ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন থেকে শুরু করে সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের যে স্বাধীনতার আন্দোলন, সেসব আন্দোলনের ফ্রন্ট লাইনে ছিল ছাত্ররা। তখন সর্বস্তরের মানুষেরই ভূমিকা ছিল। কিন্তু মুখ্য ভূমিকা ছিল ছাত্রদের, তাদের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। সে সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি কমিটি ছিল, যার আহ্বায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন থেকে সদস্য ছিল এ কমিটিতে। এ সংগঠনই তখনকার সব আন্দোলনের নেতৃত্ব দিত। এর অর্থ এই না যে, শ্রমিকদের কোনো ভূমিকা ছিল না বা সাধারণ মানুষের কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু সে আন্দোলনে ছাত্রদের ছিল মুখ্য ভূমিকা। সেসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সারা দেশের ন্যায় গাজীপুরেও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চের পূর্বে যে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাতেও ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। ছাত্র এবং শ্রমিকরাই ছিল সে আন্দোলনের সম্মুখ সমরে। সে সময় যেকোনো আন্দোলনেই স্কুল-কলেজের সব ছাত্রছাত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে যেত। ভাওয়াল কলেজসহ এ এলাকায় যত স্কুল ছিল, তাদের ছাত্ররা সব আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। সে সময় আমরা জয়দেবপুর থেকে হেঁটে মিছিল নিয়ে চৌরাস্তায় যেতাম। চৌরাস্তা থেকে আবার মিছিল নিয়ে জয়দেবপুরে আসতাম। তখন মূলত দুটো স্কুল ছিল, রানী বিলাসমনি বয়েজ স্কুল এবং গার্লস স্কুল। প্রতিটা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
১৯ মার্চের কয়েক দিন আগেই গুঞ্জন ছিল যে, জয়দেবপুরের রাজবাড়ীতে অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করা হবে। এখানকারই কিছু সেনাসদস্য এসব খবরাখবর তখনকার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এর আগে ১৩ বা ১৪ মার্চের দিকে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইয়াকুব আলী হেলিকপ্টার দিয়ে রাজবাড়ী মাঠে নামার চেষ্টা করেও নামতে পারেননি। জনতার ইটপাটকেল ও জুতাবৃষ্টি নিক্ষেপের কারণে তাকে ফেরত যেতে হয়েছে। ১৯ মার্চ পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের একটি বাহিনী রাজবাড়ীতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই খবর ছড়িয়ে পাড়ে। তখনকার সময় মানুষ মুক্তির জন্য এতই পাগল ছিল যে, সামান্য কোনো খবর পেলেই মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে যেত। যখনই শুনেছে যে, ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব রাজবাড়ীতে আসছে এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সৈনিক খবর দিয়েছে যে, দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করবে। তখনই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এ খবর মাইকে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ওইদিন জয়দেবপুরে হাটবার ছিল। মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষ বটতলায় দুপুর থেকে জমায়েত হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন স্টেশন থেকে মালগাড়ির বগি এনে রেললাইনে ব্যারিকেড দেই, যাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বের হতে না পারে। ছাত্র-শ্রমিক ও হাজার হাজার জনতা এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে রাখে। পাকিস্তানি সৈন্যরা চেষ্টা করে ব্যারিকেড সরাতে না পেরে বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সদস্য এনে শুইয়ে দেয় এবং জনতার ওপর গুলি ছুড়তে বলে। তারা প্রথমে গুলি করতে অস্বীকার করে এবং পরে বাধ্য হয়ে উপরের দিকে গুলি ছোড়ে। এতে পাকিস্তানিরা ক্ষেপে যায়। তারা নিজেরাই জনতার ওপর গুলি করা শুরু করে। সেখানে সন্তোষ ও ডা. ইউসুফ গুলিবিদ্ধ হন। শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা।
এদিকে টাঙ্গাইল থেকে রেশন আনতে যাওয়া বাঙালি সেনাদের একটি কনভয় ফেরার সময় বটতলায় এলে আমরা এটি ঘিরে ধরি এবং তাদের কাছ থেকে পাঁচটি অস্ত্র ছিনিয়ে নিই। তাদের মুন্সীপাড়ার একটা ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখি। তারপর পাঁচটা অস্ত্র দিয়েই গুলি ছুড়ি পাকিস্তানি সৈন্যদের দিকে। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে আমরা আর কুলিয়ে উঠতে পারিনি। একপর্যায়ে আমার সঙ্গে থাকা সে সময়কার ছাত্র শাহজাহান গুলিবিদ্ধ হয়। এটা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। এরপর বাঙালি সেনাসদস্যরা হ্যান্ডমাইক দিয়ে ঘোষণা করে যে, আপনারা চলে যান, কারফিউ দেয়া হয়েছে। এরপর আমরা মনু খলিফা ও নেয়ামতের মরদেহ নিয়ে চলে যাই বিআইডিসি রোডে। সেখান থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দুটো নিয়ে হাবিবুল্লাহ, মোজাম্মেল হক ও এমএ মোত্তালিব ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। এ মরদেহ নিয়েই ঢাকায় প্রথম মিছিল হয়, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ এদিকে জয়দেবপুর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা যাওয়ার পথে জয়দেবপুর চৌরাস্তায় পৌঁছালে সেখানেও বাধার সম্মুখীন হয়। সেখানে স্থানীয় ভোগড়া গ্রামের হুরমত আলী একজন পাকসেনার একটি রাইফেল ছিনিয়ে নেয়ার সময় আরেক পাকসৈন্য তাকে গুলি করলে তিনি শহীদ হন।
১৯৭১ সালে এ দেশের মুক্তিপিয়াসী মানুষ মুক্তির জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ জনতা ও শ্রমিকদের পাশাপাশি ছাত্ররা তখন বিশাল ভূমিকা নিয়ে এ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। সে সময়ের আন্দোলনে ছাত্রদের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, তাদের সে আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক।
১৯ মার্চের সে যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছিল, যারা আহত হয়েছিল এবং যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের ভূমিকা এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন। আমরা শুধু ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ বা ১৯ মার্চে তাদেরকে স্থানীয়ভাবে স্মরণ করি। কিন্তু তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা উচিত। কারণ ১৯ মার্চ যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ কম থাকবে। কারণ যারা বলে, জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, আর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এ সুযোগটা তখন থাকবে না। স্বাধীনতার সংগ্রাম একদিনের সংগ্রাম নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দীর্ঘ একটা আন্দোলনের ফল। ১৯ মার্চকে জাতীয় স্মৃতির পাতায় নিয়ে এলে ইতিহাস বিকৃতির সম্ভাবনা মিলিয়ে যাবে। তাই প্রকৃত ইতিহাস জানা ও চর্চার স্বার্থে এ দিনটিকে জাতীয় ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিতে হবে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ১৯ মার্চ প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা






