ত্রিশের দশকে ভারতের পূর্ব দিকের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে মিনতি রায়ের ছেলেবেলা কেটেছে। সেখানে বসবাসের সময় তার মায়ের মুখে ‘মৌমাছি’র নার্সারি রাইম শুনতে ভালোবাসতেন।
মিনতি রায়ের বয়স এখন ৫৬ বছর। তিনি ৫-১৩ বছর বয়সী শিশুদের সামনে বসে সেই ছড়াটি আবৃত্তি করছিলেন। জায়গাটি নর্থওয়েস্ট ওয়াশিংটনের চার্চের একটি ক্লাসরুম। জায়গাটি সুন্দর, উষ্ণ ও কচিকাঁচায় ভরা। সেখানে উপস্থিত আটজন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে জন্মানো বাংলাদেশী ও ভারতীয় শিশু। তাদের জন্য তিনি প্রতিটি শব্দ ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করছিলেন। তাদের জন্য বাংলা ছিল বিদেশী ভাষা।
‘আমাদের ছেলেমেয়েরা আমেরিকার সমাজে বেড়ে উঠেছে’, বাংলাদেশের দূতাবাসে কাজ করা ৪০ বছর বয়সী একজন কর্মকর্তা এ কথা বলেন। তিনি নাম প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন।
তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু আমাদের বাচ্চারা যদি আমাদের ভাষা লিখতে বা পড়তে না পারে, তাহলে তারা আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে না। তারা আমাদের ব্যাপারে কিছুই জানবে না। কিছুটা অন্তত জানা উচিত।’
মেট্রোপলিটন এলাকায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী বাংলাদেশী অভিবাসীরা তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ধরে রাখতে চান। আমেরিকার মতো একটি জায়গায় তা কঠিন। তবু সে উদ্দেশ্যে চার মাস ধরে তারা একটি স্কুল চালানোর চেষ্টা করছেন। প্রতি রোববার বিকালে এ স্কুলে তারা নিজেদের ও বাংলা ভাষাভাষী শিশু-কিশোরদের তাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেবে।
ওয়াশিংটনে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশী অভিবাসীর বসবাস। তরুণদের নিয়মিত স্কুলের সঙ্গে বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা পায় না। এখানে ২৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ২৬ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে পাওয়া মাসিক ৫ ডলারের টিউশন ফি, ইউনাইটেড চার্চের ক্লাসরুম স্পেস ভাড়া ও নিউইয়র্কের জি স্ট্রিটের স্পেস থেকে পাওয়া মাসিক ৫০ ডলার ভাড়ার ওপর নির্ভর করে। প্রতিষ্ঠানের ১০ জন শিক্ষক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেই কাজ করেন। তারা বাংলাদেশী ও ভারতীয়।
নার্সারি রাইম, ফুলের নানা রকম ছবি ও দেশীয় নানা খাবারের ছবি দেখিয়ে কিশোর-তরুণদের দেশ সম্পর্কে জানানো হয়। তবে বাংলা ভাষা শেখানোই এই স্কুল ও প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য।
২ ঘণ্টাব্যপী ক্লাসে শিক্ষার্থীরা বাংলা পড়া ও লেখার পাশাপাশি বাংলায় নানা ছড়া, কবিতা বা লাইন মুখস্থ করার চেষ্টা করে। মূলত এসবই দেশ ও দেশের মানুষকে জানার জন্য জরুরি। রুসলিনের ফরেন সার্ভিস ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষা প্রশিক্ষক হিতা এমনটাই মনে করেন। ৫৯ বছর বয়সী এ ব্যক্তি স্কুলের একজন শিক্ষক এবং তিনি মিনতি রায়ের স্বামী। হিতা রায় বলেন, ‘আমরা আমাদের ভাষাকে ভালোবাসি। ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মাকে কথা বলতে শোনে, গান শোনে এবং তারা তখন এ সংস্কৃতিকে জানতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিছু জায়গা বাদে আমাদের নিরেট একটা ব্যাকরণ আছে। আমি যা বলেন আপনি তা লেখেন। ইংরেজিতে সবসময় এমন হয় না। তবে জার্মানের সঙ্গে এর মিল আছে। এতে বাক্যের শেষে ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়।’
আলেকজান্দ্রিয়ার ১৫ বছর বয়সী নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ‘এগুলো মুখস্থ রাখা কঠিন। আমরা বাড়িতে এ ভাষায় কথা বলি না। আমি আগে কখনো এ ভাষা পড়িনি।’ বেথেসদার ১২ বছর বয়সী মনিরা হুর মতে, ‘বাড়িতে বসে এ ভাষায় কথা বললে কাজটা সহজ হয়ে যায়। আমি ভাষাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বলতে পারি এবং এর জন্য আমার বাবা-মা, শিক্ষক ও স্রষ্টাকে ধন্যবাদ। কোনো একদিন আমিও বাংলা পড়াব এবং কাজটি করে সম্মানিত বোধ করব।’
যেসব তরুণ, কিশোররা যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে তাদের দেশ সম্পর্কে কিছু না কিছু জানত তাদের জন্য সংস্কৃতির ধারা বোঝা তুলনামূলক সহজ। তারা সহজে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এজেডএম ওবায়দুল্লাহ খানের ভাষায়, ‘তাদের শেকড় খুঁজতে দেয়া ও বাঙালি হিসেবে গর্ব অনুভব করার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন।’
কিন্তু ইংরেজি বা আমেরিকান সংস্কৃতিতে ঢোকা কঠিন। এ বিশেষ প্রোগ্রামে যুক্ত একজন তরুণ যে বাংলাদেশে তার শৈশব কাটিয়েছে, সে জানায় ইংরেজি শেখা ও এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে তার যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।
নর্দার্ন ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজের একজন ছাত্র বলেন, ‘আমেরিকানদের কাছ থেকে আমি এক ধরনের চাপের মুখে পড়েছি। আমাদের জীবনযাপন এমনকি পোশাকের কারণেও আমেরিকান সতীর্থরা আমাকে নিয়ে কৌতুক করেছে। তারপর আমি লক্ষ করতে শুরু করি অন্যরা কীভাবে চলে এবং এরপর আমি তাদের অনুসরণ করেছি।’ এ ছাত্রের বাবা বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন চাকুরে। তিনি তার পরিবারের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। ২১ বছর বয়সী এ তরুণ নিজের দেশে ফেরত যেতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি দেশে ফিরে যেতে চাই। কেননা আপনি যে-ই হন, যেখান থেকেই আসেন না কেন, নিজের দেশকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।’
[ওয়াশিংটন পোস্টে ক্রিস্টাল কুইনের প্রতিবেদনটি ১৯৮৬ সালের ১৪ আগস্ট প্রকাশিত হয়। অনুবাদ: আসরার আবেদিন]





