১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। আমি রাজনীতি করতাম না, ছিলাম শ্রমিক আন্দোলনের একজন কর্মী। ’৭০ সালে আমি পাকিস্তান মেশিন টুলস কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি। আর শ্রমিক ইউনিয়নের বড় নেতা ছিলেন এমএ মোত্তালিব। ওই এলাকার সবচেয়ে বড় কারখানা এটি। মেশিন টুলস কারখানার শ্রমিকরা ন্যূনতম এসএসসি পাস এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কাজেই তারা সবাই মোটামুটি সচেতন। তাদের নেতা হিসেবে এলাকায় আমাদের বেশ প্রভাব ছিল। আওয়ামী লীগ তখন মূল রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের সমর্থক অনেক, কিন্তু নেতা ছিল কম। জয়দেবপুরে আওয়ামী লীগের মূল নেতা ছিলেন হাবিবুল্লাহ মাস্টার। তিনি শিক্ষকতা করতেন এবং সম্মানী মানুষ ছিলেন। সেখানে লোকাল আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন বারেক নেওয়াজ। একজন ডাক্তার ছিলেন, নাম তার সাইদুর রহমান। তারা হলেন আওয়ামী লীগের নেতা। আর ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন আ ক ম মোজাম্মেল হক, যিনি এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। তার বাসা ছিল জয়দেবপুরের পাশে, তবে তিনি অধিকাংশ সময় জয়দেবপুরেই থাকতেন। ন্যাপের মণীন্দ্রনাথ গোস্বামী। ইয়াকুবসহ আরো কিছু তরুণ ছিল, যারা ছাত্র ইউনিয়ন করত। আহম্মেদ ফজলুর রহমান ছিলেন পেশায় পশু ডাক্তার। খুব সামাজিক মানুষ ছিলেন, সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল তার। অধ্যাপক আয়েশ উদ্দিন ছিলেন ভাওয়াল কলেজের শিক্ষক। আরেকজন শিক্ষক ছিলেন শহীদ উল্লাহ। শহীদ উল্লাহ বাচ্চু বলে একজন ছিলেন, যিনি ছাত্রলীগ করতেন। হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া ছিলেন জাসদের নেতা। আবদুস সাত্তার ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা, থাকতেন জয়দেবপুর চৌরাস্তায়। নুরুল ইসলাম ছিলেন রানী বিলাসমনি বয়েজ স্কুল ও গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক। খুরশিদ হাসান নয়ন বলে একজন ছাত্র ইউনিয়ন করত। ’৭০ সালে যখন নির্বাচন হয়, তখন আমরা কোনো রাজনীতি না করেও সবাই নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট দিয়েছি। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সবার ক্ষোভ এতই বেশি ছিল যে সবাই পরিবর্তন চাচ্ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। সবাই তখন আওয়ামী লীগ করে। বিজয়ের আবহ সারা বাংলায়। এমন যেন সবাই আমরা জিতে গেছি। কে কোন রাজনীতি করে, কোনো কিছুই তখন আর মুখ্য হয়ে ওঠেনি। মুসলিম লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল ছিল না। জয়দেবপুরে মুসলিম লীগ নেতা ছিলেন বাবর আলী। তিনি তখন চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু তার বাড়িতেই দর্জি ডেকে নিয়ে পতাকা তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের সেই পতাকা আমরা ২৩ মার্চ পাকিস্তানের রিপাবলিক ডেতে উড়িয়েছিলাম।
নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালের মার্চের ৩ তারিখ সংসদ অধিবেশন বসার কথা ছিল। সবাই এর অপেক্ষায় ছিল, বিভিন্ন স্থানে মিটিং হচ্ছে। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান হঠাৎ সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। পুরো বাংলাদেশে বিস্ফোরণ ঘটল। সবাই বলতে লাগল, এ সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। ১ মার্চ আমি ঢাকায় ছিলাম। তখন জয়দেবপুর ও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল মুড়ির টিন টাইপের বাস। আর ট্রেনে যাতায়াত করা যেত। আমরা দ্রুত জয়দেবপুরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কারণ আমাদের যা করার, তা জয়দেবপুরে করতে হবে। বিকালের ট্রেনে জয়দেবপুর চলে গেলাম। ঐতিহাসিক ঘটনা হলো, ২ মার্চ রাতের বেলা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের বাসায় বসলাম অন্যান্য নেতাসহ। ওইদিনই আমরা সর্বদলীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। তিনজনকে বানানো হলো হাই কমান্ড। তারা হলেন মূল নেতা। তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। আওয়ামী লীগ থেকে হাবিবুল্লাহ মাস্টার, ন্যাপ থেকে মণীন্দ্রনাথ গোস্বামী এবং শ্রমিক নেতা হলেন এমএ মোত্তালিব। আ ক ম মোজাম্মেল হক হলেন আহ্বায়ক এবং আমি হলাম ট্রেজারার। আর বাকি সবাই হলেন সদস্য, মোট ১১ জনের কমিটি। এ কমিটি দিয়ে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করি। মেশিন টুলস কারখানার পাশেই ছিল সমরাস্ত্র কারখানা। এটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার করিমউল্লাহ। সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী যাদের এমওডিসি বলা হতো, তারাই পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। আমরা বললাম, এখানে অস্ত্র ও গুলি তৈরি হবে, আর সেগুলো দিয়ে আমাদেরই মারবে, সেটি হবে না। এ কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। সমরাস্ত্র কারখানার শ্রমিকরা আমাদের উৎসাহিত করল, আপনারা মিছিল করে কারখানায় আসেন, আমরা কারখানা বন্ধ করে চলে আসব। আমরা তখন বুঝিনি এটি খুবই মারাত্মক একটি কাজ। এটি সমরাস্ত্র কারখানা এবং এলাকাটি সংরক্ষিত। ৫ মার্চ আমরা নেতা-শ্রমিক-জনতা-ছাত্ররা একত্র হলাম কারখানার পাশে শিমুলতলীতে। তখনকার দিনে আন্দোলন ছিল উৎসবের বিষয়। আমরা মিছিল করে সমরাস্ত্র কারখানার দিকে এগোতে থাকলাম। গেটে ছিল সাধারণ গার্ড, তারা খুব একটা বাধা দিল না। আমরা কম্পাউন্ডের ভেতর প্রবেশ করলাম। ঢুকে ডান পাশে কারখানা এবং বাম পাশে ছিল কলোনি। আমরা ঢুকে ডানদিকে এগোতে থাকলাম। মেইন গেট ছিল আরো পরে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল আকাশ-বাতাস। হঠাৎ করে এমওডিসিরা এসে আমাদের আটকে দিল। আমরা স্লোগান দিচ্ছি। একটু পর কর্মকর্তারা এলেন এবং সর্বশেষ ব্রিগেডিয়ার করিম উল্লাহ এলেন। তিনি ধমক দিচ্ছেন। কেউ তার কথা শুনছে না। আমরা তখন কোনো কমান্ডই বুঝি না, সর্বশেষ তারা স্ট্যান্ড টু পজিশন নিল। হাঁটু গেড়ে বসে তারা আমাদের দিকে বন্দুক তাক করেছিল, আমরা পরে শুনেছি এর পরের আদেশ ছিল গুলি করা। এমন সময় মেইন গেট খুলে সমরাস্ত্র কারখানার সব শ্রমিক বের হয়ে এল। তারা বের হয়ে আসা মানে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কারখানা বন্ধ করে দেয়া। উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাওয়ায় আমরা চলে এলাম। ৫ মার্চ বিকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় এলাম তার সঙ্গে দেখা করতে এবং জানাতে, আমরা সমরাস্ত্র কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেখানে ড. কামাল হোসেন ছিলেন। আমরা সমরাস্ত্র কারখানার ঘটনাটি তাকে বললাম, দেখলাম তিনি আগেই খবরটি পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের বললেন, ‘তোদের কে বলেছিল এটি করতে।’ আমরা ভাবলাম, আমরা একটি ভালো কাজ করে এলাম, আর তিনি আমাদের ধমক দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বাক্যটি ছিল— ‘গুলি করত যদি, যদি মেরে ফেলত।’ তখন আমরা বুঝলাম, আমাদের কাজটি তার অপছন্দ হয়নি। তবে তার আচরণ ছিল পিতৃসুলভ। আমাদের ক্ষতি হতো সেই অনুভূতি থেকে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি আমাদের কিছু পরামর্শ দিলেন। দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি আমাদের সতর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে ওই দুজন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করেনি। বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে বের হয়ে আসার পর পরই হঠাৎই একটি জিপে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো জহুরুল হক হলে। সেখানে নিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হলো, সেখানে কী আছে, কোন অস্ত্র আছে প্রভৃতি। আমরা প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে থাকলাম। কারণ এ সম্পর্কে আমাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে আমরা জানতামও না, সেখানে কী পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ রয়েছে। আমরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করিনি। তাদের বললাম, আপনারা যখন জানতে চাইছেন, তখন আমরা কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পর্কে যদি জানতে পারি, তবে জানাব। পরে আমরা আর তথ্য দিতে তাদের কাছে আসিনি। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আগরতলায়।
আমরা বিভিন্ন প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ও জনমত গঠনের কাজ করেছি। কিছু নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন জনকে। শ্রমিকদের বলা হয়েছিল সাইরেন বাজলে কারখানার মেইন গেটে চলে আসতে হবে। আমরা মানুষকে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপ্ত করতে থাকলাম। ঢাকায়ও আন্দোলন চলতে থাকল সমান তালে। এর মধ্যে বড় ঘটনা ঘটল ১৯ মার্চ। এর আগেই আমরা খবর পেলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জয়দেবপুর আসতে পারে এবং সেখানে অবস্থানরত সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নিতে পারে। কিছুদিন আগে জিয়াউর রহমান ছিলেন, তিনি ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার পর সেখানে সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মেজর কেএম সফিউল্লাহ। কমান্ডার ছিলেন আমার আত্মীয় মাসুদুর হাসান খান। তাদের সঙ্গে সরাসরি আমাদের যোগাযোগ ছিল না চাকরিবিধির কারণেই। তবে পরোক্ষভাবে তাদের কাছ থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি। সৈন্যদের কাছ থেকেও নিয়মিত তথ্য পেতাম। শ্রমিক নেতা শেখ আবুল হোসেন খুবই তত্পর ছিলেন। মেশিন টুলস কারখানার অনেক শ্রমিক নেতা ছিলেন খুবই সক্রিয়, তারা বীর মুক্তিযোদ্ধাও। যুদ্ধে লুত্ফর বলে একটি ছেলে মারা যান। হাসান, মোখলেছসহ অনেকেই জয়দেবপুর আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, অনেকের নাম এখন আর মনে নেই। সবার নাম বলতে গিলে একটি ছোট বই হয়ে যাবে।
অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার খবর টঙ্গীতেও দ্রুত পৌঁছে যায়। টঙ্গীতে তখন নেতা ছিলেন কাজী মোজ্জামেল, হাসানউদ্দিন সরকার, হাকিম মাস্টার। কাজী মোজাম্মেল ছিলেন তখন এমএলএ। শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হাসানউদ্দিন সরকার। চৌরাস্তার কাছে ভাওয়াল সরকারি কলেজের কিছু শিক্ষক ছিলেন খুবই সক্রিয়। সবার নাম এখন উল্লেখ করা সম্ভব হচ্ছে না। ১৯ মার্চ সকাল বেলা আমরা খবর পেলাম, ঢাকা থেকে সামরিক কনভয় এসে জয়দেবপুরের অবস্থানরত সৈন্যদের নিরস্ত্র করা হবে। বাঙালি কর্মকর্তাদের সরিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের নিয়োগ করবে, যাতে করে এখানে পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা ধরেই নিলাম এটি হলো আমাদের পরাজিত, আক্রমণ ও ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা। অতএব এটি হতে দেয়া যাবে না। এখানে বাঙালি অফিসাররা রয়েছেন, ফলে কিছুতেই পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য পূরণ হতে দেয়া যাবে না। খুব নামকরা অফিসাররা ছিলেন এখানে। সফিউল্লাহ সাহেব পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছেন। মেজর নুরুজ্জামান ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে রক্ষীবাহিনীর প্রধান হয়েছেন। ক্যাপ্টেন মঈনুল হোসেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। এজাজ আহমেদ, আজিজুর রহমান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার হেলাল মুরশেদ চৌধুরী, মেজর জেনারেল ইব্রাহিমও ছিলেন সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। টঙ্গী থেকে প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেল। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি, ইট প্রভৃতি দিয়ে ঢাকা থেকে আগত সামরিক কনভয়ের গতিরোধ ও প্রতিরোধের চেষ্টা চলে। জয়দেবপুর চৌরাস্তায়ও ব্যারিকেড দেয়া হয়। জয়দেবপুরে বড় রকমের প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা হয়। কারখানার সাইরেন বাজানো হলো, আমাদের শ্রমিকরা সব জমা হলো মূল গেটে। আমরা সবাই দৌড়ে জয়দেবপুর চলে এলাম এবং ওইদিন ছিল হাটের দিন। ফলে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে গেল জয়দেবপুর। ঢাকা থেকে আগত কনভয়কে হাটের মধ্য দিয়ে রেললাইন পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টে যেত হতো। জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টটি ছিল রাজবাড়ীতে এ রেললাইনের পূর্ব পাশে। পাকিস্তানের গাড়ি একটির পর একটি বাধা অতিক্রম করে আসার আগেই আমরা রাজবাড়ীতে পৌঁছে গেছি। তখন আমরা একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম পাকিস্তানের সামরিক বহরকে যেতে দেয়া হবে না। রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হলো। মানুষ যখন সংঘবদ্ধ হয়, তখন অসাধ্য সাধন করতে পারে। জয়দেবপুরের রাস্তার ওপর রেললাইনে একটি বগি এনে রেখে দুই পাশ থেকে ফিশপ্লেট খুলে রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়। সাধারণ মানুষ এটি করেছিল। আর বগি না সরিয়ে কোনো গাড়ি পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে আসতে পারবে না। যে যা পেরেছে, তাই নিয়ে এসেছে প্রতিরোধে। লাঠি, দা, কেউ কেউ আবার লাইসেন্স করা বন্দুকও এনেছিলেন। আজিমুদ্দিন স্যারও লাইসেন্স করা একটি বন্দুক নিয়ে এসেছিলেন, সেটি এখনো জাদুঘরে রক্ষিত রয়েছে। হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ আসে। হাজার হাজার লোকের মধ্যে পড়ে যায় যানটি। জনগণ সৈনিকদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়। কে কোন অস্ত্র নিচ্ছে, তার কোনো খবর নেই, তারা যে সেটি চালাতে পারবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঘটনাক্রমে যারা অস্ত্র নিয়েছে, তাদের কেউ কেউ সেটি চালাতে পেরেছেও। খানিকক্ষণ পর পূর্ব দিক থেকে একটি কনভয় আসছে। সেখানে বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈন্য আছে। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আবরারও ছিলেন এতে। তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল বারবার— তোমরা সরে যাও, কেউ সরকারি কাজে বাধার সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরে গুলি করার কথাও বলা হয়। তখন হঠাৎ খবর এল আওয়ামী লীগের শামসুল আলম সাহেব, যিনি পরবর্তীতে পাটমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও হয়েছিলেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। টেলিফোন এসেছিল জয়দেবপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। আর ঘটনাক্রমে এক্সচেঞ্জটি ছিল পূর্ব দিকে যেদিকে অবস্থান করছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কনভয়। আমাকে পাঠানো হলো কথা বলতে। শামসুল হক সাহেব বললেন, বঙ্গবন্ধু খবর পেয়েছেন এবং তিনি জানতে চাইছেন জয়দেবপুরে কী হয়েছে। আমি ঘটনার বর্ণনা দিলাম। তিনি বললেন সব মানুষ তো মারা যাবে, কি করা যাবে। আমি বললাম কিছুই করার নেই। কথা বলতে বলতে কারফিউর ঘোষণা দেয়া হলো। গুলি করা হবে। হঠাৎ করেই গুলি শুরু হয়ে গেল। কোন পক্ষ থেকে গুলি আগে হয়েছে, তা বোঝা গেল না। টেলিফোনে শামসুল হক সাহেবকে গুলির শব্দ শোনালাম। আমি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আটকে থাকলাম। মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। ১৫ মিনিট সময় দেয়া হলো। আমি
সেখান থেকে বের হয়ে বাসায় গিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে অন্যত্র গিয়ে থাকলাম। গুলিতে আমাদের অনেকে মারা গেছে। সেনাবাহিনীরও অনেক ক্ষতি হয়েছিল। রেললাইনের পাথর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মানুষ পাথর আর ইট ছুড়েছে। সাধারণ মানুষের সাহস যে কি, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। বাঙালি অফিসারদের গুলি করার হুকুম দেয়া হলে তারা মাটিতে ও আকাশে গুলি ছুড়েছে। এটি দেখে পাকিস্তানিরা তাদের সরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানিদের নিয়োগ করল গুলি করার জন্য। তারা সোজাসুজি গুলি করেছে। এতে মানুষ মারা যায়। রেললাইন ঠিক করে তারা কনভয় দিয়ে ঢাকায় ফিরে যায়। পথে টঙ্গীতেও ব্যারিকেড পার হতে হয়েছিল তাদের। সেখানেও গুলি করেছে তারা। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়। জয়দেবপুরের মানুষ অসীম ও অবিশ্বাস্য সাহসিকতা দেখিয়েছে। এ কারণে ঢাকায় স্লোগান হয়েছে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।
পরদিন সোর্স পাঠিয়ে আমাদের খবর দেয়া হলো, যে পাঁচটি অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তারা ছিল বাঙালি সৈন্য। তাদের অস্ত্র ফেরত না দেয়া হলে ওই সৈন্যদের কোর্ট মার্শাল হয়ে যাবে। আজকেই অস্ত্র জমা না করা গেলে তাদের মৃত্যুদণ্ড হয়ে যেতে পারে। খবর পাওয়ার পর আমরা এক হয়ে অস্ত্র উদ্ধারে নেমে পড়লাম। কোনো অস্ত্র গ্রামের কুয়ার মধ্যে, কোনোটা পুকুরে, কোনোটা আবার বাড়ির মাচার ওপর ছিল। তবে একটি অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছিল না এবং সেটি ছিল সবচেয়ে ভালো অস্ত্র। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, অস্ত্রটি নিয়ে আমাদের এক শ্রমিক তার বাড়ি গফরগাঁও চলে গেছে। ট্রেনে চিঠি দিয়ে অস্ত্র ফেরত আনতে লোক পাঠানো হলো। মোটরসাইকেলে করে দূতকে রাজেন্দ্রপুর থেকে ট্রেনে তুলে দেয়া হলো, তিনি চিঠি দিয়ে অস্ত্র নিয়ে আবার ট্রেনে করে এসে অস্ত্র জমা দেন। সৈন্যদের বাঁচানো হলো, এই সৈন্যরাই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ২৫ মার্চের পর সমরাস্ত্র কারখানা থেকে অস্ত্র নিয়ে যায় অনেকে। তখন তো অস্ত্র সম্পর্কে কারো ধারণাই ছিল না। কেউ অস্ত্র নিয়েছে এলএমজি, অথচ গুলি নিয়েছে রাইফেলের। কেউ আবার থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়েছে আবার গুলি নিয়েছে চাইনিজ রাইফেলের। এত ভারী যে কেউ দুই-তিনটি নিয়েছে এবং কিছু দূর যেতে একটি ফেলে দিয়েছে। আমরা ২৬ অথবা ২৭ মার্চ জয়দেবপুর চলে গেলাম। ২৬ তারিখ সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য ও কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় তাদের গন্তব্যে। পরবর্তীতে আগরতলার মনতলায় তারা অবস্থান গ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধে জয়দেবপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্ভবত সর্বপ্রথম একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় জয়দেবপুরে, সর্বপ্রথম একটি সামরিক স্থাপনা বন্ধ করে দেয় জয়দেবপুরবাসী, সর্বপ্রথম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে এবং তাদের মোকাবেলা করা হয়েছে।
আমার জন্ম জামালপুর জেলায়। কিন্তু আজকে যে নজরুল ইসলাম খান শ্রমিক নেতা কিংবা রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী যা-ই বলেন না কেন, তার জন্ম হয়েছে জয়দেবপুরে। শ্রমিক আন্দোলন বলেন আর মুক্তিযুদ্ধ, এর উত্থান জয়দেবপুরে। জয়দেবপুরের মাটি ও মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধে জয়দেবপুরের অনেকে শহীদ হয়েছে, আহত হয়েছে অগণিত। ১৯ মার্চের প্রতিরোধেই মারা যান কয়েকজন। তবে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। চার-পাঁচজনের নাম জানা যায়। তাদের কবরও আছে জয়দেবপুরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জয়দেবপুরের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গৌরবদীপ্ত।
[শ্রুতিলিখিত]
লেখক: জয়দেবপুর সংগ্রাম পরিষদের কোষাধ্যক্ষ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য






