বাংলাদেশীদের ব্রাজিলে যাওয়ার শুরুর গল্প: মূলত লাতিন আমেরিকায় বাংলাদেশীদের যাওয়া শুরু হয়েছিল প্যারাগুয়ে দিয়ে। মানে সবচেয়ে পুরনো বাংলাদেশীদের বসবাস প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ায়। বলিভিয়ায় প্রায় ৪০ বছর আগে বাংলাদেশীরা গিয়েছিলেন। প্যারাগুয়েতেও ৪০ অথবা ৪৫ বছর পুরনো বাংলাদেশীরা আছেন। আমরা এমন বাংলাদেশীও পেয়েছি যারা যুদ্ধের সময় ওইসব দেশে ছিলেন। ব্রাজিলেও এমন পুরনো বাংলাদেশী আছেন। ব্রাজিলে ১৯৭৮ সালে গিয়েছেন তারেক নামের একজন। সেখানে ওনার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি আছে। পুরনো বাংলাদেশী ও দূতাবাসের অফিসারদের কাছ থেকে আমরা শুনেছি, তারও আগের অনেক বাংলাদেশী ছিলেন এখানে, যাদের জনসম্মুখে দেখা যায়নি বা আমাদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়নি। তারেক ভাইয়ের পর ১৯৯২ সালের দিকে আরো বাংলাদেশী গিয়েছিলেন। কিছু বাংলাদেশী ওই দেশে প্রফেসর হিসেবে গিয়েছেন। বাংলাদেশীদের একটা ছোট অংশ ২০০২ থেকে ২০০৪ সালে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। আমরা অল্প কয়েকজনের দেখা পেয়েছি। ২০০৯ থেকে একটু একটু করে যাওয়া শুরু। এরপর মূল যাওয়া শুরু হয়েছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে। এ সময় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী ব্রাজিলে ঢুকছেন বলিভিয়া, একুয়েডর ও পেরু হয়ে। সরাসরিও অনেকে গিয়েছেন। ২০১৪-১৫ সালে ব্রাজিলের ভিসা নিয়ে সরাসরি পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশী ঢুকেছেন। এরপর ২০১৭ সাল পর্যন্ত পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম নিয়ে ব্রাজিলে ঢুকেছেন আরো অনেকে। একটা সময় ব্রাজিলে ২০-২৫ হাজার মানুষ ছিলেন। এরপর অনেক মানুষ বিভিন্ন দেশে চলে গিয়েছেন। আমার জানা মতে, ৭৩ জন বাংলাদেশী ওয়ার্ক পারমিটে গিয়েছেন। এছাড়া সাতজন পেয়েছি যারা স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়েছেন।

যেভাবে ব্রাজিলে যান বাংলাদেশীরা: বাংলাদেশীদের ব্রাজিলে যাওয়ার বিভিন্ন পন্থা আছে। আগে ব্রাজিলের আশপাশের দেশগুলোতে বাংলাদেশীরা যেতেন। ভারতে অবস্থিত ওইসব দেশের দূতাবাস থেকে তারা ভিসা নিতেন। পরে সেখানকার ফ্লাইট করতেন। বিমানে করে পৌঁছে ওসব দেশ থেকে বর্ডার ক্রস করে ব্রাজিলে ঢুকতেন। এছাড়া অনেকে ব্রাজিলের এয়ারপোর্টে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম নিয়ে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে ব্রাজিলে ঢুকতেন। এখনো এ পন্থা চলমান আছে। তারপর বাংলাদেশে যখন ব্রাজিলের দূতাবাস হলো, তখন প্রচুর পরিমাণে ভিসা বাংলাদেশীদের দেয়া হয়েছিল। সে সময় হাজার হাজার বাংলাদেশী ভিসা নিয়ে সেখানে গিয়েছেন। কিন্তু সে সময় প্রচুর পরিমাণে দুর্নীতি হয়েছে, যার ফলে এখন কোনো ধরনের ভিসা হচ্ছে না। আমরা এখন ভুক্তভোগী।

ব্রাজিলে বাংলাদেশীদের বসবাস: ব্রাজিলে মোট কত বাংলাদেশী আছেন তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ ব্রাজিল একটা বড় দেশ। সেখানে এত বেশি বাংলাদেশী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন যে নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা অসম্ভব। তবে ফেডারেলের তথ্য অনুযায়ী, একসময় ২৫ হাজারের মতো বাংলাদেশী রেজিস্টার্ড ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন সময় বাংলাদেশীরা ব্রাজিলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে অন্য দেশে চলে গিয়েছেন। যেহেতু বাংলাদেশের দূতাবাস ব্রাজিলে আছে, সেহেতু দূতাবাস কয়েক মাস পরপর কনসুলার সার্ভিস করে থাকেন। নিউ সাও ্পাওলো, পারানা, রিও ডি জেনিরো, মাদকরেসো, মিনাজারাইস, সান্তাকাতারিনা এ এলাকাগুলোতে বাংলাদেশীরা বসবাস করে থাকেন। তবে হাজার দুয়েক বাংলাদেশী এখন আছেন বলে মনে হয়। আর ভাসমান হিসেবে প্রচুর বাংলাদেশী প্রতিদিনই ব্রাজিলে ঢোকেন। তারপর বের হয়ে যান। সাও ্পাওলো শহরে যারা বসবাস করেন, তাদের ৮৫ শতাংশ কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, কিছুসংখ্যক সুপার শপ দিয়েছেন। কয়েকজন হোটেল ও অ্যাকসেসরিজ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় আছেন বাংলাদেশীরা। এখানে অনেকে চাকরি করেন আর একটা অংশ ফুড ট্রাকের সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ কাঁচামাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ফারানাতে বেশির ভাগ বাংলাদেশী ফ্যাক্টরি ও গাড়ির কোম্পানির কাজের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া সান্তারানি শহরে অনেকে চাকরি ও ব্যবসা করেন।

বাংলাদেশীদের কাপড়ের ব্যবসা: ২০০৯-১০ সালের দিকে কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে এ-দেশীরা বেশি জড়িত হন। তখন তারা আর কিছু জানতেনও না। দিনমজুরি করতেন কেবল। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশীদের আস্তে আস্তে মুভমেন্ট পরিবর্তন হয়। ব্রাজিলের সাও ্পাওলোতে তারা তখন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম পাইকারি মার্কেটের খোঁজ পান। তারা এখানে আসতে থাকেন এবং নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। প্রথম প্রথম বাংলাদেশীরা অল্প অল্প কাপড় কিনে হকারি করতেন। হকারি করতে করতে তারা জানতে পারলেন যে এখানে মেলা হয়। বিভিন্ন সিটিতে মেলা হয়। সেসব মেলায় বাংলাদেশীরাও কাপড় বিক্রি শুরু করেন। এক বাংলাদেশী আরেক বাংলাদেশীকে সহযোগিতা করা শুরু করলেন। যাদের কাছে টাকা ছিল তারা রিস্ক নিয়ে বহু দোকান খুলে বসলেন এবং বাংলাদেশীদের সেখানে চাকরি দিলেন। ব্রাজিলিয়ানরা মেলা ডাকলে তারা বিভিন্ন শহরে চলে যেতেন। এখানে রাত ২টায় পাইকারি মার্কেট ওপেন হয়ে রাত ১২টায় শেষ হয়। এরপর কিছু বাংলাদেশী স্থায়ী দোকান ভাড়া নেয়া শুরু করলেন। সাও ্পাওলো থেকে পাইকারি কিনে শোরুম ভাড়া নিয়ে তারা সেখানে খুচরা বিক্রি করতেন। কিছু বাংলাদেশী বড় বড় শোরুম ভাড়া নিয়ে বক্স তৈরি করে ভাড়া দিতেন। করোনাকাল পর্যন্ত বাংলাদেশীরা কাপড় ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কয়েকজন বাংলাদেশী আছেন যাদের পঞ্চাশের অধিক দোকান আছে। যেমন চাঁদপুরের হারুনুর রশিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়নাল আবেদিন। এছাড়া জন, ইসমাইল, আব্দুর রহিম, সিলেটের জাকির হোসেন, ফয়েজ আহমেদ লিটন, কুমিল্লার শাকিল, গাজীপুরের আলমগীর, সিলেটের সাজুও এ তালিকায় রয়েছেন। তারা সেখানকার নামিদামি ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন ও ব্রাজিলজুড়ে ব্যবসা করছেন। তবে ব্রাজিলে বাংলাদেশী কাপড়ের ব্যবসার কোনো প্রতাপ নেই। অনেক ব্যবসায়ী চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ থেকে নেয়ার জন্য, কিন্তু তারা পারেননি। যদি বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাস উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে ভালো একটা বাজার তৈরি হবে। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও আমরা বিক্রি করতে পারব।

ব্রাজিলে পরিবার নিয়ে বসবাস: আগে এক হাজারের মতো ছিল। এখন দুইশোর মতো আছে।

শ্রমবাজার হিসেবে সম্ভাবনা : ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকার প্রতিটি দেশই আমাদের জন্য একটা বড় শ্রমমার্কেট। তবে এখানে শুধু প্রফেশনালদের জন্য। সেটা কৃষি হোক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। প্রফেশনালদের জন্য যেকোনো সেক্টরে বড় সম্ভাবনার জায়গা এ দেশ। অবশ্যই এ শ্রমবাজার ধরে রাখতে চাইলে ওইসব দেশে গিয়ে কাজ করতে হবে। এখানে ডকুমেন্টারি ও বাণিজ্যের সুবিধা প্রচুর। খুব দ্রুত এখানে দোকান নেয়া যায়, ব্যবসা শুরু করা যায় যা ইউরোপেও সম্ভব না। লাতিন আমেরিকায় বিশাল বাজার। এখানে বিনিয়োগ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। আমরা এ বাজারটা হাতছাড়া করছি। এ বাজারটা ধরা দরকার।

 

এ এইচ এম খায়রুল ইসলাম: ব্রাজিল প্রবাসী