উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা এখন আর স্বপ্নের দেশ নয়। তাই বলে যে দুঃস্বপ্নের দেশে পরিণত হয়েছে, এমন নয়। শুধু বলতে চাই, এটা এখন খুব বেশি রকমের বাস্তব। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসছে। একটা পরিসংখ্যানে দেখেছিলাম, ২০২০-২১ শিক্ষাবছরে (আগস্ট-জুলাই) বাংলাদেশের প্রায় নয় হাজার শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছিল। এ প্রবন্ধে তাদের জীবনের একটা সাধারণ চিত্র দেখানোর চেষ্টা করব।

অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যাজুয়েট স্টাডির ব্যবস্থাটা একটু আলাদা। মাস্টার্স বা পিএইচডিকে এখানে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম হিসেবে ধরা হয়। অন্য অনেক দেশে স্কলারশিপের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা এক অর্থে চাকরিজীবী। ওদের সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কোনো এক শিক্ষককে ক্লাসরুমে অথবা কোনো শিক্ষকের গবেষণায় সাহায্য করতে হয়। এদের যথাক্রমে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে। এ চাকরির জন্য স্টুডেন্টদের পড়াশোনার বেতন মাফ করে দেয়া হয়, পাশাপাশি ওদের বেতনও দেয়া হয়। বেতন কেমন বা সে বেতনে জীবনযাত্রার মান কেমন হতে পারে, সেটা নিয়ে একটু পরে বলছি। আগে শিক্ষার মান আর ধরন নিয়ে একটু বলে নিই।

সত্যি বলতে, এসএসসি পরীক্ষার পর আমাকে কেউ তেমন একটা পড়তে দেখেনি। এইচএসসির পুরো দেড় বছর কাটিয়েছি ফাঁকিবাজি করে। অনেকেই ভেবেছিল, পাস করার সম্ভাবনা শূন্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স করার সময় প্রথম সেমিস্টারে সবাই মনে করেছিল আমি হয়তো কয়েক সাবজেক্টে ফেল করব। কারণ পরীক্ষার আগের দুই সপ্তাহ সবাই আবাসিক হলে চলে আসত, ধুমায়ে পড়াশোনা করত। সেই দুই সপ্তাহেও সবাই আমাকে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরতে দেখেছে, গল্পের বই পড়তে দেখেছে। এইচএসসিও পাস করেছি সম্মানের সঙ্গে, অনার্সও তাই। কলেজ আর ভার্সিটি জীবনে শুধু একটা কাজ ঠিকমতো করতাম, কলেজে যখন বিভিন্ন সাবজেক্টের জন্য প্রাইভেট পড়তে যেতাম আর ভার্সিটিতে যখন স্যাররা ক্লাসে লেকচার দিতেন, তখন মনোযোগ দিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করতাম। এসএসসি পর্যন্ত মুখস্থ করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে (বাবা-মা, শিক্ষক) এক ধরনের চাপ থাকত। এরপর থেকে সেই চাপ আর নিজের ওপর নিইনি। যেকোনো বিষয়ের ভিত্তিটার আগাগোড়া বুঝতে চেয়েছি।

ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেললাম। মূল কথা হচ্ছে, মুখস্থ না করে বোঝার ওপরে মনোযোগ দেয়ার চর্চা যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্যান্য দেশে গেলে চমত্কার কাজে দেবে। এখানে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো এমনভাবে বানানো হয়, যাতে মুখস্থ করলে লাভ হয় না। ক্লাসে শেখা বিষয়গুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটার ওপরে প্রশ্ন হয়। অনেক শিক্ষকই ‘ওপেন বুক এক্সাম’ নেন, যেখানে ক্লাসের সব লেকচার আপনি পরীক্ষার হলে নিয়ে আসতে পারবেন। আবার অনেক শিক্ষক প্রশ্ন দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাসায় পাঠিয়ে দেন। এরপর ক্লাস লেকচার, ইন্টারনেট, সব ব্যবহার করে আপনি উত্তরপত্র তৈরি করে জমা দেবেন। এটাকে ‘টেক হোম এক্সাম’ বলে। আমার কাছে ব্যবস্থাটা চমত্কার মনে হয়েছে। বাস্তব জীবনে যখন আমি চাকরি করব, তখন সামনে কোনো সমস্যা এলে কি আমি একটা বদ্ধ ঘরে ঢুকে আমার স্মৃতি থেকে সেটার সমাধান বের করব? নাকি বই বা ইন্টারনেট থেকে সব উপাদান ঘেঁটে বের করে সমাধানের উপায় খুঁজব? তাই এখানে পরীক্ষা বা বাড়ির কাজে বাজিমাত করতে চাইলে আমার পরামর্শ হচ্ছে, ক্লাস লেকচারের সময় এমনভাবে নোট নিন, যাতে সেটার ওপর চোখ বুলালেই পুরো জিনিসটা আবার আপনার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে ভালো শিক্ষক আছেন অনেক। আমি নিজেই এত চমত্কার কিছু শিক্ষক পেয়েছি, যারা না থাকলে শিক্ষার প্রকৃত সৌন্দর্যটা ধরতে পারতাম না। যুক্তরাষ্ট্রে সে ধরনের শিক্ষকদের সংখ্যা আরো বেশি। অনেকেই বেশ মজা করে ক্লাস নেন, ছাত্ররাও ক্লাসে হাসি-ঠাট্টা করতে পারে। এমন অনেক শিক্ষক পেয়েছি, যাদের লেখা বইগুলো বাংলাদেশেও অনেকের পাঠ্যবই। তাদের কাছ থেকে তাদেরই লেখা বইতে অটোগ্রাফ নেয়াটা খুবই আনন্দের ব্যাপার!

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবনে আরেকটা বড় আনন্দের ব্যাপার নিজের গবেষণার ফলাফল যখন ভালো মানের কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নালে প্রকাশ হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রদের গবেষণা করতে হয়। সে গবেষণার ফলাফল প্রবন্ধ আকারে (মাস্টার্স থিসিস বা পিএইচডি ডেজার্টেশন হিসেবে) লিখে জমা না দিলে ডিগ্রি হবে না। এটা তো সবাই জানে। আরো একটা জিনিস যেটা জানা দরকার, সেটা হচ্ছে আপনার রিসার্চ সুপারভাইজার বা মেজর প্রফেসর যদি আপনার কাজে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে গবেষণার ক্ষেত্রে আপনাকে ‘অসন্তোষজনক’ গ্রেড দিতে পারেন। দুই সেমিস্টারে দুবার ‘অসন্তোষজনক’ গ্রেড পেলে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ বাতিল হয়ে যাবে। তখন নিজেকে টিউশন বাবদ চড়া মূল্য দিতে হবে, আবার মাসিক বেতনও পাওয়া যাবে না। আরো এক কারণে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চলে যেতে পারে, সিজিপিএ ৩-এর নিচে চলে গেলে, দুটো বিষয়ে ‘সি’ গ্রেড পেলে। এসব কারণে কেউ কেউ তটস্থ হয়ে থাকলেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়াশোনা, গবেষণা আর ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে পারে।

আমার মনে হয় গবেষণা আর ইংরেজি দক্ষতার পাশাপাশি আরেকটা বিষয়ে সবার দক্ষতা থাকা উচিত, সেটা হচ্ছে সময়ের কাজ সময়ে করা, টাইম ম্যানেজমেন্ট। প্রতিদিন নিয়মিত কাজ এগিয়ে নিতে পারলে, একটু একটু করে নিশ্চিত অগ্রগতি করতে থাকলে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জন্য সোনায় সোহাগা। কিন্তু গড়িমসি কমবেশি সবাই করে। তখন দেখা যায়, রাত জেগে কাজ করতে হচ্ছে। গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের কাজের চাপ থাকে ভালোই। কিন্তু সে কাজের বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য সময় চুরি করে বের করে নিতে হয়।

এখানে মানুষ সপ্তাহে পাঁচদিন মানে উইকডেগুলোয় ধুমিয়ে কাজ করে। এরপর শনি আর রোববার মানে উইকেন্ডে আয়েশ করে। গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের মধ্যে কাউকে কাউকে উইকেন্ডেও কাজ করতে হয়। তবে বেশির ভাগ আমেরিকান শিক্ষার্থী এটা একদম পছন্দ করে না। আমার এক আমেরিকান বন্ধু তার পিএইচডি জীবনের প্রথম সপ্তাহে তার সুপারভাইজারকে বলে দিয়েছিল, ‘আমাকে সন্ধ্যার পরে বা উইকেন্ডে ই-মেইল দিলে রিপ্লাই পাবে না, কারণ আমি ওই সময় ই-মেইল চেকই করি না।’ এটার জন্য তার পিএইচডি জীবনে কোনো সমস্যাই হয়নি। উল্টো আমার পরিচিত কেউ তার মতো এত দ্রুত পিএইচডি শেষ করেনি। মাত্র ২ বছর ৩৬৩ দিনের মাথায় (অর্থাত্, তিন বছরের চেয়ে কম সময়ে) সে পিএইচডির সব কাজ শেষ করে ফেলেছিল। অন্যদিকে আমি অনেক উইকেন্ডেও কাজ করেছি, অনেক উইকডেতে ফাঁকিও মেরেছি, ফলাফল কাটাকাটি হয়ে গিয়েছে। আমি ৩ বছর ৭ মাসে একটা পিএইচডি আর একটা মাস্টার্স নিয়ে বের হয়েছি। গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের কেউ কেউ উইকেন্ডে কাজ করলেও পড়াশোনা শেষে চাকরিতে ঢুকে কেউ উইকেন্ডে কাজ করে না বললেই চলে। আমি পিএইচডি শেষ করে একটা ন্যাশনাল ল্যাবে ঢুকেছি প্রায় এক বছর হলো। এক বছরে আমার রিসার্চ গ্রুপ ম্যানেজার আমাকে একবারের জন্যও উইকেন্ডে কাজ করতে বলেনি। প্রত্যেক শুক্রবার বিকালে কথা হলে ‘হ্যাভ এ ফান উইকেন্ড’ বলে বিদায় দিয়েছে। অবশ্য আপনি কাজপাগল বা ওয়ার্কোহলিক হলে ভিন্ন কথা। আর একাডেমিক লাইনে থাকলে, মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলে মনে হয় উইকেন্ডে কাজ করার হার বেড়ে যায়।

অনেককেই দেখেছি, উইকেন্ডে একসঙ্গে অনেক রান্না করে রেখে দেয়। যাতে সপ্তাহের মাঝে বেশি রান্নাবান্নার ঝামেলা পোহাতে না হয়। আমার পরিচিত একজন শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় একদমই রান্না করতে পছন্দ করত না। সে রোববার রাতে একসঙ্গে বেশি করে নুডুলস সেদ্ধ করে রাখত। এর পরের পাঁচদিন একেক বেলায় একেক রকম সস দিয়ে সেই নুডুলস মিশিয়ে খেত। এটা আমার পক্ষে একেবারেই সম্ভব হতো না। অনেক গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টই ঝটপট রান্না করা শিখে নেয়। বিশেষ করে মুরগি আর শাকসবজি দ্রুত রান্না করা যায় বলে এগুলোই গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের প্রধান খাদ্য।

আমেরিকা অনেক ব্যস্ত জায়গা, কথা সত্য। তার পরেও এখানে আপনি আপনার বিনোদন ও সৃজনশীলতার পেছনে সময় দিতে পারবেন। আমার বেশির ভাগ সৃজনশীল কাজ কিন্তু আমেরিকায় আসার পরেই। আমি যখন এসেছিলাম, তখন (২০১২ সালে) হলিউডের নতুন সিনেমাগুলো হলে আসত না। সত্যি বলতে, আমেরিকায় আসার পেছনে এটা ছিল অন্যতম একটা কারণ। গল্পটা বেশ মজার!

২০১০ সালের কথা! ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইনসেপশন’ মুভি বের হবে। আমি আর আমার বন্ধু সালমান দুজনেই সিনেমাপাগল। অধীর আগ্রহে ইনসেপশন দেখার জন্য দিন গুনছি। সিনেমা রিলিজ হয়ে গিয়েছে অনেক আগে, কিন্তু তখনো বাংলাদেশে ভালো প্রিন্টের ডিভিডি আসেনি। প্রতিদিন ডিভিডির দোকানে ঢুঁ মারি, আর জিজ্ঞেস করি, ‘ইনসেপশন এসেছে?’ দোকানদার আমাকে এমন চেনা চিনেছিল যে দরজা দিয়ে উঁকি দিলেই বলে দিত, ‘এখনো আসে নাই।’ ওই রকম একদিন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সালমান আর আমি শপথ করেছিলাম, ক্রিস্টোফার নোলানের পরবর্তী মুভি আমরা আমেরিকায় একসঙ্গে দেখব। সে ওয়াদা আমরা রাখতে পেরেছিলাম। দুই বছর পর ২০১২ সালে আমরা একসঙ্গে ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’ দেখেছিলাম আমেরিকার সিনেমা হলে।

গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের বেতন খরচ করতে হয় টিপে টিপে। কিন্তু সিনেমা দেখার ব্যাপারে কখনো কার্পণ্য করিনি ঘুণাক্ষরেও। মাস্টার্স/ পিএইচডি শেষ করার পর সত্যিকারের চাকরি করলে যত বেতন পাবেন, গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের বেতন সে তুলনায় সামান্য। তবে সে টাকায় থাকা-খাওয়ার কাজ চলে যায়, মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক ঘুরতে যাওয়া যায়, একটু হিসাব করে চলতে পারলে দুয়েক বছরের মধ্যে পুরনো গাড়িও কিনে ফেলা যায়। যদি একা আসেন এবং এখানে কোনো রুমমেটের সঙ্গে থাকেন, তাহলে বেশ ভালোই টাকা-পয়সা জমানো যায়। প্রথম দুই বছর আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে আমার কোনো রুমমেট ছিল না। তার পরও প্রথম বছরের ডিসেম্বরেই নিউইয়র্ক সিটি আর ওয়াশিংটন ডিসি ঘুরতে গিয়েছিলাম। দুই বছর শেষ হতে না হতেই একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনে ফেলেছিলাম। প্রথম গাড়ি কেনার আনন্দটা অন্যরকম। প্রথম পাসপোর্ট পাওয়ার আনন্দের মতো! পাখির ডানা পাওয়ার আনন্দের কাছাকাছি। যা-ই হোক, বলছিলাম ঘোরাঘুরির কথা! হ্যাঁ, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়ই ৫০টার মধ্যে ১৪-১৫টা স্টেট ঘুরে ফেলেছিলাম। বড় গ্রুপের মধ্যে থাকলে অনেকে আরো বেশি ঘোরাঘুরি করে।

কিশোর বয়সে যখন হলিউডি মুভি দেখা শুরু করেছিলাম, তখন আমেরিকা বলতে শুধু নিউইয়র্ক সিটি বা লস অ্যাঞ্জেলেস চিনতাম। কিন্তু আদতে আমেরিকা অনেক বড় একটা দেশ। বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় সত্তর গুণ বড়। এখানে ঘুরে দেখার মতো জায়গার কোনো শেষ নেই। বড় বড় শহর তো আছেই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও কোনো কমতি নেই। শুধু ন্যাশনাল পার্কই আছে ৪০০ ওপরে। স্টেট পার্ক, বিনোদন এলাকা (পিকনিক বা রিক্রিয়েশন এরিয়া), সংরক্ষিত বন, এসব তো আছেই। একসঙ্গে বন্ধুবান্ধব মিলে ঘুরতে গেলে বেশ কম খরচে অনেক কিছু দেখা যায়। হোটেল, ভাড়া করা গাড়ি, এগুলোর খরচ ভাগাভাগি হয়ে গেলে বেশ সুবিধা হয়। এছাড়া আরো একটা উপায়ে ঘোরাঘুরি করা যায়, সেটা হচ্ছে কনফারেন্সে যাওয়া। আমি বেশ কয়েকটা স্টেটে যেতে পেরেছি বিভিন্ন কনফারেন্সে আমার গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনা করতে গিয়ে।

হঠাত্ বাংলাদেশ ছেড়ে এখানে এলে অনেকেই দেশে ফেলে আসা মানুষ আর স্মৃতিগুলোর কথা ভেবে মন খারাপ করে। সেটা অবশ্য বেশিদিন থাকে না। আসার পর প্রথম প্রথম ডলারে খরচ করতে অনেকেরই মন খচখচ করে। কয়েক মাসের মধ্যে সেটাও চলে যায়। তবে অনেক দিন চলে যাওয়ার পরেও প্রবাসীদের জন্য কিছু কিছু জিনিস পাল্টায় না। আমরা এখনো দুটো টাইমলাইনে থাকি। নিজের ঘড়ির পাশাপাশি ‘বাংলাদেশে এখন কয়টা বাজে’ এটা ভেবে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এখানে আসার পর যদি বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কমিউনিটি পাওয়া যায়, তাহলে অভিযোজন করতে কিছুটা হলেও সুবিধা হয়। বেশির ভাগ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ই মোটামুটি সংখ্যক বাংলাদেশী শিক্ষার্থী থাকে। ওদের অ্যাসোসিয়েশনও থাকে। আমি যেখানে মাস্টার্স করতে এসেছিলাম, সেখানে আমি ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ছিল না, কোনো অ্যাসোসিয়েশনও ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ছোট, শহরটাও ছিল ছোট। দেশি খাবার মিস করতাম, বাংলা স্টাইলে আড্ডা দেয়াও মিস করতাম। তবে এতে লাভও হয়েছে একটা। অনেকেই আমেরিকায় এসে সোশ্যাল সার্কেল বলতে শুধু নিজের দেশের মানুষের সঙ্গেই মেশে। আমার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। আমি আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গভাবে পরিচিত হতে পেরেছিলাম। আমেরিকানরা কীভাবে অক্টোবরে হ্যালোইন, নভেম্বরে থ্যাংকস গিভিং, ডিসেম্বরে ক্রিসমাস, এগুলোর উদযাপন করে সেগুলো খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলাম।

ভালো-খারাপ সব রকমের স্মৃতিই আছে প্রবাস জীবনে। স্মৃতিকাতরতার ব্যাপারটা বাদ দিলে ভালোর পাল্লাটাই অনেক ভারী হয়ে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সম্ভাবনার একটা জায়গা। যদি উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে চান, এখানে সে সুযোগ অনেক বেশি। এরই মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী সুযোগটা নিচ্ছে। তবে আসল সত্যটা হচ্ছে মোট সুযোগের খুবই সামান্য একটা অংশকে কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।

ফরহাদ হোসেন মাসুম: গবেষক, আর্গন ন্যাশনাল ল্যাব, শিকাগো, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র