উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, সম্মানজনক চাকরিকে অগ্রাহ্য করে মিডিয়ায় এসে তারকাখ্যাতি পেয়ে যান অনেকেই। আবার অনেকে ছোট বেলা থেকেই সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে বিনোদন জগতের রঙিন দুনিয়ার একসময় স্থায়ী হয়ে যান। শুরুতে সাফল্যের সম্ভাবনা কিংবা সফলতা নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন সামনের দিকে। কিন্তু বিনোদন জগতের নানা গ্যাঁড়াকলে পড়ে খেই হারিয়ে ফেলেন অনেকে। যার কারণে মিডিয়ায় কদর কমে যায় অনেকের। এছাড়া ক্যারিয়ারের সফলতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েনের কারণে দেশান্তরী হচ্ছেন দেশের অনেক তারকা। আবার উন্নততর জীবনের সন্ধানেও সপরিবারে কেউ কেউ প্রবাসী হচ্ছেন। যার বড় একটি অংশ আমেরিকায় বসত গেড়েছেন। আর স্থায়ী হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন অনেকেই। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন লাক্স সুপারস্টার মিলা হোসেন। সন্তান সংসার নিয়ে তিনি আমেরিকার নাগরিক হিসেবে সেখানে জীবনযাপন করছেন। জানা যায়, চাকরি করেই দিনাতিপাত করছেন। তার কিছুকাল পরে সেখানে স্থায়ী হয়েছেন অভিনেতা টনি ডায়েস। অভিনয় না করলেও বাঙালি কমিউনিটিতে রয়েছে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। চিত্রনায়িকা রোমানা দ্বিতীয় বিয়ে করে আমেরিকায় গিয়েছেন প্রায় অর্ধযুগ আগে। সেখানে গিয়ে তিনি দুই সন্তানের মা হয়েছেন। স্বামীকে নিয়ে সুখেই আছেন একসময়ের ঢালিউডের এই চিত্রনায়িকা।
প্রবাসী বাংলাদেশী এক ব্যবসায়ীকে বেশ ঘটা করে বিয়ে করেছিলেন জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী মোনালিসা। তবে বিয়ের অল্প সময় পরেই তার সংসার ভেঙে যায়। তবে সংসার ভাঙলেও আমেরিকায় ছোটখাটো চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। তবে মাঝেমধ্যে দেশে ঘুরতে এসে অভিনয় করছেন তিনি। মঞ্চ, টিভি নাটক ও সিনেমার গুণী অভিনেত্রী তমালিকা কর্মকার অনেকটা চুপিসারেই ঢাকায় গাড়িসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। মাঝেমধ্যে দেশে এলেও এখন আর মিডিয়ায় কাজ করেন না তিনি। আমেরিকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেই দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
অভিনয় ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান পুলিশ অফিসারকে বিয়ে করে আমেরিকায় সংসার জীবন শুরু করেন রিচি সোলায়মান। বাংলাদেশে যাওয়া-আসা থাকলেও আমেরিকায়ই চাকরি করছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যেহেতু
আমার স্বামী আমেরিকায় সরকারি চাকরি করেন তাই সেখানে আমাকেও স্থায়ীভাবে থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া আমার দুই সন্তান সেখানে পড়ালেখা করছে। ওদের জন্য হলেও আমাদের আমেরিকায় থাকতে হবে। তবে দেশকে সবসময়ই অনুভব করি। মিডিয়ার কাজকেও মিস করি। তাই বেড়াতে গেলে নাটকে অভিনয় করি।’
মডেল, অভিনেত্রী ও উপস্থাপিকা হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন নওশীন নাহরিন। প্রায় দশ বছরের মতো মিডিয়া ক্যারিয়ার ছিল তার। তবে নানা কারণে তার মিডিয়া ক্যারিয়ার বিবর্ণ হতে থাকে। কিছুটা হতাশাও পেয়ে বসে তাকে। সেই অবস্থা কাটানো এবং উন্নত জীবনের খোঁজে আমেরিকায় পাড়ি জমান নওশীন। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও যান। সেখানে গিয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে চাকরি করছেন। নতুন পরিবেশ ও জীবনযাপন প্রসঙ্গে নওশীন বলেন, ‘শুরুতে
কিছুটা কঠিন ছিল আমেরিকার জীবন। তবে এখন অনেকটাই গুছিয়ে এনেছি। চাকরি করছি। সন্তানের মা হলাম আবার। যদিও এখন ছুটিতে আছি, তার পরও ভালো আছি। দেশে স্থায়ীভাবে ফেরার কোনো ইচ্ছাই নেই। সবার কাছে দোয়া চাই যেন জীবনের বাকি সময়গুলো এখানেই থাকতে পারি।’
ছোট পর্দার মডেল এবং অভিনেত্রী নাফিজাও অভিনয় ক্যারিয়ারের সুসময়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। এখন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই তিনি সে দেশে বসবাস করছেন। তিনিও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
২০২০ সালের প্রথম ভাগে সপরিবার আমেরিকায় গেছেন নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। তিনি সেখানে চাকরি না করলেও দুই সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। তার স্বামী নির্মাতা ও অভিনেতা তৌকীর আহমেদ তাদের সঙ্গ দেয়ার জন্য বছরের বেশির ভাগ সময়ই সেখানে অবস্থান করছেন। এ প্রসঙ্গে বিপাশা হায়াত বলেন, ‘আমার
ছেলেমেয়ের উন্নততর শিক্ষার জন্যই আমেরিকায় আছি। তাছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তবে ওরা পড়ালেখা শেষে যদি অন্য কোথাও যেতে চায়, যাবে। তবে এখন আমেরিকায়ই থাকব।’ অবসর সময়টায় বিপাশা নতুন চিত্রকর্ম তৈরির কাজ করছেন।
স্বামী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে চিত্রনায়িকা শাবানা আমেরিকায় বসবাস করছেন। গত নির্বাচনের আগে দেশে ফিরেছিলেন। তার স্বামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিফল হয়ে আবার ফিরে গেছেন মেরিকায়। শাবানা বলেন, ‘অভিনয় তো অনেক করেছি। নিজেদের জন্য তো অনেক করেছি। সন্তানদের জন্য ভালো কিছু করার প্রত্যাশায় আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছি। আমরা ভালোই আছি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন সামনের সময়গুলোও ভালোভাবে কাটাতে পারি।’
নাটক ও সিনেমায় অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ঈপ্সিতা শবনম শ্রাবন্তী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খোরশেদ আলমকে বিয়ে করে দুজনই আমেরিকায় পাড়ি জমান। তাদের ঘরে দুই কন্যাসন্তান আসে। কিন্তু পারিবারিক টানাপড়েনের কারণে তার স্বামী খোরশেদ আলম দেশে ফিরে এলেও শ্রাবন্তী সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমেরিকায়ই রয়ে গেছেন। চাকরি করে সন্তানদের পড়ালেখা করাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে দেশে আসেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তখন আলাপকালে বলেন, ‘আমেরিকার
জীবনটা একধরনের কঠিনই। কারণ সবকিছুই বৈরী। চেনা মানুষ নেই, আত্মীয় পরিজন অনেক দূরে, তাই কিছুটা কষ্ট নিয়েই জীবনযাপন করছি। এখানে কাজটাকেই মুখ্য রাখতে হয়। পরিশ্রম করছি, ভালো আছি। দেশকে খুব মিস করি। তবে দেশে স্থায়ীভাবে ফেরার ইচ্ছা নেই।’
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ দীর্ঘকাল ধরেই দুই দেশে বসবাস করছেন। বছরের পুরো সময়টা দুই ভাগে বিভক্ত করে জীবনযাপন করেন তিনি। দেশে এলেও অভিনয়ে নিয়মিত নন তিনি। তবে করোনাকালের আগে বিক্ষিপ্তভাবে দেশে কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। জীবনের বাকিটা সময় এভাবেই কাটাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। চলতি বছরে সবচেয়ে বড় খবর হলো চিত্রনায়ক শাকিব খানের আমেরিকায় নাগরিকত্ব নেয়ার বিষয়টি। যদিও তিনি খোলাসা করে কিছুই বলেননি। তবে দীর্ঘ ছয় মাস তার আমেরিকায় অবস্থানের বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন গণমাধ্যমে। সেখানে নাকি তিনি অবকাশযাপন এবং সিনেমার শুটিং করতে গিয়েছেন। কিন্তু গভীরভাবে তার আমেরিকায় অবস্থানের সময় কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে অনেকে মনে করছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার জন্য অফিশিয়ালি আবেদন করেছেন এবং তার আবেদনটি গৃহীত হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে আমেরিকায় বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়েছে। যার কারণে টানা ছয় মাস তিনি সেখানে ছিলেন। এখন দেশে থাকলেও আগামী মাসে আবারো উড়াল দিচ্ছেন আমেরিকায়। তবে সেখানে গিয়ে কিছুদিন আগে ঘোষিত সিনেমার শুটিং শুরু করবেন। যেটি পরিচালনা করবেন বাংলাদেশী নির্মাতা হিমেল আশরাফ। তিনিও আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। জনপ্রিয় ব্যান্ড দল প্রমিথিউসের ভোকাল বিপ্লব সফল সংগীত ক্যারিয়ার থাকলেও নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে পাড়ি জমিয়েছেন। সেখানে গিয়ে তিনি সংগীতবিষয়ক কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হননি। তিনি প্রথমদিকে ট্যাক্সি ড্রাইভারের চাকরি করতেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে বিপ্লবই জানিয়েছিলেন।
সোহেল আহসান: সাংবাদিক





