যেন মনে হচ্ছে এই সেদিন, যেদিন আমার জীবন চিরতরে বদলে গিয়েছিল। আমি জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করিনি, বরং শুরু করেছি জীবনের সম্পূর্ণ একটি বই।

আমার বয়স তখন ২৪ বছর। মাতৃভূমি, মা, মাটি ও পরিচিত মানুষের গন্ধ পেছনে ফেলে স্বপ্নের শহর লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে নতুন করে জীবনযাপন করা একটু কষ্টকর। কিন্তু এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে ১৯৯৫-এর এপ্রিলে। আমার সে দিনগুলো যেমন ছিল আনন্দদায়ক তেমন ছিল বেদনায় ভরপুর। দিনের মতো পরিষ্কার মনে আছে, সেদিন বাবা-মা আর ভাই আমাকে নিয়ে এসেছিল এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে। আমার আড়াই বছরের একমাত্র ছোট্ট বাবুকে নিয়ে পাড়ি জমালাম ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস সিটিতে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর পৌঁছলাম লস অ্যাঞ্জেলেস এয়ারপোর্টে। তখন প্রায় দুপুর। আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন আমার স্বামী ও তার এক শ্রীলংকান বন্ধু ক্রিস্টোফার।

লস অ্যাঞ্জেলেস! স্বপ্নের শহর! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া। এর উত্তরে ওরিগন, পূর্বে নেভাদা এবং আরিজোনা ও দক্ষিণে স্টেট অব মেক্সিকো। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম জনবহুল অঙ্গরাজ্য। বিখ্যাত হলিউড, সিলিকন ভ্যালি, নাপা ভ্যালি, সেকিয়া ফরেস্ট এগুলো সবই এই ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এ ক্যালিফোর্নিয়া দেশটির অন্যতম ধনী অঙ্গরাজ্য গোল্ডেন স্টেট নামে পরিচিত। আর লস অ্যাঞ্জেলেস হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বৃহৎ শহর।

আমি এখানে এসেছিলাম একজন বৈধ অভিবাসী হয়ে। এর অর্থ হচ্ছে আমি একজন গ্রিন কার্ডহোল্ডার। আর এই গ্রিন কার্ড হচ্ছে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে আমেরিকায় বসবাস করার সুযোগ লাভ। ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে গ্রিন কার্ড প্রদান করা হচ্ছে একজন খেলোয়াড়কে ফেয়ারলি প্লে করার জন্য মাঠে প্রবেশের অনুমতি দেয়া। আবার হকি খেলার ক্ষেত্রে এটি একটি সতর্ক কার্ড। বৈধ বা অবৈধ যাই হোক, নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে অভিবাসীদের কোনো কার্ড দেখাতে হয় না। বরং তাদের ধাপে ধাপে নিয়মকানুনের মধ্যেই চলতে হয়। সাধারণ ফেডারেল আইনগুলো মেনে চলা আমেরিকার জীবনের প্রথম শিক্ষা—রাস্তার ডান দিক দিয়ে গাড়ি চালানো; ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন কার্ড সারাক্ষণ নিজের সঙ্গে রাখা, যেন দরকার পড়লে খুব সহজেই তা বের করা যায়; সিটবেল্ট বেঁধে গাড়িতে বসা; শিশুদের বয়স অনুযায়ী কার সিটে বসানো; সব ট্রাফিক আইন ও সংকেত মেনে চলা। আর নিত্যকার জীবনের এই নিয়মনীতিগুলো অনেক গুরুত্ব বহন করে। আইনগুলো আমাদের সাধারণ নিরাপত্তা রক্ষা করে এবং অন্যান্য ব্যক্তি, সংস্থার এমনকি সরকারের দ্বারা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করে।

সাধারণ নিরাপত্তার জন্য আমাদের সাহায্য করার অনেক আইন আছে। এগুলো স্থানীয়, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে বিদ্যমান। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো খাদ্যনিরাপত্তা আইন। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে নাগরিক অধিকার আইন, ভোটাধিকার আইন, সামাজিক নিরাপত্তা সংশোধনী আইন, যা বয়স্ক ভাতা এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার আইন, জাতীয় প্রতিরক্ষা শিক্ষা আইন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করার আইন। অনেক বিধি রয়েছে, যা সবাইকে মেনে চলতে হয়। সমাজের দুর্বল শ্রেণীকে রক্ষা করার জন্য অনেক আইন প্রতিষ্ঠা হয়েছে।  এ ধরনের প্র-বিধান ভঙ্গ হলে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়। আর নিয়মগুলো যখন সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় তখন একটি  স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়, যার ফলে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকে।

কান্ট্রি অ্যান্ড দেয়ার কালচারস ফোরামের তথ্য অনুযায়ী ১৮৮০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশীদের অভিবাসন শুরু হয়। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন এবং তখন থেকেই এ দেশে বাংলাদেশীদের অবস্থান দ্রুত বাড়তে থাকে। এর আগে বাঙালি অভিবাসীরা বৈষম্যমূলক কারণে নাগরিকত্ব পায়নি। তখন শুধু শ্বেতাঙ্গ-ককেশীয়দের নাগরিকত্বের অনুমতি দেয়া হতো। যাই হোক, এই অভিবাসীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধরনের ছাত্রকর্মী অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ব্রিটিশ ভাইসরয় জর্জ লর্ড কার্জনের হাতে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। ছাত্রদের এ ক্ষুদ্র দলটি পশ্চিম উপকূলে, সানফ্রান্সিসকো, ওরিগন ও ওয়াশিংটনে বসবাস স্থাপন করেছিল। এই ছাত্র-অভিবাসীরা পশ্চিম এবং পূর্ব উভয় বাংলা থেকেই এসেছিল এবং তাদের সংখ্যা আনুমানিক একশ ছিল। কিছুসংখ্যক সামুদ্রিক বাণিজ্যিক ব্যবসায়ীরাও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অভিবাসিত হয়েছিল। এমনকি জাহাজ থেকে লাফিয়ে স্বল্পসংখ্যক অভিবাসী নিউইয়র্ক এবং সানফ্রান্সিসকোতে স্থান নিয়েছিল। জাতিগত বৈষম্যের কারণে শ্বেতাঙ্গ নারীদের বিয়ে অন্যদের সঙ্গে নিষিদ্ধ থাকায় বাংলা থেকে আসা পুরুষ অভিবাসীদের অধিকাংশই মেক্সিকান কালো বা মিশ্র বর্ণের নারীদের বিয়ে করে এবং এই জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্প্রদায়ও গঠন করে।

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশী অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের সব স্টেটে বসবাস করেছেন ও করছেন। ২০১৯ সালের সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার বাংলাদেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। নিয়মকানুন এবং বসবাসের সুযোগ-সুবিধার জন্য বাংলাদেশীরা সব স্টেটের সর্বত্র বসবাস করেন না। এদের বেশির ভাগই নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন এলাকা, নিউজার্সি, ওয়াশিংটন ডিসি, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ইলিনয়, মিশিগান ও উইসকনসিনে বসবাস করেন। তবে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী নিউইয়র্কে বসবাস করেন। প্রায় এক লাখের বেশি বাঙালি এখানে রয়েছেন। যদিও নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাস তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল তবুও ইউনিট শেয়ার করে থাকা, কাজ ও যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা থাকায় বেশির ভাগ বাংলাদেশী এ শহরে বসবাস করেন।

হাজার বছর ধরে অবৈধ অভিবাসীর আমেরিকায় প্রবেশের গল্প হয়তো ভিন্ন। কিন্তু এখানে আইনকানুন সবার জন্য সমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা একজন অভিবাসী শিশুর অভিজ্ঞতা অনেক সময় জীবনে নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়। কারণ তাদের গল্পগুলো অনেক হূদয়বিদারক, হতাশায় আবদ্ধ। এমন যন্ত্রণা ও বেদনাগ্রস্ত, যা ৩০ বছর পরেও নিরাময় হয়নি। বছরের পর বছর পরিবারের অনেক সদস্যের সঙ্গে এদের দেখা হয় না। একটি সুদিনের প্রত্যাশায় অনেক বাবা-মা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি উন্নত জীবন খোঁজার মধ্য দিয়ে বহু ত্যাগ শিকার করে অভিভাসীরা। এখানে কলেজে পড়াশোনা করার কোনো বয়সসীমা নেই। এমন আলাদা কোনো কলেজ নেই, যাতে শুধু বয়স্করাই পড়তে পারবে। দেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে তার যথাযথ স্বীকৃতি না পেয়ে অনেকেই আবার ডিগ্রির পুনরাবৃত্তি করতে স্কুল-কলেজে ফিরে যায়।

আমি যখন এসেছি তখন আমেরিকার প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভাষার প্রতিবন্ধকতা। বেশির ভাগ মানুষ খুব কম ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসে। কর্মসংস্থান, স্কুল ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য তাদের তখন দ্রুত ইংরেজি শিখতে হতো। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। সেই ২৯ বছর বয়স থেকে আমিও কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখেছি, আমার বহুদিনের পরিচিত রাইমা সিরাজও স্বপ্নে বিভোর ছিল। বছরে দু-একটা ক্লাস নেয়া আমাদের জন্য কখনোই সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু রাইমা, ও হারতে চায়নি।

রাইমার স্বপ্নের লড়াই আর আমারটা সম্পূর্ণ আলাদা। হয়তো আমাদের স্বপ্নগুলো এক, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার কিংবা না-পৌঁছার গল্পটি ভিন্ন। আমরা একই বয়সী, রাইমা ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস পিয়ার্স কলেজে সবে ক্লাস নিয়েছে। ওর একমাত্র ছেলের বয়স তখন চার। সে প্রি-কিন্ডারগার্টেনে যায়। মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা ক্লাস শেষে যখন ও বাড়ি ফিরত তখন ওর স্বামী ঘুমিয়ে পড়ত। বেচারাও-বা কী করবে? সারা রাত কাজ করে দিনের বেলা ঘুমিয়ে আবার রাতে কাজ করার শক্তি জোগাচ্ছে সে। আসলে রাতে আর দিনে এখানে কোনো পার্থক্য নেই। সপ্তাহে তিন-চারদিন রাইমা স্কুলে যেত। স্কুল থেকে এসে দেখত ছেলে ওর জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। ছেলের বিষণ্নতা আর একাকিত্ব সহ্য করতে না পেরে আবার বন্ধ হলো রাইমার কলেজ যাওয়া। চাইল্ড কেয়ারের তিনটি ক্লাস শেষ করে এবারো তাকে কলেজ ড্রপ দিতে হলো। অনেক দিন পেরিয়ে গেলে রাইমা এবার ফুলটাইম কাজ শুরু করল। প্রায় বছর তিন পর রাইমা এবার মেয়ে সন্তানের মা হয়েছে। কলেজে যাওয়া বন্ধ রেখে এবার ও নিউবর্ন বেবিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। আর ফিরে যাওয়া হলো না কলেজে। কারণ শিশুরা মায়ের অনুপস্থিতির কারণে মানসিকভাবে অসুস্থতায় ভোগে। তাদের মধ্যে এডিএইচডির মতো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। এই ভেবে ওর নিউবর্ন বেবিকে মায়ের আদর-স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করল না। অবশ্য চাইল্ড সাইকোলজি বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই।

বছর চার পরের কথা। এবার দুই সন্তানকে স্কুলে নেয়ার পালা। একজন প্রি-কিন্ডারগার্টেন আরেকজন ফোর্থ গ্রেড। সব যেন এলোমেলো হয়ে গেল। যেন এ এক ব্যস্ত জীবন। আর এ ব্যস্ততা শুধু রাইমা আর আমার নয়। সবার গল্প এমনই। চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠা রাইমার ছোট্ট ছেলে আর মেয়ে দুটি আজ কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও রাইমা তার অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি অর্জন করে দীর্ঘদিন ধরে একটি করপোরেশনে কাজ করছে। সেদিন হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল ওর সঙ্গে। দীর্ঘ একটানা তিন বছর ভয়াবহ কভিড ১৯-এর কারণে আমাদের প্রায় সব রকম সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আমরা একে অন্যের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি। ও আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চাচ্ছিল না। গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল ওর জমে থাকা সেই গল্পগুলো, যা আমরা প্রায়ই করতাম। স্টুডেন্ট ভিসায় পড়তে এসে অবৈধ অভিবাসী হয়ে গেল রাইমার বড় ভাই আর ভাবি, আমেরিকার ফ্লোরিডায় বসবাস করছিল দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে। আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করা তার দুই মেয়ের বড় মেয়ে ১৮ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর বাবা-মায়ের জন্য অ্যাপ্লিকেশন করেছিল আর সে কারণেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বৈধতা পেল ওর ভাই-ভাবি। এ যেন এক মহা উল্লাস আর আনন্দ! দীর্ঘ ৩০ বছর পর আমেরিকায় বৈধতার আনন্দ যেন ওর পরিবারকে এক নতুন জীবন দান করল। রাইমার পরিবারের এ আনন্দ-উল্লাস আমাকেও ছুঁয়ে গিয়েছে। এখানকার একেকটা পরিবারের আনন্দ যেন কারো একার নয়, আমাদের সবার। এখানে কোনো কিছু অর্জন যেন সব বাংলাদেশীদের অর্জন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন লিটল বাংলাদেশ (খরঃঃষব ইধহমষধফবংয) সাইনবোর্ডটির কথা ধরা যাক। ক্যালিফোর্নিয়ার  লস অ্যাঞ্জেলেসের নিউ হ্যাম সায়ার এবং থার্ড স্ট্রিটের সংযোগস্থলে এটি অবস্থিত । ২০১০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি কর্তৃক এটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয়। এ স্থানটিকে বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের বসবাস ও ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু বলা যেতে পারে। লিটল বাংলাদেশ নামকরণ নিয়ে কোরিয়ান আমেরিকান এবং বাংলাদেশী আমেরিকানদের মধ্যে বেশ উত্তেজনাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এক সময়। কোরিয়ান আমেরিকানরা এটাকে কোরিয়ানদের অংশ হিসাবে ‘কোরিয়া টাউন’ নামকরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউনসেলর ঞড়স খধইড়হমব এর বিরোধিতা করে বাংলাদেশীদের পক্ষে কাজ করে লিটল বাংলাদেশ নামকরণে সহায়তা করেছিলেন।  প্রায় এক বছর বাংলাদেশীদের কঠোর পরিশ্রমের পর ২০১০ সালে সরকারিভাবে এটি অনুমোদন পেয়েছিল  এবং ২০১১ সালে খরঃঃষব ইধহমষধফবংয সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়।

 মেক্সিকো থেকে প্রতিনিয়ত ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রবেশ করছে বহু অবৈধ অভিবাসী। শুধু  বাঙালি নয়। নানা দেশ থেকে আসছে ওরা। এ রকম হাজারো পরিবার অবৈধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবার বৈধতার স্বপ্নে পাড়ি দিচ্ছে দীর্ঘ পথ। গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এখানে কোনো ব্যক্তি তার জীবনে যা হতে চায় তার দরজা খোলা আছে। নতুন পরিবেশ, খাবার-দাবার, সংস্কৃতি, ভাষা—সবকিছুই এখানে আলাদা। আস্তে আস্তে নতুন লোকেদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। জীবনযুদ্ধ শেষে নিজেকে স্বপ্নের সে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময়। তবে কোনো কিছুই অসাধ্য নয়। ‘আমেরিকান ড্রিমে’র সাধনা প্রায়ই প্যারাডক্সিক্যাল। মা-বাবা সর্বদাই আশা করেন, সন্তানরা তাদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে অক্ষত রেখে সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে নিজস্ব হাইব্রিড পরিচয় ও পদ্ধতি তৈরি করবে। এমন আশার বাস্তবায়ন সুদূরের আমেরিকায় সম্ভব হয় না মোটেও। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে চলে। স্বপ্নে বাঁচে।

 

আফরোজা রিতা হক: লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত বাংলাদেশী