অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, কারণ এটি অসংখ্য সংক্রামক রোগের চিকিৎসাকে সম্ভব করেছে।
কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না বলে সমস্যা তৈরি হয়। যেমন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, প্রয়োজন না থাকলেও ওষুধ খাওয়া, ভুল মাত্রায় ব্যবহার অথবা ওষুধের পুরো কোর্স শেষ না করা। ফলে জীবাণুগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস না হয়ে ধীরে ধীরে ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর। অর্থাৎ, জীবাণু এমনভাবে পরিবর্তন হয় আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করত, সেটি আর কার্যকর থাকে না। ফলে সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে এবং রোগীর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এএমআর শুধু একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা একটি বৈশ্বিক সংকট, যার প্রভাব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর পড়ে।
বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)-এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তার অন্যতম কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার পদ্ধতি। বাংলাদেশে অনেক মানুষ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে। ফার্মেসি থেকে সহজেই এসব ওষুধ কেনা যায় এবং অনেক সময় উপসর্গ কমে গেলে পুরো কোর্স শেষ করা হয় না। ফলে জীবাণু পুরোপুরি না মরে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে সে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না।
দ্বিতীয় বড় কারণ বাংলাদেশে পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। মানুষের ও প্রাণীর মলমূত্র, হাসপাতালের বর্জ্য এবং বিভিন্ন উৎসের দূষণ যখন খোলা পরিবেশে বা পানির উৎসে মিশে যায়, তখন সেখানে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো ধীরে ধীরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠে। এভাবে পরিবেশে তৈরি হওয়া রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি সে ব্যক্তি কখনো যদি এ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে, তার পরও এমনটি হতে পারে। এভাবে এএমআর একটি ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হয়।
এএমআর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ওয়ান হেলথ ধারণার সঙ্গে যুক্ত। কারণ এখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—এ তিনটি একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। মানুষের অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ এবং পরিবেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এ তিনটি মিলেই এএমআর সমস্যাকে জটিল করে তোলে।

সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী রহিমা খাতুন জানান যে বর্তমানে নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দ্রুত সুস্থতায় অবদান রাখছে ছবি: ওয়াটারএইড
তাই এএমআর মোকাবেলায় শুধু স্বাস্থ্য খাতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ, জলবায়ু এবং উন্নয়ন—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
এএমআর নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারের এএমআর-সংক্রান্ত বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে সমর্থন ও শক্তিশালী করা। আমরা চাই সরকার যখন কোনো কর্মসূচি বা প্রকল্প গ্রহণ করবে, আমরা যেন সে উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারি।
এএমআর একটি বহু খাতভিত্তিক সমস্যা। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পানি, পরিবেশ, কৃষি ও স্থানীয় সরকার খাতকে যুক্ত করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা টেকনিক্যাল সহায়তা, গবেষণা সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
আমাদের উদ্দেশ্য নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে এএমআর বিষয়টিকে ইনক্লুসিভভাবে যুক্ত করা।
এএমআর বিষয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। আমরা মূলত আচরণগত ও সচেতনতার পরিবর্তন দেখতে চাই। মানুষ যেন বোঝে অ্যান্টিবায়োটিক কখন প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন নয়। একই সঙ্গে তারা যেন বুঝতে পারে যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ কীভাবে এএমআরের সঙ্গে যুক্ত। যদিও আমরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করি না। তবে আমাদের অংশীদার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সরকারের মাধ্যমে এ সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
আমরা চাই মানুষ তার আশপাশের পরিবেশ রক্ষা করুক, নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবহার করুক এবং বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করুক। এ ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে এএমআর প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।










