বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এবং স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে এসব জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে সেই দূষিত পানি ব্যবহারকারী মানুষ ও জলজ প্রাণী ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে সার্জিক্যাল রোগীদের ক্ষেত্রেও যেখানে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে সংক্রমণ আর সাড়া দিচ্ছে না, ফলে চিকিৎসা হয়ে উঠছে আরো জটিল ও ব্যয়বহুল। সাম্প্রতিক গবেষণা ও পরিবেশগত নজরদারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
২০২৩ সালে প্রকাশিত রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এএমআর সার্ভিল্যান্স ডাটা অনুযায়ী, দেশের হাসপাতালগুলোয় সার্জিক্যাল সাইট ইনফেকশনের (এসএসআই) ৪০-৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে শনাক্ত হওয়া ব্যাকটেরিয়া—যেমন: ক্লেবসিয়েলা, ই. কোলাই ও অ্যাসিনেটোব্যাক্টর—ঢাকার নদী, খাল ও ড্রেনের পানিতে পাওয়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল-রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর সঙ্গে জেনেটিক্যালি মিল রয়েছে। এ তথ্য ইঙ্গিত দেয়, হাসপাতালের সংক্রমণের একটি বড় অংশ পরিবেশ থেকে আগত রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু দ্বারা ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, অপরিশোধিত হাসপাতাল ও শিল্পবর্জ্য এবং নগরের নর্দমা ব্যবস্থা এএমআর বিস্তারের প্রধান পরিবেশগত চালক হিসেবে কাজ করছে। ওয়াসা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের যৌথ পানি মান পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার নদীগুলোর পানির প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায় ইএসবিএল ও Carbapenem-resistant ই. কোলাই শনাক্ত হয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘লাস্ট লাইন’ অ্যান্টিবায়োটিককেও অকার্যকর করে তুলছে।
পরিবেশের সঙ্গে খামার ব্যবস্থাপনাও এএমআর বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ১০টি জেলার পোলট্রি খামারের ৮০ শতাংশ নমুনায় এমন ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যেগুলো মানুষের হাসপাতালে পাওয়া রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর মতো একই জিন (ESBL, mcr-1) বহন করে। এসব জীবাণু খামারের বর্জ্যের মাধ্যমে খাল ও নদীতে গিয়ে আবার মানুষের খাদ্য ও পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ শতাংশ খামারে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক যেমন: সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও কোলিস্টিন প্রাণী চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই পশুপাখিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মানুষ-প্রাণী-পরিবেশ এ তিন খাতের মধ্যে এক ধরনের ‘এএমআর চক্র’ তৈরি হয়েছে।
ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার সূর্যকান্দি গ্রামে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি মুরগির খামার রয়েছে। খামারের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পশুপাখি পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে। এসব খামারের বর্জ্য অপসারণেরও নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তা আশপাশের পুকুরেও ফেলে দেয়া হয়, যে পুকুর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। আশপাশের মানুষ একই পুকুরের পানি দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে। খামারগুলোয় পশুর রোগ প্রতিরোধ বা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, তাদের খামারের খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো, মাছের রোগ প্রতিরোধ ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুরগির গ্রোথ বা দ্রুত ওজন বাড়ানোর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হতো। সাধারণত টেট্রাসাইক্লিন গ্রুপের ওষুধ যেমন অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, ম্যাক্রোলাইড গ্রুপের টাইলোসিন, ব্যাসিট্রাসিন বা কিছু সালফা ড্রাগ খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হতো।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ওষুধ সরাসরি গ্রোথ বাড়ায় না, বরং মুরগির অন্ত্রে থাকা ক্ষতিকর ও কিছু উপকারি ব্যাকটেরিয়া একসঙ্গে দমন করে। এতে খাবার দ্রুত শোষিত হয় এবং মুরগি তুলনামূলক দ্রুত ওজন বাড়ায়। এ কারণে এগুলোকে একসময় ‘ গ্রোথ প্রোমোটার’ হিসেবে খামারিরা ব্যবহার করেন। এ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ক্ষতিকর হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। দীর্ঘদিন অল্প মাত্রায় ওষুধ ব্যবহার করলে মুরগির শরীরের জীবাণু ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে যায় এবং সে জীবাণু বা তার জিন মানুষের শরীরে পৌঁছলে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। ফলে মানুষের সাধারণ সংক্রমণও ভবিষ্যতে ভয়ংকর ও চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটাকে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
গরু পালন, অসুস্থতা চিকিৎসা বা মোটাতাজা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, তবে এগুলোর উদ্দেশ্য এক নয়। গরু অসুস্থ হলে বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মাস্টাইটিস, ইউটেরাইন ইনফেকশন বা ক্ষত সংক্রমণের ক্ষেত্রে পশুচিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেন। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে পেনিসিলিন গ্রুপ, টেট্রাসাইক্লিন গ্রুপ (যেমন অক্সিটেট্রাসাইক্লিন), সেফালোস্পোরিন গ্রুপ, ম্যাক্রোলাইড গ্রুপ বা কখনো ফ্লুরোকুইনোলোন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মূল কাজ শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে গরুকে সুস্থ করে তোলা।
গরুর খামারে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়, যেমন গোবর, মূত্র, ধোঁয়া–পরিচ্ছন্নতার নোংরা পানি, অবশিষ্ট খাবার, কখনো ওষুধ বা রাসায়নিকের অংশ। অনেক খামারে এসব বর্জ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা ছাড়া খামারের পাশেই খোলা জায়গায় ফেলা হয়, কেউ আবার পাশের খাল-বিল, পুকুর বা নিচু জমিতে ছেড়ে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে গোবর রাস্তার ধারে বা মাঠে স্তূপ করে রাখা হয়, যাতে বৃষ্টি হলে তা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ছোট ও মাঝারি খামারগুলোয় সাধারণত এ ধরনের অব্যবস্থাপনার চিত্র বেশি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি খামারে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ওষুধের অবশিষ্টাংশ বর্জ্যের সঙ্গে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা মাটি ও পানিতে থাকা জীবাণুর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে মানুষ ও পশুর রোগ চিকিৎসা আরো কঠিন হয়ে ওঠে। এসব কারণে গরু খামারের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা শুধু খামারের আশপাশ নয়, পুরো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে বাংলাদেশে অধিকাংশ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা বর্জ্য পোড়ানো হয় খোলা জায়গায় (open burning) বা খুবই নিম্নমানের ইনসিনারেটরের মাধ্যমে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল, ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় আধুনিক ইনসিনারেটর না থাকায় শার্পস ও সংক্রামক বর্জ্য হাসপাতালের পেছনে, ফাঁকা জমিতে বা ডাস্টবিনে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার বর্জ্য একত্র করে সিটি করপোরেশন বা তৃতীয় পক্ষের হাতে দেয়া হয়, কিন্তু সেখানেও চূড়ান্তভাবে তা নিরাপদে পোড়ানো বা প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। ঢাকার কিছু বড় হাসপাতালে ও সীমিত কয়েকটি কেন্দ্রে উন্নত ইনসিনারেটর থাকলেও সেগুলোর সংখ্যাও কম এবং সব জায়গার বর্জ্য সামাল দেয়ার মতো সেগুল সক্ষম নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী, শার্পস বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে ইনজেকশনের সুচ, সুচসহ স্যালাইনের টিউব, স্ক্যালপেল, রেজার ব্লেড, ল্যানসেট এবং ভাঙা কাঁচ—যেগুলো রক্ত বা অন্য সংক্রামক উপাদান দ্বারা দূষিত হতে পারে। এ ধরনের বর্জ্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এগুলোর মাধ্যমে সহজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এএমআর মোকাবেলায় কেবল ওষুধের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, সংযমী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার (antibiotic stewardship), নিরাপদ পানি ও পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা ও খামার ব্যবস্থার সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ পদক্ষেপ গ্রহণ করাই মূল চাবিকাঠি। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) ব্যবস্থার উন্নয়ন, খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসংগত ব্যবহার এবং হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার না করলে এএমআর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সাধারণ অস্ত্রোপচারও উচ্চঝুঁকির চিকিৎসায় পরিণত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর।
I সংকলনে: ফারিন জাহান সিগমা
বিশ্লেষণে: ডা. মালিহা শিফা










