যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান একবার ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে সাংঘাতিক একটি শব্দ হলো: আমি সরকার থেকে এসেছি এবং এখানে এসেছি সাহায্য করতে।’ বিষয়টি অন্যভাবে নেয়া যাক, নীতিনির্ধারকরা সমস্যাগুলোর প্রতি প্রায়ই এমনভাবে সাড়া দেয়, যাতে সমস্যার জটিলতা আরো বাড়ে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের প্রতি নীতিনির্ধারকদের সাড়া বিবেচনা করুন। উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কর্তৃক নেয়া প্রায় এক দশকের অগতানুগতিক মুদ্রা নীতিগুলোর পর ওইসিডিভুক্ত সব দেশের অর্থনীতি এখন সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি উপভোগ করছে এবং আর্থিক বাজারগুলো ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুল মার্কেটের (যে বাজারে শেয়ারমূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকে) মুখোমুখি। ২০০৯ সালের মার্চ থেকে এস অ্যান্ড পি ৫০০-এর সূচক ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হওয়ায় কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (কিউই) এবং অতি-নিম্ন সুদহারের মতো নজিরবিহীন বা অগতানুগতিক মুদ্রানীতিগুলো সাফল্যের সঙ্গে ঘোষণার প্ররোচনা চলছে।
এক্ষেত্রে সন্দেহের তিনটি কারণ রয়েছে। এক. এ সময়ে আয়বৈষম্য নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ঋণাত্মক প্রকৃত (মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত) সুদহার এবং নগদ অর্থ (ক্যাশ) ও সরকারি বন্ড দমনের মাধ্যমে কিউই সঞ্চয়কারীদের আঘাত হানলে তারা শেয়ার দাম ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক সম্পদ চাঙ্গা করেছে, যা সাধারণভাবে অধিকাংশ সম্পদশালীর অধিকারে। সরকারি বন্ডের মতো গতানুগতিক স্থির-আয় (ফিক্সড-ইনকাম) বিনিয়োগে যখন কোনো সুফল নেই, এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে লগ্নি করা ছাড়া রক্ষণশীল পেনশন ফান্ডের খুব কমই সুযোগ রয়েছে, তখন সম্পদ বিভাজন বা বৈষম্য বাড়িয়ে দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ক্রেডিট সুইজ রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনীদের ১ শতাংশই শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগ সম্পদে থাকা জাতীয় সম্পদের প্রায় অর্ধেক অংশের মালিক; যেখানে নিচের ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজেদের বাড়ি থেকে তাদের অধিকাংশ সম্পদপ্রাপ্ত। এ শ্রেণীর সম্পদ (উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ) মন্দার সময় ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হয়। প্রকৃতপক্ষে সম্পদশালী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা এখন ১৯২০-এর দশকের মতো জাতীয় সম্পদের বৃহৎ অংশের অংশীদার। আবার বৈশ্বিক পর্যায়ে উপরের ১ শতাংশ ধনীরা সব সম্পদের অর্ধেক এবং ১০ শতাংশ ধনী ৮৮ শতাংশ সম্পদের মালিক।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ নিম্ন সুদে ঋণ নেয়া এবং পুনঃঅর্থায়ন করতে কোম্পানিগুলোকে অনুমতি দেয়া হয়েছে, তবু উল্লিখিত কোম্পানিগুলো মজুরি বাড়াতে খুব কমই চাপ অনুভব করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে প্রকৃত মজুরি বেড়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। বড় কথা, আর্থিক প্রণোদনার আকার ও সময় সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মূল্যস্ফীতি নিশানায় ধারাবাহিকভাবে ঘাটতি তৈরি করেছে। আজকের হারানো মূল্যস্ফীতি বয়স্ক জনসংখ্যার আধিক্য, বিশ্বায়ন ও বিভিন্ন দেশে নিম্ন মজুরির শ্রমিকের প্রাপ্যতা, অটোমেশন ও শ্রম-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিগুলোর বিস্তার, জ্বালানি খাতের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন (যা ওই খাতে দাম বৃদ্ধি পুষিয়ে দিতে পারে) বা অন্য ফ্যাক্টরগুলোর দিক থেকে সংকোচনমূলক চাপের প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে ঘটনা যা-ই হোক না কেন, উন্নত বিশ্বে নিম্ন মূল্যস্ফীতির সার্বিক প্রভাব হলো কম স্থিতিশীল সামাজিক বুনন এবং লোকরঞ্জনবাদকে শক্তি জোগানো ক্রমবর্ধমান সম্পদ ব্যবধানেরই প্রকাশ।
গত দশকের পুরোটা সময়ে নীতি সাড়ার ক্ষেত্রে উদ্বেগের দ্বিতীয় কারণ হলো, কিউই চালিত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বাড়ন্ত প্রবাহ। এটি পরোক্ষ বিনিয়োগকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করেছে। এ প্রবণতা নতুন ঝুঁকির সূচনা করেছে। সংকটের পর থেকে বাজারগুলো কঠোরভাবে সুসমন্বিত, সেখানে ডিসপারসন হার ব্যতিক্রমীভাবে কম। সর্বোপরি সেখানে ঝুঁকি ও ঝুঁকিবহির্ভূত ধরন অনুসরণপূর্বক ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ হয়ে আসছে, যা সক্রিয় ব্যবস্থাপনা ছাড়িয়ে নিম্ন ব্যয়ের পরোক্ষ বিনিয়োগের জন্য যথাযথ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যাহার করে ইনডেক্স ফান্ডের মতো প্যাসিভ ভেহিকলে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে।
বর্ধমান চাহিদা মেটাতে এমনকি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকরা হাজার হাজার নতুন পণ্য চালু করা সত্ত্বেও পরোক্ষ কৌশল-সমর্থিত পরিবেশের পরিবর্তন হওয়া শুরু করেনি। স্টার্টারদের জন্য নিজেদের বন্ড ক্রয় কমানো দ্বারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শিগগিরই মুদ্রানীতি স্বাভাবিক করবে। আন্তশ্রেণীর মধ্যকার সম্পদের ডিসপারসন বৃদ্ধির সঙ্গে নৈপুণ্য পেন্ডুলাম এরই মধ্যে সক্রিয় ব্যবস্থাপনার দিকে ফিরে আসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে গত দশকে পরোক্ষ বিনিয়োগে জমা হওয়া বিপুল সঞ্চিতি পুঁজির ভুল বণ্টন ও সম্পদ-দাম বিকৃতির শঙ্কা বাড়িয়েছে, যেখানে যত্নের জিম্মাদারি কর্তব্য ও অন্য পদ্ধতিগত বিষয়গুলো সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়ছে।
সতর্কতার জন্য তৃতীয় কারণ এই যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনো পুরোপুরিভাবে নিজেদের অগতানুগতিক নীতিগুলো বদলাতে এবং বৃহৎ স্থিতিপত্রগুলো শিথিল করতে পারেনি। আর্থিক সংকট সামলানো এবং নজিরবিহীন বা ব্যতিক্রমী নীতিগুলো জারি রাখা কঠিন মনে হলেও পরবর্তীতে কী আসে, তার জন্য অপেক্ষা করা জরুরি। এক্ষেত্রে অন্যতম করণীয়, অর্থনীতি থেকে নজিরবিহীন মাত্রার তারল্য প্রত্যাহার করা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক অব জাপান এবং ন্যাশনাল সুইস ব্যাংকের স্থিতিপত্রগুলো সম্মিলিতভাবে ১৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে স্ফীত হয়েছে। বলা যায়, এটি ২০০৭ সালের শেষ থেকে এ পর্যন্ত চার গুণ বেড়েছে।
সামনে অপেক্ষমাণ বড় প্যাঁচ খোলার কাজটি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রধান কিছু নতুন ঝুঁকির সূচনা করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রের আকার হলো, অর্থের চাহিদা এবং জোগানের একটি কাজ, মুদ্রাগত সম্প্রসারণের দ্বারা যা সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২০১৮ সাল এবং তার পরবর্তীতে স্থিতিশীল স্থিতিপত্র নিশ্চিতে যথাযথভাবে অর্থের চাহিদা নির্ণয়ও করতে পারে, তবু অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ থাকবে। উদাহরণস্বরূপ এ ধরনের আর্থিক স্বাভাবিকীকরণ প্রত্যক্ষ না করে বাজারে অংশগ্রহণকারীরা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের ইচ্ছা সম্পর্কে ভুল বুঝত, তাহলে তাদের ১৯৯৪ সালে বন্ড মার্কেট বিপর্যয়ের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে হতো। ফেডারেল রিজার্ভে এখনকার নতুন নেতৃত্বের কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত হলে অনিশ্চয়তা দূর করা কঠিন হবে না।
এদিকে সুফল অন্বেষণে অধিক ঝুঁকি নেয়ায় পেনশন ফান্ডগুলোকে নিম্ন ফিউচার মার্কেট রিটার্নস সমন্বয় করতে হবে এবং বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের কারণে বাজারে উদ্বায়িতাও বাড়বে। ২০১৫ সালে বিশ্বজনসংখ্যার এক-অষ্টমাংশের বয়স ছিল ষাট বা তদোর্ধ্ব। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এ অনুপাত ২০৩০ সাল নাগাদ এক-ষষ্ঠাংশে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ এক-পঞ্চমাংশে উন্নীত হবে।
ভবিষ্যতে যদি পেনশন ফান্ডগুলো তাদের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে না পারে, সরকারকে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো কর্মসূচি নিতে হবে। তথাপি বৈশ্বিক জিডিপির অংশ হিসেবে মোট সরকারি ঋণ ২০০৭ সাল থেকে বার্ষিক হারে ৯ শতাংশের অধিক বেড়েছে এবং সার্বিকভাবে এটি জিডিপির ৩২৫ শতাংশের কাছাকাছি থেকেছে। ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ঋণগ্রস্ত সরকারগুলোর জন্য বন্ডবাজার একই জায়গায় স্থির থাকবে না। প্রাগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোয় পেনশন এবং সরকারগুলো বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে আলোচ্য অর্থনীতির দেশগুলোকে সামাজিক অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হবে।
যেহেতু ২০১৮ সালে প্রবেশ করছি, সেহেতু আমরা আশা করব যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের ভূমিকা হ্রাসে ততটা পারদর্শী হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কেন্দ্রে বাজারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে রিগ্যান যেমনটা দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। সাফল্য নির্ভর করবে দুটো অনুঘটকের ওপর। এক. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে রাজনীতিকীকরণ দমন করতে হবে এবং তাদের স্বাধীনতা এবং অনন্যসাধারণ কারিগরি কৌশলগুলো বজায় রাখতে হবে। দুই. ধাপে ধাপে তাদের বড় ধরনের আর্থিক স্বাভাবিকীকরণ পথের সন্ধানের প্রয়োজন হবে এবং আকস্মিক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি এড়াতে হবে। নিশ্চয়ই আলোচ্য অনুঘটকগুলো আমলে নিলে তারা ২০১৭ সালের বজায়যোগ্য পরিমিত প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতির মধ্যে কৌশলী ভারসাম্য নতুন বছরেও রক্ষা করতে পারবে।
লেখক: জিএএমের প্রধান নির্বাহী; সাবেক প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা, ইউবিএস এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির






