মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গাজীপুর নানা কারণেই অনন্য। বীরত্বগাথার দিক দিয়ে এ জেলার মানুষ যেমন নমস্য, পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এ জেলার নেতারাও তেমনই ধীমান-বিচক্ষণ। রাজধানীর উপকণ্ঠে অবস্থান হওয়ায় এ জেলার ভৌগোলিক চৌহদ্দি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, এ জেলার সুদূর অতীত থেকে অধুনা অবধি সংগ্রামী ইতিহাসও তেমনই সমৃদ্ধ। অরণ্যানীর প্রকৃতি ও সম্পদ যেমন জাতির অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে, তেমনই নানাবিধ উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। একইভাবে সামরিক ছাউনি ও অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি থাকায় জেলার সামরিক গুরুত্ব উল্লেখ করার মতো। ধর্মীয় দিকেও বিশেষত মুসলিম জগতে এ জেলার রয়েছে বিশ্ব পরিমাপের পরিচিতি।
দেশের একটি বিরাট অংশ থেকে রাজধানী ঢাকায় যেতে-আসতে সিংহদুয়ারের মর্যাদায় সমাসীন এই সাবেক জয়দেবপুর আজকের গাজীপুর জেলা। বিস্ময় জাগে বীর গৌরব এ জেলার পাদদেশে এসে যেন পুঞ্জীভূত হয়েছে, যা আসলে এখানকার অকুতোভয় সাধারণ মানুষেরই অর্জন। লক্ষণীয় বিষয়, এই গাজীপুরেই ১৯৭১ সালের ৩ মার্চে সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রথম প্রাণ যায় বাঙালিরই, এই গাজীপুরেই ১৯ মার্চ পাকসেনাদের সঙ্গে আমজনতার সশস্ত্র যুদ্ধ হয়। আবার এই গাজীপুরেই পাকসেনা-রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে মুক্তিসেনাদের ঘোরতর এবং শেষ যুদ্ধ (ছয়দানার যুদ্ধ) হয় ১৫-১৬ ডিসেম্বরে। এ পুরো ঘটনাপ্রবাহের ওপর ১৯ মার্চ: গাজীপুরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক। যে লেখাটি ২০০৩ সালের বিজয় দিবসে ‘দৈনিক মুক্ত সংবাদ’-এ প্রকাশিত হয়। জনাব মল্লিকের নিজের লেখাটি নানা কারণে বর্তমান এবং আগামীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ আকরের উৎস বলে মনে করার যথেষ্ট সমাজ বাস্তবতা রয়েছে। সেই বিবেচনায় তার ওই লেখাটি এখানে সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন এবং সময়োচিত বলে মনে করি।
১৯৭১ সালের মার্চে জয়দেবপুরে সংঘটিত ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা, অসাধারণ তাত্পর্যে মহিমান্বিত একটি অধ্যায়। আরো স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯ মার্চ নতুন মাত্রা সংযোজনের অনন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী একটি দিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলেও এর আগেই ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের মাটিতে সূচিত হয়েছিল দখলদার বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির পক্ষ থেকে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। এ দিনেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল মুক্তিকামী বাঙালির তরফ থেকে স্বাধীনতার সপক্ষের প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র। সেদিন জয়দেবপুরবাসীর এ অতুলনীয় বীরত্বব্যঞ্জক ও সাহসী ভূমিকা সারা বাংলাদেশে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল এবং সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাক সামরিক জান্তা প্রধান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার কথা শোনার পর পরই জনগণ বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে— শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন।
এর ঢেউ লাগে জয়দেবপুরেও। স্বাধীনতা লাভের দুর্বার শপথে জয়দেবপুরের লোকজনও হয়ে ওঠে উজ্জীবিত। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে চলতে থাকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। এলাকায় অবস্থিত বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ও সমরাস্ত্র কারখানা এবং ডিজেল প্লান্টের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীর জোরালো অংশগ্রহণে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। গাজীপুর ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত বলে এলাকার নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মরহুম মো. শামসুল হক (পরে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত) ও মরহুম মো. হাবিব উল্লাহ (পরে এমপি) ও আ ক ম মোজাম্মেল হক সে সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতেন। ১ মার্চের পর পরই মরহুম মো. হাবিব উল্লাহর আহ্বানে তত্কালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা ডা. আহমেদ বজলুর রহমানের বাসায় জয়দেপুর সর্বদলীয় রাজনীতিবিদদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয়ভাবে একটি সংগ্রাম কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এ কমিটিতে দুটি শাখা থাকবে— একটি হাইকমান্ড, অন্যটি অ্যাকশন কমিটি বা আহ্বায়ক কমিটি। হাইকমান্ডে ছিলেন মরহুম মো. হাবিব উল্লাহ (আওয়ামী লীগ নেতা), প্রয়াত ডা. মণীন্দ্রনাথ গোস্বামী (ন্যাপ নেতা) ও মরহুম এমএ মোত্তালিব (শ্রমিক নেতা)। অ্যাকশন বা আহ্বায়ক কমিটি ছিল নিম্নবর্ণিত সদস্য সমন্বয়ে আ ক ম মোজাম্মেল হক, আহ্বায়ক; নজরুল ইসলাম খান, কোষাধ্যক্ষ; মো. নূরুল ইসলাম, সদস্য; মো. আয়েশ উদ্দিন, সদস্য; মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু, সদস্য; মো. আব্দুস সাত্তার মিয়া, সদস্য; মো. হারুন অর রশিদ ভূইয়া, সদস্য; শহীদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ, সদস্য; শেখ আবুল হোসাইন, সদস্য। এছাড়া যেসব নেতাকর্মী সে সময় আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তারা হচ্ছেন— মরহুম ডা. ছাঈদ বক্স ভূঁইয়া, আবদুল বারী মিয়া, গিয়াস চৌধুরী, আব্দুল বারী, নূরুল আনোয়ার, জামাল হায়দার, মো. হযরত আলী, হাবিবুর রহমান, মো. শহীদুল্লাহ, খুরশিদ হোসেন নয়ন, সরকার নয়ন, ইয়াকুব আলী সরকার, কাজী আলিমউদ্দিন, রফিকুর রহমান প্রমুখ। এ সময়কার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো পাকিস্তানের জাতীয় পতাকায় অগ্নিসংযোগ। জয়দেবপুরে হরতাল পালিত হয়। হরতালের শেষ পর্যায়ে জকী স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বটতলায় মরহুম ডা. ছাঈদ বক্স ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তৃতা করেন মো. হাবিব উল্লাহ, আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রয়াত ডা. মণীন্দ্র নাথ গোস্বামী, ছাত্রনেতা মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু ও মো. হারুন অর রশিদ ভূঁইয়া। সভা শেষে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। পতাকায় অগ্নিসংযোগ করেন মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু ও মো. হারুন অর রশিদ ভূঁইয়া। সে সময় এটি ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক একটি কাজ। কারণ মাঠের অন্য পাশে রাজবাড়ীতে ছিল সেনা ছাউনি। ৭ মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য সেদিন জয়দেবপুর থেকে ১৫-২০টি গাড়িসহ শতাধিক গাড়ি বোঝাই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জয়দেবপুরে চলতে থাকে তীব্র আন্দোলন। এলাকায় এরই মধ্যে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন-সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এলাকায় আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। প্রতিদিনই চলতে থাকে জঙ্গি মিছিল, সভা-সমাবেশ। সারা দেশের মতো জয়দেবপুরও হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ উন্মাতাল।
এ সময়কার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে জয়দেবপুর ভাওয়াল রাজবাড়ীতে অবস্থানরত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাঙালি অফিসার-সৈনিকদের তত্পরতা। এরই ফলে সূচিত হয়েছিল ১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ীতে (বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) সে সময় অবস্থানরত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২৫ জন পশ্চিম পাকিস্তানি বাদে সবাই ছিলেন বাঙালি অফিসার-সৈনিক এবং এরা প্রায় প্রত্যেকেই মনে মনে ছিলেন বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থক। এলাকায় বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে এ রেজিমেন্টের কিছুসংখ্যক অফিসার-সৈনিকের যোগাযোগ ছিল। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪তম পদাতিক ডিভিশনের ঢাকাস্থ ৫৭ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে ছিল দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এ রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল মাসুদুল হাসান খান এবং সহঅধিনায়ক ছিলেন মেজর কেএম সফিউল্লাহ (পরে মুক্তিযুদ্ধকালীন এস. ফোর্স অধিনায়ক, স্বাধীনতা-পরবর্তী সেনাবাহিনী প্রধান, বর্তমানে আওয়ামী লীগদলীয় এমপি)। এছাড়া ছিলেন বেশ কয়েকজন বাঙালি অফিসার যেমন— মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর নূরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এএএম নাসিম, ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান, ক্যাপেটন এজাজ আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক।
একাত্তরের মধ্য মার্চে সারা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু আহূত অসহযোগ আন্দোলন যখন উত্তাল, তখন পাক প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রহসনমূলক আলোচনার ধুয়া তুলে, সঙ্গে কুচক্রী ভুট্টো। একদিকে চলতে লাগল প্রহসনের আলোচনা, অন্যদিকে পাক সামরিক জান্তা প্রস্তুতি নিচ্ছে জঘন্য হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাঙালিদের চিরতরে দমিয়ে দেয়ার। ষড়যন্ত্রের এ নীলনকশা অনুযায়ী পাক সামরিক জান্তা তখন বাঙালি সৈনিকদের আলাদা আলাদা করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে। যাতে তারা সংঘবদ্ধ হতে না পারে, আর সহজেই তাদের ওপর আঘাত হানা যায়। এ ব্যাপারটি বিভিন্ন সেনাছাউনিতে অবস্থানরত কিছু বাঙালি অফিসার সৈনিক আঁচ করতে পারেন। জয়দেবপুরে অবস্থনরত দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে অনেক বাঙালি অফিসার-সৈনিকও এ ব্যাপারটি আঁচ করতে সক্ষম হন। সে সময় বাঙালি অফিসার-সৈনিকদের মনে আরেকটি আশঙ্কা দানা বেঁধে ওঠে যে, বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পাশাপাশি তাদের কৌশলে নিরস্ত্রও করে ফেলতে পারে পাক সামরিক জান্তা। এ ধরনের গুজব জয়দেবপুরেও ছড়িয়ে পড়ে মার্চের মাঝামাঝি। এ গুজবের পেছনে অবশ্য একটা কারণও ছিল। কারণটি হচ্ছে মাত্র কিছুদিন আগে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যবহূত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ৩০৩ ক্যালিবার রাইফেল বদলে নতুন ৭.৬২ চাইনিজ রাইফেল দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ৩০৩ ক্যালিবার রাইফেলগুলো ব্রিগেড সদর দপ্তরে জমা দেয়া হয়নি। হঠাৎ করে ১৫ মার্চ ঢাকার ব্রিগেড থেকে নির্দেশ এল রাইফেলগুলো ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে জমা দেয়ার। এতে জনগণের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, জয়দেবপুরে অবস্থানরত বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হচ্ছে। ফলে ১৫ মার্চের পর ঢাকা-জয়দেবপুর সড়কে জনগণ বেশকিছু ব্যারিকেড স্থাপন করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাসুদ ঢাকার ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে জানান যে, এ সময় অস্ত্র নিয়ে ঢাকা যাওয়া বিপজ্জনক হবে। কিন্তু ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার এ জবাবে সন্তুষ্ট হলেন না। কড়া নির্দেশ এল যেভাবেই হোক অস্ত্র ঢাকায় নিয়ে জমা দিতে হবে। ১৯ মার্চ সকালে ঢাকার ৫৭ ব্রিগেড কমান্ডার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবার বার্তা মারফত লে. কর্নেল মাসুদকে জানালেন যে, তিনি সেদিনই দুপুরে জয়দেবপুর অবস্থিত দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিদর্শনে আসবেন এবং দুপুরে খাবার খাবেন। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের এ সিদ্ধান্ত রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসার সৈনিকদের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হতে পারে এমন আশঙ্কার কথা দানা বেঁধে ওঠে। এ আশঙ্কার কথা আশপাশে লোকজনদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
১৯ মার্চ দুপুরের দিকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব রাস্তায় সৃষ্ট ব্যারিকেডগুলো অপসারণ করে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান জয়দেবপুর রাজবাড়ীতে উপস্থিত হন। সঙ্গে নিয়ে আসেন লাইট মেশিনগান সজ্জিত ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৭০ জনের একটি বৃহৎ দল। বলা যায়, অনেকটা রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে তিনি জয়দেবপুর উপস্থিত হন। তার রাজবাড়ীতে আসার পর পরই আশপাশে সর্বত্র দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, পাঞ্জাবি সৈন্যরা দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে এসেছে। এছাড়া সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়। ফলে হাজার হাজার উত্তেজিত জনতা জড়ো হতে লাগল জয়দেবপুরে। সেদিন ছিল শুক্রবার জয়দেবপুরে হাটের দিন। এছাড়া মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট, সমরাস্ত্র কারখানা থেকেও হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এসে উপস্থিত হন জয়দেবপুরে। শুরু হয় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি। উত্তেজিত জনতা মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরিত করে তোলে দশ দিক। জনগণ বেপরোয়া ও হয়ে ওঠে। তারা কিছুতেই বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করে অস্ত্র ঢাকা নিয়ে যেতে দেবে না। জনতার অনেকের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, তীর-ধনুক, বল্লম, এমনকি কারো কারো হাতে বন্দুক।
বন্দুকধারীদের মধ্যে ছিলেন কাজী আজিম উদ্দিন আহমেদ, সালাম সেকান্দার প্রমুখ। এরই মধ্যে জনগণ জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ে একটি মালগাড়ির ওয়াগন এনে রাস্তায় অবরোধ করে দিয়েছে। স্থানে স্থানে স্লিপারও খুলে ফেলেছে। নিরস্ত্র করা হতে পারে এ আশঙ্কায় দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার-সৈনিকরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এটি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের দৃষ্টি এড়ায়নি। খাবার টেবিলে থাকা অবস্থায় তিনি খবর পান, স্থানীয় জনতা রাস্তায় গড়ে তুলেছে দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড। এছাড়া মুহুর্মুহু স্লোগানও শুনছিলেন তিনি। এতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি লে. কর্নেল মাসুদকে নির্দেশ দেন অবিলম্বে ব্যারিকেড অপসারণ করতে। লে. কর্নেল মাসুদ তখন ব্যারিকেড অপসারণ করতে মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরীকে পাঠান।
কিন্তু এরই মধ্যে সেখানে জমাত বিপুলসংখ্যক জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে— তারা কোনো আবেদন-নিবেদনেও ব্যারিকেড অপসারণ করতে রাজি নয়। বরং স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে তোলে চারদিক। মেজর মইনের বাঙালি সৈনিকদের পেছনে পেছনে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব, তার বাহিনী ও লে. কর্নেল মাসুদসহ হাজির হলেন। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে মো. হাবিব উল্লাহ, আ ক ম মোজাম্মেল হক ও এমএ মোত্তালিবকে মেজর মইন ব্যারিকেড অপসারণের অনুরোধ করলে তারা জানান, এত বিপুল জনগণকে রাজি করানো সম্ভব নয়। এতে ক্রুদ্ধ জাহানজেব গুলিবর্ষণ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু লে. কর্নেল মাসুদ ও মেজর মইন এরা প্রত্যেকে বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে তারা ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের ফায়ার ফর এফেক্ট নির্দেশ না মেনে প্রথমে ফাঁকা গুলিবর্ষণের আদেশ দেন। একই সময়ে প্রতিরোধকারী জনতার মধ্য থেকেও গুলিবর্ষণ করা হয়। বিশেষত জয়দেবপুর বাজারের মসজিদের ছাদ এবং আশপাশের অলিগলি থেকে বেশকিছু গুলি পাঞ্জাবি সৈন্যদের লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। এতে কয়েকজন সৈন্য আহত হন। (তথ্য: উত্তাল মার্চে ভাওয়ালের রাজবাড়ী, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.), দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০০০) ঠিক এ সময়ই দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে কোম্পানিটি টাঙ্গাইল ছিল তাদের জন্য রেশন নিতে একটি তিন টন বেডফোর্ড ট্রাক জয়দেবপুর রাজবাড়ীতে আসছিল। এতে ড্রাইভার ছাড়া হাবিলদার সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচজন বাঙালি সৈনিক ছিলেন। তাদের কাছে ছিল চারটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি এসএমজি। ট্রাকটি জয়দেবপুর বাজারের মসজিদের কাছে পৌঁছলে উত্তেজিত জনতা তাদের ঘিরে ফেলে এবং পাঞ্জাবি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ে অংশ নিতে আহ্বান জানায়। উত্তেজিত জনতা আটকিয়ে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া অস্ত্র দিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কাজী আজিম উদ্দিন আহমদসহ আরো যারা সেদিন বন্দুক, শটগান নিয়ে উপস্থিত ছিলেন তা থেকেও গুলিবর্ষণ করা হয়। ফলে শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়। সেই সময় উত্তালমুখর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির পক্ষ থেকে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার এ ঘটনাটি ছিল প্রথম। সেদিন উভয় পক্ষের গুলিবিনিময় সত্ত্বেও হতাহতের সংখ্যা ছিল কম। যদি লে. কর্নেল মাসুদ ও মেজর মইন বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল না থাকতেন এবং ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নির্দেশানুযায়ী সরাসরি গুলিবর্ষণ করতেন, তবে সেদিন কত লোক হতাহত হতো বলা শক্ত। আর বাঙালি সৈন্যরা সামনের কাতারে থেকে যদি প্রতিরোধকারী জনতার মোকাবেলা না করতেন, তবে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের সঙ্গে আগত পাঞ্জাবি সৈন্যরাই মোকাবেলা করত প্রতিরোধকারী জনতার, এর ফলে রক্তলোলুপ পাঞ্জাবি বাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে সেদিন কত বাঙালি যে নিহত হতো তা বোধ হয় ধারণা করা যেত না। যা-ই হোক, সেদিন গুলিবর্ষণে জয়দেবপুর বাজারে নিহত হন নিয়ামত নামে এক কিশোর এবং মুন মিয়া নামে একজন খলিফা। গুলিতে আহত হন ডা. ইউসুফ, সন্তোষ, শাহজাহানসহ আরো অনেকে। শেষ পর্যন্ত মেজর মইন গুলি ছুড়তে বাধ্য হন। জনতার দেয়া প্রবল ব্যারিকেড অপসারণ করে জাহানজেব ও তার সঙ্গীরা জয়দেবপুর বাজারে প্রবেশ করে। এরপর জাহানজেব ঢাকার পথে চান্দনা-চৌরাস্তার দিকে অগ্রসর হন। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব নির্দেশ দিয়ে যান জয়দেবপুর ও আশপাশে কারফিউ জারি করার, বিশেষত অস্ত্র লুট করে নেয়ার ঘটনার কারণে।
জয়দেবপুর থেকে চান্দনা-চৌরাস্তা পর্যন্ত ২০-২৫টি ব্যারিকেড দেয়া হয়। এগুলো অপসারণ করে জাহানজেব বিকালের দিকে পৌঁছেন চান্দনা-চৌরাস্তায়, সেখানেও হাজার হাজার জনতা সমবেত হয়ে গড়ে তুলেছে প্রবল প্রতিরোধ। এখানে প্রতিরোধকারী জনতার নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাত্তার মিয়া, মো. হযরত আলী, এমএ বারী, আসকর আলী সরকার, আফসার উদ্দিন প্রমুখ। পাকবাহিনীর সঙ্গে এখানেও সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী ভোগড়া গ্রামের এক অসম সাহসী যুবক হুরমত আলী একজন পাঞ্জাবি সৈন্যকে জাপটে ধরে তার আগ্নেয়াস্ত্রটি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় অন্য একজন পাঞ্জাবি সৈন্যের গুলিতে তিনি শহীদ হন। এছাড়া গুলিতে আহত হন আরো বেশ ক’জন। তাদের মধ্যে কানু মিয়া নামে এক ব্যক্তি গুলিতে আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থেকে কিছুদিন পর মারা যান। এদিকে চান্দনা-চৌরাস্তা পাঞ্জাবি সৈন্যরা প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিরোধ ভেঙে টঙ্গীর দিকে রওনা হয়। পথিমধ্যেও ছিল অনেকগুলো ব্যারিকেড, যেগুলো ভেঙে তাদের টঙ্গীতে পৌঁছতে হয়েছিল। টঙ্গীতে জাহানজেবের বাহিনী প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এখানেও জনতা গড়ে তোলে ব্যারিকেড। বহু কষ্টে এসব ব্যারিকেড অপসারণ করে সেদিন ঢাকায় ফিরতে হয়েছিল পাকসেনাদের। জয়দেবপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা ঢাকায় পৌঁছে যায় তড়িৎ বেগে। বঙ্গবন্ধুও শোনেন জয়দেবপুরবাসীর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা। শুধু তাই নয়, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এ ঘটনা। পাকিস্তানি সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে আলোচনা চলছিল, তাতে জয়দেবপুরের এ ঘটনাটি ওঠে। তিনি পাকবাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে বাঙালিদের নিহত হওয়ার প্রতিবাদ জানান। সেদিন সভায় বিবিসি থেকেও যুদ্ধের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়। ১৯ মার্চের জয়দেবপুরের এ ঘটনা যেমন বাংলাদেশের মানুষকে শোকাচ্ছন্ন করেছিল, তেমনি তাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছিল অভূতপূর্ব উদ্দীপনা। তাদের মধ্যে সঞ্চার করেছিল সাহস ও শক্তি। আঘাত করলে পাল্টা আঘাত— এ প্রেরণাও শুরু হয়েছিল বাঙালিদের মধ্যে। স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিদের মধ্যে এ ধারণার সৃষ্টি করেছিল যে, পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবেই ছিনিয়ে আনতে হবে স্বাধীনতা। আর জয়দেবপুরবাসীরাই সে পথ দেখিয়েছে ১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে। এ কারণেই উজ্জীবিত হয়ে তখন সারা বাংলাদেশে স্লোগান উঠেছিল— ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।
এদিকে ১৯ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই জয়দেবপুর ও চান্দনা-চৌরাস্তায় কারফিউ জারি করা হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের পক্ষ থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। বঙ্গবন্ধু তার একজন দূত তখনকার এমএনএ মরহুম মো. সামসুল হককে জয়দেবপুর পাঠান। তিনি দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। তিনি ছাড়াও স্থানীয় অন্যান্য নেতৃত্ব যেমন তত্কালীন এমপিএ আবদুল হাকিম মাস্টার, মো. হাবিব উল্লাহ, শ্রমিক নেতা এমএ মোত্তালিব, আ ক ম মোজাম্মেল হক, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর ফলে ২১ মার্চ কারফিউ উঠিয়ে নেয়া হয়। এদিকে ১৯ মার্চ কারফিউ জারির সুযোগে হাতে অস্ত্র পেয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচজন সৈনিক অস্ত্রসহ পালিয়ে গিয়ে জনতার কাতারে যোগ দেন। আর এভাবেই ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধের এক বীরত্বপূর্ণ গৌরবগাথা।
[গতিধারা প্রকাশিত গাজীপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বই থেকে নেয়া]
লেখক: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক






