২০১৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কেমন হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মেতে রয়েছেন। এদের মধ্যে এমন কম জনই রয়েছেন, যারা আফ্রিকার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। অনেকেই জানেন যে, বিশ্বের মধ্যে এখনো এ মহাদেশে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র লোকের বাস, অথবা তরুণদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা ও কাজের সন্ধানে নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় দেখা যায়, আফ্রিকাকে নিয়ে সবচেয়ে ইতিবাচক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেও নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। অথচ এখানে আধুনিক মার্শাল প্ল্যান প্রবর্তন করা হয়েছে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব ও প্রবৃদ্ধির অনুঘটক হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণের নতুন কাঠামো হিসেবে।
এটা ঠিক যে, আফ্রিকার বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ২ হাজার ডলারে থমকে রয়েছে এবং বিশ্বের মধ্যে এ অঞ্চলে মজুরি উপার্জনকারীর অনুপাত সর্বনিম্ন (প্রায় ২০ শতাংশ)। স্থায়ী দারিদ্র্য, এর সঙ্গে যোগ দেয়া জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্বের হার বেড়েই চলছে। শ্রমশক্তির বড় অংশই এখনো নিম্ন উৎপাদনশীলতায় আটকে রয়েছে। কমোডিটি পণ্যের দামের ওপর বড় আকারে নির্ভরশীলতার জন্য অনেক দেশের রাজস্ব সক্ষমতা হ্রাসমান।
এ মহাদেশে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে, তবে তা অনেক শ্লথগতিতে। বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে আফ্রিকা মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ অবদান রাখতে পারে, এ হার কয়েক দশক ধরে বৃদ্ধি পায়নি। এর ওপর আফ্রিকার ১২০ কোটি জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, বছরপ্রতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। অন্যদিকে তরুণ জনসংখ্যার স্ফীতি— আফ্রিকার জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে— সরকারগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েই চলেছে। যখন এ সরকারগুলো এমনিতেই দুর্বল পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার কারণে গুরুতরভাবে ভুগছে।
এ সত্ত্বেও আফ্রিকা নিয়ে চলা কথাবার্তার অনেকগুলোই ভ্রান্ত। ‘আফ্রিকা’ কিন্তু একক কেউ নয়। এ মহাদেশে ৫৪টি দেশ রয়েছে। এ দেশগুলো অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স একে অন্যের তুলনায় ভিন্ন। ২০১৬ সালে মাথাপিছু সামষ্টিক জাতীয় আয় (জিএনআই) যেমন বুরুন্ডিতে ২৮০ ডলার, আবার সিসিলিতে ১৫ হাজার ৫০০ ডলার।
যুদ্ধবিধস্ত ও সংঘাতে আক্রান্ত আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে দক্ষিণ সুদান। আবার এ মহাদেশেই রয়েছে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান কিছু দেশ যেমন— আইভরি কোস্ট, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া ও সেনেগাল। এবং আফ্রিকায় রয়েছে প্রায় ৩০টি মধ্যম আয়ের দেশ, যার সম্মিলিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী (প্রায় ৩০ কোটি) দ্রুত বাড়ছে।
এখনো বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো এ প্রগতিশীল উদীয়মান আফ্রিকার প্রতি যথেষ্ট নজর দেয়নি, যার অর্থ এ মহাদেশ যে সুযোগ তৈরি করেছে, তা তারা হাতছাড়া করছে। একদিকে ধনী দেশগুলোর হাতে অতিরিক্ত সঞ্চয় রয়েছে, যা মুনাফালোভী ব্যাংকারদের অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। ব্যাংকারদের এ আচরণ শেষমেশ তৈরি করে আর্থিক বুদ্বুদ। বিপরীত দিকে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোয় বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে। ফলে এদের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হচ্ছে এবং এ মহাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুদর্শাকে স্থায়ী করে তুলছে। এ সমস্যা শেষমেশ দরিদ্র, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বৃহৎ আকারের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের অভিবাসন বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দেয়।
এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বৈশ্বিক অতিরিক্ত সঞ্চয় ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় (বিশেষ করে আফ্রিকায়) মুনাফাজনক বিনিয়োগ সুযোগের মধ্যকার অসঙ্গিত প্রতিফলিত করছে যে, মধ্যস্থতা সঠিক জায়গায় হচ্ছে না। আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তার মোট আকারের তুলনায় বেসরকারি অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংকটি অনেক ছোট। ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ছিল ১৩৫ বিলিয়ন ডলার (এর মধ্যে ৪৫ বিলিয়ন ডলার আফ্রিকা পেয়েছে)। সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে (সভরেইন ওয়েলথ ফান্ড) রয়েছে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এটি বিনিয়োগ পাওয়ার আরেকটি সম্ভাবনাময় বৈশ্বিক উৎস।
উন্নত দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের উচিত অর্থায়নের কিছুটা দরিদ্র দেশগুলোয় করা, বিশেষ করে আফ্রিকায়। এ মহাদেশটিতে বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে। যদিও মুনাফার সুযোগ রয়েছে প্রচুর। ম্যাকিনসি অ্যান্ড কোম্পানির গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল বিশ্বের যেকোনো জায়গার তুলনায় আফ্রিকায় বিদেশী বিনিয়োগের রিটার্ন উচ্চতর। তবুও বৈশ্বিক বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহের একটা ক্ষুদ্র অংশ আফ্রিকায় আসে। (পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০১৭ সালে এফডিআই প্রবৃদ্ধি ফের বাড়তে শুরু করবে এবং ২০১৮ সালে তা ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে)।
এ পরিস্থিতির একটি প্রধান কারণ হলো, আফ্রিকায় ব্যবসায়িক পরিবেশ খুব খারাপ, এমনটা মনে করা। কিন্তু কর আদায়ের দুর্বল রেকর্ড সত্ত্বেও আফ্রিকা কর ও অন্যান্য আর্থিক রাজস্ব থেকে বার্ষিক আয় করে ৫০০ বিলিয়ন ডলার, প্রতি বছর মহাদেশটি যে পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য পায়, তার তুলনায় এটি ১০ গুণের বেশি। এবং ২০১৫ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রাপ্তি ৪৩২ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলার এসেছে আফ্রিকায়।
পণ্য আমদানি করতে মহাদেশটি প্রতি বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে। অথচ এসব পণ্য মহাদেশটি নিজ সীমানায় অনেক সস্তায় ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারত, যদি এর শিল্পায়ন কৌশল প্রতিযোগিতা সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে শিল্পে সহায়তা জোগাত। কিছু দেশে অর্থ পাচার বাধাহীনভাবে ঘটছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার কারণে সুযোগ হারানোর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
যদি এমন একটি অর্থায়ন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা যায়, যা অনুযায়ী বিশ্বের উত্তর থেকে অতিরিক্ত সঞ্চয় এনে বিশ্বের দক্ষিণে বিনিয়োগে ব্যবহার করা হবে, তবে তা থেকে সবাই উপকৃত হতো। কেননা আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সুযোগ সন্ধান করে এবং উন্নত অর্থনীতিগুলো নতুন রফতানি চাহিদার উেসর খোঁজ করে। এখানে যেটা করতে হবে তা হলো, আফ্রিকার সবচেয়ে প্রতিযোগীক্ষম, শ্রমঘন শিল্প খাতগুলোকে টার্গেট করতে হবে। এদের শুধু অর্থ দিয়ে সহায়তা করলে হবে না, বরং বিভিন্ন সংস্থা যেমন— ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, শিল্প পার্ক এবং এজেন্সি, যারা সনদ ও মানসম্পন্ন অবকাঠামো প্রদান করবে, তাদের মাধ্যমেও সহায়তা দিতে হবে।
যথাযথ নীতির সঙ্গে আফ্রিকায় শিল্পায়ন ঘটানো গেলে তা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন দ্রুতবেগে এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে উচ্চতর দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে গড় আয় ও স্থানীয় ভোগ বৃদ্ধি করবে। আফ্রিকাকে সেবা ও কৃষি খাতের মধ্যে, গ্রাম্য ও শহুরে অর্থনীতির মধ্যে এবং ভোক্তা, কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল গুডস ইন্ডাস্ট্রির মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। এবং উৎপাদিত রফতানি পণ্যের দাম প্রাইমারি গুডসের তুলনায় কম পরিবর্তনশীল ও টেকসই করা গেলে, তা শিল্প দেশগুলোকে কমোডিটি পণ্য রফতানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসে সহায়তা করবে।
জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনআইডিও) অনুমান করছে যে, আফ্রিকা ও নিম্নোন্নত দেশগুলোর জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অংশ বৃদ্ধির কারণে প্রায় ৪৮৫ বিলিয়ন ডলার সামষ্টিক বিনিয়োগ হতে পারে এবং পারিবারিক ভোগ বৃদ্ধি পেতে পারে প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ইউএনআইডিওর গবেষণা অনুযায়ী, আফ্রিকার জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং অংশে যোগ হওয়া প্রতি অতিরিক্ত শতাংশীয় পয়েন্টের জন্য মাথাপিছু বিনিয়োগ বাড়বে ৬৬ ডলার করে, যেখানে মাথাপিছু ভোগ বাড়বে ১৯০ ডলার করে।
আফ্রিকায় বিনিয়োগ ও ভোগের এ বৃদ্ধি বিশ্বের অন্য অঞ্চল, বিশেষ করে জি২০ অর্থনীতিগুলো থেকে ক্যাপিটাল ও কনজিউমার পণ্যের চাহিদা বাড়াবে। ক্যাপিটাল ও কনজিউমার পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে অর্থনীতির বিভিন্ন গুণক প্রভাব (একটির অবস্থার উন্নতি হলে ক্রমান্বয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য খাতগুলোরও উন্নতি ঘটে) সক্রিয় হবে এবং কাঁচামালের চাহিদা বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আয় প্রবৃদ্ধি দ্রুততর হবে।
এ সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে, আফ্রিকায় সমৃদ্ধি অপেক্ষায় রয়েছে এবং এটি সঠিক। বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা এ সুযোগ এড়িয়ে যাবে না।
লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপ
ভাষান্তর: সাঈদ সরকার






