বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে তার ঝাঁপি মাথায় নিয়ে ওই যাচ্ছে ফেরিওয়ালা। মুখে ফুটছে চিত্তাকর্ষক প্রচারবোল। এগলি ওগলি হেঁটে রেশমি চুড়ি আর নূপুর-পায়েলের ঝনঝন বইয়ে দিচ্ছে পাড়ার বউ-ঝিদের মনে। আলতার রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে কিশোরীর প্রভাত। সবাই মিলে পাকড়াও করছে তাকে। এটা-ওটার দর নিয়ে চলছে কষাকষি। অবশেষে সবার মন মানিয়ে নিজের মনিহারি পণ্যটি বিক্রয় করে সে আবার চলছে নতুন গন্তব্যে। গমনাগমনের ভেতর দিয়ে চলছে তার জীবন। অনিশ্চিত তার যাত্রা। আমরা জানলে খুবই অবাক হব, পায়ে হেঁটে ফেরি করা এ লোকগুলোর প্রতিনিধিই বাঙালিদের মধ্যে সর্বাগ্রে আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছিল। সেখানে তারা চিকনদার নামে পরিচিতি পেয়েছিল।

বাঙালি ফেরিওয়ালাদের আমেরিকা জয়ের এই গল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও আমাদের অজানা ছিল। কালেভদ্রে কয়েকজনের মুখে মুখরোচক গল্প হয়ে সেগুলো ঘুরত। কিন্তু তার সত্য-মিথ্যা নিরূপণের কোনো উপায় ছিল না। অতি সম্প্রতি আমেরিকার নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক বিবেক বল্ড দেশটিতে চিকনদারদের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আমেরিকার বন্দরগুলোয় নোঙর করা বিভিন্ন জাহাজের অবতরণের বিবরণ, সে সময়ে প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদপত্রের খবর, বিয়ের রেজিস্ট্রি প্রভৃতি কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। ২০১৩ সালে প্রকাশিত বেঙ্গলি হারলেম অ্যান্ড দ্য লস্ট হিস্টোরিস অব সাউথ অ্যাসিয়ান অ্যামেরিকা বইটিতে তিনি এসব লিপিবদ্ধ করেছেন। তার এ বই থেকেই আমরা পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের অভিবাসন প্রচেষ্টা নিয়ে অনেক চিত্তাকর্ষক তথ্য পাই। এছাড়াও বইটি পড়ে আমরা ব্রিটিশ জাহাজে দল বেঁধে চাকরি নেয়া বাঙালির রোমাঞ্চকর সমুদ্র অভিযাত্রার গল্প জেনে শিহরিত হই। এরা শিপ জাম্পার হিসেবে আমেরিকার লোকেদের কাছে পরিচিতি পায়। চিকনদার ও লস্কররাই আমেরিকায় বাংলা ভাষী মানুষের প্রথম পদচিহ্ন এঁকে দেয়।  

কলকাতা শহরের উত্তরাংশের একগুচ্ছ গ্রাম থেকে ১৮৮৫ সালের দিকে মুসলিম ফেরিওয়ালাদের একটি দল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় আসতে শুরু করে। এটাই দেশটিতে বাঙালিদের প্রথম অভিবাসন প্রচেষ্টা ছিল। তারা তোরঙ্গ আর বস্তা নিয়ে সেখানকার বন্দরে হাজির হতো। সেগুলো বিচিত্র একজটিক সামগ্রী, যেমন সুতি ও রেশম বস্ত্র এমব্রয়ডারি করা, শাল, ছোট গালিচা, সুগন্ধি প্রভৃতি দিয়ে পূর্ণ থাকত। আমেরিকার বাজারে এগুলোর তখন ব্যাপক চাহিদা ছিল। এগুলো সেখানে চিকন বা চিকান বলে সমাদৃত হতো। আর চিকানের ব্যাপারী এসব বাঙালি ফেরিওয়ালা স্থানীয়দের কাছে চিকনদার নামে অভিহিত হয়।

আঠারো শতকের এ সময়টায় ভারতবর্ষের বাজার ব্রিটিশ কারখানায় তৈরি কম মূল্যের কাপড়ে সয়লাব হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় কুটির শিল্পের বাজার ধ্বংসের মুখে পড়ে। আবার একই সময়ে পাশ্চাত্যের মধ্যবিত্ত সমাজে ভারতের এসব পণ্যের কদর বাড়তে থাকে। ভারতের বিভিন্ন ব্যবসায়ী উপমহাদেশের বিভিন্ন হস্তশিল্প ভূমধ্যসাগরীয় ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় বিক্রি করত। কিন্তু বাঙালি ব্যবসায়ীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন এক দেশে ব্যবসা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হয়ে মধ্য আমেরিকার পানামা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে চিকনের ব্যবসা ছড়িয়ে দেয়। এ অঞ্চলের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত লোকের মধ্যে প্রাচ্য ও প্রাচ্যের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে মোহ কাজ করত।

স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য শুরুতে এসব চিকনদার তাদের স্বদেশভূমি ত্যাগ করত না। মূলত প্রাচ্যের জিনিসপাতি আমেরিকায় সরবরাহ করতে তারা সচেষ্ট থাকত। পণ্যসামগ্রী বিক্রি শেষ হয়ে গেলে আবার দেশে এসে মাল বোঝাই করে জাহাজে করে তারা আমেরিকায় যেত। তাদের পরিবার-পরিজন কিন্তু স্বদেশেই থেকে যেত। ফেরিওয়ালারা আমেরিকায় গিয়ে একটা স্থানে অস্থায়ী গুচ্ছবস্তি তৈরি করত এবং নিজেদের পসরা রেখে দিত। এভাবে আমেরিকায় প্রাচ্যের একজটিক জিনিসের জোগান দিত তারা। মূলত সমুদ্র-তীরবর্তী বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যেমন অ্যাশবেরি পার্ক, আটলান্টিক সিটিতে তারা ফেরি করে বেড়াত। ধীরে ধীরে সমগ্র আমেরিকায় তাদের ব্যবসায়িক জাল বিস্তৃত হয়। নিউইয়র্ক থেকে তারা দক্ষিণের লুইজিয়ানায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। হুগলি থেকে মিসিসিপি পর্যন্ত এভাবেই বাঙালিদের জয়যাত্রা সূচিত হয়।

আগেই উল্লেখ করেছি, ইউরোপ ও আমেরিকার অধিবাসীদের চেতনায় প্রাচ্য নিয়ে এক ধরনের মোহ বিরাজ করত। প্রাচ্যের রেশমের শাল, কুশন কভার, দেয়ালে ঝোলানোর পটচিত্র, তামার তৈজসপত্র, মিনা করা কৌটো, অলংকার, ধূপধুনা প্রভৃতির প্রতি এ আকর্ষণ আমেরিকায় ক্রমেই বেড়ে চলল। কারণ উচ্চবিত্তদের অনুকরণে মধ্যবিত্ত সমাজও অরিয়েন্টাল সামগ্রী ব্যবহার করতে শুরু করে। এ অঞ্চলের হুক্কা, বাঘছাল, হাতির দাঁত, খঞ্জর, লাস্যময়ী নারীদের ছবি প্রভৃতি দিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বৈঠকখানা সজ্জিত হতে থাকে।

প্রথম দিকে বাঙালি মুসলিম চিকনদার দলটি ছিল কলকাতার অদূরে হুগলি জেলার বাসিন্দা। এ দলটিতে পূর্ববঙ্গের কয়েকজন সংযুক্ত হয়। এরা মূলত কৃষক সমাজের প্রতিনিধি, যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে সুতিবস্ত্র ও রেশমের হস্তশিল্প নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিল। বছরের একটা সময়ে যখন মাঠের কাজ আর তেমন থাকত না তখন অবসরে তারা বুটিদার রেশমের কাপড় বুনত এবং স্থানীয় বাজারে সেসব বিক্রি করত। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীন বঙ্গে তারা কোম্পানির তরফ থেকে নানা রকম বাধার সম্মুখীন হয়। ঊনবিংশ শতকে বাংলাসহ সমগ্র ভারত ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি কাপড়ে ছেয়ে যায়। ফলে হুগলির এসব গ্রাম থেকে উত্পন্ন হস্তশিল্পের স্থানীয় বাজার দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এসব পণ্যের বহির্বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে কৃষকরা কলকাতা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় যায়। এরপর এদেরই দশ-বারো জনের একটি দল আমেরিকার উদ্দেশে জাহাজে রওয়ানা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের পণ্যের বাজার তৈরির উদ্দেশ্যে এ যাত্রা শুরু হয়।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে চিকনদাররা আমেরিকায় ঘন ঘন যাওয়া-আসা করতে শুরু করে। গরমের সময়টাকে উদ্দেশ্য করে তারা নিউজার্সিতে নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে জমায়েত হতো। পরিসংখ্যানে পাওয়া যায়, তাদের সংখ্যা ১৮৯৪-এর জুনে ছিল ৭ জন, পরের বছর জুনে হয় ২০ জন। এভাবে ১৮৯৬ ও ১৮৯৭-এ তা যথাক্রমে ২০ জন ও ১২ জনে দাঁড়ায়। এ সময়ে আমেরিকায় চিকনদাররা সংগঠিত হয়ে ব্যবসায় জেঁকে বসে। চার মাস পরপর তাদের দুই থেকে সাতজনের একটি দল কলকাতায় ফিরে যেত এবং পরের গ্রীষ্মকে লক্ষ্য করে আরেকটি দল কলকাতা থেকে পাল তুলত। তারা নিউ অর্লিয়নসে গিয়ে ঘাঁটি করত। ঊনবিংশ শতকে এ স্থানটি ভ্রমণ ও আসা-যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে। শহরটি আমেরিকার উত্তর-দক্ষিণের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এভাবেই বাঙালিরা অ্যাটলান্টা, চার্লট, বাল্টিমোর, ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্ক, বার্মিংহাম, চ্যাটানুগা, সেন্ট লুইস, লুইসভিল, সিনসিনাটি, শিকাগো, হুস্টন, ডালাস প্রভৃতি জায়গায় নিজেদের পণ্য নিয়ে যায়।

১৮৯০-১৯১০ পর্যন্ত বাঙালি চিকনদাররা একই রকমে আমেরিকার উদ্দেশে তাদের এ যাত্রা অব্যাহত রাখে। এর ফলে আমেরিকায় তাদের ব্যবসায়িক জাল আরো সমৃদ্ধ হয়। এলিস দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার পর চিকনদাররা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নিউ জার্সির সমুদ্র উপকূলের শহরগুলোয় ছড়িয়ে পড়ত। এ সময়ে চিকনদারদের অনেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা নতুন পণ্যের বাহক হিসেবে কাজ করত। কারণ গত বছরে আসা কিছু চিকনদার পরের বছরেও থেকে যেত। তাদের সঙ্গে নতুন দলটি যুক্ত হয়ে নিউ অর্লিয়নসে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করত। আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে আস্তানা গাড়তে পারলে তারা নিজেদের পণ্য বিক্রির পাশাপাশি নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করত, মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করত এবং কলকাতা থেকে আসা নতুন পণ্য গ্রহণ করে বাকি চিকনদারদের মাঝে বণ্টন করত। বাঙালি ফেরিওয়ালাদের নেটওয়ার্কে অতঃপর জ্যামাইকা, কিউবা, পুয়ের্তো রিকো, পানামা, ত্রিনিদাদ যুক্ত হয়। পানামার কোলন শহরের উন্নয়নকর্মে বাংলার বিভিন্ন শ্রমিকরা এ সময়ে যুক্ত হয়। খাল কাটায়, রেললাইন স্থাপনে ও বিভিন্ন ভবন নির্মাণে তারা অংশ নেয়। শুধু বাঙালি কেন, পাঞ্জাবি শিখরাও এসব কাজ করতে পানামায় পাড়ি জমাত। পরে সিন্ধি ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়ে নিজেদের দোকান খুলে ভারতীয় পণ্য বিক্রি করতে থাকে। ১৯০৫-১০ পর্যন্ত এ কাজে পানামায় চিকনদারদের একটি দল যায়। শ্রম বিক্রির পাশাপাশি তারা সেখানেও চিকন বিক্রি করত। এভাবে হুগলির ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য-জালের সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকা সংযুক্ত হয়।

বাঙালি মুসলমান চিকনদাররা আমেরিকায় ঠিক অভিবাসী হতে যায়নি। তারা সময়ে সময়ে দেশে ফিরে আসত আবার যেত। আর সে সময়ে আমেরিকায় তাদের বসবাসের অনুমতি মেলাও ছিল বেশ দুষ্কর। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এসব চিকনদার স্থানীয়দের কাছে ‘হিন্দু’ নামেই অভিহিত হতো। এভাবে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকায় চিকনদাররা দাপিয়ে বেড়ায়। ১৯২০-এর দিকে তাদের গমনাগমন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

প্রথম যুগের বাঙালি চিকনদাররা সমসাময়িক বর্ণবাদী অভিবাসন আইনের বলি হয়েছিল। তারা মূলত আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোয় আশ্রয় নিয়েছিল। বর্ণবাদী ‘জিম ক্রো’ আইন সেসব রাজ্যে কার্যকর থাকায় তারা দমন-পীড়নের শিকার হতো। কারণ এ আইনে বাঙালিদের কালার্ড বা কালো মানুষের জন্য চিহ্নিত অঞ্চলে থাকতে হতো। বল্ডের গবেষণায় চিকনদারদের বিয়ে ও সংসার পাতার বিষয়টি পর্যন্ত উঠে আসে। তিনি দেখান, চিকনদাররা বেশির ভাগই ছিল মুসলিম নামধারী এবং এরা পুয়ের্তো রিকোয় গিয়ে সেখানকার মেয়েদের বিয়ে করত। মূলত আফ্রিকি-আমেরিকার মেয়েদের বিয়ে করত এসব বাঙালি। শোনা যায়, বিয়ের বাজারে বাঙালি ছেলেদের বেশ কদর ছিল।

এবার আসা যাক শিপ জাম্পারদের প্রসঙ্গে। চিকনদারদের আমেরিকা গমনের কয়েক বছরের মধ্যে পূর্ববঙ্গের সিলেট, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বিভিন্ন লোক চট্টগ্রাম বা কলকাতা বন্দরে গিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমাতে শুরু করে। এ লোকগুলো মূলত জাহাজে লস্কর বা খালাসি হিসেবে কাজ করত। ইউরোপ বা আমেরিকাগামী বিভিন্ন জাহাজে তারা অনেক তদবির করে লস্করের কাজটি জোগাড় করার চেষ্টা করত। অবশ্য লক্ষ্য থাকত, আমেরিকার কোনো একটি বন্দরে গিয়ে সেখান থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া। বিবেক বল্ডের গবেষণায় এদের নিয়ে অনেক বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসে। জাহাজ বন্দরে নোঙর করার আগেই এরা লাফিয়ে সাঁতার কেটে তীরে উঠত। তারপর তারা আমেরিকার বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাত। ইমিগ্রেশনের শক্ত বেড়া এড়িয়ে চলতে তারা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করত। পূর্ববঙ্গের সিলেটের এমন একজন ব্যক্তির কথা বল্ড তার বইয়ে উল্লেখ করেন। শাহ আব্দুল মজিদ কুরেশি নামের এই ব্যক্তি ১৯৩৫ সালে নিউইয়র্কের উপকূলে শিপ জাম্পিং করে ব্যর্থ হলে পরে লন্ডনে স্থানীয় নিবাস স্থাপন করেন। কুরেশি তার জবানিতে বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল জাহাজে একটা চাকরি নেয়া। কিন্তু মূল লক্ষ্য হয় আমেরিকা, নয় ব্রিটেন যাওয়া। যদিও ব্রিটেন আমাকে তেমন একটা আকর্ষণ করত না। কারণ আমি দেখতাম আমেরিকায় পৌঁছে জাহাজ থেকে যারা পালিয়ে যেত তারা পরে কোনো না কোনো উপায়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে মোটা অংকের টাকা পাঠাতে পারত। তাদেরই কেউ কেউ ফিরে এসে আমাদের আমেরিকায় যাওয়ার ধারণা দিয়েছিল। এ থেকে আমার মাথায় আসে, যদি কোনোভাবে আমেরিকায় গিয়ে হাজির হতে পারতাম তাহলে যথেষ্ট টাকা উপার্জন করতে পারতাম।’

কোনোভাবে আমেরিকাগামী একটি জাহাজে চাকরি নিয়ে কুরেশি উঠে পড়েন। জাহাজগামী অবশিষ্ট বাঙালিদের তুলনায় তিনি যথেষ্ট শিক্ষিত হওয়ায় ব্রিটিশ অফিসাররা তার ওপর কড়া নজর রাখা শুরু করল। এমনকি নিউইয়র্কে তিনি যেন তীরে অবতরণ না করেন সেজন্য তারা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করল। কিন্তু তার সঙ্গে থাকা প্রায় একশ বাঙালি পালিয়ে যেতে সমর্থ হলেও তিনি পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে পরে তিনি লন্ডনে গিয়ে স্থায়ী হন।

বল্ড অবশ্য আরো বিস্ময়কর তথ্য উপস্থাপন করেন। বলা হয়ে থাকে, চিকনদারদের প্রায় এক যুগ পরে আমেরিকায় লস্করদের আনাগোনা শুরু হয়। তারা ইঞ্জিন ও ডেকে নিম্ন মজুরির কাজগুলো করত। এ সময়ে এলারম্যান লাইন, ক্ল্যান লাইন ও কুনার্ড লাইনের জাহাজগুলো শীতের সময়ে নিউইয়র্কে যেত। ৬০-৮০ জনের একটি বাঙালি লস্কর বাহিনী জোট বেঁধে এসব জাহাজে উঠত। এদের বেশির ভাগই নাকি সিলেট, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও কলকাতার লোক ছিল। বল্ডের মতে, ১৯১৭-২৪ সময়ের মধ্যে প্রায় ২০-২৫ হাজার লস্কর ব্রিটিশ জাহাজে করে আমেরিকার নিউইয়র্ক বন্দরে আসে। শিপ জাম্পিং করে আমেরিকায় অভিবাসী হওয়া এসব বাঙালির মধ্যে দাদা আমির হায়দার খান, মুস্তফা জন আলি, ইবরাহিম চৌধুরি প্রভৃতি ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যায়। খান ১৯১৮-এর ফেব্রুয়ারিতে শিপ জাম্পিং করে নিউইয়র্কে আসেন। ইংরেজি জ্ঞান একেবারেই না থাকায় সেখানে কোনো রকমের একটি চাকরি জোগাড় করতে তারা হিমশিম খান। বাংলার চিকনদাররা যখন লুইজিয়ানা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া, টেক্সাস প্রভৃতি দক্ষিণের দেশগুলোর দিকে ধাবিত হয় তখন লস্কররা উত্তর ও পশ্চিমের আটলান্টিকের উপকূলের দিকে ধাবিত হতে থাকে। কারণ এসব অঞ্চলে থাকা বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজের সন্ধানে লস্কররা যাতয়াত করত। মূলত লাকাবান্না, দেত্রোয়া, চেস্টার, ইয়াংসটাউন প্রভৃতি স্থানের শিল্প-কারখানায় তারা কাজ করতে শুরু করে।

মুস্তফা জন আলি নামের আরেক শিপ জাম্পার ১৯২০ সালে জাহাজ থেকে লাফিয়ে বাল্টিমোরে সমুদ্রের তীরে উঠে আসেন। কিন্তু প্রথমবারের চেষ্টায় তিনি আমেরিকায় স্থায়ী হতে ব্যর্থ হওয়ায় সিলেটে তার বাড়িতে চলে আসেন। এরপর আবার তিনি সেখান থেকে কলকাতায় গিয়ে একই লক্ষ্যে জাহাজে যাত্রা করেন। তিনি ম্যারিল্যান্ডে এসে জাহাজ থেকে লাফিয়ে ১৯২০ সালের মাঝামাঝি পুনরায় বাল্টিমোরে আসেন। সেখানে তিনি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলাকে বিয়ে করে সেটেল হন।

নিউ ইয়র্কের দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দি বেঙ্গল গার্ডেন নামে একটি রেস্তোরাঁ জনপ্রিয় হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হাবিব উল্লাহ। তিনি পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মাত্র ১৪ বছর বয়সে শিপ জাম্পিং করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেয়ার উদ্দেশ্যে কলকাতায় আসেন। সেখান থেকে জাহাজের চাকরি নিয়ে বোস্টন বন্দরে এসে জাম্প করে সমুদ্রে পড়ে যান। পরে কোনো রকমে নিউ ইয়র্ক সিটিতে পৌঁছেন। এখানে বিয়ে করে স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে দি বেঙ্গল গার্ডেন নামের এ রেস্তোরাঁটি চালু করেন।

কুরেশি ও জন আলির এ গল্প আমেরিকার স্বপ্নে বিভোর হওয়া তখনকার অনেক বাঙালিরই গল্প। তারা কীভাবে যেন খবর জানত আমেরিকার কোথায় গেলে জাহাজ থেকে লাফ দেয়া যাবে, কোথায় গেলে চাকরি পাওয়া যাবে কিংবা কোথায় গেলে অন্য বাঙালিদের খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনকি দীর্ঘ সমুদ্র ভ্রমণে খালাসি হিসেবে কাজ করে জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ার সময় তারা তাদের সম্পূর্ণ বেতনটাও পেত না। কারণ ব্রিটিশরা বাঙালিদের এ কৌশলের খবর জানত। সুতরাং জাহাজ থেকে লাফিয়ে অপর্যাপ্ত টাকা নিয়ে তাদের তখন অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতে হতো। জাহাজ থেকে নেমেই তাদের কিছুদিন লুকিয়ে থাকতে হতো, শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নতুন কাপড় কিনতে হতো এবং খাবারদাবার কিনে খেতে হতো। তার ওপর ভবিষ্যৎ গোছানোর চিন্তা তো ছিলই। তবে এসব বাঙালির পরস্পরের মধ্যে বন্ধন ছিল অটুট। তারা একে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসত এবং বিদেশ-বিভুঁইয়ে একজন ছিল অপরজনের ভরসার আশ্রয়স্থল। এভাবে তারা অভিবাসনের শিকল রচনা করেছিল।

প্রথমে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে চিকন বিক্রয় করতে বাংলার মুসলমান আমেরিকায় পাড়ি জমায়। তাদের অনুকরণে আসে জাহাজের লস্কররা। প্রথমোক্তদের যদিও আমেরিকায় থেকে যাওয়ার তেমন ইচ্ছে ছিল না, দীর্ঘদিন দেশে ফিরতে না পেরে তারাও লস্করদের মতো সেখানে সংসার পাততে শুরু করে। এভাবে অভিবাসনের কঠোর নিয়ম-কানুনকে পাশ কাটিয়ে চিকনদার ও লস্কররা স্বীয় অধ্যবসায়ে অতলান্তিকের পাড়ে নিজেদের ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে স্বপ্নজয়ী বাঙালি ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকায়।

 

ইসফানদিয়র আরিওন: লেখক ও অনুবাদক