প্রথমত, বর্জ্যপ্রবাহে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি এবং মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাবে কী পরিমাণ ক্ষতিকর উপাদান প্রতিনিয়ত পরিবেশে মিশছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের বিপজ্জনক বর্জ্য এবং সাধারণ বর্জ্য একত্রে মিশে যায়। ফলে তা পরিবেশের জন্য আরো বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা ও দক্ষ জনবলের অভাব। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) প্রতিরোধের জন্য যে ধরনের নিরোধক এবং প্রশমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রয়োজনীয় ধারণা ও কারিগরি দক্ষতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল, হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরি থেকে উৎপন্ন বর্জ্যের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে পরিবেশ অধিদপ্তর বেশকিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিকের মিশ্রণ রোধে অ্যান্টিবায়োটিক-সমৃদ্ধ বর্জ্যগুলোকে সাধারণ বর্জ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা এবং তা পৃথকভাবে সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের সময় শর্তাবলি প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়মিত মনিটরিং করা হয়।

শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের ইটিপি (Effluent Treatment Plant বা বর্জ্যপানি পরিশোধন কেন্দ্র) এবং ডব্লিউটিপি/ডব্লিউডব্লিউটিপি (Wastewater Treatment Plant বা অ-বর্জ্যপানি পরিশোধন কেন্দ্র) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখার জন্য বিভিন্ন ভৌত পদ্ধতি যেমন absorption, Membrane filtration, UV radiation এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদ্ধতি Advanced Oxidation, Ozonation, chlorination পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ বা অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি পরিশোধন করতে সক্ষম উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন করার প্রয়োজন রয়েছে।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় বা নীতিমালা লঙ্ঘন করে তখন পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক জরিমানার আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। তাছাড়া এ সমস্যা যেহেতু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে একটি সমন্বিত বা যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে উভয় খাতের বিশেষজ্ঞ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা যায়।

দেশের বর্তমান পরিবেশ রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইনগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বা অ্যান্টিবায়োটিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বিদ্যমান আইনগুলোতে সাধারণ বর্জ্যের কথা থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিকের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর উপাদানের জন্য বিশেষায়িত নির্দেশনার অভাব রয়েছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও বিস্তারিত ‘জাতীয় গাইডলাইন’ প্রণয়ন করা জরুরি। এ জাতীয় বিপজ্জনক বর্জ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন, নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ এবং চূড়ান্তভাবে ধ্বংস বা ডিসপোজাল করার জন্য যে প্রটোকল বা নীতিমালা রয়েছে, সেগুলোকে আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নদী, খাল ও ড্রেনের মতো জলাশয়গুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত এবং তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে ‘Project for implementing water quality monitoring and purification technologies to mitigate health risks for antimicrobial resistances (AMR) in the Dhaka Metropolitan area’ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মহানগর এলাকায় অবস্থিত নদী, খাল, হাসপাতাল ও ফার্মাসিউক্যাল কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যে কী পরিমাণ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া নির্গত হচ্ছে তা পরিমাপ করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে কাজ করবে।

09

শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি এবং ড্রেন সিস্টেমের কার্যকারিতা সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বেশকিছু কঠোর ও আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আকস্মিক বা ‘সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন’-এর মাধ্যমে বর্জ্য পরিশোধনের বাস্তব চিত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ইটিপি ব্যবহারে অবহেলা করে বা পরিবেশগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় (নন-কমপ্লায়েন্স), তবে তাদের জরিমানা করা এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের মতো কঠোর নির্দেশ প্রদান করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নজরদারি ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতে ‘অনলাইন ইটিপি মনিটরিং’ এবং আইপি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বন্যা বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিক এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বিস্তারে একটি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যার সময় হাসপাতাল এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রগুলো প্লাবিত হয়। ফলে সেখানে সংরক্ষিত বিপজ্জনক বর্জ্য ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ সরাসরি সাধারণ পানির সঙ্গে মিশে যায় এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে শহরের বিদ্যমান স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সিস্টেম প্রায়ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বর্জ্য পানি পরিশোধিত হওয়ার সুযোগ পায় না এবং সরাসরি নদী-নালা বা জলাশয়ে মিশে গিয়ে সামগ্রিক পানিসম্পদকে দূষিত করে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়া উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত বংশবৃদ্ধির জন্য একটি আদর্শ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার এ দ্রুত বিস্তার এবং একই সঙ্গে সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে রেজিস্ট্যান্স তৈরির প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করে। পরিশেষে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ যখন এ দূষিত পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে তখন তাদের সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এ দূষিত পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রতিরোধী বা রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে, যার ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ রোগও নিরাময় অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। এভাবেই মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলো পরিবেশে এএমআরের ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মেডিকেল বর্জ্য এবং সাধারণ বর্জ্যের সংমিশ্রণ রোধে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ চলমান রয়েছে। পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয় সরকার কর্তৃক মেডিকেল বর্জ্য এবং সাধারণ বর্জ্যের সংমিশ্রণ প্রতিরোধের জন্য আধুনিক গ্রাউন্ড তৈরি করা হচ্ছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ টাস্কফোর্স’ গঠন করা যেতে পারে। এ টাস্কফোর্স মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া তদারকি এবং নীতিনির্ধারণে কাজ করতে পারে। বর্জ্য যাতে হাসপাতাল থেকেই সঠিকভাবে আলাদা করা হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চিকিৎসা বর্জ্য (প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০০৮ অনুসারে হাসপাতালে ‘কালার-কোটেড বিন’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ওয়াটারএইড বা অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরিবেশগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এ কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী ও টেকসই করতে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার ও বাজার এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নিয়ে প্রশিক্ষণ, আলোচনা সভা ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণে উদ্বুদ্ধ হবে। এছাড়া স্থানীয় জনগণকে সরাসরি কার্যক্রমে যুক্ত করা দরকার। যেমন বর্জ্য পৃথক্‌করণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ইত্যাদিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে জনগণের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হবে এবং তারা উদ্যোগগুলোকে নিজেদের বলে মনে করবে।

এর পাশাপাশি নারী ও যুবসমাজকে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। নারীরা পরিবার ও সমাজে সচেতনতা ছড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং যুবসমাজ নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এজন্য যুব ক্লাব ও নারী গ্রুপ গঠন করে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরো কার্যকর হবে এবং জনগণ সহজেই এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যবহার করে ইতিবাচক উদাহরণ প্রচার করা হলে জনগণের আগ্রহ আরো বাড়বে।

পানি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থা যদি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তবে পরিবেশগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম আরো শক্তিশালী, কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। এতে সুস্থ পরিবেশ গড়ে উঠবে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।