সহজ কথায়, আমরা জীবাণু ধ্বংস করার জন্য যেসব অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ ব্যবহার করি, জীবাণুরা সময়ের সাথে নিজেদের পরিবর্তন করে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলো আর কাজ করছে না এবং সাধারণ সংক্রমণও হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। বিষয়টি কতটা ভয়াবহ তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলোতে। বিখ্যাত সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ কেবল এএমআর-এর কারণে মারা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের জন্য এই চিত্রটি আরো ভীতিকর। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (IHME)-এর তথ্যমতে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে অন্তত ২৩,৫০০ জনের মৃত্যুর সরাসরি কারণ ছিল এএমআর এবং প্রায় ৯৬,৯০০ জনের মৃত্যুর সাথে এর পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত।
দীর্ঘদিন ধরে এএমআরকে আমরা কেবল চিকিৎসা খাতের সমস্যা বা হাসপাতালের চারদেয়ালের ভেতরের এক সংকট হিসেবে দেখে এসেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এএমআর-এর বিস্তার এখন আর কোনো একক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের গবাদি পশু-পাখি (যা পরবর্তীতে আমরা খাই, যেমন: গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি), নদ-নদী, ড্রেন, জলাশয় এবং সামগ্রিক পরিবেশে। আমাদের পরিবেশ এখন একটি বিশাল ‘রেজিস্ট্যান্সের আধার’-এ পরিণত হয়েছে, যা সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সব খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের শহরের নর্দমার পানি, নদী এবং ক্লিনিক বা হাসপাতালের বর্জ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন প্যাথোজেন পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব জিন বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু (সুপারবাগ) পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ রোগজীবাণুর বিস্তারকে অত্যন্ত দ্রুত ও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশে এএমআর সংকটের সাথে আমাদের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন, সংক্ষেপে ওয়াশ) সেক্টরের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং জটিল। আমাদের দেশের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই সংকটকে আরো প্রকট করছে। এর একটি অন্যতম কারণ হলো অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষিত পানি। উল্লেখিত গবেষণায় দেখা গেছে, অনিরাপদ স্যানিটেশন এবং নর্দমা ব্যবস্থার কারণে মানুষের মলমূত্র, গবাদিপশুর মলমূত্র ও হাসপাতালের বর্জ্য কোনো প্রকার শোধন ছাড়াই পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে পয়ঃবর্জ্য দূষণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। যখন অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকারী কোনো ব্যক্তির বর্জ্য সঠিকভাবে শোধন না হয়ে পানিতে মেশে, তখন সেই পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলোও প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে পানির মাধ্যমে বা স্যানিটেশনের দুর্বলতায় এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুগুলো আবার সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বর্জ্যের অপর্যাপ্ত ট্রিটমেন্ট বা শোধন ব্যবস্থা রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াকে পরিবেশে মিশিয়ে দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে। আপনি যদি অ্যান্টিবায়োটিক নাও খান, তবুও কেবল দূষিত পানি বা পরিবেশের সংস্পর্শে এসে আপনি রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ এএমআর শুধু হাসপাতালের বা ওষুধ খাবার সংকট নয়; এটি পুরো পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি জাতীয় সংকট।

সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আয়েশা আফরিন একজন গর্ভবতী নারী। তিনি রঘুনাথপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতি মাসে আসেন এবং সুব্যবস্থা থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারেন, যা গর্ভাবস্থায় তার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছবি: ওয়াটারএইড
এই প্রেক্ষাপটে, এএমআর মোকাবিলায় পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যদি সংক্রমণের হারই কমিয়ে আনতে পারি, তবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং এর ওপর নির্ভরতা—দুটোই কমে আসবে। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবিধির অভাব, বিশেষ করে সঠিক নিয়মে হাত না ধোয়ার অভ্যাসের কারণে মানুষ ঘন ঘন অসুস্থ হয়। ফলে বাড়ে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, যা অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নেয়া হয়। এই সংকট মোকাবিলায় ওয়াটারএইড বাংলাদেশ একটি সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে। আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি প্রধান স্তম্ভ, যা কমিউনিটি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রথমত, আমরা কমিউনিটি পর্যায়ে আচরণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছি। বিশেষ করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা সংক্রমণের হার কমিয়ে আনতে চাই। যখন একজন মানুষ সচেতন হন এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন, তখন তার বেশ কিছু অসুস্থতার হার কমে যায়; ফলে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসে, যা পরোক্ষভাবে এএমআর-এর ঝুঁকি কমায়।
দ্বিতীয়ত, আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি জলবায়ু সহনশীল ও নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে, যা স্যানিটেশন ব্যবস্থার অবকাঠামোগুলোকে ভেঙে ফেলে এবং জীবাণু ছড়িয়ে দেয়। এজন্য আমরা দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কাজ করছি। পাশাপাশি নগর বস্তি, পৌরসভা এবং হাসপাতাল বা ক্লিনিক এলাকায় আমরা নিরাপদ স্যানিটেশন ও পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কাজ করছি, যাতে বর্জ্য কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করতে না পারে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা জোরদার করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। হাসপাতালের পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এএমআর কমানোর একটি কার্যকর মাধ্যম। একটি হাসপাতালে যদি নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেখান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম।










