১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক কিছু দিন আগে ১৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয় জয়দেবপুর তথা আজকের গাজীপুরে। সেদিন পাকসেনাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল গাজীপুরের ছাত্র, শ্রমিক ও আপামর জনতা। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল বীরজনতা। আর এ লড়াইয়ের পরই দেশজুড়ে স্লোগান উঠেছিল, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। সেদিন পাকবাহিনীর গুলিতে বর্তমান গাজীপুর শহরে শহীদ হয়েছিলেন নিয়ামত আলী ও মনু খলিফা। আর জয়দেবপুর চৌরাস্তায় শহীদ হয়েছিলেন হুরমত আলী। আহত হয়েছিলেন অনেকে। জীবন দিয়ে মুক্তির পথ তৈরি করেছিলেন যেসব অকুতোভয় বীরসেনানী, স্বাধীনতার এত বছর পরও সেসব শহীদ ও বীরযোদ্ধা পাননি সঠিক মূল্যায়ন। শহীদ বীরদের পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি আজো। তাদের অনেকেই দুঃখ-কষ্ট নিয়ে জীবনযাপন করছেন।

সেদিনের শহীদ পরিবারের সদস্যরা কেমন আছেন, তা জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে খোঁজ নেয়া হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।

পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ মনু খলিফার স্ত্রী রহিমা আক্তার। বয়স বর্তমানে ৬০-এর উপরে। অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান তার নানা দুঃখের কাহিনী। স্বাধীনতার এত বছর পরও তিনি কোনো সরকারের কাছ থেকে তেমন কিছুই পাননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রহিমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঢাকার মিরপুরে বাড়ি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ি তার স্বপ্নই থেকে গেছে।

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে তাকে গাজীপুরের জোলার পাড়া এলাকায় এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। নানা জটিলতায় সে জমির দখল পাননি এখনো। বর্তমানে প্রতি মাসে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পান। তার পাঁচ মেয়ের বিয়ে-সংসার হলেও সবাই সচ্ছল নন। রহিমার নিজের কোনো ঠিকানা নেই। স্বামী রেখে যেতে পারেননি ভিটেবাড়ি, সহায়-সম্পদ। তিনি এখন শহীদ স্বামী মনু খলিফার ছোট ভাইয়ের বাসায় থাকেন। চোখের পানি ছেড়ে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বেঁচে আছি কাজের মেয়ের মতো। মার্চ মাস, ১৯ মার্চ এলে অনেকে আসেন খোঁজখবর নিতে। আর সারা বছর কেউ কোনো খোঁজ নিতে আসেন না। রহিমার আকুতি, জেলা শহরে সামান্য একটু জায়গা হলেও একটা ঘর তৈরি করে বসবাসের ঠিকানা করে দেয়া হোক।

গাজীপুর শহরের বাসস্টেশন থেকে সামান্য উত্তরে শিববাড়ী-শিমুলতলী সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে চলে গেছে শহীদ নেয়ামত সড়ক। ১৯ মার্চ গাজীপুরে শহীদ হওয়া আরেক বীর নেয়ামত আলীর নামে নামকরণ করা হয়েছে এ সড়ক। সড়কটি ধরে সামান্য এগোলে রাস্তার ডান পাশে একটি মসজিদের পাশেই রয়েছে নেয়ামত আলীর বাড়ি। আর মসজিদের পশ্চিম পাশে শুয়ে আছেন নেয়ামত ও তার সঙ্গে শহীদ হওয়া আরেক বীর মনু খলিফা। পাশাপাশি দুটি কবর কয়েক বছর আগে টাইলস দিয়ে বাঁধানো হয়েছে। কবরের চারদিকে দেয়া হয়েছে প্রাচীর। স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে এ কাজগুলো করা হয়েছে।

বাড়ির পাশেই দেখা হলো নেয়ামত আলীর ছোট ভাই কেরামত আলীর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় দিলেও কথা বলার খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। জানালেন, মার্চ মাস এলেই সাংবাদিকরা আসেন। টিভিতে সাক্ষাত্কার নেন। কিন্তু আমাদের কিছুই হয় না। অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, ১৯ মার্চ জেলা শহরের রাজবাড়ী মাঠে ১৯ মার্চের ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে সেদিনের শহীদ ও বীরদেরকে সংবর্ধনার জন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। দাওয়াত দিলেও তাদেরকে কোনো সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাদের।&dquote;&dquote;

তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা ছিলেন ছয় ভাই। তারা হলেন— গোলাম তাজ আলী, নেয়ামত আলী, ইন্তাজ আলী, এমারত আলী, কেরামত আলী ও লিয়াকত আলী। এদের মধ্যে নেয়ামত আলী ছিলেন দ্বিতীয়, তখনকার স্কুলছাত্র নেয়ামত ছিলেন অত্যন্ত জেদি আর সাহসী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিগত বছরগুলোতে জেলা শহরের উন্নতি হয়েছে অনেক। উঁচু উঁচু দালান-কোঠার মাঝেও টিকে আছে শহীদ নিয়ামত আলীর রেখে যাওয়া জোড়াতালির মাটির ঘর। ওই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বর্ণনা করেন ইতিহাস আর ক্ষোভের কথা। তিনি জানান, ১৯ মার্চ মায়ের দেয়া ভাত না খেয়েই নেয়ামত চলে যান প্রতিরোধ যুদ্ধস্থলে। সেখানে জনতার মিছিল চলাকালেই পাক আর্মিদের একটি গুলি লাগে তার বুকে। সেখানেই শহীদ হয় নেয়ামত। আর তার পাশেই মনু খলিফার মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন তিনি। পরে দুজনকেই দাফন করা হয়েছে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে। তিনি আরো বলেন, কবরস্থানটিতে বর্তমান সরকার সীমানা প্রাচীর তৈরি করে সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেছে। তবে পারিবারিক সুবিধাদি এবং শহীদের নামে প্রতিষ্ঠান করার দাবি রয়েছে তাদের। কেরামত আলী জানান, তার মায়ের জন্য একটি বাড়ি করার জন্য অনেকবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি।

বাড়ির উঠোনে কথা হয় নেয়ামতের মা আমেনা খাতুনের সঙ্গে। রোগ, শোক আর বয়সের ভারে অনেকটাই দুর্বল আমেনা খাতুন অশ্রুসিক্ত নয়নে সেদিনের কথা স্মরণ করে বলেন, আমাকে নেয়ামত বলেছিল, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের মারবে, আমরা কি বসে থাকব। আমরাও পাকিস্তানিদের মারব। এতে যদি মারা যাই, তাহলে শহীদ হব। আমেনা খাতুন জানান, ১৯ মার্চ শুক্রবার সকালে আমি নেয়ামতকে খাবার দিয়ে বাইরে যাই। এসে দেখি সে নেই। পরে খবর পেলাম, শহরে গোলাগুলি হয়েছে, অনেকে মারা গেছে। দুপুরের পরও সে বাড়িতে না আসায় আমার মনে দুশ্চিন্তা জাগল। পরে সবাই তার লাশ নিয়ে এল।

তিনি জানান, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমাদের কোনো উন্নতি হয়নি। অনেক কষ্ট করে দিন অতিবাহিত করছি। বড় ছেলে গোলাম তাজ আলী মারা গেল অসুখে, চিকিৎসা করাতে পারলাম না। কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পেলাম না। সরকারিভাবে আমাদের কিছু সহযোগিতা করলে হয়তো আমরা একটু ভালোভাবে আগামী দিনগুলো কাটাতে পারতাম। তিনি বলেন, আমাদের বাসার পানি, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের বিল যদি মাফ করা হতো, তাহলেও আমাদের অনেক উপকার হতো। ১৯ মার্চ যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সরকারের নজর বাড়ানোর দাবি জানান।

১৯ মার্চেও আরেক বীর শহীদ হুরমত আলী। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় পাকবাহিনীর এক সদস্যের রাইফেল কেড়ে নেয়ার সময় আরেক পাকসৈন্যের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন হুরমত। তার মেয়ে হালিমা বর্তমানে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক। আর একমাত্র ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জয়দেবপুর চৌরাস্তার দক্ষিণ পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশেই ভোগড়া নামক স্থানে রয়েছে হুরমতের সমাধি। অনেকটা অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে সমাধিটি। হুরমতের মেয়ে হালিমা জানান, ২১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি। তার বাবার কবরটি বাঁধাই করার কথা রয়েছে। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান হালিমা।

১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ এবং জয়দেবপুর বটতলায় নির্মাণ করা হয়েছে ‘মুক্তমঞ্চ’। প্রতি বছর পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গাজীপুরবাসী এদিনটি স্মরণ করে থাকে। যাদের আত্মত্যাগ আর বুকের রক্তে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, তাদের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ঋণ শোধ করার প্রয়াস পেতে পারি।

 

লেখক: সাংবাদিক