দেশ ভ্রমণের বেশ ইচ্ছা ছিল তার। পাশাপাশি তিনি চেয়েছিলেন বেশকিছু ভাষা শিখতে। কেবল ইংরেজিতেই থেমে থাকতে চাননি সোয়েব গাজী। স্প্যানিশের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। ব্রাজিলে পর্তুগিজ, কানাডায় ইংলিশ আর ফ্রেঞ্চ ছাড়া আশপাশে স্প্যানিশের ব্যবহার হয়। ধারণা করা হয়, ২০৫০ নাগাদ আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষাভাষীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ পেরিয়ে যাবে। বিষয়টি সোয়েব গাজী বুঝতে পেরেছিলেন। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা জানতে হবে কিন্তু এ অঞ্চলে স্প্যানিশটা কমন ভাষা। সে কারণেই স্প্যানিশ শিখেছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্প্যানিশ শিখেছিলেন সোয়েব। তারপর স্টুডেন্ট ভিসায় চিলি গমন। তবে মজার ব্যাপার হলো তিনি টেম্পোরারি রেসিডেন্ট ভিসা পেয়ে যান। চিলির টেম্বোরারি রেসিডেন্ট ভিসার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার। সোয়েব জানান, ‘এ
ভিসায় প্রায় সব ধরনের কাজই করা হয়। পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসা সবই অনুমোদিত। যদিও আমি জানি না তারা কী বিবেচনায় আমাকে তা দিয়েছিল, তবে বিষয়টি আমার জন্য ছিল ইতিবাচক।’
২০১৫ সালে পড়াশোনার সূত্রে চিলি গিয়েছিলেন সোয়েব। সেখানে অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার মতো ফুটবলপ্রিয় অঞ্চলে সোয়েব যুক্ত হন ক্রিকেটের সঙ্গে। আসলে ক্রিকেট তার প্রিয় ছিল। এমনকি চিলি যাওয়ার সময় ব্যাগে করে বল নিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য ব্যাট কোথায় পাবেন তিনি জানতেন না। চিলিতে গিয়ে ব্যাটটা তিনি বানিয়েছিলেন নিজের মতো করে। পেয়ে গিয়েছিলেন দুজন বন্ধুও। তাদের সঙ্গেই সোয়েব ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। তাদের একজন বাংলাদেশী এবং অন্যজন চিলির স্থানীয়। চিলির সেই বন্ধু সম্পর্কে সোয়েব বলেন, ‘চিলির
সেই বন্ধুকে আমি নিজে ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছি। বোলিং-ব্যাটিং সবই শেখাই। সফট বল দিয়ে খেলা হতো তখন।’
চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে ৬০০ মাইল দূরে লা সেরেনায় শুরু হয়েছিল সোহাগের এ ক্রিকেটযাত্রা। বাংলাদেশী এমনকি এশিয়ান কেউ ছিল না সে জায়গাটিতে। স্বাভাবিকভাবেই সোয়েব সেখানে অনেকটা একাকী জীবন কাটাচ্ছিলেন। প্রথম কয়েকটা মাস এভাবেই কাটে। সেখানে থাকার সময় সান্তিয়াগোতে আসা এক বাংলাদেশীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। উজ্জ্বল নামের এ ব্যক্তি ছিলেন সোয়েবের সিনিয়র। তিনিই আগ্রহ করে চিলির ক্রিকেট সম্পর্কে খোঁজ করেন। ২০১৬ সালে আইসিসির সাইট ঘেঁটে তারা জানলেন চিলি এর অ্যাসোসিয়েট মেম্বার।
নতুন এক সুযোগ তৈরি হলো সোয়েব গাজী আর উজ্জ্বলের সামনে। চিলির ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ই-মেইল চালাচালির মাধ্যমে তারা জানলেন সামনেই শুরু হচ্ছে তাদের মার্সি লীগ (চিলির স্থানীয় ক্রিকেট লীগ)। সে সূত্রেই তারা সোয়েবদের আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথমত তারা দেখতে চেয়েছিলেন এবং বুঝতে চেয়েছিলেন ক্রিকেট সম্পর্কে সোয়েবের আগ্রহ ও যোগ্যতা কতটা। সান্তিয়াগোতে গিয়ে নেটে তার বোলিং টেস্ট হলো। পাস করে গেলেন ভালোভাবেই। সেখানে ভারতীয় দলে ফাস্ট বোলার হিসেবে জায়গা হয়ে গেল সোয়েবের।
অবাক হয়েছিলেন সোয়েব। তিনি বলেন, ‘আমি
তো নিয়মিত খেলি না। ওরা রেগুলার খেলে। সেখানে আমাকে। কিন্তু ভাগ্য ভালো ছিল। প্রথম খেলার দিন প্রথম ওভারে এক রাতে দুটো উইকেট পেয়ে যাই।’ সান্তিয়াগো স্টেশন সেন্টার নামে দলটিই সোয়েবকে চিলির ক্রিকেটের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দলটি চিলির ক্রিকেটে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম সারির দল হিসেবে পরিচিত। দলটির খেলোয়াড়দের প্রতি চিলির ক্রিকেটের এক ধরনের আগ্রহ থাকে। এমন একটি দলের হয়ে প্রথম ম্যাচে ভালো পারফর্ম করায় সোয়েবের নাম হয়ে যায়। সেই ২০১৬-তে খেলা শুরু করার পর থেকে এখন অবধি তিনি চিলির ক্রিকেটে নানা সময়ে ডাক পেয়ে থাকেন।
২০১৬ সালে এ দলে লীগ খেলেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে টপ ইলেভেনে চলে আসেন তিনি। চিলি ক্রিকেট এরপর তাদের র্যাংকিং থেকে সেরা ১৬ খেলোয়াড়কে ডাকে সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য। এ টুর্নামেন্টের বৈশিষ্ট্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বাদে আমেরিকার সব দলই খেলে। এর মধ্যে মেক্সিকো ও আর্জেন্টিনাও যুক্ত। দক্ষিণ বা মধ্য আমেরিকার দেশগুলোকে নিয়ে আয়োজিত বৃহৎ এ টুর্নামেন্ট টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হয়। সোয়েব যখন শুরু করেন তখনো আইসিসির অনুমোদনে ছিল না এ আয়োজন। অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপ থাকলেও ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টির মর্যাদা দেয়া হয়নি।
কিন্তু খেলার আয়োজন তো থেমে থাকে না। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো তাদের ক্রিকেট ফেডারেশন থেকে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। আদলটি আমাদের এশিয়া কাপের মতো। কোপা আমেরিকা বা কনকাকার মতো ক্রিকেটের এ আয়োজনের নাম করা হয় সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০১৬-তে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় প্রথম টুর্নামেন্টটি আয়োজিত হয়। এ টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে সোয়েবের যাত্রা হয় চিলির জাতীয় ক্রিকেটে। কেবল যাত্রাই নয়, তার দলটি হয়েছিল সেরা। ‘২০১৬ সালে আমি অফিশিয়ালি চিলির হয়ে খেলি। আর ওই বছর আমরা সাউথ আমেরিকান বা সেন্ট্রাল আমেরিকান জোনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।’
সোয়েব এ টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন চিলির হয়ে। মজার ব্যাপার দলটিতে মাত্র তিন-চারজন ছিলেন চিলির খেলোয়াড়। বাকিরা ভারতীয়, ইংলিশ ও অস্ট্রেলিয়ান। চিলির বেশির ভাগ দেশের ক্রিকেট দলের এটিই সাধারণ রীতি। প্রতিটি দেশের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই এ তিন দেশের। এমনিতে স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটে যেসব দেশ ভালো করে তাদের দেশ থেকেই খেলোয়াড় নেয়া হয়। তাছাড়া অভিবাসীদের সংখ্যা বা অনুপাতের কারণেও এমন হয়ে থাকে। আর সেখানে সোয়েব গাজী ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশী।
সোয়েবের এ অভিজ্ঞতা দক্ষিণ আমেরিকার এক নতুন চিত্র তুলে ধরে আমাদের কাছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ যে মহাদেশটিকে আমরা চিনি ফুটবলের জন্য, সেখানে আমাদের সাধারণ জানার বাইরে ক্রিকেট বেড়ে উঠেছে অগোচরে। এমনকি সেই ক্রিকেট খেলোয়াড়রা মূল ধারার ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের নাগরিক। তারা চিলিতে অভিবাসী বা সোয়েবের মতো টেম্পোরারি সিটিজেনশিপের অধিকারী। আবার সেখানে খেলাটাও হয় অন্যান্য অঞ্চলের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আদলে। যেমন সোয়েব নিজেই জানিয়েছেন, এখানে আমেরিকার বৃহত্তর ক্রিকেট টুর্নামেন্টটি আসলে হয় এশিয়া কাপের আদলে। হয়তো বিষয়টা কেবলই উদাহরণ। কেননা কোপা আমেরিকার সঙ্গেও তুলনাটা করা যায় সহজে। তবে মূল বিষয়টি হলো ক্রিকেট চর্চার ইচ্ছা আছে চিলির এবং সেখানে দলগুলো ক্রিকেট নিয়ে আশাবাদী।
কেননা সেখানে টুর্নামেন্টের পাশাপাশি নিয়মিত ঘরোয়া লীগ হয়। ২০১৬ সালে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য সোয়েব এর পরের দুই বছর ঘরোয়া লীগে খেলেন। ‘এর মধ্যে ২০১৯ সালে চিলি আইসিসি টি-টোয়েন্টি স্ট্যাটাস পায়।’ তথ্যটি চিলির ক্রিকেটের উন্নতির প্রমাণ দেয়। চিলির ক্রিকেটের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান বাংলাদেশী ক্রিকেটার সোয়েব। চিলির প্রথম অফিশিয়াল টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিতে তিনি খেলেছিলেন। এ খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল পেরুতে। একই সঙ্গে এটি সোয়েবের জন্যও ছিল প্রথম অফিশিয়াল টি-টোয়েন্টি। আইসিসির টি-টোয়েন্টি মর্যাদার ম্যাচ সোয়েবের জন্য এটি প্রথম। কিন্তু শেষ অবশ্যই নয়। তিনি নিয়মিত ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত আছেন। চিলির নানা ঘরোয়া ও বাইরের খেলায় অংশ নিচ্ছেন তিনি।
২০১৯ সালের পর ২০২০ সালে ব্রাজিলে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে যা পিছিয়ে যায়। পিছিয়ে যাওয়া সে টুর্নামেন্টটি আগামী ২৩ অক্টোবর শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন সোয়েব। পুরনো যে সাউথ আমেরিকান টুর্নামেন্ট খেলা হতো তা এখন আইসিসি সাউথ আমেরিকান টুর্নামেন্ট হিসেবে খেলা হবে। এ সময় চলছে খেলা-পূর্ববর্তী অনুশীলন পর্ব। এর আগে একটি খেলায় (২০১৮) ভিসা জটিলতার কারণে আর্জেন্টিনা যেতে পারেননি সোয়েব গাজী। তবে এবারের আসরের জন্য নিয়মিত চলছে তার প্র্যাকটিস। তার ভাষায়, ‘প্র্যাকটিস
করলাম গত সপ্তাহে। এ সপ্তাহের উইকেন্ডে আবার যেতে হবে। আগামী মাসে ব্রাজিলে যাওয়া হবে, যেহেতু গেম স্কোয়াডে আছি।’
চিলির আবহাওয়া বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন। এখানে জুন-আগস্টে ক্রিকেট খেলা হয় না। কেননা এ সময়ে চিলিতে শীত আর সেখানে বৃষ্টি হয় এ মৌসুমে। বছরের প্রথম কয়েকটা ও শেষের কয়েকটা মাস প্র্যাকটিস হয়। ক্রিকেট আর বৃষ্টি যেহেতু দুই মেরুর বিষয়, এ মৌসুমে খেলা তো সম্ভব হয় না। এমনকি প্র্যাকটিসও নয়। লীগ ও ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টেরও সময়কাল বছরের শেষ মাসগুলো—আগস্ট থেকে নভেম্বর।
চিলির মানুষ ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সোয়েবরা ২০১৭ সালে যখন ক্রিকেট শুরু করেন, তখন ততটা ভালো সুযোগ ছিল না বা ক্রিকেট খেলা হতো না। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ক্রিকেটের জন্য যেভাবে কাজ করা হয় চিলিতে তা নেই। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে ক্রিকেট বাংলাদেশে যে সময়ে যেভাবে শুরু হয়েছিল চিলিতে তা হয়নি। ব্রিটিশ যুগ থেকেই ক্রিকেট ভারতীয় উপমহাদেশে খেলা হতো ও তা পরে জনপ্রিয় হয়। চিলির চিত্রটা ভিন্ন। চিলিতে ফুটবলের যে জনপ্রিয়তা ছিল তা ক্রিকেটে ছিল না। এ কথা সোয়েবের গল্প থেকেই বোঝা যায়, কেননা তিনি যখন নিজের মতো করে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন, সেখানে ক্রিকেটের কোনো আলামত পাননি। এছাড়া চিলির তার বন্ধুকে তিনি ক্রিকেট শিখিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নিজে। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন চিলিতে খেলা হয় কিন্তু সেখানেও দেখা যায় চিলির খেলোয়াড়ের সংখ্য নগণ্য। বেশির ভাগই অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়। ক্রিকেটে সেভাবে গুরুত্ব বা সময়ও দেয়া হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক না হলেও স্থানীয় ও আইসিসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে চিলির ক্রিকেটে উন্নতি হতে শুরু করে।
চিলির ক্রিকেটের ক্ষেত্রে জাতীয় দলটি এর আগে চিলির সরকারের অধীন ছিল না, পরবর্তী সময়ে এটিকে সরকারের রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হয়। অর্থাৎ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে চিলির দল তথা ক্রিকেট। স্বভাবিকভাবেই এ পৃষ্ঠপোষকতা বা সরকারি মনোযোগের কারণে ক্রিকেট দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর ফলাফল চিলির স্কুল কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায়। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে এসব প্রতিষ্ঠানে আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তরুণদের মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এখন চিলিতে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্রিকেট খেলা হয় বলে সোয়েব জানিয়েছেন। স্কুলের বাইরেও শহরকেন্দ্রিক ক্রিকেট ক্লাবের সংখ্যা বাড়ছে। ক্রিকেটটা চিলিতে বিকশিত হচ্ছে।
চিলির ক্রিকেটের বিষয়টি বেশ আগ্রহোদ্দীপক। কেননা যে দেশটির ক্রিকেট নিয়ে বাইরে তেমন কোনো ধারণা নেই, তারা ক্রিকেটে নিয়মিত। অন্যদিকে সে দেশটির ক্রিকেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছেন একজন বাংলাদেশী। ফুলবলভিত্তিক এক মহাদেশের ক্রিকেটে আবার ফ্রন্ট লাইনেই আছেন একজন বাংলাদেশী। বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেট ভক্তদের জন্যও এ এক আশার খবর। সোয়ের গাজী পড়াশোনার জন্য চিলিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি পড়াশোনার পর চাকরি ও ক্রিকেটে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।
চিলি থেকে দেশে আসা একটু জটিল বিষয়। অনেকটা খরুচেও। দেশে তার তেমন আসা হয় না। সোয়েব বলেন, ‘প্রথম
আসার পর মনে হয়েছিল এ কোন অকূল সাগরে এসে পড়লাম!’ তার
এমন কথার কারণ সেখানে বাঙালিদের অভাব। সোয়েব যেখানে থাকতেন সেখানে বাঙালি বা বাংলাদেশী তো দূর, এশীয়দেরও পাওয়া যেত না। তবে চাইলেই ফেরা যায় না। ‘টিকিটের খরচ অনেক বেশি। প্রায় দুই আড়াই লাখ টাকা লাগত ফিরতে চাইলে। অত টাকা খরচ করা তো সম্ভব না। কতই ভাবলাম চলেই যখন আসছি তখন তো আর করার কিছু নেই। থাকতে হবে এখানে। থেকেই যাই।’ থাকাতে ভালোই হলো তার নইলে চিলির ক্রিকেট ইতিহাসের সঙ্গী হওয়া হতো না। এখন তিনি সেখানে নিজের মতো একটা জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশে আসার সুযোগ অবশ্য আগের মতোই কম। তিনি ২০১৯ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশে এসেছিলেন। এখন আবার আসার চিন্তা করছেন কিন্তু কবে নাগাদ আসতে পারবেন সেটা তিনি নিশ্চিত নন।
ক্রিকেটের বাইরে চিলিতে সোয়েব খুব যে ‘হোম’ অনুভব করেন তা নয়। কেননা চিলিতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা খুবই কম। কভিড-১৯-এর আগে চিলিতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০। এখন তা কমে গিয়ে ৫০ জনের মতো। তবে আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোর মতো এখানে পড়াশোনার খাতিরে খুব কম বাংলাদেশীই আসেন। সোয়েবের মতে, ‘চিলিতে
ব্যবসায়ের সুযোগটা বেশি। বাংলাদেশী টাকায় ৭-১০ লাখ টাকা হলেই এখানে ভালো ব্যবসা করা যায়। চিলিতে অভিবাসী বাংলাদেশীদের ৮০ শতাংশই ব্যবসা করেন।’ অর্থাৎ অন্যান্য অনেক দেশে যে সুযোগটা পাওয়া যায় না বা কঠিন, চিলির অভিবাসীরা তা পাচ্ছেন। এখানে তারা নিজেদের মতো করে ব্যবসাটা করতে পারেন।
চিলির বেশির ভাগ অভিবাসী বাঙালিদের ব্যবসা রেস্টুরেন্ট ও গ্রোসারি। ফাস্টফুড ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করে তারা ভালো করছেন। গ্রোসারির ব্যবসা তুলনামূলক সহজ ও এদিকে অনেকের ঝোঁক রয়েছে। এর বাইরে কিছু মানুষ কাপড়ের ব্যবসা করেন। বাংলাদেশী গার্মেন্টসের পণ্য নিয়ে তারা ব্যবসা করেন। তবে এ ব্যবসা নতুন। কেবলই শুরু হয়েছে। চিলিতে এ ধরনের ব্যবসা প্রসার হয়নি। তবে প্রসার করার সুযোগ রয়েছে।
চিলিতে বাঙালিদের রেস্টুরেন্টের মতো ভারতীয় ও পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সেখানে ভারতীয় ও পাকিস্তানি খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশী খাবারের মেনু তেমন নেই। ‘আমরা যদি একসঙ্গে কয়েকজন একত্র হই বা কেউ দাওয়াত করে সেক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টে এ ধরনের খাবার আয়োজন করা হয়। এছাড়া হয় না।’ চিলির বাঙালিরা সে দেশের খাবারেই মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
চিলির মানুষদের অন্য দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। ‘সাউথ এশিয়ান মানুষকে তারা অনেক ভালো জানে। সম্মান করে। তাদের সঙ্গে চলাফেরা করা বেশ কমফোর্টেবল একটা বিষয়। ওরা ওয়েলকামিং। মানুষকে তারা বেশ পছন্দ করেন।’ চিলিতে বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশী পরিবারের সংখ্যা খুব কম। চার-পাঁচটাই মাত্র আছে। বাকিরা এখানে একাই বসবাস করেন।
সোয়েব ক্রিকেটার। কিন্তু চিলিতে ফুটবলের চল বেশি সে কথা সবাই জানে। সোয়েব তাদের সঙ্গে তাদের মধ্যেই বসবাস করেন। মজার ব্যাপার দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির এ খেলা নিয়ে বাংলাদেশের মাতামাতি তাদের জানা নেই। সোয়েব অবশ্য তার চিলির বন্ধুদের সঙ্গে এ কথা বলেন। অবশ্য সেখানে কিছুটা বাধা রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আসলে
আমাদের আগ্রহ তো আর্জেন্টিনা ব্রাজিল নিয়ে। ওরা তো চিলির মানুষ। তো এটুকু অন্তত বলি যে আমাদের দেশ ফুটবল ভালোবাসে। তাদের আবিদাল, সানচেজকে নিয়ে আমাদের দেশে আগ্রহ আছে।’
চিলির বাইরে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছেন। এমন কোনো দেশ নেই আসলে যেখানে বাংলাদেশী নেই। প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, কলাম্বিয়া, বলিভিয়া প্রতিটি দেশেই তারা কোনো না কোনো কাজের সূত্রে অভিবাসী হয়ে বসবাস করছেন। এছাড়া ভেনেজুয়েলায় সোয়েবের পরিচিত একজন বাংলাদেশীই রয়েছেন। সোয়েব বলতে চান দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভালো সুযোগ রয়েছে এবং তারা ছড়িয়ে আছেন সেখানে নিজেদের মতো করেই। সোয়েবের ক্রিকেটের পাশাপাশি ব্যবসা ও চাকরিতেও তারা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন।
আলী আমজাদ : লেখক





