এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। বাংলাদেশ এরই মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। মৎস্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০-এর ধারা ১৪ (১) অনুযায়ী পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য সব ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইনটির বাস্তবায়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রচলিত পশুখাদ্য নিয়মিত মনিটরিং ও পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে কেউ পশুখাদ্যে নিষিদ্ধ কোনো দ্রব্য ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খামারিদেরও সচেতন করা হচ্ছে যেন গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে তারা কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করেন। রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেন কেউ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী শাস্তি বা জরিমানা করা হচ্ছে। এ পদক্ষেপে গ্রোথ প্রমোটর হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে।
এখানে আরেকটি বিষয় দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশনকারী ডাক্তার বা পশুচিকিৎসকের পাশাপাশি কৃষক ও ফিড উৎপাদনকারীদের সচেতনতা অনেক জরুরি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিতে একটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। যার মূল উদ্দেশ্য অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কমানো। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে কৃষক, ফিড উৎপাদনকারী ও প্রাণিসম্পদ খাতে জড়িত অন্যান্য সব অংশীজনকে নিয়ে সচেতনতা কর্মশালা ও সেমিনার করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহযোগিতায় বছরব্যাপী এএমআর জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে চলেছে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত খামারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মুরগির খামার ছবি: বণিক বার্তা
চলমান এ কর্মসূচিগুলোয় অধিদপ্তরের পাশাপাশি অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জড়িত করা গেলে কার্যক্রমটি আরো বেগবান করা সম্ভব হবে। এএমআর নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারগুলোর মধ্যে জোরালো সহযোগিতা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পশুচিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়বদ্ধতা বাড়াতে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রথমত, প্রয়োজন অননুমোদিত বা প্রেসক্রিপশন ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় ও ব্যবহার
বন্ধ করা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এক্ষেত্রে পশুচিকিৎসা কাউন্সিল আইন ২০১৯ প্রয়োগের মাধ্যমে রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসক ছাড়া গবাদিপশুর চিকিৎসা ও প্রেসক্রিপশন নিরুৎসাহিত করে আসছে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ও যথেচ্ছা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে এবং মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলোয় তা প্রেরণ করেছে। এ গাইডলাইন মাঠ পর্যায়ের পশুচিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে সহায়ক হবে।
তৃতীয়ত, পশুচিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলামে অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও এএমআর শীর্ষক বিষয়াবলি সংযুক্তির বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করে চলেছে। ভবিষ্যৎ প্রেসক্রিপশনারদের এএমআর বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে ওয়ান হেলথ প্রক্রিয়ায় সমন্বিত সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ওয়ান হেলথ প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, যৌথ নজরদারি এবং সমন্বিত সচেতনতা কর্মশালার মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়বদ্ধতা বাড়াতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
ওয়ান হেলথ প্লাটফর্ম আমাদের কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের একটি সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগকে আরো কার্যকর করতে আমাদের এখন একটি সুনির্দিষ্ট ইন্টার-সেক্টোরাল সেন্টার প্রয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় থেকে দক্ষ পেশাজীবী ও জনবল কর্মরত থাকবেন। ওয়ান হেলথ সোসাইটি, ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট, ওয়ান হেলথ ইউনিভার্সিটি নেটওয়ার্ক এবং ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েটের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি ও মৎস্য খাতকেও এ প্লাটফর্মে নিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের যাবতীয় সমন্বয় প্রক্রিয়াকে বাস্তবে রূপদানের জন্য নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিবিদদের বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। কাজেই তাদেরও কীভাবে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটিও আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ভেড়ার খামার ছবি: বণিক বার্তা
বিচ্ছিন্নভাবে চলমান ওয়ান হেলথ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিগুলোর সমন্বয় সাধন এবং একত্রীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ওয়ান হেলথ প্রক্রিয়া আরো কার্যকর করা সম্ভব। আমার এরই মধ্যে ওয়ান হেলথ কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক করেছি, যেখানে ইমার্জিং এবং রিইমার্জিং হাই ইম্প্যাক্ট রোগের জন্য ওয়ান হেলথ কৌশলে যৌথ নজরদারি, প্যান্ডেমিক প্রিপার্ডনেস, পরিবেশের ঝুঁকি নিরূপণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আমরা আশা করছি, এসব পদক্ষেপে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে এএমআর পশুচিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম আরো বেগবান হবে।










