‘সেপ্টেম্বর ওয়ান, ১৯৩৯’ কবিতায় ডব্লিউ এইচ অডেনের ‘বিষাদময় শঠতায় ভরা এক দশকের’ মতো বিষণ্ন ও অন্যায্য এক বছর শেষে বিশ্বের ‘কুশলী প্রত্যাশাগুলো’ (ক্লেভার হোপস) এ বিষয়টিই স্বীকার করে নিচ্ছে যে, আমাদের অসংখ্য গুরুতর সমস্যার সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি হচ্ছে অর্থনৈতিক অসমতা বা বৈষম্য; যার দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি অস্তিত্ববিনাশী প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ মাত্রা দারুণভাবেই উঠে এসেছে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ তমা পিকেটি, ফ্রাসোয়াঁ বার্গিনিয়োঁ, ব্র্যাঙ্কো মিলানোভিচ, জোসেফ ই. স্টিগলিটজের কাজে এবং অক্সফাম ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে। অবশ্য নিউইয়র্ক, বার্লিন, বেইজিং কিংবা নয়াদিল্লির রাস্তায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলেও বিষয়টি আঁচ করা যায়।
ডানপন্থীদের দাবি, বৈষম্য কেবল সমর্থনযোগ্যই নয়, বরং তা যথাযথও। কারণ কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার হচ্ছে ধনসম্পদ; অন্যদিকে অলসতা দারিদ্র্য ডেকে আনে। এ ধরনের দাবি ‘মিথ’ ছাড়া কিছুই নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, দরিদ্র মানুষকে কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই কঠোর পরিস্থিতির মধ্যেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়।
সম্পদশালী কেউ যদি কঠোর পরিশ্রমী স্বভাবের হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি তার জিনগত প্রবণতার পাশাপাশি বেড়ে ওঠার সঙ্গেও জড়িত; এক্ষেত্রে যেসব সুবিধা, মূল্যবোধ বা সুযোগ সে তার পারিবারিক আবহ থেকে পেয়েছে সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ক্রমে বেড়ে চলা দারিদ্র্যের মধ্যে অঢেল সম্পদের পক্ষে সত্যিকারের কোনো নৈতিক যুক্তি থাকতে পারে না।
তবে একথা বলছি না যে, যেকোনো মাত্রার বৈষম্যের পেছনে কোনো ন্যায্যতা নেই। যেহেতু বৈষম্য অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে এক ধরনের পার্থক্যকে প্রতিফলিত করে; যেমন কেউ কেউ অন্যকিছুর চেয়ে বস্তুগত সম্পদের পেছনে ছোটাই অর্থবহ মনে করতে পারে। তবে বিভিন্ন প্রণোদনা বা পুরস্কার মানুষের জন্য উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। ফলে শেখা, কাজ করা ও উদ্ভাবনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে সাহায্য করে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি পর্যায়ে এসে বৈষম্য এতটাই তীব্রতর হয়ে ওঠে যে, এর বিপরীত প্রভাব চোখে পড়তে থাকে। আমরা অবশ্য অনেক আগেই সেই পর্যায় পার হয়ে এসেছি।
অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের মধ্যে বিশ্বের অনেক ধনীও রয়েছেন, যারা স্বীকার করছেন, তীব্র বৈষম্য কতটা অগ্রহণযোগ্য; নৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই। কিন্তু বিত্তশালী কেউ যদি অসমতার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাহলে প্রায়ই তাদের চুপ করিয়ে দেয়া হয়, ভণ্ড হিসেবেও তকমা সেঁটে দেয়া হয়। দৃশ্যত, বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা বা ইচ্ছাটা তখনই খাঁটি কিংবা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে, যখন ব্যক্তি তার নিজের সম্পদ পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে সত্যিটা হচ্ছে, সম্পদ ত্যাগ না করার সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে, একটি বৈষম্যহীন ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সম্পদশালী কারোর থাকতে পারে না। বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সমালোচনাকারী কোনো ধনী ব্যক্তিকে ভণ্ড হিসেবে আক্রমণ করার বিষয়টি মূলত আবেগতাড়িত, লজিক্যাল ফ্যালাসি। এর উদ্দেশ্য তাদেরকে চুপ করিয়ে দেয়া, যাদের উচ্চারণ পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম।
সৌভাগ্যবশত কৌশলটি বোধহয় এর কিছু কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ধনী অনেক ব্যক্তিই এ ধরনের সমালোচনাকে তুচ্ছজ্ঞান করছেন। একই সঙ্গে চরম বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিগুলোকে খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন এবং সামগ্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করছেন, যে ব্যবস্থার কারণে অসংখ্য মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। যদিও এ ব্যবস্থার মাধ্যমেই ওই ধনীরা সম্পদশালী হয়েছে।
কিছু মার্কিন ধনী কংগ্রেশনাল রিপাবলিকান ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রণীত কর সংস্কার আইনটির বিরোধিতা করছেন। যদিও এ আইনের মাধ্যমে তাদেরকে আরো কম আয়কর দিতে হবে। ভ্যানগার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক বোগল, যিনি প্রস্তাবিত আইন থেকে লাভবান হবেন, মার্কিন প্রশাসনের এ পরিকল্পনাকে ‘নৈতিক কদর্যতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
বর্তমান কাঠামোর ত্রুটিগুলো স্বীকার করে নেয়ার বিষয়টিকে কেবল সূচনা হিসেবে দেখা যায়। মূল চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজের জন্য একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন (এমন একটি কার্যকর ব্লুপ্রিন্ট বা পরিকল্পনার অভাবে ইতিহাসের অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে)। এক্ষেত্রে লক্ষ্যটা থাকা উচিত, লভ্যাংশ বণ্টন ব্যবস্থাটি আরো সম্প্রসারণ করার ওপর। এক্ষেত্রে বাজার প্রণোদনাগুলোকে শ্বাসরোধ বা কেন্দ্রীভূত করা যাবে না, কারণ এগুলো প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হতে পারে একটি দেশের অর্থনীতির সুফলের নির্দিষ্ট অংশ দেশটির জনগণের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া। মার্টি ওয়াইটজম্যান, হিলেল স্টাইনার, রিচার্ড ফ্রিম্যান ও ম্যাট ব্রুনিগের মতো অর্থনীতিবিদরা নানাভাবে এ ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আজকের বিশ্বে এ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু জাতীয় আয়ে মজুরির অংশ কমে গেছে এবং মুনাফা ও ভাড়ার অংশ বেড়েছে। এ ধারাটি প্রাযুক্তিক অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত করছে।
লভ্যাংশ বণ্টনের আরো একটি মাত্রা রয়েছে, যা খুবই কম মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। এটা একচেটিয়াত্ব ও প্রতিযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে উৎপাদনের পরিমাণ (রিটার্ন টু স্কেল) এতটাই বেড়েছে যে এর সঙ্গে চাহিদার কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন, এক হাজারটি প্রতিষ্ঠান একই পণ্য উৎপাদন করছে, প্রত্যেকেই সামগ্রিক চাহিদার এক হাজার ভাগের এক ভাগ পূরণ করছে।
এক্ষেত্রে আরো পরিশীলিত পদক্ষেপটি হতে পারে, এক হাজারটি প্রতিষ্ঠানের সবাই পণ্যটির একেকটি অংশ তৈরি করবে। অর্থাৎ গাড়ি নির্মাণ শিল্পে একটি কোম্পানি মোটরগাড়ির যাবতীয় গিয়ার তৈরি করবে, অন্য একটি কোম্পানি ব্রেক প্যাড এবং এভাবে চলতে থাকবে।
১৮৯০ সালে আমেরিকায় শেরম্যান অ্যাক্ট প্রণয়নের মাধ্যমে প্রবর্তিত অ্যান্টিট্রাস্ট ও প্রো-কম্পিটশন আইন এ ধরনের কার্যকর একটি ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। কিন্তু একচেটিয়া উৎপাদন মানেই একচেটিয়া উপার্জন নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারক উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় থাকবে। ফলে সময় এসেছে যুগোপযোগী পরিবর্তনের, বাধ্যতামূলক আইন প্রণয়ন করে প্রচলিত অ্যান্টি-মনোপলি আইন সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারের বিস্তৃতি আরো বাড়ানোর।
ধারণাগুলো বৃহৎ আকারে পরীক্ষিত নয়। এ কারণে বাস্তবায়নের আগে আরো কিছু গবেষণা প্রয়োজন। বিশ্ব এখন এক সংকট থেকে আরেক সংকটে পতিত হচ্ছে, বৈষম্য আরো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। সুতরাং চলমান ব্যবস্থায় আমাদের আটকে বা স্থির থাকার বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ নেই। আমরা যদি সহসা বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা না করি, তবে সামাজিক সংহতি ও গণতন্ত্র গভীর সংকটে নিপতিত হবে।
লেখক: বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস






