বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রণীত গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান অন এএমআর অনুযায়ী এ সমস্যা মোকাবেলায় পাঁচটি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান কৌশল হলো কার্যকর এএমআর সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বাংলাদেশে এ কৌশল বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব পালন করছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
বাংলাদেশে এএমআর সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম ওয়ান হেলথ ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। মানবস্বাস্থ্য খাতে এএমআর সার্ভিল্যান্সের সেক্টরাল কো-অর্ডিনেশন সেন্টার হিসেবে আইইডিসিআর দায়িত্ব পালন করছে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দেশের ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ফর এএমআর সার্ভিল্যান্স হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন সার্ভিল্যান্স সাইটে পরিচালিত ল্যাবরেটরি কার্যক্রমের মান নিয়ন্ত্রণ, উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের প্রধান কেন্দ্র হলো আইইডিসিআর।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩টি এএমআর সার্ভিল্যান্স সাইট রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এর পাশাপাশি দেশের ২৩-২৪টি সরকারি-বেসরকারি উন্নতমানের ল্যাবরেটরি এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে। এসব ল্যাবরেটরির মাধ্যমে বিভিন্ন জীবাণুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হয়। এ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বর্তমান অবস্থা, প্রবণতা ও ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।
সংগৃহীত উপাত্ত শুধু সংরক্ষণ করাই নয়, তা বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়াও এ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইইডিসিআর নিয়মিতভাবে রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ড ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব তথ্য শেয়ার করে। উপাত্তর ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে অ্যান্টিবায়োগ্রাম প্রস্তুত করা হয়, যা চিকিৎসকদের জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর নির্দেশিকা। অ্যান্টিবায়োগ্রামের মাধ্যমে জানা যায় কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর এবং কোন ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কালচার টেস্ট করা সম্ভব হয় না। ফলে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে ওষুধ নির্ধারণ করতে হয়। এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োগ্রাম বাংলাদেশের বাস্তব রেজিস্ট্যান্স প্যাটার্ন অনুযায়ী চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
এএমআর সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম নীতিনির্ধারক ও চিকিৎসক—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকরা এ উপাত্তর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক এএমআর পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পান এবং জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্যদিকে চিকিৎসকরা উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করতে সক্ষম হন, যা অপ্রয়োজনীয় ও ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি কমায়।
ডব্লিউএইচওএর গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী এএমআর মোকাবেলার প্রথম ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে আইইডিসিআর মেডিকেল শিক্ষার্থী, টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH) সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমেও এএমআর বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উন্নত হ্যান্ড হাইজিন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সংক্রমণ কমায়, ফলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনও হ্রাস পায়।
জাতীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি হিসেবে আইইডিসিআর এএমআর সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণাও পরিচালনা করছে। তবে উন্নত গবেষণার জন্য যে প্রযুক্তিগুলো প্রয়োজন, যেমন জিনোম সিকোয়েন্সিং ও মেটাজিনোমিক্স, সেক্ষেত্রে এখনো সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনার কথা সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশগত ও ওয়েস্টওয়াটার সার্ভিল্যান্স এএমআর পর্যবেক্ষণের একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে আসছে। ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএইচ) ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে এ ধরনের কাজ শুরু হয়েছে। ওয়েস্টওয়াটার সার্ভিল্যান্সের মাধ্যমে সমাজের বৃহৎ অংশের রোগ ও রেজিস্ট্যান্স প্যাটার্ন সম্পর্কে আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব, যেমনটি পোলিও ও কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশে ওয়ান হেলথ প্লাটফর্ম তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য, মৎস্য ও পরিবেশ খাতের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এএমআর মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইইডিসিআর দেশে ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে এবং এরই মধ্যে একাধিক যৌথ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ইন্টিগ্রেটেড এএমআর সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
উপাত্ত বিনিময় ও বিশ্লেষণ এ কার্যক্রমের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও কিছু উপাত্তের আদান-প্রদান এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, তবে উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হয়নি। শুধু উপাত্ত সংগ্রহ নয়, কার্যকর বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
দক্ষ জনবল, উন্নত প্রযুক্তি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এএমআর সার্ভিল্যান্স জোরদার করার পথে বড় বাধা। বিশেষ করে সরকারি মেডিকেল কলেজ ল্যাবরেটরিগুলোতে জনবল সংকট প্রকট। তবে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় গড়ে ওঠা মলিকুলার টেস্টিং সক্ষমতা ভবিষ্যতে এএমআর সার্ভিল্যান্সে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে এএমআর মোকাবেলার ভিত্তি এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ, নীতিগত সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য। এ সমন্বিত প্রচেষ্টাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এএমআর-এর ভয়াবহতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।










