বাংলাদেশীদের অভিবাসনের ইতিহাস দীর্ঘ হলেও কানাডায় বসতি স্থাপনের ইতিহাস পুরনো নয়। জীবন ধারণের তাগিদে এখানকার মানুষ কখনো রেঙ্গুন আবার কখনো ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাড়ি জমিয়েছে। দেশীয় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী হওয়া জনপ্রিয়তা পেতে থাকে বড় একটা অংশের মধ্যে। তরুণ ও শিক্ষিত শ্রেণী ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে উড়াল দেয় ইউরোপ ও আমেরিকায়। ঔপনিবেশিক আমলেই ইংরেজ জাহাজের শ্রমিক হিসেবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার অধ্যায় শুরু হলেও গন্তব্য হিসেবে ততটা প্রাধান্য পায়নি কানাডা।

স্বাধীনতার আগ অবধি কানাডায় যে অল্পসংখ্যক বাঙালি অভিবাসী গিয়েছে, তারা আলাদাভাবে পরিচিতি পায়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা তাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরি করে। সত্তরের দশকে উল্লেখযোগ্য তরুণেরা অভিবাসী হয় কেবেক ও মন্ট্রিলে। জেনারেল এরশাদের সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে এ স্রোত ব্যাপকাকার ধারণ করে। ক্রমে শ্রমিক শ্রেণী, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংখ্যালঘুর বাইরে গিয়ে অভিজাত শ্রেণীদের কাছেও প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয় কানাডা। বাংলার আর্থসামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চশিক্ষার ব্যয়, অনিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপরীতে কানাডায় চাকরির সুবিধা, সহজ অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অভিবাসী হওয়ার পথে নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ২০০১ সালের জরিপেই দেখা যায়, কেবল টরন্টোতেই বসবাস করে ১৮ হাজার ৪৭০ জন বাংলাদেশী। স্থানীয়দের মতে, সেই সংখ্যা এখন ৬০ হাজারের কম হবে না। বসবাসরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টরন্টোর ইস্ট ইয়র্কে তৈরি হয়েছে বাংলা টাউন। কানাডার মাটিতে বাংলাদেশী সংস্কৃতি নিয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ যেন।

দীর্ঘ সময় ধরেই বাংলা টাউন কানাডায় বসবাস করা বাংলাদেশীদের জন্য ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। কী নেই সেখানে! বাংলাদেশী মুদি দোকান থেকে শুরু করে রয়েছে রেস্টুরেন্ট, বই, কাপড়, ওষুধ এবং মাংসের দোকান অবধি। গড়ে উঠেছে স্থানীয় সংবাদপত্রের অফিস, আইনজীবীদের অফিস, রাজনৈতিক নেতাদের অফিস, প্রেস, ট্রাভেল এজেন্সি, স্টুডিও এবং মানি এক্সচেঞ্জ স্টোর। ডানফোর্থ এভিনিউয়ের দুই পাশেই বিস্তৃত অংশজুড়ে তৈরি হয়েছে বাঙালিদের এ আস্তানা। আরেকটা বিষয় বেশ লক্ষণীয়। এখানকার সব দোকানেই নির্দেশনাগুলো বাংলায় লেখা। ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে কথাবার্তা চলে বাংলা ভাষায়। আমেরিকায় লিটল বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে সেখানকার বাঙালিদের জাতিগত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে। কানাডার জন্য সেই ভূমিকা পালন করছে বাংলা টাউন। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য পাওয়া যায় সব দোকানেই। যেকোনো মূল্যে তারা মাতৃভূমির স্মৃতিকে ধরে রাখতে চায়। ক্রেতারাও কিনে নেয় আগ্রহ ভরে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যকার দরাদরি করার ধরন, দোকানদারদের পারস্পরিক আলোচনার বিষয়বস্তু, ক্রেতাদের সঙ্গে বিক্রেতাদের আচরণ কিংবা বিল দেয়ার প্রক্রিয়া, সবকিছুতেই ফুটে ওঠে বাংলাদেশের সংস্কৃতি। উপরন্তু দোকানি ও ক্রেতাদের মধ্যে বজায় রাখা হয় ব্যক্তিগত যোগাযোগও। নিজের জেলার মানুষ হলে তো কথাই নেই। ক্রেতা তখন সেই দোকানেই নিয়মিত গমনাগমন শুরু করে।

প্রতি শনিবার বিকালে বাংলা টাউনে নামে বাংলাদেশীদের ঢল। টরন্টোর চারদিক থেকে সাপ্তাহিক বাজারের জন্য চলে আসে মানুষ। কিনে নেয় মাছ, মাংস, তরিতরকারি কিংবা যার যা কিছু দরকার। এমনকি বাংলা অথবা হিন্দি মুভি, নাটক কিংবা গানের পাইরেটেড কপিও পাওয়া যায় সেখানে। প্রথমবার দেখলে যে কেউ ভেবে বসবে, বাংলাদেশেরই কোনো অঞ্চলের হাট। গ্রীষ্মকালে এ প্রবণতা থাকে আরো প্রবল। শুক্র ও শনিবারের বিকালজুড়ে লেগে থাকে উৎসব। নারী-পুরুষ, বালক-বৃদ্ধের সমাগমে প্লাবিত হয়ে ওঠে ডানফোর্থ রোড অঞ্চল। একদিকে বাহারি রকমের খাবার, অন্যদিকে নানা রকমের রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মুখর মানুষ। বাংলা টাউন যেন কানাডার মাটিতে স্মৃতিকাতর বাঙালির জন্য মাতৃভূমির স্পর্শ। আত্মপরিচয়ে উদ্বেলিত বাংলাদেশী জনগণের প্রাণকেন্দ্র।

অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক স্বর

বাংলাদেশের জাতীয়, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো পালন করতে দেখা যায় টরন্টোর জনগোষ্ঠীর মাঝেও। যদিও ব্যস্ততা আর সময়ের স্বল্পতায় কিছুটা রদবদল ঘটে। প্রায়ই বাংলাদেশী উৎসব উদযাপন করতে বাছাই করতে হয় কানাডার সরকারি কোনো ছুটির দিনকে। বাংলাদেশী উৎসবগুলো সাধারণত হিজরি এবং বাংলা মাসনির্ভর। ওদিকে ক্রিসমাসের ছুটি বাদে কানাডায় আলাদা করে ধর্মীয় ছুটি নেই। ফলে আয়োজকদের বিষয়টা মাথায় রাখতে হয় আনন্দ উদযাপনের সময় নির্ধারণে। এ কারণেই ঈদ-পরবর্তী ঘোরাফেরা এবং নববর্ষ উদযাপনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একই দিনে। কাছাকাছি ব্যাপার অন্যান্য উৎসবের ক্ষেত্রে।

অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে পরিগণিত হয় বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ। এ উৎসব পালনের তিনটা ধরন দেখা যায় সেখানে। পারিবারিক, সামাজিক এবং সর্বসাধারণে। তিন থেকে পাঁচটি পরিবার মিলে ছোট পরিসরে আয়োজন করা হয় দেশীয় খাবার। স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় পান্তা ভাত, ইলিশ, কাঁচামরিচ, ভর্তা ও খেজুর গুড়। নারীরা এদিন জামদানি এবং সুতির শাড়ি পরিধান করে। সাজে চুড়ি আর আলতায়। অন্যদিকে পুরুষরা পরে পাঞ্জাবি আর পাজামা। নববর্ষ উদযাপনের দ্বিতীয় ধরনটা দেখা যায় আরেকটু বড় পরিসরে। ১০-১২টি অভিবাসী পরিবার মিলে কোনো পার্টির আয়োজন করে। সেখানে হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাদেশী সমবেত হয়। ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে থাকে বাহারি রকমের ফল। তৃতীয় ধরনের উদযাপন দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার আয়োজনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের দুই সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট এবং উদীচীর শাখা রয়েছে টরন্টোতে। নেয়া হয় দিনটিকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।

বাংলা টাউনে বেশ জমকালোভাবেই পালিত হয় বাঙালি জীবনের জাতীয় দিবসগুলো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা এবং আত্মপরিচয়ের যোগসূত্র। ধর্ম ও শ্রেণী-পেশার ঊর্ধ্বে গিয়ে পালিত হয় এসব দিন। বাংলা টাউনে দেখা মেলে অস্থায়ী শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেখান পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ভোরে খালি পায়ে সেখানে যাওয়ার পথে গলায় থাকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান। হরেক রকমের বই নিয়ে আয়োজন করা হয় বইমেলার। বিজয় দিবস এবং স্বাধীনতা দিবসে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলও দিনগুলোকে নিজেদের মতো করে উদযাপন করে।

দেশীয় ঐতিহ্যের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদযাপন কানাডা দিবস। দীর্ঘ সরকারি ছুটি থাকার কারণে এ সময়েও বাংলাদেশী অভিবাসীরা পরস্পরকে সঙ্গে নিয়ে উদযাপন করে। ফলে নামে কানাডা দিবস হলেও মূলত প্রকাশ পায় বাংলাদেশী সংস্কৃতিই। স্থানীয় পত্রিকা ‘সময়’-এর নেতৃত্বে আয়োজিত হয় বাংলাদেশী নাচ এবং সংগীতের। থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশী খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে দোকানি। সেখানকার ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরাও নীরব থাকে না। এভাবে সুদূর কানাডার মাটিতে ফুটে ওঠে আরেকটি বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। এ ছবি তাদের মাধ্যমে, যারা মূলধারায় মিশে গিয়েও ভুলে যায়নি শেকড়ের ঘ্রাণ। 

 

জাকারিয়া হাসান: লেখক