নতুন বছর আসার লগ্নে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দশক-পুরনো একটি বিতর্ক আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে: কৃচ্ছ্র বা ব্যয়সংকোচন নীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করে, না ক্ষতি করে? আরো বড় করে বললে এই বিতর্ক দুই দলের মধ্যে: রক্ষণশীল, যারা সরকারি ব্যয়সংকোচনের পক্ষে, এদের সংখ্যা কম এবং প্রগতিশীল, যারা বিভিন্ন পণ্য ও সেবা যেমন— অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরো বেশি বিনিয়োগ চায়।

অবশ্যই বাস্তবতা এর থেকে অনেক বেশি জটিল এমনকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো গোঁড়া প্রতিষ্ঠানও বলছে ব্যয়সংকোচন পরাজয় ডেকে আনতে পারে। ১৯৩০ দশকে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেয়নার্ড কেইনস যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, অর্থনৈতিক অবনতির সময় যদি সরকার ব্যয়সংকোচন করে, তবে একটি স্বল্পমেয়াদি মন্দা পুরোদস্তুর মহামন্দায় পরিণত হতে পারে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ইউরোপের ব্যয়সংকোচনের সময় ঠিক এটিই ঘটেছে।

এবং প্রগতিশীলদের এজেন্ডা শুধু সরকারি ব্যয় নিয়ে নয়। কেইনস নীতিনির্ধারকদের আরো বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করতে বলেছেন। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত নিজ বই ‘দ্য এন্ড অব লেইস ফেয়ার’-এ  কেইনস লিখেছেন, সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সেসব কাজ না করা, যা ব্যক্তিরা এরই মধ্যে করে ফেলেছে। বরং সেসব কাজ করতে হবে, যা এখনো কেউ করেনি। অন্যভাবে বললে, কীভাবে বিনিয়োগ নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে গড়ে তুলতে  সাহায্য করবে, তা নিয়ে সরকারের কৌশলগত চিন্তা করা উচিত।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ কার্ল পোলানি তার ক্ল্যাসিক বই ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন’-এ আরো বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এ বইয়ে তিনি বলছেন, ‘মুক্তবাজার’ নিজেই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পণ্য। অন্যভাবে বললে, বাজার কোনো অবাধ স্বাধীন ক্ষেত্র নয়, যেখানে রাষ্ট্র ভালো কিংবা খারাপ যে কারণেই হোক হস্তক্ষেপ করতে পারে; বরং বাজার শুধু প্রাইভেট নয়, পাবলিক কার্যক্রমের ফল।

ব্যবসা, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয় এবং নতুন বাজারের উত্থান প্রত্যাশা করে, তা এ বিষয়টি বুঝতে পারে। শীর্ষ ব্যবস্থাপকরা, যাদের অনেকেই নিজেদের ভাবে ‘সম্পদ সৃষ্টিকারী’, সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান, কৌশলগত ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের ওপর কোর্স গ্রহণ করে। তাদের উৎসাহ দেয়া হয় ঝুঁকি গ্রহণে এবং মন্থরতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।

কিন্তু যদি ‘ভ্যালু’ সম্মিলিতভাবে তৈরি করতে হয়, তবে সেসব ব্যক্তি যারা সরকারি খাতে ক্যারিয়ার গড়ছে, কীভাবে ঝুঁকি গ্রহণকারীর মতো চিন্তা করতে হয়, তাদের সে বিষয়ে শিক্ষা দেয়া উচিত। এখন তাদের এ শিক্ষা দেয়া হয় না। প্রকৃতপক্ষে সরকারি নীতিনির্ধারক ও কর্মচারী নিজেদের বাজার বা সম্পদ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিন্তা করে না, তারা সর্বোচ্চ যেটা ভাবে, তাহলো ‘বাজার মধ্যস্থতাকারী’ এবং সবচেয়ে বাজে হলো ‘সম্পদ সৃষ্টির পথে অন্তরায়’।

স্বধারণার এ পার্থক্যের জন্য আংশিক দায়ী মূলধারার অর্থনৈতিক তত্ত্বের ফলাফল। মূলধারার অর্থনৈতিক তত্ত্বে বলা হচ্ছে, একমাত্র বাজার ব্যর্থ হলেই সরকারের উচিত হস্তক্ষেপ করা। রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো এ খেলার নিয়ম তৈরি এবং কার্যকর করা; লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা; অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, মৌলিক গবেষণার মতো সরকারি পণ্যে তহবিল জোগানো এবং দূষণের মতো ক্ষতিকর নেতিবাচক বাহ্যিকতা কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

যখন বাজার ব্যর্থতা ঠিক করতে রাষ্ট্র নিজের নির্ধারিত ভূমিকা ছাড়িয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন সরকারকে অভিযুক্ত করা হয় ‘নির্দিষ্ট কিছু খাত বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা প্রদান’ বা ‘বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাসের’ মতো বাজারে বিকৃতি সৃষ্টিকারী হিসেবে। এর ওপর ‘নতুন সরকারি ব্যবস্থাপনা’ তত্ত্বের উত্থান (যেটা আত্মপ্রকাশ করেছে ১৯৮০ দশকের ‘সরকারি পছন্দ’ তত্ত্ব থেকে) সরকারি কর্মচারীদের এটা বিশ্বাস করাচ্ছে যে, তাদের উচিত যথাসম্ভব কম দায়িত্ব গ্রহণ করা, এই ভয়ে যে বাজার ব্যর্থতার চেয়ে হয়তো সরকারের ব্যর্থতা অনেক বেশি মন্দ/বাজে হবে।

এ চিন্তার কারণে অনেক সরকার ‘ব্যয়-মুনাফা বিশ্লেষণের’ মতো হিসাব পদ্ধতি বেসরকারি খাত থেকে গ্রহণ করেছে, অথবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের হাত দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিচ্ছে এবং এসব করা হচ্ছে দক্ষতার নাম করে। তবে এ পদ্ধতি শুধু নিজ লক্ষ্য অর্জনেই ব্যর্থ হবে না, বরং এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আত্মবিশ্বাসই কমিয়ে দেবে এবং বয়স্ক লোকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলায় তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি তৈরি করবে।

সবসময় যে এটা ঘটে, তা নয়। যুদ্ধোত্তর সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দুটি সংস্থা নাসা ও ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (ডিএআরপিএ) এমন কিছু তৈরি করে, যা পরবর্তীতে ইন্টারনেট নামে পরিচিতি পায়। উভয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০-এর দশকে এবং এদের যথেষ্ট তহবিল জোগান এবং পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। মিশন-ভিত্তিক পদ্ধতির কারণে এরা শীর্ষ মেধাবীদের আকর্ষণ করতে পেরেছিল এবং এদের কর্মকর্তাদের বড় চিন্তা ও ঝুঁকি গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল।

একইভাবে, ইউএস অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি-এনার্জি (এআরপিএ-ই) (প্রতিষ্ঠিত করা হয় ২০০৯ সালে) নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে ব্যাটারি স্টোরেজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন দেখিয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) বিভিন্ন ‘ব্লকবাস্টার’ ওষুধ তৈরিতে তহবিল জুগিয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ১৯৮০ দশকে বিবিসির উচ্চাভিলাষী কম্পিউটার সাক্ষরতা প্রকল্পের কারণে মাইক্রো কম্পিউটারে বিনিয়োগ ঘটে। এই ডিভাইসের যন্ত্রাংশ তৈরি করতে গিয়ে অ্যাডভান্সড আরআইএসসি মেশিনসের মতো প্রতিষ্ঠান (পরবর্তীতে যার নতুন নাম হয় আর্ম) নিজেদের উন্নতি করে এবং জাতীয় পাওয়ারহাউজে পরিণত হয়।

আজ উল্টোটা ঘটছে। অনেক মিশনভিত্তিক সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে। বড় ধরনের মিশন ধাওয়া করার বদলে নাসা আজ বর্তমান অর্থনৈতিক মূল্যের দিক থেকে নিজেকে জাহির করে চলছে। বিবিসিও ক্রমবর্ধমান সংকীর্ণ ব্যবস্থায় জড়ানোর মাধ্যমে নিজেকে মূল্যায়ন করে চলেছে। হয়তো উচ্চমানের কন্টেন্টে বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি ন্যায্যতা পেতে পারে, কিন্তু এ ফরমেটের স্বাধীনতার জন্য যে পাবলিক ভ্যালু বা সর্বজনীন মূল্য তৈরি হতো, তাতে সহায়তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

পাবলিক ভ্যালু মানে এই নয় যে বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বণ্টন বা পাবলিক পণ্যে প্রভাব ফেলা ইস্যুগুলোকে ঠিক করা। প্রকৃতপক্ষে এর অর্থ হলো বিভিন্ন জায়গায় ভ্যালুর কো-ক্রিয়েশন (সহনির্মাণ)। যখন মিশন-ভিত্তিক সরকারি খাতের কুশীলবরা বড় ধরনের সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করে, তখন তারা নতুন বাজার সহনির্মাণ (কো-ক্রিয়েট) করে, যা প্রবৃদ্ধির হার ও দিকনির্দেশনা উভয় ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

কিন্তু ভ্যালুর সহনির্মাণ ও প্রবৃদ্ধিকে নির্দেশনা প্রদানের জন্য প্রয়োজন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুসন্ধান, ট্রায়াল ও ভুলত্রুটি। সরকারি কর্মচারীরা যদি অতিরিক্ত ঝুঁকিবিমুখ হন, ভয় পান যে হয়তো ব্যর্থ প্রকল্পের খবর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হবে, অথবা অনুৎসাহিত হন এই ভেবে যে সফলতা এলে তা মনে করা হবে বেসরকারি খাতের অবদান, কবে এটি কাজ করবে না। সোলার স্টার্টআপ সোলিন্দ্রায়, যেটি পরবর্তীতে ব্যর্থ হয়, বিনিয়োগ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে তুলোধুনো করেছিল বাজার মৌলবাদীরা, কিন্তু এরা কখনো এটা উল্লেখ করে না যে টেসলা এস, যেটি এখন বড় সাফল্য, প্রায় একই ধরনের সরকারি সহায়তা পেয়েছিল।

এই বুদ্ধিমান পরিবেশে সরকারি খাতের ঝুঁকি গ্রহণকে রক্ষা করার বদলে সরকারি খাত ছোট করার ঘোষণা দেয়া রাজনীতিবিদদের জন্য সহজতর হয়েছে। এজন্য আশ্চর্য হতে হয় না যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআরপিএ-ইকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা নিয়মিতভাবে সরকারি সম্প্রচারকারী পিবিএসকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে বিবিসির সম্মানও হুমকির মুখে।

২০১৮ সালের প্রবৃদ্ধি নিয়ে চলা বিতর্কে অবশ্যই ঝুঁকি গ্রহণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোকে যুক্ত করতে হবে। এ ধরনের পদ্ধতি প্রগতিশীল এজেন্ডাকে পুনর্জীবিত করতে পারে, সব কুশীলবকে এই অনুভূতি দিতে পারে যে তারা সবাই চালকের আসনে রয়েছে এবং সম্পদ সৃষ্টিকারীর মতো সংকীর্ণ স্বদাবি রোধ করতে পারে। এবং এটি সুশীল সমাজের মধ্যে আরো গতিশীল মিথস্ক্রিয়া তৈরি করবে। এতে যে মিশন তৈরি হবে, তা হবে শ্রেষ্ঠ এবং এতে সম্মিলিতভাবে সবাই বাজি ধরবে।

 

লেখক: অধ্যাপক, ইকোনমিকস অব ইনোভেশন অ্যান্ড পাবলিক ভ্যালু; পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনোভেশন অ্যান্ড পাবলিক পারপাজ, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন।

ভাষান্তর: সাঈদ সরকার