১৯৭১ সাল; পুরোটা বছর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মব্যথার ইতিহাস। ১৯৭১-এর ইতিহাস কোনো আলোচনার টেবিলে তর্ক-বির্তক, টকশো, নাটক, সিনেমা, চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, টেলিফিল্ম, সভা-সেমিনার, ঝাড়ফুঁকের কেরামতি নয়, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। ইতিহাসের ইতিহাস আরো ব্যাপক। পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের ও জাতির ইতিহাসই ঐতিহ্য ও গৌরবমণ্ডিত। আমাদের ইতিহাসও ব্যতিক্রম নয়, বরং শ্রেণী চেতনায় উজ্জ্বল। পৌনে ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ, ২৩ বছরের পাকিস্তানি জঞ্জাল, অধিকারহীনতা, শোষণ-বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, একপেশে প্রাধান্য প্রভৃতি বাঙালি জাতিকে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছেষট্টির ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনে মুখোমুখি করেছিল। বিশেষ করে সত্তরের নির্বাচন ও এর ফলাফল চূড়ান্ত সর্তকবাণী বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার।

সত্তরের নির্বাচনের ফলাফলে পাকিস্তানের ভিত আগের মতো কেঁপে উঠলেও আগের যেকোনো সংগ্রামের চেয়ে ভোটের মতামত থরথরিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং পৃথিবীর মানচিত্রে আরো একটি নতুন দেশের জন্মের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী পাকিস্তানি টালবাহানা বাঙালি জাতিকে বারবার উত্তেজিত করেছে। আর এখানেই মেহনতি মানুষের টান টান উত্তেজনা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার অসীম সাহস জুগিয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জনগণ ইতিহাসের স্রষ্টা কিংবা ইতিহাসের ইঞ্জিন হলেও ঘটনার পালায় অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায়। আর সৃষ্টি হয় চাপা পড়া ইতিহাস, যন্ত্রণার ইতিহাস, সংখ্যালঘুর ইতিহাস, মুখে বলা ইতিহাস প্রভৃতি। কেবলই শিক্ষিত চালাক মানুষ লিখে নেয় কেতাবি ইতিহাস, যা কখনো কখনো মৌলিকতা হারায় আবার কখনো পুঁজ পাকা রক্তে পরিণত হয়। ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ৩০ লাখ শহীদের এক সমুদ্র রক্ত, ৪ লাখ ৬৮ হাজার নারীর ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হওয়া, যুদ্ধশিশুর জন্ম সূচনা থেকে শেষের উপাখ্যান। কিন্তু তারই আগে একাত্তরের প্রথম তিন মাস পবিত্র ভূমি রক্তে ভেজানোর প্রস্তুতি কোনোক্রমেই অবহেলিত নয়। তেমনি একটি স্মরণীয় ক্ষণ ১৯ মার্চ ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম প্রতিরোধ, সশস্ত্র প্রতিরোধ। স্বাধীনতার জন্য প্রথম আত্মবলিদান। স্বাধীনতা অর্জনের সূচনা। বাংলাদেশের প্রাক-স্বাধীনতা।

সারা দেশের বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষের অসীম সাহসী সংগ্রামের সূচনায় জয়দেবপুরবাসী হয়ে ওঠে ইতিহাসের ইঞ্জিন। স্বাধীনতাকামী মানুষের সময়ে গঠিত হয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ জয়দেবপুর। নেতৃত্বের হাইকমান্ডে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মো. হাবিবুল্লাহ, ন্যাপ নেতা ডা. মণীন্দ্র নাথ গোস্বামী, এসএ মোত্তালিব প্রমুখ। জয়দেবপুর মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আ ক ম মোজাম্মেল হক ও নজরুল ইসলাম খান কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। পরিষদের অন্য সদস্যরা হলেন মো. নুরুল ইসলাম, মো. আয়েশ উদ্দিন, মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু, হযরত আলী মাস্টার, আব্দুস সাত্তার মিয়া, হারুন অর রশিদ ভূইয়া, শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ, সাঈদ বকস ভুইয়া ও শেখ আবুল হোসেন (কারো বর্তমান পরিচয় দেয়া হয়নি)। এ সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে জয়দেবপুরে চলছিল পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন (বর্তমান পতাকায় পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রখচিত), পাড়ায় পাড়ায় সংগ্রাম কমিটি গঠন প্রভৃতি। ঘটনাক্রমে সৃষ্টি হলো ইতিহাসের ঐতিহাসিক পরিক্রমা ১৯ মার্চ। ১৯ মার্চের আগেই শোনা যাচ্ছিল, জয়দেবপুর সেনানিবাসের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হবে। এ শোনা কথাটিও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের অংশ, যা বাঙালি সৈনিক মারফত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের সংকটের ফল প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল।

১৯ মার্চ ১৯৭১ দুপুরে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব এক দল পাকিস্তানি সৈনিক নিয়ে জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জয়দেবপুরের বীর জনতা জয়দেবপুর বাজার বটতলায় সমবেত হয়। জয়দেবপুর সেনানিবাসের সিও ছিলেন তখন লে. কর্নেল মাসুদুল হোসেন খান ও সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর সফিউল্লাহ। বীর জনতা জাহানজেবের আগমনবার্তা শুনে ধীরে ধীরে আরো মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করে। মালগাড়ির ওয়াগন দিয়ে রেল ক্রসিং বন্ধ ও রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের বন্দুক, শ্রমিকসহ ঘটনাস্থলে আসেন এবং পরিস্থিতি আরো প্রাণ পায়।

সংগ্রাম পরিষদের হাইকমান্ডের কাছে সিও লে. কর্নেল মাসুদুল হোসেন খান জনতার ব্যারিকেড সরানোর বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলে নেতারা সম্মতি জানালেও ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব অসম্মতি জানান। জয়দেবপুর বাজার বটতলায় জনতার বিক্ষোভ সমাবেশ তখনো চলছিল। সমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যরা জনতার ওপর গুলি ছোড়ে। অস্ত্রধারী জনতা ও বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সৈনিকদের ওপর গুলি ছুড়ে প্রতিরোধের হুঙ্কার দেয়। এমন সময় টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে পাঁচজন বাঙালি সৈন্য জয়দেবপুর সেনানিবাসে ফিরছিলেন। বীর জনতা তাদের চারটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি স্টেনগান ছিনিয়ে নেয় এবং জনৈক বাঙালি সৈন্যের সহযোগিতায় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ করতে থাকে। মাইকে কারফিউ ঘোষণা দেয়। কিন্তু জনতা ছিল অদম্য। আর ঠিক তখনই ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব তার বিশেষ সামরিক বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনতার ওপর। গুলিতে নিহত হলেন মনু খলিফা ও নেয়ামত। সন্তোষ মল্লিক, ডা. ইউসুফ ও শাজাহানসহ আহত হলেন অনেকে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির আগে এ ঘটনা ছিল অবিস্মরণীয় ও ইতিহাসের মাইলফলক। জয়দেবপুর থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত অনেক ব্যারিকেড ছিল রাস্তায়। এসব ব্যারিকেড সরাতে পারলেও চৌরাস্তায় প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় জাহানজেবের সৈনিক দল। প্রতিরোধ সংগ্রামে নিরস্ত্র বাঙালি হাতাহাতি যুদ্ধের সূচনা করে। ভোগড়া গ্রামের অসীম সাহসী যুবক হুরমত আলী এক সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাকে জাপটে ধরেন। পাকিস্তানি সৈন্য পেছন থেকে হুরমতকে লক্ষ করে গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হুরমত। আহত হন বেশ কয়েকজন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমসহ দেশের সব খবরের কাগজে প্রচারিত হয় জয়দেবপুরের প্রতিরোধ যুদ্ধের। স্লোগান ওঠে, জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। শহীদ মনু খলিফা, শহীদ নেয়ামত, শহীদ হুরমতের নাম যোগ হয়েছে ৩০ লাখ শহীদের তালিকার অগ্রভাগে। শহীদ মনু খলিফা, নেয়ামত, হুরমত আলী ছিলেন ৩০ লাখ শহীদের মতো শোষিত-বঞ্চিত-মেহনতি সর্বহারা শ্রেণীর মানুষ। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত দলিল সংবিধানও রচিত হয়েছিল সেমতে। কিন্তু খুব বেশি পথ পাড়ি দিতে পারেনি। গণতন্ত্রের কি বেহাল দশা? সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্মের গোঁজামিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে টানাটানি। রাজাকাররা বেশ কয়েকবার মনু খলিফাদের পবিত্র রক্তের পতাকা উড়িয়ে বেড়িয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি, বিনাচিকিৎসায় মারা যাওয়া প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পরিহাস করে দূরে ঠেলে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত একমাত্র হাসপাতাল ১৮ বছর ধরে বন্ধ। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী দালালি, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, ধর্মীয় মৌলবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, খুন, ধর্ষণসহ অসংখ্য অপরাধ স্বাধীনতা সংহত হওয়ার পরিবর্তে মুক্তি সংগ্রাম পিছিয়ে গেছে যোজন যোজন দূরে। জানা-বোঝার কিছুই নেই, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী।

ভোট ও গণতন্ত্র আলাদা হতে পারেনি, ২২ পরিবারের জায়গায় কয়েক হাজার কোটিপতির আবির্ভাব, ৩০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশে ক্ষেতমজুরের সংখ্যা উন্নীত, ৪৭ শতাংশ স্নাতকধারী শিক্ষিত বেকার, ৪৫ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকের কর্মপরিবেশ মালিকশ্রেণীর করতলে, দারিদ্র্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি, দুর্নীতি সর্বত্র, ৭৫ শতাংশ বিদেশী সাহায্য লুটপাট রাষ্ট্রযন্ত্রের আষ্টেপৃষ্ঠে কাজে পরিণত হয়েছে। শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন সেই কবেই ধূলিসাৎ হয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর স্থানে স্থানে চলছে একই রকম সংকট। বিশেষত আদর্শের সংকট, সৎ মানুষের সংখ্যা সংকট। বুলি আওড়ানোর মহোৎসব। যেখানে দেখেছি রঙের খনি, সেখানেই রাঙিয়ে নিয়েছি মন— ভূপেন হাজারিকার এ গান আজ যেমন ভূপেনের জন্য সত্য প্রমাণিত, তেমনি আমাদেরও। না হয় সারা জীবনের ত্যাগ, গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষকে পায়ে চেপে ধরে বিজেপিতে যান কেমনে ভূপেন? আসামের একটি সংসদীয় আসনে বিজেপির হয়ে লড়ে পরাজিত হন। সুমন চট্টোপাধ্যায়ও একই কাণ্ড করে এবার বসে পড়েছেন। দুর্ভাগ্য, আমাদের কাছে প্রশ্ন ওঠে, সৎ রাজাকার ভালো, না অসৎ মুক্তিযোদ্ধা ভালো। ভাবতেও অবাক লাগে। আর কেনই বা হবে না এমন? গত ৪৬ বছরের শাসন-শোষণ, লুটপাটের চিত্রটা খালি চোখে দেখে নিলেই হয়।

জয়দেবপুরের চিত্র আর বাংলাদেশের চিত্র একই। গাজীপুর জেলার কতজন মানুষ জেনেছে শহীদ মনু খলিফাদের। আমরা কী করতে পেরেছি মনু খলিফাদের জন্য। বরং খবর পড়েছি পত্রিকায়, ওই শহীদদের কবর ভেঙে রাস্তা তৈরি করে দুর্বৃত্তরা। স্মৃতিস্বরূপ জয়দেবপুর বটতলায় ঊনিশে চত্বর মুক্তমঞ্চ স্থাপিত হয়েছে বছর ১৫ আগে। বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে তরকারি মঞ্চে। শহীদদের স্মরণে দুবার স্মৃতিসৌধ নির্মাণের লক্ষ্যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও সৌধ গড়ে ওঠেনি। কেন গড়ে ওঠেনি, এর উত্তরও প্রশ্নের চাপে নির্বাক। শহীদ মিনারের পাদদেশ সংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সময় আপত্তি উঠেছিল শহীদদের নাম বাদ পড়া নিয়ে, এটি এখন নেতিয়ে পড়েছে। অবশ্য উচিত ছিল ১৯ মার্চকে রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা, প্রাক-স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা, সরকারি ছুুটি ঘোষণা হতে পারত। কেন হলো না কিংবা কেন হবে না, তা আবার ঠিক করতে হবে জয়দেবপুরবাসীকেই। তাই ইতিহাসের পটভূমি ১৯ মার্চকে স্মরণীয় করে, শিক্ষা নিয়ে, চেতনা জাগ্রত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। জেগে ওঠো জয়দেবপুরবাসী— এ আহ্বানের সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধা শহীদদের প্রতি, বিপ্লবী অভিনন্দন প্রথম প্রতিরোধ ১৯ মার্চের সংগ্রামে অংশ নেয়া বীর জনতাকে; যারা বেঁচে আছেন এবং এরই মধ্যে যারা মারা গেছেন।

 

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক যোগফল