বিগত বছরে আমরা বেশকিছু হামলার শিকার হয়েছি, যার অনেকগুলোই ছিল কানের পাশ দিয়ে গুলি যাওয়ার মতো। অগ্রসরমান বিশ্ব যেখানে উন্নত অর্থনীতি এবং বর্ধনশীল অর্থনীতির সমৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট ছকের দ্বারা অর্জিত। এক্ষেত্রে আলোচিত হামলাগুলো একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসছে। এসব হামলার পেছনের কারণ কি অর্থনৈতিক, নাকি সাংস্কৃতিক? আমার কাছে মনে হয় দুটোই। সাংস্কৃতিক হলে উত্তরটা অনেকটা এ রকম যে, এখনই কেন? আর অর্থনৈতিক উত্তরটা অনেকটা এ রকম, আয় প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অবনমন।
এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী? আমার মূল চ্যালেঞ্জ আসলে অসন্তুষ্ট অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নীতির সঠিক প্রয়োগের অভাবের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতিগুলোই রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল।
তবুও আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে, কেননা সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, মানুষ তার যাপিত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। জেনারেল সোস্যাল সার্ভে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালের পরিসংখ্যানে যে সন্তুষ্টির মাত্রা অনেক উপরে ছিল, সেটা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে তলানিতে এসে ঠেকেছে যদিও তাদের আয় অনেক গুণ বেড়েছে। অন্যান্য বড় এবং প্রধান অর্থনীতির মানুষও একই তথ্য দিয়েছে। ইতালি এবং ফ্রান্সেও পরিসংখ্যান বলছে সন্তুষ্টির হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ট্রাম্প কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার কোনোটাই তিনি নিজে বা তার দলের কেউই পূরণ করতে পারেননি। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান বাড়াবেন, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, হয়েছে তার উল্টো। সারা বিশ্বে মেশিন দ্বারা মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। এ হার ক্রমাগত বাড়ছে মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির বিপরীতে।
একইভাবে ট্রাম্প আরো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কয়লাভিত্তিক শিল্পকে তিনি আবার পুনর্জন্ম দিতে চান, যার প্রবৃদ্ধি গত এক দশকে অনেকখানি অবনমন হয়েছে। মজার বিষয় হলো এটা প্রযুক্তিগত কারণে হয়নি বরং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম অতিরিক্ত মাত্রায় কমে যাওয়া এবং কয়লানীতিকে আরো কঠিন করার কারণে হয়েছে। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, মজুরি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের উপরে অর্জন, যা কিনা জনতাত্ত্বিক প্রবণতা এবং বিশ্বব্যাপী ধীরগতির উৎপাদন প্রবৃদ্ধির আড়ালে হারিয়ে গেছে, যা একই সঙ্গে বর্তমান সময়ের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি শক্তিশালী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। যদিও দেশে দেশে তা ভিন্ন রকম। মূলত শক্তিশালী নীতিতে উন্নত শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, বাণিজ্য বৃদ্ধি, ট্যাক্স নীতি পুনর্গঠনসহ ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো স্থান পায়।
কিন্তু উন্নত অর্থনীতিগুলোয় সব ধরনের নীতির সংস্কার খুব সামান্যই ভূমিকা রাখে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সামান্য নীতি সংস্কারের ফলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি। যেমন বাজার অর্থনীতিতে চীনের রূপান্তর কিংবা লাইসেন্স রাজের ক্ষেত্রে ভারতের সংস্কার অথবা লাতিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক উদারীকরণ। উন্নত অর্থনীতিগুলোও একই ধরনের প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে গেছে কিন্তু সেগুলো মধ্যবর্তী কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি (কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে নীতি সংস্কার বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম)।
উন্নত অর্থনীতিগুলো যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে প্রবৃদ্ধির হার হবে ধরে নেয়া যাক দশমিক ৩ শতাংশ। এটাই যথেষ্ট যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের গৃহস্থালি আয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০০ ডলার যোগ করার ক্ষেত্রে।
একইভাবে অসাম্য দূর করতে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। কিছু দেশে এর অর্থ হলো শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যেখানে অন্তত তাদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত হবে এবং শক্তিশালী ইউনিয়ন একটা ভালো শুরু হতে পারে, পাশাপাশি এটাকে দুর্বল করতে শ্রমিক অসন্তুষ্টি ও সংঘাত এবং শ্রমিকদের কর্ম পরিবর্তনের অধিকার না থাকার মতো বিষয়ও আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।
প্রতিযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি এবং অকার্যকর ভাড়া কমানোর মতো নীতি খুবই ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। এটা তীব্র প্রতিবাদ এবং শুরুতে প্রবেশে বাধা সৃষ্টিকারী প্রচেষ্টাকে দূর করতে পারে মানুষকে তার নিজস্ব তথ্য সংরক্ষণের মালিকানার অধিকার প্রদানের মাধ্যমে। তার পরও এ রকম প্রচেষ্টা কম মনে হতে পারে অসাম্য ও আয় প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে।
কিছু নীতি অর্থনৈতিকভাবে বিচক্ষণ মনে হতে পারে কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে। যেমন— আমার কাছে মনে হয় সমাজের দুর্বলদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা অনেক বেশি প্রয়োজন, যারা বিশ্বায়নের জন্য অনেক কিছু হারিয়েছে এবং বাজার প্রতিযোগিতার কাছে কিছুই পায়নি।
ওবামাকেয়ার নামে ২০১০ সালে যে সামাজিক সুরক্ষা নীতির শুরু হয়েছিল, তা বিগত ৫০ বছরের মধ্যে বড় এবং আগামী ৫০ বছরে এ রকম কিছু চিন্তা করাও কঠিন। স্বাস্থ্যবীমার জন্য অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং বীমা না থাকার সুযোগ কমে আসা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় কোনো প্রভাব রাখেনি। এটা অনেককেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সাহায্য করলেও অনেকের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে, যারা সরকারের সুবিধাভোগী তাদের কাছে নিজের পকেট কেটে অন্যকে খাওয়ানোর মতো।
তবু এ রকম কিছু অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন সবসময়ের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ন্যায় এবং তা কিছুটা হলেও উদ্বেগ কমায়। আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রেও কিছুটা নম্র হতে হবে।
২০১৮ সাল কিংবা পরবর্তী যেকোনো সময়ের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান হয়তো আমাদের নতুন কোনো নীতি কিংবা বস্তুগত কোনো পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের মধ্যে নেই কিন্তু আমাদেরকে একটা উপায় বের করতে হবে, যা আমাদের সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং নীতিনির্ধারকদের সহজাত সীমাবদ্ধতাকে মোকাবেলা করতে পারে। কোথাও না কোথাও একটা সমাধান আছে শুধু মানুষের সামনে রাজনৈতিক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়ার থেকেও।
লেখক: হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: হাসান রাহফি






