উক্ত আইনে ঢাকাসহ সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ (জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায়) ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিডিএ কর্মকর্তারা মামলা দিচ্ছেন, বিজ্ঞ আদালত অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী জরিমানা করে তা আদায় করছেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শনকালে আমাদের কর্মকর্তারা ফার্মেসিগুলোতে সংশ্লিষ্ট ধারা অবহিত করে এ বিষয়ে আন্তরিক ও সতর্ক থাকার পরামর্শ প্রদান করছেন। দোকানে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত রেজিস্টার মেইনটেইন করার তাগিদ দিচ্ছেন। সারাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধ যাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় করা না হয় এবং সঠিক নিয়মে পুরোপুরি ডোজ কমপ্লিট, কোথাও কোনোভাবে যাতে কোনো অবহেলা করা না হয়, তার জন্য ডিজিডিএ কর্মকর্তারা নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ/অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন। প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। এভাবে আইন প্রয়োগের কাজ চলমান রয়েছে।

শুধু মামলা-জরিমানা করে আইন মানানো সম্ভব নয়, এটা বাস্তব। আমাদের দেশে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের স্বল্পতা, রোগীদের আর্থিক সামর্থ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শ/ব্যবস্থাপত্র গ্রহণের মানসিকতার অভাব, ফার্মেসিগুলোয় গ্র্যাজুয়েড ফার্মাসিস্ট না থাকা, ওষুধ বিক্রিতে বাড়তি চাপ মনে করা ইত্যাদি খুব কমন কিছু সমস্যা রয়েছে। এছাড়া ক্রেতাদের সচেতনতার অভাবে বিষয়টি বাস্তবায়ন বেশ কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির ছোবল থেকে বাঁচার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। এক্ষেত্রে সবাইকে একত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সবাই যার যার জায়গা থেকে চেষ্টা ও সঠিক দায়িত্ব পালন করলে আশা করি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব।

সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালসে (যেমন লেবেল, কার্টন, ব্লিস্টার ফয়েল ইত্যাদি) রেড মার্কিং বাধ্যতামূলক করা এবং ডিজিডিএ থেকে বিষয়টি মনিটরিং করায় প্রায় শতভাগ অনুসৃত হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে ও করছে। তবে এ রেড-মার্ক দেখে অ্যান্টিবায়োটিক চেনা ও ক্রয়/বিক্রয়/ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসরণের বিষয়ে আরো প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে।

রেড-মার্কিং সিদ্ধান্তের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক সহজে চেনা যাচ্ছে। মানুষ সচেতনভাবে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারে মানুষ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এতে বাড়তি নজরদারি থাকায় অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহার কমছে। ফলে বিতরণ ও ব্যবহারে সতর্কতা-সচেতনতা বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।

ঔষধ ও কসমেটিস অ্যাক্ট ২০২৩-এ সাবস্ট্যান্ডার্ড (নিম্নমান), ভেজাল, নকল ওষুধ উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিক্রয় ও বাজারজাতে সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অবশ্য পূর্বের আইনেও (দ্য ড্রাগস কন্ট্রোল অধ্যাদেশ ১৯৮২) এ বিষয়গুলোয় শাস্তির বিধান ছিল। তবে বর্তমান আইনে এ ধরনের অপরাধগুলোকে অতিগুরুত্বপূর্ণ মনে করায় শাস্তির (জেল/জরিমানা/উভয়ই) পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। ডিজিডিএ নিয়মিত এ বিষয়ে মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কেট সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড কন্ট্রোল বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত বাজারজাতকৃত ওষুধের ওপর নজরদারি করছে। এগুলো আমাদের রুটিন দায়িত্বের অংশ। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কোথাও কোনো ওষুধ সন্দেহ মনে করলে নিয়ম অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করে স্থানীয় মিনিল্যাব ও সরকারি ওষুধ পরীক্ষাগারে প্রেরণ করেন পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের জন্য। পরীক্ষার ফলাফলে ওই ওষুধ নিম্নমান পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যেমন প্রথমেই জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নিম্নমান ঘোষিত ওষুধটির উৎপাদনকারী কোম্পানিকে একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচারের মাধ্যমে মার্কেট থেকে সব নিম্নমান/ভেজাল ওষুধ প্রত্যাহার (রিকল) করার নির্দেশ প্রদান করা হয়; একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না এ বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিস করা হয়। অতঃপর প্রতিষ্ঠানের জবাবের ওপর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ওষুধটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িক স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা করা হয়। অধিকতর গুরুতর অপরাধ ও প্রতিষ্ঠানের প্র্যাকটিসের ত্রুটির প্রমাণ থাকলে উৎপাদন লাইসেন্স বাতিল/সাময়িক স্থগিদের মতো সিদ্ধান্তও নেয়া হয়।

২০২৫ সালে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক সারা দেশে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে আলোচনা করা হল।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মানব ও প্রাণীদেহে ব্যবহার্য সব ধরনের গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ ও ভ্যাকসিন দেশে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, আমদানি, রফতানি ইত্যাদি ব্যবস্থা মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। আমরা human medicine-এর পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রাণী চিকিৎসায় ব্যবহার্য সব অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ মনিটরিং করি। যেহেতু এএমআর বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও একটি ভয়াবহ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, সুতরাং এটি বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর/বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। প্রাণী ও মৎস্য চিকিৎসায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে, তাই এএমআরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচে কাজ করছে, যাতে দেশের সব মানুষ এ কার্যক্রমে সুফল পেতে পারে।