আলহাজ আ ক ম মোজাম্মেল হক (জয়দেবপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ’৭১-এর আহ্বায়ক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী) বলেন, জয়দেবপুরে আমার পরামর্শে ২ মার্চ রাতে তত্কালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্লাহ সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে (আ ক ম মোজাম্মেল হক) আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাঈদ বকস ভূইয়া (মরহুম), মো. আবদুস ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মো. শহীদ উল্লাহ বাচ্চু (মরহুম), মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়ালরত্ন), মো. আয়েশ উদ্দিন, হারুন-অর-রশিদ ভূইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন মো. হাবিব উল্লাহ (মরহুম), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতা বাবু মণীন্দ্র গোস্বামী (মরহুম) এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এমএ মোত্তালিব (মরহুম)।
১৯ মার্চ ’৭১ জয়দেবপুরে প্রথম সফল সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম
১৯ মার্চ ’৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নের প্রথম সফল সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের দিন। এ প্রসঙ্গে আলহাজ আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএনএ সামসুল হক (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্লাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কিনা বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রে মজুদ কমে গেছে অজুহাতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের রক্ষিত অস্ত্র আনার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নেয়ার সংবাদ জানাই। সামসুল হক সাহেবের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই একটা আহম্মক, কী শিখেছিস যে আমাদের বলে দিতে হবে? একটু পায়চারি করে বললেন, বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেয়া যাবে না। রেজিস্ট অ্যাট দ্য কস্ট অব এনিথিং। নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম।
১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রি. জাহানজেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরের (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতি প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে, ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব চলে এসেছে। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থল মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিব উল্লাহ ও শহীদউল্লাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদউল্লাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দিলে ১ ঘণ্টার মধ্যেই হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনলা বন্দুকসহ জয়দেবপুরে উপস্থিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে সেদিন শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা। এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে ব্রি. জাহানজেব চান্দনা চৌরাস্তায় এলে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে পেছন দিয়ে জাপটে ধরলে আরেক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করলে তিনি সেখানেই শাহাদতবরণ করেন।
জয়দেবপুরের প্রতিরোধ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
ড. কামাল হোসেন বলেন, ২০ মার্চ সকালে শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। ওই সাক্ষাতে শেখ মুজিব সঙ্গে নিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও আমাকে। ইয়াহিয়ার পক্ষে ছিলেন পীরজাদা, কর্নেলিয়াস ও কর্নেল হাসান। আগের দিন সেনাবাহিনীর একটি ট্রাকবহর টঙ্গী-জয়দেবপুর অতিক্রমকালে জনগণ কর্তৃক আক্রান্ত হয় এবং সেনাদল ও জনগণের মধ্যে গোলাগুলি চলে। বস্তুত এটা ছিল জনগণ কর্তৃক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রথম পর্যায়ের একটি ঘটনা। পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রে ঘটনাটিকে পাকিস্তানি জাহাজ এমভি সোয়াতযোগে সেনা সরবরাহের স্বাভাবিক চলাচলে জনগণ বাধা দেয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বাঙালিদের চোখে ওই সরবরাহ ছিল জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর উদ্দেশ্যে সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্রের প্রতীক। পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠে ইয়াহিয়া বললেন, যদিও তিনি আলোচনার উদ্দেশ্যেই এসেছেন এবং সেনাবাহিনীকেও সংযত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ সামরিক সরবরাহে বাধা দেবে, এটা তিনি সহ্য করতে পারেন না। প্রত্যুত্তরে শেখ মুজিবও দৃপ্তকণ্ঠে বললেন, যখন আলোচনা চলছে, সৈন্যরা তখন ব্যারাকে থাকবে, এটাই প্রত্যাশিত। প্রতিবাদে ইয়াহিয়া বললেন, সৈন্যরা যদি ব্যারাকেও থাকে, তাহলেও সেনা সরবরাহ অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। শেখ মুজিব তখন বললেন, এভাবে সৈন্যদের ট্রাকে চলাচলের বিষয়টি জনগণের কাছে উসকানিমূলক। কারণ এ রকম সৈন্যরাই অতীতে বহু নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে। বস্তুত মাত্র ক’দিন আগেই টঙ্গীর খুবই কাছে জয়দেবপুরে এ ধরনের ঘটনায় সৈন্যরা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষজনের ওপর গুলি চালিয়ে বেশ ক’জনকে হত্যা করে। কাজেই স্থানীয় জনগণের অনুভূতি ছিল সংবেদনশীল। শেখ মুজিব বললেন, জনগণের স্পর্শকাতর অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে সৈন্যদের দিক থেকে উসকানিমূলক কিছু করাটা ঠিক হবে না। তিনি আরো বললেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানো হতে থাকলে এটা জানা কথা যে, শেষ পর্যন্ত পাল্টা গুলি চালানোর জন্য তারা হাতে অস্ত্র তুলে নেবেই। কাজেই আর রক্তপাত নয়, একটি রাজনৈতিক সমাধানই কাম্য।
জয়দেবপুরে ১৯ মার্চ ’৭১ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি
১৯ মার্চ ’৭১ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখ সশস্ত্র জনপ্রতিরোধের অনেকগুলো দিকের মধ্যে একটি বিশেষ দিক হলো, জনগণের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে শ্রমিকশ্রেণীর অংশগ্রহণ, যা আন্দোলনে একঠি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৯ মার্চ খবর আসে, দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একদল সৈন্য আসছে। এ খবরে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির বাঙালি শ্রমিকরা। যদিও প্রস্তুতিটা আগে থেকেই চলছিল। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সাইরেন বাজানো মাত্রই আশপাশের কলকারখানা ও গ্রাম থেকে মানুষ জয়দেবপুর বাজারে জড়ো হতে থাকে। যে যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থায় বেরিয়ে পড়েন মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারীরা। ফ্যাক্টরির নিরাপত্তারক্ষীরাও বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে এলেন পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিহত করতে। জয়দেবপুর চৌরাস্তার কাছেও ব্যারিকেড দেন শ্রমিক-জনতা। প্রতিরোধে অংশ নেন রেলওয়ে শ্রমিকরাও। শাবল চালিয়ে রেললাইন ও স্লিপার উপড়ে ফেলেন তারা। রাস্তা বন্ধ থাকল। পাকিস্তানি সৈন্যরা এগোতে চাইলে শুরু হয় প্রতিরোধ। গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারীসহ জনপ্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন হুরমত, নেয়ামত ও মনু খলিফা। প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়া শ্রমিক নেতা সফর উদ্দিন খান বলেন, ২৬ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির অনেক শ্রমিক সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। অনেকে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতাও করেন।
প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে টঙ্গী শিল্প এলাকার শ্রমিকদের অংশগ্রহণ
টঙ্গী শিল্প এলাকার নেতাদের সুচারু কর্মদক্ষতায় টঙ্গী এলাকার সর্বসাধারণ পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় নেমে পড়ে। জয়দেবপুর সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে তারাও টঙ্গী ব্রিজ থেকে উত্তরে বোর্ডবাজার পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে। টঙ্গীর টেলিফোন শিল্প সংস্থা, মেঘনা, মুন্নু, অলিম্পিয়া, জিন্নাত টেক্সটাইল, নিশাত জুট মিলসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও টঙ্গী রেলস্টেশনের রেল শ্রমিকরা বেরিয়ে আসেন এবং সমবেত হয়ে স্লোগান ও মিছিল ধরে রাস্তায় অবস্থান নেন। রেল শ্রমিকরা টঙ্গী রেলস্টেশনে ট্রেন আটকে দেয়। টঙ্গীতে আব্দুল হাকিম মাস্টার, কাজী মোজাম্মেল হক, হাসান উদ্দিন সরকার, শ্রমিক নেতা আব্দুল মান্নান পাঠান, আহসান উল্লাহ মাস্টার, সাহাবুদ্দিন বদিউল আলম, সবদর আলী মাস্টার, গাজী আব্দুল লতিফ প্রমুখের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের পথ ধরে সারা দেশে শ্রমিক জাগরণ
মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের প্রতিরোধের এ ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেজবাহ কামাল সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন’ গ্রন্থে। ১৯ মার্চের ওই ঘটনাটি ছিল গণমানুষের প্রতিরোধ। জয়দেবপুরের ওই প্রতিরোধ যুদ্ধ অন্যদেরও উৎসাহিত করে। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর যশোর-খুলনাসহ অন্যান্য অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন শ্রমিক-জনতা। সূচনাপর্বে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির এ প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে যায় দেশের সব প্রান্তে। ২৮ মার্চ খুলনার ফুলতলার প্রতিরোধ লড়াইয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শ্রমিকদের। নাটোরের লালপুর গোপালপুরে অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস ঘিরেও গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। ৩০ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন এখানকার শ্রমিকরা।
প্রতিরোধ সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগানো
জয়দেবপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ’৭১ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তrকালে দেশের মধ্যে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে জয়দেবপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ অনেকটাই দূরদৃষ্টিসম্পন্নের পরিচয় বহন করে, অন্তত যেখানে শ্রমিকদের অনেকখানি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কমিটিতে স্থান পেয়েছেন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ছাত্রনেতা, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। এক্ষেত্রে তত্কালীন জয়দেবপুরে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামের সফল সংগঠক ও নেতত্ব দানকারী সংগ্রাম কমিটির হাইকমান্ড সদস্য মরহুম মো. হাবিব উল্লাহ ও আহ্বায়ক আলহাজ আ ক ম মোজাম্মেল হকের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য, যা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ফলে ১৯ মার্চ ’৭১-এর মতো একটি বিশাল মাপের বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণীর অংশগ্রহণ, এমনকি নেতৃত্ব দানেরও সুযোগ হয়েছিল, যা সে সময় দেশের অন্যত্র প্রায় অনুপস্থিত। আন্দোলনের সময়ে এ বীরোচিত ঘটনার জন্য একদিকে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জে. ইয়াহিয়া যেমন চরম ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আনন্দে গর্ববোধ করেছিলেন।
কেননা মার্চ ’৭১-এর ঘটনা ও সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে, দ্বিস্তরবিশিষ্ট কমিটিতে কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এমএ মুত্তালিব, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খান কোষাধ্যক্ষ, সদস্য শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ) ও কমিটির আহ্বায়ক আলহাজ আ ক ম মোজাম্মেল হক জয়দেবপুর অর্ডন্যান্স, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ও ডিজেল প্লান্টের শ্রমিকদের সংগঠিত করার বিশেষ দায়িত্ব দেন কমিটির সদস্য মো. শহীদ উল্লাহ বাচ্চুকে (মরহুম)। কমিটিতে শ্রমিকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্তিই বলে দেয়, তাদের অনেকটাই প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল যে আশায়, বলতে দ্বিধা নেই, সে আশা পূরণে জনগণের সঙ্গে একত্রে শ্রমিক ভাইয়েরাও ১৯ মার্চ ’৭১ প্রতিরোধ সংগ্রামে মিছিল করে, রেললাইন উপড়ে ফেলে, রাস্তা ব্লক করে দিয়ে, রেলের মালগাড়ি ঠেলে যাতায়াত বন্ধ করতে, রাস্তা কেটে গাড়ি আটকানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো জনতার সঙ্গে থেকে করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নের প্রথম সফল সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে গর্বিত অংশীদারও হয়েছিলেন।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রই, কি নিখুঁত সাংগঠনিক দক্ষতায় ২ মার্চ জয়দেবপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ’৭১ গঠিত হয়ে সেই কমিটিরই অপ্রতিরোধ্য কর্মকৌশলে তত্কালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর ও হিংস্র পাকিস্তানি সেনাদের হটিয়ে দিয়ে ১৯ মার্চ ’৭১ জয়দেবপুরে প্রথম সফল সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম সফল হয়েছিল।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক






