অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ভালোর দিকে যাচ্ছে, এমন আশাবাদ ছিল লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৬ ও ২০১৮ সালে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। বেশকিছু প্রধান অর্থনীতি ও অঞ্চলে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং ব্যবসা ও ভোক্তা আস্থায় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির এ পুনরুদ্ধারের পুরো সুবিধা তুলে নিতে চায় ইন্দোনেশিয়া। ২০১৭ সালে দেশটি ধারাবাহিকভাবে ৫ শতাংশের কাছাকাছি সম্মানজনক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। প্রবৃদ্ধির এ হার বেশির ভাগ উদীয়মান অর্থনীতির চেয়ে ভালো। এর পেছনে কাজ করেছে বিনিয়োগ ও ভোগ বৃদ্ধি এবং রফতানি খাতে পুনরুদ্ধার। এ পুনরুদ্ধারে আংশিকভাবে কমোডিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও অবদান রেখেছে। আদতে দেশটির প্রবৃদ্ধির তৃতীয় চালিকাশক্তি হিসেবে ক্রমেই নির্ভরযোগ্য ভিত হয়ে উঠছে এ রফতানি।

ইন্দোনেশিয়ার সামষ্টিক অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলো বেশ ভালো অবস্থান নির্দেশ করছে। নতুন কর্মসংস্থান ও প্রকৃত মজুরির ক্ষেত্রে দেশটি দৃঢ় প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির মূল্যস্ফীতির হারও নিম্ন, প্রায় ৪ শতাংশে স্থিতিশীল থাকছে। এর ওপর খাদ্যমূল্যে স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী ভোক্তা আস্থা, নিম্ন সুদহার ও বিনিময় হারে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে অবদান রেখেছে অবকাঠামো খাতে ব্যয় বৃদ্ধি।

ইতিবাচক এ ধারাগুলো চলমান সংস্কারের গতিতে প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। সর্বোপরি, সূর্য যে সময় ঝলমল করে, সে সময়ই ছাদ মেরামতের সবচেয়ে ভালো সময়। এ নীতি মেনেই প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো উচ্চতর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার শক্তিশালী ভিত প্রতিষ্ঠা করবে। কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি আমরা বিচক্ষণ রাজস্ব ও মুদ্রানীতি প্রণয়নে কাজ করছি। কারণ আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ দিগন্তের বাইরে।

ইন্দোনেশিয়ার অগ্রগতির প্রমাণ দেখা যাবে প্রাপ্ত স্বীকৃতিতে। ইন্দোনেশিয়ার অগ্রযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েই চলেছে। তিনটি প্রধান রেটিং এজেন্সি ইন্দোনেশিয়াকে ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড ক্রেডিট রেটিং দিয়েছে। ওইসিডি/গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ ইন্দোনেশীয়র সরকারে আস্থা রয়েছে— জরিপকৃত দেশগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।

এর ওপর ২০১৪ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে’ ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ধাঁ করে বেড়ে ৩৪তম হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর নেতৃত্বে দেশটির ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি দারুণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি সংস্কারক দেশের একটি ইন্দোনেশিয়া।

২০১৭ সালের শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্ট বিশাল অংকের ২০১৮ জাতীয় বাজেট অনুমোদন করেছে। এ বাজেটের লক্ষ্য ব্যবসায় আস্থাকে আরো শক্তিশালী, উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা। গত তিন বছরে দেশের অবকাঠামো ও মানবসম্পদের মধ্যকার ব্যবধান কমানোর জন্য জোরেশোরে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া সরকার ভবিষ্যতের জন্যই বিনিয়োগ করছে। নতুন বাজেটেও একই ধারা বজায় রয়েছে। নতুন বাজেটে এ দুই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে, যেন এক্ষেত্রে নজিরবিহীন স্তরে পৌঁছানো যায়।

সত্যি কথা হচ্ছে, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অঞ্চলের চেয়েও নাগরিকরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল দেশ। এ কারণে দেশটির রয়েছে বিশাল ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ শ্রমশক্তি, যা আগামীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে আরো বেগবান করবে। আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার একুশ শতকের যুবারা অনেক বেশি সংযুক্ত, সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী। এরাই আমাদের আগামী দিনের উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, প্রফেশনাল, নাগরিক সমাজের নেতা ও করদাতা। এবং এ তরুণরা এরই মধ্যে সবলে প্রতিযোগিতা করছে ডিজিটাল অর্থনীতিতে, যেখানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ফলে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সামনে আসতেই থাকবে।

আগামী দিনের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পরবর্তী প্রজন্মকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতে হবে। এ লক্ষ্য পূরণে, সরকার
মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। ২০১৮ সালের জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে আর ৫ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে।

অধিকন্তু সরকার দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও অরক্ষিত সম্প্রদায়কে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা জালের মাধ্যমে ক্যাশ ট্রান্সফার, ক্যাশ-ফর-ওয়ার্ক কর্মসূচি ও অন্যান্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমরা দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র থেকে নাগরিকদের বের করে আনছি। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ শিক্ষা প্রকল্প ‘ইন্দোনেশিয়া পিনতার’ নিশ্চিত করবে ২ কোটি ৩ লাখ স্কুল বয়সী শিশুর বিদ্যালয়ে গমন। স্বাস্থ্য প্রকল্প ‘ইন্দোনেশিয়া সেহাত’ জনসাধারণের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বৃদ্ধি করবে। এবং বড় আকারের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পগুলো চালু করা হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিগুলো যেন জোরেশোরে এগিয়ে যেতে পারে।

তিনটি টাইম জোনে ছড়িয়ে থাকা ১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপপুঞ্জ। সৌভাগ্যক্রমে অবকাঠামো খাতে চলমান বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃসংযুক্ত করবে। যেহেতু লজিস্টিক ব্যয় কমছে এবং দক্ষতা বাড়ছে, তাই আমরা শিগগিরই প্রধান দ্বীপগুলোর বাইরে নতুন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রের উত্থান দেখতে পাব।

সরকার জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী করতে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কর আহরণ আরো কার্যকর ও করের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত করতে আমরা নতুন একটি বিস্তৃত কর-সংস্কার পরিকল্পনা চালু করেছি। এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। এগুলো দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।

ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যারা ইন্দোনেশিয়াকে এড়িয়ে যান, তারা আদতে এখানকার সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। ইন্দোনেশিয়ার সফলতার গল্প এখন বিশ্বনন্দিত। জি-২০ সদস্য হিসেবে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি হতে যাচ্ছে। যখন ইন্দোনেশিয়া সমৃদ্ধি লাভ করে, তখন সবাই লাভবান হয়।

পূর্ব এশিয়ার গতিশীলতায় অবদান রাখতে ইন্দোনেশিয়া নিজের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটির বর্তমান সরকারও আগামী দিনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক: ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান

ভাষান্তর: সাঈদ সরকার