আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর আগেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ফ্যাক্টরির ডিজাইন, এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (ইএমপি) ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হয়। এছাড়া প্রতি বছর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র (এনভায়রনমেন্টাল ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট) নবায়ন করতে হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে আমাদের নিজস্ব ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) রয়েছে। এ ইটিপির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাস অন্তর পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত পরীক্ষাগারে আমাদের বর্জ্য পানির নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। নির্দিষ্ট প্যারামিটার অনুযায়ী পানি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আমাদের বিরুদ্ধে শোকজ, জরিমানা এমনকি প্রয়োজনে ফ্যাক্টরি বন্ধ করার আইনগত ক্ষমতা পরিবেশ অধিদপ্তরের রয়েছে।
এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতি কোয়ার্টারেই আমাদের ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে আসেন। শুধু তাই নয়, পরিবেশগত লাইসেন্স নবায়ন আছে কিনা—বিষয়টি আবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) ম্যানুফ্যাকচারিং লাইসেন্স নবায়নের সময়ও যাচাই করে।
এমনকি নতুন ফ্যাক্টরি স্থাপনের ক্ষেত্রেও কাজ শুরু করার আগেই পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আলাদা পরিবেশগত ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, আমাদের ওষুধ শিল্পে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসরণ করা শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং পুরো কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বর্জ্যের যে সলিড অংশগুলো থাকে, সে বিষয়টি দেখার জন্য আবার আমাদের সরকার নির্ধারিত এবং ড্রাগস রেজিস্টার্ড কয়েকটা প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন একটা প্রতিষ্ঠান আছে প্রিজম নামে। এটি কাঁচপুরের এ মাতুয়ালের এদিকে। আমাদের সব সলিড বর্জ্যকে আবার প্যাকেট করে গাড়ি দিয়ে প্রিজমে আনা হয়। তারা এটাকে ডেস্ট্রয় করে সার্টিফিকেট দেয়। এটার জন্য আমরা প্রিজমকে প্রতি মাসে পে করি এবং সেই সার্টিফিকেট আবার পরিবেশ এবং ডিজি ড্রাগসকে আবার জমা দিতে হয়।
পরিবেশ-সংক্রান্ত কাজগুলোয় আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা আসলে নিয়মকানুন নয়, বরং সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা।
আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের বিষয়টি একটু আলাদা। খাতটি এমনিতেই অন্য অনেক শিল্পের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং আমাদের উৎপাদন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কারণ আমাদের নিয়মিত বিদেশী ইন্সপেকশনের মুখোমুখি হতে হয় এবং পণ্য রফতানি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের মানদণ্ড পূরণ করা বাধ্যতামূলক। যারা বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ওষুধ রফতানি করে প্রায় ৪০-৫০টি কোম্পানি, তারা স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় আইনের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে আরো উচ্চমান বজায় রাখে।
ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানায় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠোর। ইটিপির মান, আশপাশের পরিবেশ, পোকামাকড় ও কীটনিয়ন্ত্রণ, পেস্ট কন্ট্রোল—সবকিছুই নিয়মিত মনিটর করতে হয়। এমনকি সাপ বা অন্যান্য প্রাণী নিয়ন্ত্রণের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা থাকে। কারণ উৎপাদনের পরিবেশে সামান্য ত্রুটিও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা প্রক্রিয়াগত সহযোগিতা। বিশেষ করে লাইসেন্স ও বিভিন্ন রেগুলেটরি নবায়ন প্রক্রিয়াগুলো যদি আরো সহজ, স্বচ্ছ ও সময়সাশ্রয়ী করা যায়, তাহলে শিল্প খাত অনেকটাই উপকৃত হবে। আমরা এমনিতেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা বজায় রাখতে বাধ্য, কারণ ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত মান রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
এ শিল্পে সামান্যতম ত্রুটিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনো কারণে একটি পিঁপড়া বা ছোট কোনো পোকা একটি ট্যাবলেটের প্যাকেটে বা সিরাপের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাহলে পুরো ব্যাচ বাতিল হয়ে যেতে পারে এবং তা ব্যবসার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়। তাই পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা আমাদের জন্য কোনো বাড়তি দায়িত্ব নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন।
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই জিরো লিকুইড ডিসচার্জ, আধুনিক ইটিপি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বড় অংকের বিনিয়োগ করছি। কিন্তু এ উদ্যোগগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো ধরনের স্বীকৃতি বা প্রণোদনা দেয়া হয়, তাহলে তা শিল্প খাতকে আরো উৎসাহিত করবে। যেমন যেসব প্রতিষ্ঠান টানা দুই বা তিন বছর কোনো পরিবেশগত অভিযোগ ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করবে, তাদের জন্য কর-সংক্রান্ত ছোট পরিসরের ইনসেনটিভ দেয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আয়ের ওপর শূন্য দশমিক ২৫ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কর ছাড়ও একটি বড় ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
এ ধরনের প্রণোদনা দিলে সরকারও পরোক্ষভাবে লাভবান হবে। কারণ পরিবেশ দূষণ কমবে, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্রের ব্যয়ও কমে আসবে। মানুষকে শাস্তির মাধ্যমে নয়, বরং উৎসাহের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে আগ্রহী করা গেলে আরো বেশি প্রতিষ্ঠান আধুনিক ইটিপি ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য নিষ্পত্তির জন্য সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে উৎপন্ন এ ধরনের সলিড বর্জ্য আমরা নিজেরা সরাসরি নিষ্পত্তি করি না। বরং পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ও এনলিস্টেড কয়েকটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়।
এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকে। চুক্তিতে উল্লেখ থাকে, প্রতি মাসে আনুমানিক কত কেজি কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হবে এবং কীভাবে সে বর্জ্য নিরাপদভাবে ধ্বংস বা দাহ করা হবে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আমাদের ফ্যাক্টরি থেকে এ সলিড বর্জ্যগুলো সুরক্ষিতভাবে প্যাকেটজাত করে ট্রাকের মাধ্যমে ওই অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।
পরিদর্শন ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ যাচাই করে তরল বর্জ্য আমাদের নিজস্ব ইটিপির মাধ্যমে পরিশোধিত হচ্ছে এবং কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এভাবেই আমরা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ওষুধ শিল্প-সংক্রান্ত বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করি।










