২০০৮ সালের কথা। আমি তখন আমেরিকায় নতুন এসেছি। নিউজার্সিতে থাকি। আশপাশে কোনো বাঙালি নেই। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অফিসে ব্যস্ত থাকি। বিকালের পর থেকে আর সময় কাটতে চায় না। হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইভারের মতো সার্ভিস তখনো মার্কেটে আসেনি। কলিং কার্ডই একমাত্র ভরসা। দশ ডলারের কলিং কার্ড এক ডায়ালেই শেষ হয়ে যায়। লাগেজে করে যে কয়েকটি বাংলা বই আনতে পেরেছিলাম, তার প্রায় সবই পড়া শেষ। এর মধ্যে ভারতীয় কিছু কলিগের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাদের বিশাল কমিউনিটি। বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন করে তারা। কিছু না থাকলে বাসায় বাসায় পটলাক করে। আমিও দাওয়াত পাই। কিন্তু সেসব দাওয়াতে, তাদের আড্ডায় নিজেকে আউটসাইডারের বেশি কিছু মনে হয় না। তাদের ক্রিকেট টিম, তাদের রাজনীতি, তাদের সাহিত্য, তাদের ফিল্ম নিয়ে যেসব তর্ক বা আড্ডা হয়, সেসবে আমি আমাকে খুঁজে পাই না। দেশের জন্য মন পুড়তে থাকে। ৮০০০ মাইল দূরের বাংলাদেশের জন্য হাহাকার জাগে। টং দোকানের এক কাপ চায়ের জন্য মন আঁকুপাঁকু করে। এমনই এক সময়ে কাকতালীয়ভাবে একদিন আমি মুক্তধারায় হাজির হই। জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ স্ট্রিটের ৩৭-৬৯ ঠিকানার দ্বিতীয় তলায় দরজা ঠেলে ঢুকতেই আমি খানিক সময়ের জন্য বিভ্রান্ত হই। আমার মনে হয় এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের এলিসের মতো খরগোসের পেছন ছুটতে ছুটতে আমি আজিজ সুপার মার্কেট অথবা বাংলাবাজারে চলে এসেছি। তাকিয়ে দেখি চারপাশে থরে থরে সাজানো বাংলা বই। লোকজন বাংলায় কথা বলছে। কয়েকজন বসে ডালপুরি খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছে। একজনের কথায় পুরান ঢাকার টোন। আমার কাছে তখন তাকে শহীদুল জহিরের গল্পের চরিত্র আব্দুল করিম মনে হতে থাকে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাই আব্দুল করিম আহাজারি করে বলে উঠে, ‘ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু!... এই হালারা আলু দিয়া কেমুন ডাইলপুরি বানায়!’ সে দিনই আমার প্রথম মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিতদার সঙ্গে সরাসরি পরিচয় হয়।

সন্ধান পাওয়ার পর মুক্তধারা আমার নিয়মিত গন্তব্যে পরিণত হয়। নিউইয়র্ক গেলেই আমি মুক্তধারায় ঢুঁ মারি। বই কিনি। কিছুদিন পর নিউইয়র্কে থিতু হলে আনাগোনার পরিমাণটা আরো বাড়ে। একসময় বুঝতে পারি মুক্তধারা কেবল একটা বইয়ের দোকান নয়, বরং আমেরিকার, বিশেষ করে নিউইয়র্কের বাংলা সাহিত্যে ও সংস্কৃতির হাব তথা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেই নব্বইয়ের দশক থেকে, যখন ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি, তখন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, বাংলাদেশের গান, নাটক, বই প্রভৃতি আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে সহজলভ্য করার মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে মুক্তধারা। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের সঙ্গে আমেরিকায় বসবাসরত অভিবাসী পাঠক ও লেখকদের যোগসূত্র বজায় রাখার জন্য মুক্তধারার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও আমার নজরে পড়ে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা অন্যতম।

নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলার যাত্রা শুরু ১৯৯২ সালে। বাংলাদেশের বইমেলার চিন্তা প্রয়াত কথাসাহিত্যিক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীনের মাথায় এলেও যারা এটাকে বাস্তবায়ন করেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা অন্যতম। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমির একুশের যে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বইমেলার আয়োজন ছিল না। তবে সে অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা। সঙ্গে ছিলেন বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম এবং স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনেও। চিত্তরঞ্জন সাহাদের সেসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগই একসময় একুশে বইমেলার সূত্রপাত করে। সম্পর্কে চিত্তরঞ্জন সাহা নিউইয়র্ক মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহার আত্মীয়; জেঠাতো ভাই। এই বিশ্বজিৎ সাহার হাত ধরেই ১৯৯২ সালে ব্রুকলিনে যাত্রা শুরু হয় নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলার। ধারাবাহিকভাবে চলছে ৩১ বছর ধরে। ২০২০ সালের অতিমারীতেও থেমে থাকেনি আয়োজন। ভার্চুয়ালি যে বইমেলা করা যায়, সেবার সে ধারণার সফল বাস্তবায়ন করেছিল নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা। বাংলাদেশ ও কলকাতার বাইরে তৃতীয় বৃহৎ বাংলা বইমেলা।

নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলার ফরম্যাট বুক এক্সপো আমেরিকা বা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো নয়। এই বইমেলার আয়োজন অনেকটা একুশে বইমেলার মতোই। মেলাকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশ ও কলকাতা থেকে বই নিয়ে আসেন প্রকাশকরা। জাহাজে করে আসে সেসব বই। একুশে বইমেলার মতো অত বই হয়তো বিক্রি হয় না। তবে প্রকাশকদের বিমান ভাড়া উঠে আসে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসেন লেখক, শিল্পী ও সাহিত্যপ্রেমীরা। যেমন এবারের বইমেলায় বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, লন্ডন, সুইডেন, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছিলেন লেখক, শিল্পী ও সাহিত্যপ্রেমী লোকজন। একুশে মেলার মতো নতুন বইও প্রকাশিত হয় এ মেলাকে উপলক্ষ করে। উন্মোচিত হয় নতুন বইয়ের মোড়ক। বইকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় নানা ধরনের অনুষ্ঠান। মেলা চত্বরে বিচ্ছিন্নভাবে চলে লেখক আর পাঠকদের আড্ডা। এই মেলা উপলক্ষে দেশ থেকে আনা নতুন শাড়ির ভাঁজ খোলার উপলক্ষ পান মেয়েরা। আর ছেলেরা পায় পাঞ্জাবি-ফতুয়া পরার উপলক্ষ। মেলার কয়েকদিন থিমপার্কের মতোই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে নিউইয়র্ক বইমেলা প্রাঙ্গণ। প্রবাসে আরো কিছু বইমেলার আয়োজন চোখে পড়ে। কিন্তু সেখানে প্রকাশকদের উপস্থিতি নিউইয়র্ক বইমেলার মতো অতটা নয়। কম থাকে বইকেন্দ্রিক কার্যক্রমও। ফলে সেগুলো ঠিক বইমেলা নয়, বরং সাহিত্য সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে। প্রচুরসংখ্যক প্রকাশক ও বইয়ের উপস্থিতির কারণে নিউইয়র্ক বইমেলা সে দোষ থেকে মুক্ত। নিউইয়র্ক বইমেলার সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মূলত বইকে কেন্দ্র করেই। এই সুযোগে বলে রাখা ভালো, বইমেলা আয়োজন করে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। মুক্তধারা ইনক (মুক্তধারা প্রকাশনী ও বইয়ের দোকান) আর মুক্তধারা ফাউন্ডেশন দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন নন প্রফিট অর্গানাইজেশন। পরিচালিত হয় কার্যকরী সদস্যদের কমিটির মাধ্যমে। প্রতি কার্যকরী কমিটির মেয়াদ দুই বছর। কার্যকরী কমিটিই ঠিক করে বইমেলার আহ্বায়ক কে হবেন অথবা অতিথি হিসেবে কাদের নিমন্ত্রণ করা হবে।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন বইমেলার পাশাপাশি আরেকটি মেলার আয়োজন করে। শিশু-কিশোর মেলা। শিশু-কিশোর মেলা শুরুর দিকে বইমেলার অংশ ছিল। ১৯৯২ সাল থেকেই শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা লিখন ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকত বইমেলায়। অনুষ্ঠিত হতো নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অংশগ্রহণে গান-নৃত্যানুষ্ঠানসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান। ২০১৭ সাল থেকে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের তরুণদের তত্ত্বাবধানে জাতির জনককে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শিশু-কিশোর মেলা প্রবর্তন করে। এই মেলা আয়োজন থেকে শুরু করে পরিচালনা সবকিছুর সঙ্গে জড়িত থাকে নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। এমনকি মেলার আহ্বায়কও হন তারা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন, মানে ১৭ মার্চ আয়োজিত হয় এই মেলা। সামনে থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন, আমেরিকার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম কীভাবে জাতির পিতার ভাস্কর্য তৈরি করে! কত চমত্কারভাবে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে অনুষ্ঠান করে, সম্মান প্রদর্শন করে প্রবাসে বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের!

এই অভিবাসীর দেশ আমেরিকায় আমাদের প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশীদের অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। প্রথম প্রজন্ম এখানে অভিবাসী হয়ে এসেছিল। আমাদের সন্তানরা এখানে নতুন প্রজন্ম পরিচয়ে বেড়ে উঠছে। এ নতুন প্রজন্ম মূলধারায় অন্য আমেরিকানদের মতোই জায়গা করে নিচ্ছে। তবে অন্য ভিনদেশী অভিবাসী গোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতিকে যেভাবে আমেরিকার মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে আমরা বাঙালিরা এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। স্প্যানিশ, আইরিশ, আফ্রিকান অথবা ইহুদি জাতির সংস্কৃতি আমেরিকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। একদিন নিশ্চয়ই আমাদেরটাও হবে। যাদের কল্যাণে আমরা এ স্বপ্ন দেখতে পারছি মুক্তধারা ফাউন্ডেশন তাদের অন্যতম। মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শুধু প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী বাংলাদেশীদের দেশের সঙ্গে, দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখে না, দেশ ও দেশের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে। শিশু-কিশোর মেলা, নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা সেসব কর্মযজ্ঞের উদাহরণ।

 

তানভীর রাব্বানী: প্রবন্ধকার