১৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজীপুরের (সেই সময়ের জয়দেবপুর) বীর জনতা গর্জে উঠেছিল এবং সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোয় বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। এ কথা শোনামাত্রই সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। দেশের সর্বত্রই স্লোগান ওঠে— ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা-বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি-বাঙালি’।

বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ আর সারা দেশে (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।

জয়দেবপুরে (আজকের গাজীপুর) ২ মার্চ রাতে তত্কালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় তত্কালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্লাহ এক সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে (আ ক ম মোজাম্মেল হক) আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলামকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন সর্বজনাব আয়েশ উদ্দিন, মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়ালরত্ন), মো. আ. ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মো. শহীদ উল্লাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. সাঈদ বকস ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন হাবিব উল্লাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এমএ মোত্তালিব এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নেতা বাবু মণীন্দ্রনাথ গোস্বামী (মরহুম)।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার আগেই আমরা এ কমিটি গঠন করি। পেছনের ইতিহাস এই যে, আমি ১৯৬৬ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা; যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেই সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। যার বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানিদের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দায়ের করা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলায়, যা বিখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। জয়দেবপুর (গাজীপুরে) সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ৩ মার্চ, ’৭১ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের বটতলায় এক সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্লোগান ওঠে— ‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মারো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। পতাকা ধরেছিলেন হারুন ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেছিলেন শহীদ উল্লাহ বাচ্চু। মাস্টার আ. ছাত্তার মিয়া পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে স্লোগান দিত।

আমরা ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী (তত্কালীন রেসকোর্স) উদ্যানে সে সময় জয়দেবপুর (গাজীপুর) থেকে হাজার হাজার বীর জনতা ট্রেনে এবং শতাধিক ট্রাক ও বাসে করে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে জনসভায় যোগ দিলাম। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজ ভাবতেও অবাক লাগে, কীভাবে এ জনস্রোত এসে মিশে গিয়েছিল ৭ মার্চের মহাসমুদ্রে। মার্চে উজ্জীবিত হয়ে আমরা গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা দিলে আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছি মাইকে। পাকিস্তানিদের বুঝতে পারার জন্য ইংরেজিতে বলি: I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr. Abdul Qader (বাঙালি) as the director of the Ordnance Factory. এ গর্জনে সত্যি কাজ হয়েছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বক্তৃতা চলাকালীনই পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকা চলে আসে। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার ১৫ এপ্রিলের পূর্বে আর গাজীপুরে যায়নি। পাকিস্তান সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। সম্ভবত ১৩ মার্চ তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি সাহেবজাদা ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ী মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করতে চেষ্টা করলে শত শত বীর জনতা হেলিকপ্টারের দিকে ইটপাটকেল ও জুতা ছুড়তে শুরু করলে হেলিকপ্টার না নামতে পেরে ফেরত চলে যায়।

সেদিন ১৭ মার্চ বুধবার, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে লাখ লাখ জনতার ঢল নেমেছিল ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। তত্কালীন আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএনএ শামসুল হক (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্লাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কিনা বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুদ কমে গেছে অজুহাতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নেয়ার সংবাদ জানাই। শামসুল হক সাহেবের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ব্যাঘ্রের ন্যায় গর্জে উঠে বললেন, ‘তুই একটা আহাম্মক, কী শিখেছিস যে, আমাকে বলে দিতে হবে’। একটু পায়চারি করে বললেন ‘বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেয়া যাবে না।’ &dquote;Resist at the cost of anything&dquote;. নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম। ১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরস্থ (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতি প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে, ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব চলে এসেছে। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থান মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিব উল্লাহ ও শহীদ উল্লাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদ উল্লাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দেয়া হলে ১ ঘণ্টার মধ্যেই মাঠে হাজারো শ্রমিক-জনতা চারদিক থেকে লাঠিসোটা, দা, কাতরা, ছেনি, দোনলা বন্দুকসহ উপস্থিত হয়। সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে যেভাবে পেরেছে, তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরো পাঁচটি ব্যারিকেড দেয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কেএম সফিউল্লাহ (পরবর্তীকালে সেনাপ্রধান)। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম, তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুর আসছিল। সে রেশনের গাড়ি জনতা আটকে দেয়। সে কনভয়ে থাকা পাঁচজন সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেয়া হয়।

এদিকে রেলগেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আদেশ দেয়। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান নিয়ে মেজর সফিউল্লাহকে জনতার ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়া হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের/জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে সামনে আসতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করি। 

পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা, আহত হন চতরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর জনতা। পাকবাহিনী কার্ফু জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ষ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে পেছন দিয়ে আক্রমণ করে।  সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেয় সে। কিন্তু পেছনে আর এক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করে, হুরমত সেখানেই শাহাদাতবরণ করেন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।

১৯ মার্চ কেন প্রতিরোধ

যুদ্ধ অনিবার্য— এ কথা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে বলেছেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। পাকিস্তানি বাহিনীকে তিনি শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠন করো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ এটিকে আমরা সবুজসংকেত হিসেবে নিয়েছিলাম। সারা জাতি মনে করেছিল, যুদ্ধ করেই আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অসম্ভবী। তাই পাকিস্তানীরা যদি বাঙালি সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে যায়, তবে আমরা দুর্বল হয়ে যাব। সে কারণে বাঙালি সৈন্যদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসতে না পারে, সেজন্য আমরা প্রতিরোধ করেছিলাম। তার সুফল আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পেয়েছি। এ ক্যান্টনমেন্ট থেকেই বহু অস্ত্র নিয়ে বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও কর্মচারী পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্রোহ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

প্রস্তুতি

১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের মধ্যে একটি নিউক্লিয়াস কমিটি গঠন করা হয়। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করব। ১৯৬৬ সালে আমি সেই কমিটির সদস্য হওয়ার সুযোগ লাভ করি। কাজেই আমরা জানতাম, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিল, তখনই আমরা উপলব্ধি করলাম, এ মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে। আর নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও অনেক রাজনৈতিক দল তাতে অংশ নেয়নি। লিগাল ফ্রেমওয়ার্কে লেখা ছিল ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের সংবিধান রচনা করতে ব্যর্থ হলে আপনাআপনি সংসদ ভেঙে যাবে। আরেকটি খারাপ শর্ত ছিল, কোনো সভা-সমিতিতে আঞ্চলিক বিষয় ও বৈষম্য নিয়ে কথা বলা যাবে না। আমাদের ওপর অত্যাচার ও অবিচার হয়েছে, সেসব কথা বলে ভোট চাওয়া যাবে না। তাদের ভাষায় উসকানিমূলক কথা বলে ভোট চাওয়া যাবে না। দেখুন কত বড় শর্ত, আমরা ন্যায়ের কথা বলতে পারব না। এসব শর্ত মেনে নির্বাচনে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দিয়ে দিলেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন। তার কারণ জানতে ছাত্রলীগের আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। ছাত্রলীগের প্রতিটি সদস্য নির্বাচনে অংশ নিতে আপত্তি জানিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের ডেকে বাসার ছাদে বসেন। আমরা ২৬ জন সদস্য তাতে অংশ নিই। আমরা কারফিউ ভঙ্গ করে জীবনবাজি রেখে আপনাকে মুক্ত করেছি, ইয়াহিয়া খানের কাছে দস্তখত দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য নয়। ২৬ জনের বক্তৃতা শোনার পর তিনি বললেন, আমি তোদের সেন্টিমেন্ট বুঝেছি। কোনো কথা না বলে প্রথম প্রশ্ন করলেন, আমি যে স্বাধীনতা চাই, এ কথা কি তোরা বিশ্বাস করছ কিনা। সমস্বরে আমরা বলেছি, আপনি যে শুধু স্বাধীনতা চান তা নয়, স্বাধীনতার কথা চিন্তা করার জন্য এ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। কাজেই আপনি স্বাধীনতা চান, তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আমরা আপনার কাজে অনুপ্রাণিত হই। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, Leaders leads he is not leads by others— নেতা নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের দ্বারা পরিচালিত হন না। তারপর তিনি আসল কথায় আসেন। ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটিকে গণভোট হিসেবে নেয়া হয়েছিল। আমরা ভারতবাসীকে বলেছিলাম, কংগ্রেস অখণ্ড ভারত চায়। আর মুসলিম লীগ তথা আমরা পাকিস্তান চেয়ে ভারতের বিভক্তি চেয়েছিলাম। যারা মুসলিম লীগের পক্ষে ভোট দিয়েছে, তারা ভারতের বিভক্তি চেয়েছে। এ লক্ষ্যে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আমি সারা দেশ সফর করে পাকিস্তানের সপক্ষে কথা বলেছি। জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রেখে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে। যেই দিন বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে তারা স্বীকৃতি দেয়নি, এমনকি অন্য কোনো গোষ্ঠীর ভাষাকে তারা স্বীকৃতি দেয়নি। সেই দিনই আমরা বুঝেছিলাম, পাকিস্তানের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তি আসবে না, অর্থনৈতিক মুক্তিও আসবে না। আর ২৪ বছরের শোষণ-নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে আমি ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করেছি। অবিচার মেনে তাদের সঙ্গে থাকা যাবে না। পাকিস্তানিরাও বাঙালিদের বিশ্বাস করে না। সেজন্য এ নির্বাচনে আমি যাচ্ছি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়। এ নির্বাচন আমাদের জন্য একটি গণভোট, বাঙালিরা দেশের স্বাধীনতা চায় কিনা। আমাদের বললেন, প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা যাবে না, কৌশলে বা পরোক্ষভাবে বলতে হবে। তোমাদের বক্তব্য থাকবে, আমরা ছয় দফার পক্ষে ম্যানডেন্ট চাই, যদি ছয় দফা না মানা হয়, তাহলে এক দফার আন্দোলন হবে। বঙ্গবন্ধুর এ নির্দেশ আমি উপস্থিত থেকে শুনেছি। মানসিকভাবে আমার প্রস্তুতি ছিল অনেক আগে থেকেই। আমার জানা ছিল, এ সুযোগটাই গ্রহণ করতে হবে। সারা দেশেই স্লোগান উঠেছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আমরা বুঝেছিলাম, জনগণের চিন্তা যে স্তরে চলে গেছে, সেটি আমাদের ধরে রাখতে হবে। এটাই মোক্ষম সময় সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে পরাজিত করার।

স্বাধীনতার ঘোষণা বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবেই দিয়েছিলেন। তার আগে তিনি স্বাধীনতার জন্য জাতিকে তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ে। আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিল, স্টেট ভার্সেস শেখ মুজিব অ্যান্ড আদারস। যাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে আমরা জানি। দেশে-বিদেশেও একই নামে পরিচিতি পায় এটি। সেই মামলায় আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ করেছেন। একটি হলো, বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের মাধ্যমে সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার জন্য প্রস্তুত করছে। দুই. শেখ মুজিব পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করে বিদ্রোহ করে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য উসকানি দিচ্ছেন। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ২৬ জন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ছিল। তিন. শেখ মুজিব এ দেশের প্রশাসন যন্ত্রকে অচল করে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বাঙালি সরকারি কর্মচারীদেরও ঐক্যবদ্ধ করছেন। এ মামলায় তিনজন সিএসপিকে অভিযুক্ত করা হয়। এরা হলেন— আহমেদ ফজলুর রহমান, কেএম শামসুর রহমান ও রুহুল কুদ্দুস। তাদের মাধ্যমে বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেখ মুজিব। আইয়ুব খানই বলে গেছেন। কীভাবে কোথায় মিটিং করেছেন, কী বলেছেন, সেসব রেকর্ড অভিযোগ হিসেবে সাক্ষী হিসেবে প্রমাণিত ছিল। কাজেই বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার জন্য দেশকে প্রস্তুত করেছেন এবং নিজে প্রস্তুতি নিয়েছেন— আইয়ুব খানই তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। নতুন প্রমাণ দেয়ার কোনো প্রয়োজন আর নেই। ১৯৫৪ সালে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন এবং ১৯৫৬-৫৭ সালে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন। তাতে তিনি বারবার পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন— যদি এ বৈষম্য-শোষণ অব্যাহত থাকে, তবে বাঙালিরা তাদের মতো করে ভাবতে বাধ্য থাকবে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলেননি, কিন্তু তিনি স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করছিলেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য তিনি আন্দোলন করেছেন। এ লক্ষ্যেই ছয় দফা প্রণীত হয়।

১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো-সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করো।

১৯ মার্চের সশস্ত্র যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯ মার্চ জাতীয় জীবনে এক স্মরণীয় দিন। তাই জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালিত হলে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যায়ন যথার্থভাবে হবে।

 

লেখক: জয়দেবপুর সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী