থিক বিশ্বে ঘাটতি থাকা নিরাপদ ও স্বল্পমেয়াদি হাতিয়ার (ইনস্ট্রুমেন্ট) সৃষ্টি করা যায়।

তবে অন্তত দুটি কারণ রয়েছে— কেন স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র বড় করা উচিত নয়। স্টার্টারদের জন্য তেমনটা করা হলে সরকারি সেবা হিসেবে তারল্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক সংকটের সময় এ ভূমিকা পালনে ব্যক্তিখাতের অপর্যাপ্ততা বা অপারগতা স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এটা পালন করা যথেষ্ট ভালো কারণ নয়। এটা সবারই জানা যে, জনগুরুত্বপূর্ণ বীমার মতো সেবাগুলো সাধারণত ব্যক্তিখাত কর্তৃক অতিনির্ভরতা এবং সরকারি খাত কর্তৃক দামজনিত অবমূল্যায়নে পর্যবসিত হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সহকর্মী চার্লস ডগলাস এবং আমি যেমনটা দেখিয়েছি, ব্যক্তিগত লিকুইডিটি সেবাগুলোর অতিরিক্ত অনেক সুফল থাকতে পারে, যেগুলো গণবিতর্কে সবসময় স্বীকার হয় না।

অধিকন্তু বৃহৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থিতিপত্রগুলো রাজনৈতিক ঝুঁকির অবতারণা করে। ফিলাডেলফিয়ার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক সভাপতি চার্লস প্লসার যেমনটা ব্যাখ্যা করেন, যখন কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার স্থিতিপত্র সম্প্রসারণ করে এবং মুদ্রানীতির সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতি না রেখে সেটি ব্যবহার করে, তখন সেটি নিজেই রাজনৈতিক চাপ উন্মোচন করে।

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক— অবকাঠামো ব্যয় বাবদ সরকারের যদি ৫০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়, এজন্য সরকার ফেডকে তার কিছু হোল্ডিংস রূপান্তরে চাপ দিতে কম কারণই দেখাবে। উদীয়মান বাজারগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা এমন অনুরোধে অভ্যস্ত। এবং সাধারণত বিনয়ীভাবে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও তারা এটা বুঝতে পারে যে, না বলা কঠিন— তারা যখন দেখে যে, গতানুগতিক মুদ্রানীতি থেকে বৃহৎ স্থিতিপত্র বিচ্ছিন্ন।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি?

চূড়ান্তভাবে প্রাগ্রসর অর্থনীতি, পুঁজিপ্রবাহ, উদীয়মান বাজার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর অগতানুগতিক মুদ্রানীতিগুলোর অপ্রত্যাশিত প্রভাববিষয়ক একটি প্রশ্ন রয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সহজ আর্থিক শর্ত সব ধরনের সম্পদে রিস্ক প্রেমিয়া হ্রাস করেছে। তবে ক্লদিও এবং দ্য ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টেসের উইলিয়াম হুয়াইট যেমনটা সতর্ক করেছেন, এটি আর্থিক চক্র বাড়ায়। অধিকন্তু বিপুল তারল্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উভয় দিক থেকে লেভারেজ বাড়িয়েছে। কারণ ঋণগ্রহণকারীরা অব্যাহতভাবে তহবিলের নাগাল পেতে বাজি ধরে। এর পেছনে যে দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, সেটি হলো সাশ্রয়ী প্রচেষ্টায় যেন আরো ঋণ পায় তারা। এটি ইঙ্গিত দেয়, আর্থিক ব্যবস্থা ক্রমেই ভঙ্গুর হচ্ছে, যা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন নিজেদের মূল্যস্ফীতি নিশানা থেকে অনেক দূরে থাকা সত্ত্বেও কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করার চিন্তা করছে।

আর্থিক ভঙ্গুরতা বা উদ্বায়িতায় মুদ্রানীতিগুলো কীভাবে অবদান রাখে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ উদীয়মান বাজারগুলোর ওপর সেগুলোর প্রভাব; যেখানে প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের নীতি সুদহার কমালে সুফল-প্রত্যাশী পুঁজি ঢালা হয় এবং আর্থিক নীতিগুলো কঠোর করা হলে তারপর ওইসব বাজার থেকে পুঁজি ফের প্রত্যাহার করা হয়। ২০১৩ সালের ‘টেপার টেনট্রাম’ কিছু উদীয়মান বাজারের জন্য বিপর্যয়কর ছিল। কারণ আলোচ্য পরিস্থিতিকে শক্তি জোগানো বিপুল, আকস্মিক পুঁজি বহিঃপ্রবাহের সঙ্গে তারা পেরে উঠতে পারেনি।

বিদেশী পুঁজির ক্ষেত্রে সাধারণ সাদৃশ্য হলো এটি বাড়ির অতিথির মতো, যাকে উদীয়মান দেশগুলোর স্বাগত জানানো উচিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা তাই করে। তবে বিদেশী পুঁজি প্রায় আসে বিপুল হারে এবং পর্যাপ্ত সংকেত দেয়া ছাড়া তারপর বিপুল হারে ফের চলেও যায়। যেকোনো অতিথিসেবকের মতো উদীয়মান বাজারের ভালোভাবে জানতে হবে কখন বিপুলসংখ্যক অতিথি আসতে পারে এবং কখন আবার চলে যেতে পারে, যাতে তারা সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। কখন পুঁজি ভিত্তি আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং কখন তা চলে যায়, সেটি একজন খুব খারাপ অতিথির মতো আচরণ করে।

আন্তঃদেশীয় বা আন্তঃসীমান্ত ব্যাংকপ্রবাহ বিশেষভাবে সমস্যাক্লিষ্ট। ফেডারেল রিজার্ভ অব বোস্টনের ফাল্ক ব্রাউনিঙ্গ এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ভিক্টোরিয়া ইভাশিনার সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, যখন আর্থিক নীতি কঠোর করা হয়, তখন ব্যাংকঋণে স্বল্প ম্যাচিউরিটির কারণ ঘটিয়ে উদীয়মান বাজার থেকে আন্তঃদেশীয় ব্যাংকপ্রবাহগুলো দ্রুত প্রত্যাবর্তন করে। অনুরূপভাবে বিদেশী বিনিয়োগকারী কর্তৃক বিক্রিকৃত বন্ডগুলো, যেগুলো অভ্যন্তরীণ/দেশীয় বিনিয়োগকারীরা তুলতে পারে, তার জন্য বিদেশী ব্যাংকগুলো কর্তৃক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান হ্রাসের পরিবর্তন না-ও হতে পারে। স্থানীয় ব্যাংকগুলো কর্তৃক দেয়া অতিরিক্ত ঋণের ঘাটতিতে উদীয়মান বাজারের কোম্পানিগুলো প্রায়ই ঋণজনিত চাপের মুখে পড়ে।

যত দূর জানি, নিজেদের কিছুটা ক্ষতির বিনিময়ে উদীয়মান বাজারগুলো লক্ষণীয় পুঁজিপ্রবাহ রদবদলের ঘটনার মাধ্যমে সামলে ওঠার শিক্ষা নিয়েছে। তবে সংকট বিস্তারের সময় বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত একটি জরুরি তর্ক এখনো বাকি।

পরবর্তীতে কী হবে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ম্যান্ডেটের ভূমিকা উৎসাহিতকরণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে ধরনের ব্যতিক্রমী বা অগতানুগতিক নীতিগুলো দেখেছি, সে সম্পর্কেও একটি চূড়ান্ত প্রশ্ন আমাদের উদ্বিগ্ন করে। অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবশ্যিকভাবে বলেছে যে, ‘আমাদের ম্যান্ডেট দাও এবং আমরা কীভাবে সেটি অর্জন করি তার ওপর কোনো বাধা আরোপ করো না।’ তবে প্রাথমিক সমস্যা যখন ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তখন এ ফর্মুলা ভালোভাবে কাজ করে থাকতে পারে এবং যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রাথমিক হাতিয়ার ছিল নীতি হার (তারল্যের কিছু প্রান্তিক টান) এবং সমস্যা ছিল নিম্ন মূল্যস্ফীতি, তখন এটি আর কাজ করেনি।

ম্যান্ডেট অর্জনসংক্রান্ত ব্যবহারিক বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া ছাড়া সুদূরপ্রসারী পরিচালনগত স্বাধীনতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বিপজ্জনক। অভিনবত্ব আনয়নে আলোচ্য ব্যাংকগুলো ব্যাপক চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে অল্প কিছু সম্পদ তারা কিনতে পারে না। এমনকি তাদের এত কম ঋণপ্রদানকারী যে, তারা তহবিলও গঠন করতে পারে না।

যখন অব্যাহতভাবে লোক দেখানো মুদ্রানীতিগুলো আর্থিক উপাদানে পরিণত হয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাজ কেবল বিজয়ীদের তেল মাখানো এবং পরাজিতদের শাস্তি দিতেই পর্যবসিত হয়। তখন রাজনীতিবিদদের এটা প্রশ্ন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র যে, কেন ব্যাংকগুলোকে এত স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। ম্যান্ডেট অর্জনে যখন যা ইচ্ছা তাই করে, তখন অসাবধানতাবশত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের গভীর রাজনৈতিক তদন্তে ফেলতে এবং তাদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের শুরুতে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ঢাকতে এত কাজ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা নিজেদের রাজনৈতিক লাইমলাইটে এনেছেন। সংকট প্রশমনে তাদের পদক্ষেপের জন্য নিশ্চিতভাবে তারা নায়ক। কিন্তু রাজনীতিবিদরা শক্তিশালী অনির্বাচিত নায়কদের পছন্দ করেন না। পিএইচডি, অভিনব কথার ফুলঝুরি, ব্যাসেল ও জ্যাকসন হোলের মতো সুদূরপ্রসারিত স্থানে গোপন বৈঠকসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বিশুদ্ধ শিকড়হীন বৈশ্বিক অভিজাত, যাদের লোকরঞ্জনবাদী জাতীয়তাবাদীরা ঘৃণা করতে পছন্দ করেন। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও এটা সত্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের অবশ্যই তাদের কাজ ও ম্যান্ডেট সম্পর্কে যেকোনো আলোচনা এড়ানোকে প্রাধিকার দিতে হবে। তবে রাজনৈতিক স্পটলাইটে আসার পরিবর্তে বরং গত কয়েক বছরে নেয়া তাদের নীতিগুলোর সংযত মূল্যায়ন প্রয়োজন। আর্থিক কর্তৃপক্ষগুলোর জন্য অবশ্যপালনীয় কাজ হলো, যৌক্তিক ও অর্জনযোগ্যভাবে ম্যান্ডেট উদ্ভাবন এবং আলোচ্য ম্যান্ডেট অর্জনে সুনির্দিষ্ট কাজ নির্ধারণ করে দেয়া। অন্যথায় ২০১৮ সাল মুদ্রানীতির সাহসী যুগের শুরু হবে না, বরং হবে সমাপ্তি।

 

লেখক: সাবেক গভর্নর, রিজার্ভ অব ব্যাংক ইন্ডিয়া

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির