২০১৭ সাল শেষ হয়েছে উচ্চ ইতিবাচক মনোভাবে। বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি দশকে এটাই বিস্তৃত চক্রাকার উত্থান। ইউরোপ, এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা বেড়েছে। অন্যদিকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতি (ব্রাজিল ও রাশিয়া) কিছুদিন আগে সংকোচনের মধ্যে থাকলেও পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে।
তবে এখনো কিছু দেশ সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি রফতানিকারক ও নিম্ন আয়ের অর্থনীতি, যারা গৃহযুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে খরায় বেশ ভালোভাবে ভুগছে। তবে দ্রুততর পুনরুদ্ধারের সুবিধা পাচ্ছে মোটামুটিভাবে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ।
বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ভৌগোলিকভাবে অসম ও থমকে থমকে চলা ‘প্রবৃদ্ধিকাল’ কাটিয়ে বিশ্বব্যাপী এ পুনরুদ্ধারের দেখা মিলেছে। ২০১৬ সালের শুরুতেও বৈশ্বিক অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে, তেলের দাম কমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২৫ ডলারে (এখন এটি প্রায় ৬০ ডলার)। ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালের স্পষ্ট সংকোচনের পর দুর্বলতম বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির দেখা মেলে। এ অবস্থায় আমরা নতুন বছরে প্রবেশ করছি, যা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মুক্তির অনুভূতি সঞ্চারিত করেছে।
কেন অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের উন্নতি ঘটেছে? ভোক্তা ও ব্যবসায়িক আস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে এবং এর সঙ্গে বিনিয়োগও বাড়ছে। যদি বলা হয়, পুরোপুরি কাকতালীয়ভাবে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রগতি ঘটেছে অথবা এর পেছনে সম্পূর্ণ অবদান রেখেছে প্রাকৃতিক উদ্দীপনা, তবে তা ভুল হবে। মৌলিক নিয়ামকগুলো, বিশেষ করে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি’ এক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে।
বড় দেশগুলোয় মুদ্রানীতি দীর্ঘদিন ধরে এবং অব্যাহতভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে সুদহার বাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর আগে অনুমানকৃত সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করে সংস্থাটি ২০১৬ সালের শুরুর অস্থিরতাকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামাল দিয়েছিল। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ড ক্রয়ের মাত্রা কমাতে শুরু করেছে। তবে তারা এও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সুদহার বৃদ্ধি দূরবর্তী প্রত্যাশা।
এসবের ফলাফল হিসাবে আর্থিক পরিস্থিতি সহজ হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ঋণ ও সম্পদের দাম উজ্জীবিত করেছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোয় আর্থিক নীতিতে ভারসাম্য বজায় রয়েছে। রাজস্বনীতি কয়েক বছর ধরে সংকোচনমূলক অবস্থা থেকে প্রায় নিরপেক্ষে রূপান্তর হচ্ছে। দশকের মাঝামাঝিতে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়লে চীন উল্লেখযোগ্য রাজস্ব সহায়তা দিয়েছে। এটি দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের ইতিবাচক অনুভূতি দিয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এত প্রণোদনা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির হার এখনো অপেক্ষাকৃত কম— প্রকৃতপক্ষে উন্নত অর্থনীতিতে যা রীতিমতো ধাঁধা সৃষ্টি করেছে। প্রকৃত ও সম্ভাব্য জিডিপির মধ্যকার ব্যবধান কমেছে কিংবা নেই, তবুও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে না। অনেকের কাছে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও নিম্নমূল্যস্ফীতির বর্তমান গঠনকে দারুণ লাগতে পারে— মনে হতে পারে, এর চেয়ে ভালো পৃথিবী আর হতে পারে না।
অনেক দেশের জন্য যদিও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম উৎসাহব্যঞ্জক। আর্থিক সংকটের পর থেকে বয়স্ক শ্রমশক্তি, শ্লথতর উৎপাদনশীলতা প্রবৃদ্ধি ও উচ্চতর ঋণ বোঝা দেশগুলোর পূর্বাভাসে কালো ছায়া ফেলছে। যেমন ১৯৯৫ সালের পরবর্তী দশকে উন্নত অর্থনীতিগুলোর বার্ষিক মাথাপিছু গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। এটি স্বাভাবিভাবেই সংকটের পর কমতে শুরু করেছে; এমনকি এখন এবং ২০২২ সালের মধ্যে গড় বার্ষিক মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি পৌঁছবে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশে। এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস।
উৎপাদনশীলতায় অপ্রত্যাশিত কিছু উত্থান না ঘটলে উন্নত অর্থনীতির বর্তমান ঊর্ধ্বগতি অনিবার্যভাবে পরিমিত হবে। মুদ্রানীতি ও আর্থিক শর্তাবলী কঠোর হলে; উচ্চ সরকারি ঋণ এবং পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকার যখন ব্যয় সংকোচনে বাধ্য হবে, তখন প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়বে। পরবর্তীতে শ্লথতর প্রবৃদ্ধি সার্বিক মজুরি প্রবৃদ্ধির ধীরগতির (বিশেষ করে অদক্ষদের ক্ষেত্রে) বিরুদ্ধে লড়াইকে কঠিন করে তুলবে। এর ফলাফল হিসেবে বৈষম্য ও অসন্তোষ বাড়বে। অনেক উদীয়মান বাজার ও নিম্ন আয়ের অর্থনীতিও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে।
বিশ্বের তাবৎ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথমত, তারা কী এমন পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে? দ্বিতীয়ত, তারা কি পারবেন নিজেদের অর্থনীতির সহ্যক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্ততা বৃদ্ধি করতে এবং একই সঙ্গে সেসব সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখতে, যা চলমান ঊর্ধ্বগতিতে আকস্মিক মন্দা নামিয়ে আনবে অথবা নতুন সংকট তৈরি করবে?
এ দুই চ্যালেঞ্জ ঘনিষ্ঠভাবে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। আজকের অনুকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের সামনে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এমন নীতি প্রণয়নের, যা এ দুই চ্যালেঞ্জকেই সামাল দিতে সক্ষম হবে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনার উন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য প্রধান কাজটি হবে মানবসম্পদের ওপর বিনিয়োগ। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং বাণিজ্য কিংবা প্রযুক্তির দরুন আসা কাঠামোগত রূপান্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি শিক্ষানবিশ কর্মসূচি উচ্চ যুবা বেকারত্বের কারণে যে সম্পদ নষ্ট হয়, তা রক্ষা করতে পারে। অন্যদিকে কাউন্সেলিং ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মজীবন দীর্ঘায়িত করতে পারে। বিপরীতভাবে, এক্ষেত্রে ব্যর্থতা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। কেননা দুর্বল কর্মসংস্থান সম্ভাবনা ও আয়বৈষম্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিকতা ও স্থানীয় ক্ষেত্রে বিচক্ষণ অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিনিয়োগগুলো অতিগুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলোর জন্য রাজস্ব বাজেটের প্রয়োজন। এরই মধ্যে ভারী হয়ে ওঠা সরকারি ঋণের বোঝা আর বাড়াতে না চাইলে সরকারের প্রয়োজন পড়বে কর ব্যবস্থা সংস্কারের, যা রাজস্ব বৃদ্ধি করবে প্রবৃদ্ধিকে নিরুৎসাহিত করা ছাড়াই। কর ব্যবস্থা এমন করতে হবে, যা অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করবে। এবং নাগরিকরা কর পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে আরো বেশি আস্থা পাবেন, যদি বড় করপোরেশন ও ধনীরা কর ফাঁকি দিতে যেসব পথ ব্যবহার করে, তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়।
আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হলে অর্থনৈতিক সহনশীলতা আরো বাড়াতে হবে। একদিকে সর্বশেষ আর্থিক সংকটের স্মৃতি মুছে যাচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক অস্থিতিশীলতার হুমকি বাড়ছে। অনেক দেশ এ সংকটের পর নিজেদের সামষ্টিক কাঠামোয় উন্নতি ঘটিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য বৃদ্ধি। সংকট-পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে চলা নিম্ন সুদহার লভ্যাংশ আয়ের পেছনে ছুটতে এবং বৈশ্বিক ঋণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে, যা কিছু ঋণগ্রহীতার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, যখন সুদহার বৃদ্ধি পাবে।
আইএমএফসহ আরো কিছু সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, যদিও স্বল্পমেয়াদে ঋণস্ফীতি দ্রুততর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত, কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই বেলা শেষে তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কিছু দেশকে ‘অতিরিক্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি’ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ঋণ ইস্যুতে রাজস্ব ভর্তুকি কমাতে বা একেবারে বাদ দিতে হবে। কিছু দেশকে আবার আগের মন্দার কারণে যে মন্দ ঋণগুলো রয়ে গেছে, সে বিষয়ে সমাধানে পৌঁছতে হবে।
উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের অর্থনীতিগুলো এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা উন্নত অর্থনীতিতে দেখা যায়। যেমন চীনের নেতারা দেশটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পেয়েছেন এবং সমাধানের জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলোর বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। সাম্প্রতিক সময়ে কমোডিটি মূল্যে ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও কমোডিটি পণ্য উৎপাদক দেশগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য রফতানি পণ্যের বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে।
যেহেতু বৈশ্বিক অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতির পরিধি বিস্তৃত, তাই এখনই সময় বহুপক্ষীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আগামী দিনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার। এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার হাত ধরে আসা দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকে শ্লথ করা।
আইএমএফের গবেষণা নির্দেশ করছে, এ শতকের বাকি সময়ে তাপমাত্রায় যে সম্ভাব্য বৃদ্ধি ঘটবে তাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলো কতখানি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। ২০১৫ সালে সম্পাদিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ নিচে রাখার লক্ষ্য পূরণ হলেও ঝুঁকি এড়ানো যাবে না। অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতিগুলোও কিন্তু ঝুঁকিতে রয়েছে। এর কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিধি বৃদ্ধি ও গণ অভিবাসন। সুতরাং নিজ স্বার্থেই তাদেরকে এখন দূষণ রোধে উন্নততর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সাহায্য করতে হবে।
মূল কথা হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য নীতিনির্ধারকদের যে দিবাস্বপ্ন দেখাচ্ছে, তা তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি’ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে। বর্তমানে যে অনুকূল সময় চলছে, তা স্বল্পমেয়াদি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি— প্রকৃতপক্ষে এ ঊর্ধ্বগতি তৈরির পেছনে যে শক্তিগুলো কাজ করেছে, সেগুলো বেশি দিন নাও টিকতে পারে। পুনরুদ্ধারকে আরো টেকসই করতে হলে নীতিনির্ধারকদের এ ইতিবাচক সময়ের সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে এবং সম্ভাব্য সংস্কার পদক্ষেপে জোর দিতে হবে। তা না হলে ভাবনার চেয়েও হয়তো দ্রুত কঠিন ভবিষ্যৎ হাজির হবে।
লেখক: আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ
ভাষান্তর: সাঈদ সরকার






