বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশেও বাঙালি জনসংখ্যা এখন উল্লেখ করার মাত্রায় পৌঁছেছে। ফলে এ জনসমাজের সাংস্কৃতিকতার তরঙ্গ অন্য জনসমাজের মানুষও এখন কিছুটা টের পায়।

এখানে বসবাসকারী বাঙালিরা কেবল জীবন ধারণই করেন না, ক্ষীণ হলেও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র একটা সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বহু নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বাঙালিয়ানার একটা অস্তিত্বধারা এখানে এখন বহমান।

ভিন্ন রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিতে এ সাংস্কৃতিক ধারা একটা স্বতন্ত্র স্বভাবও অর্জন করেছে। এ সাংস্কৃতিকতার মূলে আছে বাংলাদেশকে ভুলে না থাকার সংগ্রাম। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন স্থানে ভিন্ন এক বাস্তবতায় জীবনযাপন করেও বাংলাদেশের মনোজাগতিক আবহকে বাঁচিয়ে রাখা এ সংস্কৃতি চর্চার মূল প্রেরণা।

নিজের প্রজন্মানুক্রমিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাইরের কোথাও কেউ বসতি গড়লে ছেড়ে আসা দেশের সুর তার প্রাণে আগের চেয়ে বেশি গভীরভাবে বাজে। মুক্তিযুদ্ধ করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশের প্রতি সে দেশের মানুষের হূদয়বীণায় আবেগের টান বোধহয় তার চেয়েও একটু বেশিই। ২০১৭ সালে নিউইয়র্ক মহানগরীতে বসবাস করতে আসার পর অন্তত এমনটাই মনে হতে থাকে আমার। এখানকার বাংলাদেশী জনসমাজ বছর তিরিশেক ধরে যে হারে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে তাতে এ রকম অনুভবের মানুষ যে বিপুল সংখ্যায় পাওয়া যাবে তাতে আমার সামান্য সন্দেহ নেই! সেই সঙ্গে আমার উপলব্ধি, এ আবেগই তাদের শক্তি। কারণ মনে হয়েছে, সুদীর্ঘ কালের কৃষি সংস্কৃতির অনুশীলন বাংলাদেশের মানুষের যে মনোজগৎ গড়ে দিয়েছে, তাকে মাত্র শতবর্ষের অনুশীলিত ক্ষীণপ্রভ বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাব তেমন একটা বদলে দিতে পারেনি। নিউইয়র্কে এসে এখানকার বাংলাদেশী জনসমাজে বসবাস করতে করতে আমার এ উপলব্ধি আরো গভীর হয়েছে।

এ কথা ঠিক যে যখন বাংলাদেশী অভিবাসীদের সংখ্যা এখানে খুব কম ছিল, তখন এখানকার সামগ্রিক সাংস্কৃতিকতা ছিল বেশি প্রতিকূল। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যতটা সনদসর্বস্ব, ততটা জ্ঞানসন্ধানী নয় বলে যারা সাংস্কৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয় তারা কৌতূহল নিবারণের মধ্য দিয়ে তা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষাকে জাগরূক রাখতে পারায় সামর্থ্যবান হওয়ার চেয়ে প্রতিহত হয়ে পড়ে বেশি পরিমাণে। সে সময়ের পরিস্থিতি থেকে তার উত্তরণ ঘটে নিজ জনসমাজের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে, সহানুভূতি ও সমানুভূতিতে। এ তো সাদা চোখেই দেখা যায় যে বাংলাদেশী জনসমাজ নিউইয়র্কে যতটা সেই আশ্রয়-প্রশ্রয় বা সহানুভূতি-সমবেদনায় প্রভাবিত হয়েছে, ততটাই তাদের জীবনযাত্রাও হয়ে উঠছে স্বচ্ছন্দ ও নিনাদিত! নিউইয়র্ক মহানগরীতে বাংলাদেশ নামটি আর একটি অপরিচিত দেশের নাম নয়, একটা তরঙ্গনিনাদিত জনসমাজেরও নাম!

এখন প্রশ্ন হলো এ সংস্কৃতির আন্তরশক্তি কতটা জোরালো? ভিন্ন রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিতে কতটা তাত্পর্য বহন করতে পারে এ সংস্কৃতির চর্চা? এর কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে? থাকলে কোন দিকে এর অভিমুখ?

অনেকেই মনে করিয়ে দেন বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসে এখানকার সংস্কৃতির গভীরে শেকড় প্রোথিত করা যায় না বলে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কিংবা লেখালিখি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সম্ভবিত হয়ে ওঠে না। ঠিকই তো, দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকায় গড়ে ওঠা বুর্জোয়া সংস্কৃতির সূক্ষ্ম দিকগুলো অল্পদিনের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভিজ্ঞতায় বুঝে ওঠা কতটাইবা সম্ভব? এ রকম সাংস্কৃতিক পটভূমিতে বাংলার সংস্কৃতি কতটা বিকশিত হতে পারবে? উত্তরপ্রজন্মের পক্ষে কি এর কোনো রকম প্রবহমানতা বজায় রাখা সম্ভব? ভাষাভিত্তিক এ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে উত্তরপ্রজন্ম ভিন্ন ধারার যে সংস্কৃতি গড়ে তুলবে তার ভবিষ্যতইবা কী? এসব প্রশ্ন মনে জাগে। এসব প্রশ্নের উৎস বাংলাদেশ থেকে সৃজনশীল সত্তা নিয়ে আসা মানুষের এখানকার জীবনবাস্তবতার ধরন। দেখা যায়, অনেকেই বিভূঁইয়ের ভিন্ন পরিবেশের সংকটে পড়ে নিজেদের চেতনার গতিপথ থেকে খসে পড়েন।

সংগত কারণেই প্রথম দিকে বাংলাদেশী জনসমাজের মানুষের সংখ্যা অনেক কম ছিল, টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকে তাদের তখন যে সংগ্রাম করতে হতো তার মাত্রা এত বেশি ছিল যে টিকে থাকাটুকুতেই ছিল তাদের সাফল্যের মাত্রা। অধিকাংশেরই ভাবনা ছিল এই, উত্তরপ্রজন্মের যাত্রা শুরু করে দিতে পারলেই তাদের জীবন সার্থক! ওই রকম পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই স্বতন্ত্র প্রাকৃতিকতায় ছেড়ে আসা সংস্কৃতির চর্চার প্রাথমিকতা অর্জনকেই মনে হতো অনেক বড় সাফল্য!

কেন ও কীভাবে এমনটা ঘটে তা বোঝার জন্য বাংলাদেশের জনজীবনের ভিত্তিকেও একটু খুঁড়ে দেখা দরকার। এজন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের মানুষের কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে আধুনিক বুর্জোয়া জীবনের সংস্কৃতিতে উত্তরণের অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করে দেখা। সাধারণ পর্যবেক্ষণেই টের পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গির সঙ্গে বুর্জোয়া মনোভঙ্গির এখনো রয়েছে বিস্তর দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অর্থে সেখানকার অধিবাসীদের মানসজগৎ পুরোপুরি নাগরিক হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু তা হলেও বাংলাদেশের নগরগুলোর চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে নগরের অধিবাসীরা যুক্ত থেকে একে ত্বরান্বিত করে চলেছেন। যদিও জীবনযাপনের ধরন এখনো দীর্ঘকালের অভ্যস্ত গ্রামীণতা প্রভাবিত রয়ে গিয়েছে।

নাগরিক সামজিক কাঠামোগত বাস্তবতায় উপযুক্ত সূত্রে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জীবিকার পরও সৃজনশীল কাজের জন্য অবকাশ বের করা সম্ভব হয়। পরিবারের কর্মজীবী নারী-পুরুষ উভয় সদস্যই পেশাগত আধুনিক কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও গৃহকর্মীর সহযোগিতা নিয়ে ঘরে ফিরে আসার পরে নিজেকে খানিকটা অবকাশ দিতে পারেন। ফলে শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য কিছুটা সময় অন্তত স্বস্তির সঙ্গে অনেকের পক্ষেই ব্যয় করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমেরিকায় সে সুযোগ নেই বললেই চলে। প্রতিটি মানুষকেই এখানে পেশাগত কাজের পাশাপাশি জীবনযাপনের জন্যও ব্যক্তিগত কাজকর্মে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হয়। ফলে এমনিতেই অবকাশ মেলে খুব কম। যেটুকু মেলে তার উদযাপনের জন্যও আগে থেকেই নেয়া থাকে নানা কর্মসূচি। ফলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় অভ্যন্ত মানুষের পক্ষে ভিন্ন সাংস্কৃতিকতায় সৃজনশীলতার চর্চা করার জন্য প্রেরণার যে প্রবলতাকে নিজের মধ্যে জিইয়ে রাখতে হয় তা-ই সম্ভব হয়ে ওঠে না।

আমি এখানে অভিবাসী হয়ে আসার পর যেমন প্রথম দিকে এমন মনে হতো তেমনই মনে হতো এমনটাই যথার্থ। এখনই সে পরিস্থিতি অনেক বেশি বদলে গিয়েছে তা নয়। তবে এখন মনে হয়, বাংলাদেশী জনসমাজ বাংলাদেশ তথা বাংলাভাষীদের ভৌগোলিকতার বাইরেও একটা বাংলা সাংস্কৃতিকতাও গড়ে তুলতে পারছে। শুধু তাই নয়, এটাই আবার সমৃদ্ধ করে চলেছে ভৌগোলিক বাংলা অঞ্চলের মানসভুবনকেও। এর প্রভাবও কিছুটা এখনই দৃশ্যমান। অদূর ভবিষ্যতে তা তীব্রতর হয়ে উঠবে বলেই মনে হয়!

যেকোনো আমেরিকাবাসীই অনুভব করবেন, যৌথভাবে কোনো কাজ করার নিয়মিত একত্রে সময় বের করা আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সমন হয় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে এখানকার নাট্যকর্মীদের কথা বলা যেতে পারে। অবকাঠামোগত সুবিধা বাংলাদেশের তুলনায় পাওয়া সহজ হলেও একত্রে মহড়া করার সময় ও সুযোগ তারা করে উঠতে পারেন না জীবিকাগত বাস্তবতার কারণে। আবার পেশাদার হওয়ার জন্য যে সমাজ পরিস্থিতি দরকার আমেরিকার বাংলাদেশী জনসমাজ এখনো তা থেকে অনেক দূরে। যারা বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে এসব ক্ষেত্রে কাজ করেন তারা শেষ পর্যন্ত শৌখিনতাকেই অতিক্রম করতে পারেন না। আবার এখানে যাদের জন্ম ও বিকাশ তারা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেননি বলে তাদের প্রসঙ্গ এ বিবেচনায় আনা ঠিক হবে না।

নিজেদের জনসমাজের বাইরে যথার্থ রসিক শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে এখনো পৌঁছতে পারিনি বলে সংগীতচর্চার প্রেরণা বাঁচিয়ে রাখা খুব কঠিন। বছরে দু-একটি মঞ্চানুষ্ঠানে সংগীত উপস্থাপনের সুযোগের ওপর ভরসা করে সংগীতের সাধনা চালিয়ে যাওয়ার মতো অনুপ্রেরণা নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা খুবই দুরূহ কাজ। চিত্রকলা চর্চার সংকটের ধরনও অনেকটা এ রকমই। একাকী সাধনার ব্যাপার হলেও একজন চিত্রশিল্পীকে তার নিজের অন্তরকে তো জাগিয়ে রাখতে হয়! জীবনযাপনের ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে নিজের জীবনকে জ্বালিয়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে পরিপার্শ্বের সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে। ফলে শিল্পের সংগ্রামে তাদেরও খুঁজে পাওয়া যায় কম। এজন্য দরকার সত্যিকারের অঙ্গীকারবদ্ধ প্রতিভা, তেমন অসাধারণ প্রতিভা তো যেকোনো সমাজেই বিরল। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের যে দু-একজন শিল্পীর খোঁজ পাওয়া যায় তারও কারণ তাদের অসাধারণ ও দুর্মর সাধক শিল্পীসত্তাই।

জীবনবোধ যেমনই হোক না কেন, আমেরিকায় বাংলাদেশী জনসমাজ গড়ে তোলার পেছনে এখানকার স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর একটা জোরালো ভূমিকা রয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ কথা ঠিক যে যথার্থ সংবাদপত্র যেমন হয়, এগুলো পুরোপুরি তেমন নয়। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বলতে একসময় ছিল বাংলাদেশের সংবাদপত্রের বিবিধ রচনার পুনর্মুদ্রণ আর এখানকার ছোটখাটো অনুষ্ঠানাদির অতিরঞ্জিত বর্ণনা! বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ছেনে এখানকার পত্রিকাগুলো যে উপসম্পাদকীয় পুনর্মুদ্রণ করে এর মাধ্যমে হাজার মাইল দূরে থেকেও জাগরূক থাকে অভিবাসীদের ছেড়ে আসা দেশের প্রতি নিজেদের মননশীলতা ও আন্তরিক ভালোবাসা। বাংলাদেশের সামগ্রিকতা এসবের মাধ্যমেই অভিবাসীদের মনে হালনাগাদ হয়ে থাকে। অন্যদিকে এ পত্রিকাগুলো জনসমাজের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি তথ্যাদি মাতৃভাষায় হাজির রেখে এখানকার যাপিত জীবনকে করে তোলে সহজতর! এর মধ্য দিয়েই তারা আবার অর্জন করে চলে এখানকার বাস্তবমুখী সাংস্কৃতিকতাকেও। একসময় বাংলাদেশী জনসমাজের কোনো ছোট্ট সংগঠনের পক্ষেও যদি একটি আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করার চেষ্টা করা হতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিজেদের উপস্থিতির মাধ্যমে অনেকেই চাইত আয়োজনটিকে সফল করে তুলতে। নিজেদের তারা এ সাংস্কৃতিকতার সুবিধাভোগী মনে করত বলে এবং এর মাধ্যমেই ভিন্ন সাংস্কৃতিকতার চাপ থেকে তাদের একটু মুক্তি ঘটত বলে তারা হাজির হতো এ ধরনের অনুষ্ঠানাদিতে!

ধীরে ধীরে নানা রকম অনুষ্ঠান আয়োজনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়ে কণ্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী বা কবি যশোপ্রার্থী তথা সাহিত্যিক যশোপ্রার্থীর সংখ্যা! বক্তাদের তো রীতিমতো কোনো সংখ্যাসীমাই নেই। উপস্থিত প্রত্যেকেই আয়োজকদের কাছে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যে আলোচনা করা থেকে তাদের একজনকেও বাদ রেখে অনুষ্ঠান শেষ করা যেন অসম্ভব মনে হয়! ফলে এসব অনুষ্ঠানে বক্তব্যের চেয়ে বক্তাই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বলা যায়, অভিবাসী বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠান-সাংস্কৃতিকতা মানে পরিবেশনার সৌন্দর্যের চেয়ে পরিবেশনকারীর উপস্থিতিজনিত সামাজিক গুরুত্ব। এটাই এখানকার অনুষ্ঠানের বাস্তবতা!

এ অনুষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই রুচির দিক থেকে যথেষ্ট উজ্জ্বল হয়তো নয়। কিন্তু অস্বীকার করার তো উপায় নেই যে এগুলোই ক্রমেই গড়ে তুলেছে আমাদের জনসমাজের সাংস্কৃতিক মানসজগেক। মানগত ঊনতা নিয়ে উন্নাসিকতাও কম দেখা যায় না, কিন্তু এ কথাও সবার জানা যে বাস্তবতাকে অতিক্রম করা সহজ নয়! মানের উত্কর্ষের জন্য উন্নাসিকতার প্রতিস্পর্ধী অনুশীলনের যেকোনো সহজ বা পরিত্রাণকর বিকল্প নেই তাও সবার জানা! উত্তরপ্রজন্মকে ঠিকমতো পাওয়া না গেলেও এবং প্রথম প্রজন্মের পরিশ্রুতি ক্ষীণপ্রভ হলেও সে অনুশীলনও তো চলমান রয়েছেই; প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে নতুন নতুন অভিবাসেচ্ছুর আগমন ঘটছে বলে অনুশীলনের শ্লথতা সত্ত্বেও অগ্রসর হচ্ছে এ সাংস্কৃতিকতার পরিশ্রুতি! এ চলমানতা যে ক্রমেই পরিশ্রুতি ঘটাবে সে আশা না করারও কারণ নেই।

একটা হতাশা অভিবাসী জনসমাজে অন্তঃশীল যে অনেক প্রয়াস সত্ত্বেও উত্তরপ্রজন্মের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশী অনুষ্ঠান-সাংস্কৃতিকতায় সামান্য সংখ্যায়ও যুক্ত করা যাচ্ছে না। অভিবাসিত দেশের সাংস্কৃতিকতার ও সামগ্রিক বাস্তবতার প্রভাব বেশি প্রবল বলে এমনটি যে ঘটছে তা সবাই অনুভব করেন। কিন্তু দু-একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস সফল হলেও পরিমাণে তা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়!

পূর্বপ্রজন্মের ঐতিহ্যিক পরম্পরার সঙ্গে উত্তরপ্রজন্ম যুক্ত হতে পারছে না বলেই প্রাণশক্তি হ্রাসমান পূর্বপ্রজন্মের ক্ষুদ্র সাফল্য উদযাপনের প্রগলভতা থেকে মুক্ত হতে সময় লাগছে এ জনসমাজের। সে কারণেই বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক রূপান্তরের পরিশীলন ও পরিশ্রুতিও ঘটছে ধীরতর লয়ে। তবে তা সত্ত্বেও যত শ্লথগতিরই হোক না কেন, পরিশ্রুতি যে ঘটছে না তা নয় এবং তা অভিবাসী জনসমাজকে প্রভাবিতও করে চলেছে। এমনটি ঘটছে বলেই এর ইতিবাচক প্রভাব ভৌগোলিকভাবে বাংলা সাংস্কৃতিকতায়ও ক্রিয়াশীল।

অনেকের মনে হতে পারে সাহিত্য তো একাকী সাধনারই ব্যাপার। তা চালিয়ে না যেতে পারার কোনো কারণ থাকতে পারে না, কিন্তু এ কথা না মানলে তো চলবে না যে সাহিত্যিককে বসবাস করতে হয় একটা গতিশীল সমাজ চৈতন্যের মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে সমাজের সঙ্গে টানাপড়েন নিয়েই সাহিত্যিকের ক্রিয়াশীলতা। আমেরিকার মতো বহুজাতিক সংস্কৃতি ধারার প্রবলতার মধ্যে পড়ে আমাদের স্বসমাজ চৈতন্য এখনো স্পষ্ট রূপ পায়নি।

অভিবাসন বা সীমানির্দিষ্ট সময়ের প্রবাসজীবন কেবল ভিন দেশে প্রস্থান বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যমূলক সাময়িক স্থানান্তর নয়, বাংলাদেশের যাপিত জীবনের সীমিত জীবনবোধকে তা ভিন্ন অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ ও বিরোধে কার্যকরভাবে উত্তীর্ণও করে তোলে। কারণ অভিবাসন সূত্রে ভিন্ন যে জীবনযাপন-অভিজ্ঞতা হয় মানুষের তার আগে হয়তো অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল শ্রুতি-অভিজ্ঞতায় সীমিত ধারণায় সীমিত থাকত; অভিবাসন কিংবা প্রবাসন অনেকের জীবনবোধের পূর্বধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন জীবনবোধেও উজ্জীবিত করে তোলে। গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রিক সংস্কৃতির ঊন অনুশীলন এ বৈশ্বিকতা প্রভাবিত জীবনবোধকে এখনো যথেষ্ট উত্কর্ষে পৌঁছতে না দিলেও যে তা সক্রিয় রয়েছে সেটা মানতে অসুবিধা নেই! সর্বব্যাপী দুর্নীতি, অনৈতিকতা কিংবা মানবিক বোধ প্রাণিত রাজনীতির অভাবের মধ্যে থেকেও বিশ্বে ছড়ানো বাংলা-সাংস্কৃতিকতার সক্রিয়তা হয়তো এসব প্রতিকূলতা অতিক্রমে ক্রমেই বড় ভূমিকা রেখে চলবে।

 

আহমাদ মাযহার: প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক