১৪-১৫ মার্চ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আমাদের ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হবে। এ গুজবের মধ্যে কিছু সত্যতাও ছিল। আমাদের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু অস্ত্রশস্ত্র ছিল। সেগুলো জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। আমরাও সেই নির্দেশ মানার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। এ গুজবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ মার্চ জনসাধারণ জয়দেবপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এতে আমাদের খাদ্য সরবরাহে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় আমি ব্যারিকেডে গিয়ে জনসাধারণকে বলি যে, আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। আমি ১৭ বছর সামরিক বাহিনীতে চাকরি করেছি অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য, ফিরিয়ে দেয়ার জন্য নয়। এজন্য আমাদের ওপর আপনাদের আস্থা রাখতেই হবে। আপনারা যদি না রাখেন, তবে আমাদের ওপর আস্থা রাখার মতো লোক আর কেউ নেই। এ কথা শুনে তারা বলল যে, আমরা আপনার ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে চাই। জনতার মধ্যে থেকে চার-পাঁচজন গণ্যমান্য নেতা আমার সঙ্গে এলেন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেখানে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার এ আশ্বাস দিলেন যে, আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। আমাদের বিশ্বাস করুন এবং এ প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলুন। এতে আপনাদের সুবিধা হবে এবং আমরা কোনো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ব না। সব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলবে বলে আশ্বাস দিয়ে তারা চলে গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধকতা উঠানো হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেরাই গিয়ে প্রতিবন্ধকতা উঠাচ্ছিলাম। কিন্তু একদিকে যেই আমরা ব্যারিকেড সরাচ্ছিলাম, অন্যদিকে জনসাধারণ আবার ব্যারিকেড সৃষ্টি করছিল। 

১৯ মার্চ সকাল ১০টার দিকে ঢাকা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে আমাদের কাছে ওয়্যারলেসে এই মর্মে এক মেসেজ পাঠানো হয় যে, ‘The Commander with his escort is coming to have lunch with you. He would visit Gazipur Ordnance Factory.’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতেও এরূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয় এবং সেখানে আমাদের ব্যাটালিয়নের লোকজন গিয়ে গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির রেসিডেন্স ডিরেক্টর ব্রিগেডিয়ার করিম উল্লাহ্ (পশ্চিম পাকিস্তানি)-কে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে (তাকে ফ্যাক্টরির লেবাররা ঘেরাও করে রেখেছিল)। এ ঘেরাও থেকে উদ্ধার করতে আমাদের কোনো বেগ পেতে হয়নি। ১২টার দিকে একটা মেসেজ আসে যে, “I had cleared some barricade. Now I am at ‘chowrasta’. I am using the civilians to open the barricade. You also clear the barricade from your side and meet me enroute. If there is any opposition use maximum force.” এ খবর পাওয়ার পর আমাদের লোকজনকে নিয়ে জয়দেবপুর থেকে প্রতিবন্ধকতা সরাতে সরাতে অগ্রসর হই এবং ব্রিগেড কমান্ডারের সঙ্গে রাস্তায় মিলিত হই।

আমরা প্রতিবন্ধকতা নিজেরাই পরিষ্কার করি। কিন্তু ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব এবং তার সঙ্গীরা জনগণকে দিয়ে প্রতিবন্ধকতা পরিষ্কার করেন। প্রতিবন্ধকতা সরানোর সময় বেশ কিছুসংখ্যক লোককে মারধর করা হয়। বেলা প্রায় দেড়টায় ব্রিগেড কমান্ডার তার লোকজনকে নিয়ে জয়দেবপুর পৌঁছেন। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, ব্রিগেড কমান্ডারের সঙ্গে যেসব লোক ছিল, তাদের মধ্যে একজন লে. কর্নেল (আর্টিলারি), একজন ক্যাপ্টেন (আর্টিলারি), একজন মেজর (আর্মার), একজন ক্যাপ্টেন (ইনফান্ট্রি), একজন ক্যাপ্টেন (কমান্ডো) এবং ৭০ জন জোয়ান চাইনিজ এলএমজিতে সজ্জিত ছিল। তিনি জয়দেবপুরে প্রবেশ করে গর্বিতভাবে বললেন, ‘Nobody can stop us. We can move to any direction wherever and whenever we want to move.’ তার উক্তি ও ভাবভঙ্গিতে আমার মনে হলো যেন আলেকজান্ডার ভারত জয় করল। জয়দেবপুরে এসে শুধু অফিসাররা জয়দেবপুর রাজবাড়িতে ঢুকল। কিন্তু ৭০ জন জোয়ান প্রাসাদের বাইরে রয়ে গেল।

ব্রিগেড কমান্ডার যখন ঢাকা থেকে জয়দেবপুরে আসছিলেন, তখন যাতে আমাদের ওপর কোনো অঘটন না ঘটে, সেজন্য আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত ছিলাম। কেননা আমাদের নিরস্ত্র করা হবে বলে একটা আশঙ্কা মনের মধ্যেই ছিল। ব্রিগেড কমান্ডার প্রাসাদে ঢুকে সব জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে, এ রকমের প্রস্তুতি কেন? তখন আমি উত্তর দিয়েছিলাম, এখানকার পরিস্থিতি এমন যে, যেকোনো মুহূর্তে উত্তেজিত জনতা দ্বারা আমরা আক্রান্ত হতে পারি এবং সীমান্তের পরিস্থিতি যা, তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সীমান্ত অভিমুখে রওনা দিতে হতে পারে। উত্তর যদিও মনঃপূত ছিল, তবুও আমরা একে অন্যের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছিলাম।

ব্রিগেড কমান্ডার প্রাসাদে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার জন্য ঢাকা থেকে সেনাবাহিনী এসেছে। ফলে উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ জনতা আবার অল্প সময়ের মধ্যে জয়দেবপুর রেল ক্রসিংয়ে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। একটা ভর্তি মালবাহী গাড়ি, যেটা তখন ময়মনসিংহ থেকে জয়দেবপুরে এসেছিল, তা দিয়ে রেলওয়ে ক্রসিংয়ের ওপর বিরাট এক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল মাসুদকে নির্দেশ দেন যে, ২০ মিনিটের মধ্যে এ প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা হোক। যদি কোনো বাধার সৃষ্টি হয়, তবে যেন ম্যাক্সিমাম শক্তি প্রয়োগ করা হয়। কর্নেল মাসুদুল হাসান এ নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর মইনুল হোসেনকে (বর্তমান লে. কর্নেল) নির্দেশ দিলেন যে, তার কোম্পানি নিয়ে যেন এ প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা হয়। কোনো সময় নষ্ট না করে মেজর মইন এ প্রতিবন্ধকতার সামনে পৌঁছেন।

তিনি সেখানে গিয়ে জনতার কাছে আবেদন করেন যে, আপনাদের ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। কারণ আমাদের সঙ্গে এখনো অস্ত্র আছে। আমাদের কাছ থেকে এখনো অস্ত্র নেয়া হয়নি। জনতা যখন শুনছিল না, তখন তিনি ভিড় ঠেলে জনতার মধ্যে যারা নেতা, তাদের সঙ্গে আলাপ করেন। নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন আওয়ামী লীগ কর্মী জনাব হাবিব উল্লাহ এবং আরেকজন ছিলেন শ্রমিক নেতা আবদুল মোত্তালেব। সেদিন ছিল শুক্রবার এবং জয়দেবপুরে হাটবার। প্রায় ৫০ হাজার লোকের সমাবেশ ছিল সেখানে। কিছু জনতা প্রতিবন্ধকতার এপাশে ছিল আর কিছু জনতা প্রতিবন্ধকতার অন্য পাশে। নেতারা ছিলেন বাজারের দিকে। মেজর মইন এরই মধ্যে নেতাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, আমাদেরকে এখনো নিরস্ত্র করা হয়নি। তারা আমাদের কথায় বিশ্বাস করেন। নেতারা জনসাধারণকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে, তারা যেন আর কোনো গণ্ডগোল না করে। জনতার মাঝে তখনো হইচই ও গণ্ডগোল চলছিল। এরই মধ্যে লে. কর্নেল মাসুদ, ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব ও তার ট্রুপস সেখানে গিয়ে পৌঁছেন।

ব্যারিকেডের বাজারের পাশের দিকে অধিকাংশ জনতার সমাবেশ ছিল এবং অন্য পাশের দিকেও বেশ জনসমাবেশ ছিল। কিন্তু এ পাশের লোক বেশ উত্তেজিত ছিল। কারণ তারা জানত না যে, মেজর মইনের সঙ্গে ব্যারিকেডের অন্য পাশের জনতার কী কথাবার্তা হয়েছিল। জয়দেবপুর পর্যন্ত যে রাস্তা স্টেশনের দিকে চলে যায়, সে রাস্তার শেষ প্রান্তে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ট্রুপস মোতায়েন ছিল। তার পেছনে হুকুম দেয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবাব তার বাহিনী নিয়ে এসে যান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাকি সৈন্য প্যালেসে থেকে যায়। ব্রিগেড কমান্ডার আসার সঙ্গে সঙ্গে মেজর মইনকে আদেশ দেন, তিনি যেন তার সেনাবাহিনীকে পেছনে সরিয়ে নিয়ে এসে রেলস্টেশনে যাওয়ার পথের ওপর জনতাকে সামনে রেখে মোতায়েন করেন। মেজর মইন তখন ব্রিগেড কমান্ডারকে বললেন যে, নেতারা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান এবং এ উদ্দেশ্যে তারা এদিকে আসছেন। ব্রিগেড কমান্ডার উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘I do not want to see them. Tell them to get away and deploy troops.’

মেজর মইন নির্দেশ মোতাবেক সৈন্যদের মোতায়েন করার জন্য আদেশ দিচ্ছিলেন। এ আদেশ শুনে এবং সৈন্যদের গতিবিধি ও ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবাবের ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখে নেতারা পেছনে সরে যান। নেতাদের পেছনে সরে যেতে দেখে এপাশের জনতা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ল। তখন ব্রিগেড কমান্ডার মেজর মইনকে নির্দেশ দেন জনতার ওপর গুলি ছোড়ার জন্য। একদিকে তিনি নিজে মেজর মইনকে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন কিন্তু অন্যদিকে তিনি মেজর মইনকে কর্নেল মাসুদের নির্দেশ নিতে বলছিলেন। কর্নেল মাসুদ ওখানে ছিলেন।

এখানে বলে রাখা দরকার যে, টাঙ্গাইলে আমাদের যে কন্টিনজেন্ট ছিল, তাদের খাদ্য নেয়ার জন্য একটা ট্রাক (বেডফোর্ড) টাঙ্গাইল থেকে জয়দেবপুর আসছিল। ওই গাড়ি বাজারের কাছে এসে এক বিরাট জনতার ভিড় দেখতে পায়। তারা ভেবেছিল যে, আজ হাটবার তাই এত লোক। তারা এখানকার ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। হঠাৎ জনতার মধ্য থেকে কিছু লোক তাদের ঘিরে ফেলে এবং বলে যে, সামনে পাঞ্জাবি সৈন্যরা আমাদের ওপর গুলি ছোড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। তোমাদেরকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। ট্রাকের মধ্যে ড্রাইভারসহ সাতজন বাঙালি সৈন্য ছিল। তারা হতবুদ্ধি হয়ে কী করতে হবে কিছুই ঠিক করতে পারল না। জনতা পাঁচজনকে ধরে নিয়ে যায় এবং একটি ঘরে তাদের বন্ধ করে অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেয়। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে চারটি চাইনিজ রাইফেল এবং একটি চাইনিজ এসএমজি ছিল। ড্রাইভার ও কো-ড্রাইভার কোনো রকমে পালিয়ে এসে বলে যে, আমাদের পাঁচজন সৈন্যকে জনতা বোধ হয় মেরে ফেলেছে এবং আমরা মারধর খেয়ে কোনোরকমে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। তখন ব্রিগেড কমান্ডার হুকুম দেন, ‘Fire and clear the barricade.’ মেজর মইন এ হুকুম পাওয়ার পর প্রথম বিউগল বাজালেন এবং পতাকা উঠিয়ে গুলি ছোড়া হবে বলে মাইকে ঘোষণা করলেন। এ ঘোষণায় জনতার মাঝে কোনো ভয়ভীতির সঞ্চার হয়নি। তারপর তিনি জনতার মাঝে একজনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেন। এ আদেশ শোনার পর জনতার মাঝে একটু ভয় ও ভীতির সঞ্চার হয়। মেজর মইন যাকে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাকে বাংলায় বললেন যে, নিচের দিকে গুলি ছুড়ে দাও। যেহেতু গুলিটি গিয়ে একটা গাছের মধ্যে লেগেছে, সেহেতু ব্রিগেড কমান্ডার এটা দেখে খুব রাগান্বিত হলেন। এবং নির্দেশ দিলেন, ‘Fire for effect.’ এবারো জনতার মধ্যে একটু নড়চড় হচ্ছিল। তাই মেজর মইন আর একজনকে লক্ষ্য করে বললেন, অমুককে গুলি ছোড়ো। এবারো তিনি বাংলায় বললেন, ওপর দিকে মেরে দাও। এবার যে গুলি করছিল, সে রাইফেলটাকে এমনভাবে উঠিয়ে ধরছিল যে মনে হচ্ছিল, সে আকাশের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। তা দেখে ব্রিগেড কমান্ডার ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘I want dead body per bullet. If you cannot handle the situation I will employ my troops.’ এ সময়  জনতার মধ্যে থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে দেখে মেজর মইন এবার ঠিকভাবে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিলেন। গুলি একজন লোকের গায়ে লাগে এবং সে মাটিতে পড়ে যায়। এর ফলে জনতা ছত্রভঙ্গ হতে থাকে। এ সময় জনতার মধ্যে থেকেও ভীষণভাবে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। জনতার গুলিতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছুসংখ্যক সৈন্যও আহত হয়। এ সময় জয়দেবপুর বাজারে অবস্থিত মসজিদের ওপর থেকে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবাবকে লক্ষ্য করে এসএমজি ফায়ার শুরু হয়। আমাদের সৌভাগ্যবশত ব্রিগেডিয়ারের গায়ে তা লাগেনি। তখন জনতা ও সৈন্যদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ গুলি বিনিময় হয়। এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাকি সৈন্যসহ আমি তখন প্যালেসে ছিলাম এবং গুলির আওয়াজ শুনে কিছুসংখ্যক সৈনিককে জাহানজেব আরবাবের ট্রুপসের পেছনে মোতায়েন করি। এর দুটো উদ্দেশ্য ছিল— জনতার হাত থেকে আমাদের সৈনিকদের বাঁচানো এবং যদি ব্রিগেড কমান্ডারের অশুভ উদ্দেশ্য থাকে, তা প্রতিহত করা।

এ খণ্ডযুদ্ধ প্রায় ১৫-২০ মিনিট চলে এবং এরপর সম্পূর্ণ এলাকা জনতামুক্ত হয়। জনতা চলে যাওয়ার পর আমরা ব্যারিকেড তুলে ফেলি। এরপর ব্রিগেড কমান্ডার ঢাকার দিকে চলে গেলেন এবং যাওয়ার আগে নির্দেশ দিয়ে গেলেন জয়দেবপুর ও গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকার মধ্যে সান্ধ্য আইন জারি করার জন্য এবং আরো বলে গেলেন ওয়্যারলেসে তাকে জানাবার জন্য— কী রকম অ্যামুনিশন খরচ হয়েছে এবং কতজন হতাহত হয়েছে।

আমরা তারপর খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, দুজন লোক নিহত হয়েছে এবং কিছুসংখ্যক আহত হয়েছে। ব্রিগেড কমান্ডার যাওয়ার সময় চৌরাস্তায় কিছু লোক দেখতে পান। তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য দূর থেকে গুলি ছোড়েন এবং এতে দুজন লোক মারা যায়। আহতদের সংখ্যা জানা যায়নি।

আমরা নির্দেশ অনুযায়ী সান্ধ্য আইন জারি করি। বিকাল ৫টার দিকে পাঁচজন নিখোঁজ লোককে আমরা মসজিদের পাশের এক কক্ষ থেকে উদ্ধার করি। স্থানীয় নেতাদের সাহায্যে এবং আমাদের লোকদের সাহায্যে তল্লাশি চালিয়ে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চারটি রাইফেল উদ্ধার করতে সক্ষম হই। তিন-চারদিন পর গফরগাঁও থেকে এসএমজিটি উদ্ধার করি। অস্ত্রশস্ত্র খুঁজে বের করা পর্যন্ত ওই বেলায় সান্ধ্য আইন বলবৎ ছিল। যদি ব্রিগেড কমান্ডার সেখানে না থাকতেন, তাহলে আমরা ব্যারিকেড তুলে ফেলতে পারতাম। কোনো হতাহত হতো না। যেভাবে এ পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করা হয়েছে, তাতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ওই দিনই রাতে পাঁচজন বাঙালি সৈন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে চারটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি এসএমজি অ্যামুনিশন ছিল। সন্ধ্যার সময় ওয়্যারলেসে আমরা ব্রিগেড কমান্ডারকে জানালাম যে, আমাদের ৬৩ রাউন্ড গুলি খরচ হয়েছে এবং আমাদের কিছুসংখ্যক সৈন্য আহত হয়েছে। দুজন বেসামরিক লোক নিহত এবং বেশ কিছুসংখ্যক আহত হয়েছে। যদিও তিনি বললেন, ভালো করেছ। কিন্তু তিনি মনে মনে খুশি হতে পারেননি। কেননা তিনি বলেছিলেন, ‘Why 63 round spent and only two dead?’

ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের কর্তব্য ও দায়িত্ব তার ব্যাটালিয়নের শৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু এমন নাজুক পরিস্থিতিতে তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে কিছুই করতে পারেননি। ব্রিগেড কমান্ডারের কাছ থেকে তার ওপর কারণ দর্শাও নোটিস এল— কীভাবে ট্রাকের পাঁচজন সৈন্য থেকে অস্ত্র নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলো? এবং পাঁচজন কেন অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গেল? ব্যাটালিয়ন কমান্ডার এক্সপ্লানেশনের জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তার জবাবে ব্রিগেড কমান্ডার সন্তুষ্ট হননি। শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে নিজে গিয়ে তার বক্তব্য পেশ করেন। যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করেন। আমি তাকে বলেছিলাম যে, যতক্ষণ না আপনাকে ডাকছে, ততক্ষণ আপনি ঢাকায় যাবেন না। যেহেতু তিনি মানসিক অস্থিরতায় ছিলেন, সেহেতু তিনি সেই অস্থিরতা দূর করার জন্য ২৩ মার্চ ঢাকা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে এলেন। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবাব বললেন, তোমাকে ব্যাটালিয়নে ফিরে যেতে হবে না। তুমি স্টেশন হেডকোয়ার্টারে অ্যাটাচড; ব্যাটালিয়নের ঘটনাবলি নিয়ে তদন্ত হবে। তার পর থেকে তাকে ঢাকায় থেকে যেতে বলা হয়। সেহেতু তিনি আর ব্যাটালিয়নে ফিরে যেতে পারেননি। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, কর্নেল মাসুদ স্টেশন হেডকোয়ার্টারে অ্যাটাচড এবং তার অনুপস্থিতিতে আমি যেন ব্যাটালিয়নের কার্যভার গ্রহণ করি।

২৫ মার্চ বেলা ১১টার সময় আমাকে ব্রিগেড থেকে জানানো হয়, ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, সেন্টার কমান্ড্যান্ট, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, চট্টগ্রাম ব্যাটালিয়নে আসছেন এবং সৈন্যদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। আরো জানানো হয়, লে. কর্নেল কাজী রকিব উদ্দিন নতুন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে আসছেন এবং তিনিও আজ পৌঁছে যাবেন। কর্নেল মাসুদ আমাকে ১১টার দিকে টেলিফোনে বলেন যে, লে. কর্নেল রকিব নতুন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে আসছেন। তিনিও ভালো লোক। আমার যা হয়েছে, তার জন্য কোনো আফসোস নেই। খোদা যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।

বেলা প্রায় ১টায় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ব্যাটালিয়নে পৌঁছেন এবং আমার সঙ্গে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা করেন। তার কাছে কিছু প্রশ্ন করলে তিনি তার পুরোপুরি জবাব দিতে পারেননি। আমার মনে হচ্ছিল তিনি কিছু বলতে চাইছিলেন কিন্তু ঘোলাটে পরিস্থিতিতে মুখ খুলে কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। বেলা প্রায় আড়াইটার দিকে লে. কর্নেল কাজী রকিব ব্যাটালিয়নে পৌঁছে যান। বেলা প্রায় ৩টায় ব্রিগেডিয়ার মজুমদার সৈনিকদের উদ্দেশে এক ভাষণ দেন। ভাষণের মর্ম এই ছিল যে, আমরা সৈনিক, আমরা সরকারের নির্দেশ মোতাবেক চলি এবং সরকার যা হুকুম  দেয়, তা আমরা পালন করতে বাধ্য হই। ব্যাটালিয়নে ঘণ্টাখানেক এ পরিপ্রেক্ষিতে ভাষণ দেন। তারপর লে. কর্নেল রকিবকে ব্যাটালিয়নের ভার বুঝিয়ে দেন। এবং সৈনিকদের বলেন, আজ থেকে লে. কর্নেল রকিব তোমাদের নতুন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার। বেলা প্রায় ৫টার দিকে তিনি ঢাকা রওনা হয়ে যান। কিন্তু যাওয়ার আগে আমি তাকে বলেছিলাম যে, স্যার, আপনি আমাদের ব্যাটালিয়নে নতুন এসেছেন। তাই আজ রাতটা এখানে থেকে যান। কিন্তু তিনি বলেন যে, ঢাকায় তিনি তার শ্বশুরবাড়িতে থাকবেন। এখন আমি উপলব্ধি করতে পারছি যে, যদি তিনি সেদিন আমাদের ব্যাটালিয়নে থাকতেন, তাহলে হয়তো আজ আমাদের সঙ্গেই থাকতেন।

ব্রিগেডিয়ার মজুমদার চলে যাওয়ার পর আমি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার রকিবকে দেশের তদানীন্তন গোলযোগপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটালিয়নের সৈনিকদের মনোভাব জ্ঞাত করাই। কিন্তু তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে না জানায় তার সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করতে পারছিলাম না— যদিও আমার পক্ষ থেকে যতদূর সম্ভব ব্যাটালিয়নের সৈনিকদের মনোভাব তাকে জ্ঞাত করাই। ২৫ মার্চ পর্যন্ত ব্যাটালিয়ন কীভাবে মোতায়েন ছিল, তাও তাকে বলি। ডেপ্লয়মেন্টটা এই, এক কোম্পানি ময়মনসিংহে, এক কোম্পানি টাঙ্গাইলে— এ দুই কোম্পানির ভার ছিল আমার ওপর। এক প্লাটুন ছিল রাজেন্দ্রপুরে অ্যামুনিশন ডিপোতে। সেখানে আরো তিনটি পাঞ্জাবি প্লাটুন ছিল— এক প্লাটুন পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, এক প্লাটুন বেলুচ রেজিমেন্ট এবং এক প্লাটুন ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট। ব্যাটালিয়নের বাকি লোক সব জয়দেবপুর প্যালেসে ছিল।

২৫ মার্চ রাত প্রায় ১০টার দিকে কর্নেল রকিবের ছেলে ঢাকা থেকে টেলিফোনে জানায় যে, তাদের বাসায় কয়েকটা বেনামি টেলিফোন কল এসেছে এবং ধমক দিয়ে বলা হয়েছে যে, তাদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ওইদিন ব্রিগেড কন্ট্রোল রুমে আমাদের ব্যাটালিয়নের একজন পাঞ্জাবি অফিসার কর্তব্যরত ছিল। কর্নেল রফিক তাকে নির্দেশ দেন, সে যেন ইপিআর হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন করে সেখান থেকে কিছু আর্মড গার্ড তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তিনি ইপিআর থেকে মনে হয় এ ভরসায় সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি মাত্র কিছুক্ষণ আগে ইপিআর থেকে এসেছেন। আমর্ড গার্ড তার বাসায় পাঠানো হয়েছিল কিনা তা পরে আর জানতে পারিনি।

২৫ মার্চ রাত প্রায় ১২টায় জেনারেল টিক্কা খান ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কর্নেল রকিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং বলেন যে, গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে গোলযোগ চলছে। একজন দায়িত্বশীল অফিসারের নেতৃত্বে যেন সেখানে এক কোম্পানি সৈন্য পাঠানো হয়। গাজীপুর জয়দেবপুর থেকে নিকটবর্তী। সেখানে কোনো গোলযোগ হলে নিশ্চয়ই আমরা খবর পেতাম। কিন্তু যেহেতু টিক্কা খান নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন, সেহেতু ওই রাতেই প্রায় ৩টায় এক কোম্পানি সৈন্য একজন অফিসারের নেতৃত্বে সেখানে পাঠানো হয়। সৈন্য পাঠানোর পর সেখানে দেখা গেল কোনো গণ্ডগোল ছিল না। আমার মনে হয়, তার উদ্দেশ্য ছিল ব্যাটালিয়নের সব সৈনিককে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে রাখা, যাতে আমরা একত্রিত হয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ২৫ মার্চের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে পারি।

২৫ মার্চ রাত প্রায় ১টায় কর্নেল মাসুদুল হাসান খান ঢাকা থেকে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করেন যে, তোমাদের অবস্থা কী? ঢাকায় তো বেশ গুলিগোলার আওয়াজ শুনছি। এ টেলিফোন পাওয়ার পর পরই ঢাকার সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঢাকায় যে তখন কী হচ্ছিল, তার কোনো খবরই আমরা পাচ্ছিলাম না। ২৬ মার্চ সকালবেলায় ব্যাটালিয়ন কমান্ডার রকিবকে বললাম যে, গত রাতে যা কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং চারদিকে যেসব গুজব রটছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। এ মুহূর্তে এ ব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। যেহেতু ঢাকার সঙ্গে অন্য সব রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেহেতু আমি ওয়্যারলেস সেটে গিয়ে ঢাকায় কী হচ্ছে তা শোনার চেষ্টা করি।

২৬ মার্চ সকাল ৭-৮ ঘটিকার সময় আমি ও কর্নেল রকিব ওয়্যারলেস সেটে যাই। সেটটা জয়দেবপুর রাজবাড়ির অফিসার্স মেসের পূর্ব দিকে বসানো ছিল। আমরা যখন সেটে যাই, তখন সেটে কথা হচ্ছিল। আমরা সেখানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে অপারেটর ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করে অন্য চ্যানেলে চলে আসে। ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করায় অন্যান্য স্টেশনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি অপারেটরকে (পাঞ্জাবি ছিল) জিজ্ঞেস করি, তুমি ফ্রিকোয়েন্সি কেন চেঞ্জ করছ? আর বাকি স্টেশন কোথায়? সে উত্তর দিল যে, ঢাকা থেকে নির্দেশ দিয়েছে যে, গোলযোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য এবং এ নেট অনেক স্টেশন হয়ে যাওয়ার জন্য জয়দেবপুর-ঢাকা-টাঙ্গাইল এক নেটে থাকবে। আমি তাকে বললাম কিছুক্ষণ আগে ওয়্যারলেস সেট যে ফ্রিকোয়েন্সিতে ছিল, সে ফ্রিকোয়েন্সিতে ফিরে যাও। সে উত্তর দিল যে, স্যার, আমার সেট আর কোনো ফ্রিকোয়েন্সিতে ছিল না। আমি তখন তাকে বললাম, অন্যান্য ইউনিট যে ফ্রিকোয়েন্সিতে আছে, সে ফ্রিকোয়েন্সিতে মিলাও বা সেট করো। সে উত্তর দিল, আমার সে ফ্রিকোয়েন্সি জানা নেই। আমি তাকে আর কিছু না বলে কর্নেল রকিবের সঙ্গে অফিসে ফিরে আসি। আসার সময় রাস্তায় কর্নেল রকিবকে বলি, ‘There must have something serious happened in Dacca. That is why Dacca station does not want us to hear the conversation.’ তারপর আমি একজন বাঙালি অপারেটরকে গোপনে নির্দেশ দিই, ওই সেটের ওপর লক্ষ রাখার জন্য যে কী কথাবার্তা হয়। আমি অফিসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যাটালিয়নের নিজস্ব অপারেটর আমাকে বলে যে, ময়মনসিংহের কোম্পানি কমান্ডার মেজর নূরুল ইসলাম আপনার সঙ্গে জরুরি কথা বলতে চান। ময়মনসিংহে আমাদের নিজস্ব ওয়্যারলেস সেট ছিল। টেলিফোন যোগাযোগ ছিল না বলে তিনি ওয়্যারলেসে কথা বলতে চান। আমি সেটে যাওয়ার পর মেজর নূরুল ইসলাম বলে যে, সে কয়েক হাজার লোক দ্বারা ঘেরাও হয়ে আছে। তারা বলছে যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাদের সঙ্গে যোগ দিক।

এখানে বলে রাখা দরকার, ময়মনসিংহে ইপিআর হেডকোয়ার্টারে মেজর নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের এক কোম্পানি সৈন্য ছিল। ইপিআরের উইং কমান্ডার একজন পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার ছিলেন। ইপিআর উইংয়ে তাদের যে রিজার্ভ কোম্পানি ছিল, তার প্রায় অধিকাংশই বাঙালি। উইং কমান্ডার ঢাকার নির্দেশ মতো সব পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিককে (ইপিআর) বর্ডার থেকে উইথড্র করে উইং হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসে। তাদের সংখ্যা উইং হেডকোয়ার্টারে ছিল প্রায় ৫০-৬০ জন। জনতা যখন উইং হেডকোয়ার্টার ঘিরে ফেলল, তখন হেডকোয়ার্টারের আউটার পেরিমিটারে বাঙালি সৈনিকরা পাহারারত অবস্থায় ছিল। মেজর নূরুল ইসলাম (বর্তমানে লে. কর্নেল) মাইক্রোফোনে উচ্চৈঃস্বরে জনসাধারণকে এ এলাকা থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিল এবং এও আশ্বাস দেয় যে, সময় এলে আমরা আপনাদের নিরাশ করব না। সারা দিন তারা এ অবস্থায় ঘেরাও ছিল। মেজর নূরুল ইসলামের আশ্বাস পেয়ে জনতা আস্তে আস্তে সরে যায়। আমাকে যখন সে এসব ঘটনা জানায়, তখন আমি তাকে বললাম, ধীরে সুস্থে কাজ করো। সময় এলে সবকিছু বলব। সে আমাকে সেখানে আরো কিছু সৈনিক পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিল। আমি তাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম যে, আমি পাঠাতে চেষ্টা করব।

ওয়্যারলেস থেকে অফিসে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি যে একজন অপারেটরকে ঠিক করেছিলাম ওই ওয়্যারলেস সেটে লক্ষ রাখার জন্য, সে এসে আমাকে খবর দিল যে, স্যার, আপনারা চলে আসার কিছুক্ষণ পর সে আবার ফ্রিকোয়েন্সি চেঞ্জ করে অন্যান্য স্টেশনের কথা শুনছিল। আমি দূর থেকে শুধু এতটুকুই শুনতে পেরেছি, কে যেন কতগুলো লোক মেরেছে। পাঞ্জাবি অপারেটর তার সম্পর্কে নির্দেশ চাইলে ঢাকার অপারেটর ভীষণভাবে রাগান্বিত হয় এবং বলে সে যেন আর কখনো এ ফ্রিকোয়েন্সিতে না আসে। তাকে গতকাল যেভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সে যেন সেভাবে চলে।

এ খবর পেয়ে আমি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কর্নেল রকিবের অফিসে যাই এবং তাকে এসব ব্যাপার (ময়মনসিংহের ব্যাপার এবং ওয়্যারলেসের ব্যাপার) সব খুলে বলি এবং তাকে আমি বলি, স্যার, আমাদের এখন কিছু একটা করা দরকার। তা না হলে পরিস্থিতি আমাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। যদি চলে যায় আপনিও কিছু করতে পারবেন না, আমিও কিছু করতে পারব না। তিনি তখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী করা দরকার? আমি এ পরামর্শ দিলাম যে, ময়মনসিংহের পরিস্থিতি খারাপ। ঢাকার সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে সাহায্যের জন্য আমাদের সব সৈনিক নিয়ে সেখানে চলে যাই। আমার উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের সৈনিকদের ময়মনসিংহে গিয়ে কনসেনট্রেট করা। আর পরিস্থিতি লক্ষ করে যদি কিছু করতে হয় তাহলে আমরা যেন একসঙ্গে করতে পারি। তিনি তখন বললেন, ঢাকা থেকে নির্দেশ ছাড়া কীভাবে এ পদক্ষেপ নিই। আমি তখন বললাম, আপনি ঢাকা থেকে নির্দেশ নেন যে, ময়মনসিংহের পরিস্থিতি খুবই খারাপ, আমাদের সেখানে এনফোর্সমেন্ট পাঠানো দরকার। তিনি আমার কথামতো ঢাকায় ওয়্যারলেস সেটে কথা বললেন। কিন্তু কোনো উত্তর পেলেন না। আমি তাকে বললাম যে, এখন আমরা যদি কিছু না করি তাহলে সৈনিকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা হয়তো পালন করতে পারব না। এতে তিনি একটু ঘাবড়ে গেলেন। ২৬ মার্চ প্রায় ১০টার দিকে জেনারেল টিক্কা খান তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং ওই আইনের নির্দেশাবলি রেডিওতে প্রচার করতে থাকেন। সামরিক আইন জারির কথা শুনে সৈনিকদের মধ্যে এক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঢাকায় যে কিছু একটা ঘটেছে, তার একটা আভাস পাওয়া যায়।

২৬ মার্চ সকাল ১০-১১টার দিকে দেখলাম একটা আর্মি হেলিকপ্টার রাজেন্দ্রপুরের দিকে একবার যাচ্ছে আবার আসছে। খবর নিয়ে জানতে পারলাম, তারা রাজেন্দ্রপুর থেকে অ্যামুনিশন নিচ্ছে। তাতে বোঝা যাচ্ছে ঢাকায় যে অ্যামুনিশন ছিল, তা এত তাড়াতাড়ি কীভাবে তারা খরচ করল। এ খবর পাওয়ার পর ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে আবার বললাম যে, ‘Sir, There must have something serious happened in Dacca and that is why they are running short of ammunition and ammunition is being lifted by helicopter.’

 

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল