আমি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছি ১৪ বছর। ২০০৮ সালে এখানে পড়তে আসি আমি। এর আগে ২০০৫ সালে একবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি ইয়ুথ লিডারশিপ প্রোগ্রামে অংশ নিতে। প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে পেনসিলভানিয়ার ডিকিনসন কলেজে একটি সামার কাটাই। তখনই ভেবেছিলাম যদি কখনো প্রবাসে স্থায়ী হই বা পড়তে আসি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকেই বেছে নেব।
আমার কাছে মনে হয়, আমেরিকা ইজ আ ল্যান্ড অব অপরচুনিটি। মেধা থাকলেই এখানে এসে যে কারো সফল হওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। মেধা থাকলে আর কঠোর পরিশ্রম করতে আগ্রহী হলে আপনার জন্য এখানে প্রচুর সুযোগ।
এখানকার আরো ভালো দিকগুলো নিয়ে বলতে গেলে বলব, ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগে পার্সোনাল ফ্রিডম, এখানে আপনি আপনার সরকার ও নির্বাচিত নেতাদেরও সমালোচনা করতে পারেন। এখানকার পলিটিক্যাল সিস্টেমে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের অংশগ্রহণের যে সুযোগ রয়েছে সেটা এক কথায় অসাধারণ। এখানকার মত প্রকাশের স্বাধীনতাও আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করে। তাছাড়া এখানে চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে অনেক।
আমেরিকায় আপনি সব ধরনের জলবায়ু পাবেন। সেখানে খুব গরম পছন্দ হলে সাউথে চলে যান, বাংলাদেশের মতো আবহাওয়া পছন্দ হলে ফ্লোরিডায় চলে যান। খুব ঠাণ্ডা পছন্দ হলে মিডওয়েস্টে চলে যান, সেখানে সমুদ্র, পাহাড় পাবেন। জলবায়ুর এ বৈচিত্র্য খুব কম জায়গায়ই আছে। জলবায়ুর এ বৈচিত্র্যের কারণে নানা ধরনের শস্য, ফল, সবজি এখানে ফলে। মানে যদি কখনো যুক্তরাষ্ট্র চায় যে তারা আত্মনির্ভরশীল হবে তাহলে দেশের ভেতরেই তাদের সেটা সম্ভব।
তবু বলতে হয়, কোনো দেশই পারফেক্ট নয়। কোনো দেশ যদি পারফেক্টের কাছাকাছি থাকে তবে আমার চোখে সেই দেশের নাম যুক্তরাষ্ট্র। আমার কাছে যদি জানতে চান যুক্তরাষ্ট্র কেমন লাগে তাহলে বলব, আমি থাকি নিউইয়র্ক থেকে ২ ঘণ্টা দূরে। আমরা প্রথম প্রজন্মের ইমিগ্র্যান্ট। ফলে দেশকে খুব মিস করি। যখনই দেশের কথা মনে পড়ে তখন আমরা নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসে চলে যাই। ওখানে দেখি বাংলাদেশীরা হাঁটছেন, তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। বাংলাদেশী কী খাবার খেতে চান সেসব সেখানে পাবেন। যদিও স্বাদটা বাংলাদেশে রান্না করা খাবারের মতো শতভাগ পাবেন না, তবে কাছাকাছি পাবেন। যখন আমরা দেশকে খুব মিস করি বা দেশের খাবার খুব খেতে ইচ্ছে করে তখন নিউইয়র্কে চলে যাই।
আজ আমেরিকা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে আমরা বলি, আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে পাওয়ারফুল ও ধনী দেশ, সেখানে অভিবাসীদের ভূমিকাই মুখ্য। এসব অভিবাসীই আমেরিকার অর্থনীতির চাকা চালু রেখেছেন। এখানে থাকা মেধার বৈচিত্র্যের কারণে আমেরিকা ইজ আমেরিকা। তাদের পক্ষে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব হয়।
আমার মনে হয় আমি একটা হোমোজিনিয়াস কালচার, যেখানে আপনার আশপাশের সব মানুষই আপনার মতো সেখানের তুলনায় সেসব জায়গায় থাকতে বেশি পছন্দ করি বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি যেখানে আমার আশপাশের একেক মানুষ একেক রকম। ভিন্ন জাতির, ভিন্ন বর্ণের, ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কারণেই আমেরিকা আজকের আমেরিকা। হয়তো সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়, কিন্তু আমরা যখন বাইরে যাই, নানাজনের সঙ্গে কথা বলি তখন কে কোন ধরনের, ধর্মের, বর্ণের তা অনেক সময় উঠেই আসে না। প্রথমে মানুষের দিকে তাকালে আপনি মানুষ, আমিও মানুষ, সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
আমার মতো যারা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী, তাদের জন্ম-বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। আমরা ফিজিক্যালি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে থাকলেও আমরা মানসিকভাবে সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থাকি। এক্ষেত্রে অবশ্য ধন্যবাদ দিতে হবে প্রযুক্তিকে। আমি যখন প্রবাসে আসি তার চেয়ে ২০-৩০ বা ৪০ বছর আগে যারা প্রবাসে সেটল হয়েছিলেন তারা কিন্তু একটা কষ্টের সময় কাটিয়েছেন। তখন চাইলেই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত না। তখন ফোন করতে প্রচুর টাকা খরচ হতো। ঘরে ঘরে যে প্রচুর ফোন ছিল সেটাও নয়। কিন্তু এখন যেমন আমাদের সবার হাতে ফোন এবং প্রযুক্তির সুবাদে আমরা যখন তখন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে দেখতে পাচ্ছি, কথা বলতে পারছি। টেকনোলজির জন্য আরেকটা যেটা হচ্ছে আমরা প্রতিদিনই ঘরে বাংলা গান শুনছি অথবা বাংলা নাটক কিংবা সিনেমা যখন দেখি বা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের খেলা দেখি তখন আমাদের ঘরে যেসব সন্তান আছে তারাও কিন্তু এক্সপোজড হচ্ছে। হয়তো তারা অ্যাক্টিভলি দেখছে না বা শুনছে না, কিন্তু প্যাসিভলি যে ওরা শুনছে সেটা কিন্তু ব্রেনে স্টোর হচ্ছে। এসবই তাদের বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে অ্যাপ্রিশিয়েট করা বা ভালোবাসতে শেখাচ্ছে।
একটা কথা বলতে চাই, ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার মেয়ের সঙ্গে তার জন্মের পর থেকে বাংলায় কথা বলি। এর একটা বড় কারণ ছিল, যে শিশু বিশেষজ্ঞ ওকে দেখতেন তিনি একজন হোয়াইট আমেরিকার নারী। তিনি আমাকে বললেন, তোমাদের কি ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংলিশ? আমি বললাম, না, বাংলা। উনি তখন বললেন, তোমরা ওর সঙ্গে বাংলায়ই কথা বলো। কারণ ও ইংরেজিটা ইভেনচুয়ালি শিখবেই, তোমরা যদি ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলো, তাহলে ওর দুটো ভাষা শেখা হয়ে গেল এবং যারা দুটো ভাষায় কথা বলতে বা যোগাযোগ করতে পারে তারা মনোলিঙ্গুয়াল বা একটা ভাষায় কথা বলতে পারাদের তুলনায় অনেক স্মার্ট বলেই সবার বিশ্বাস। আমার মেয়ে যখন প্রি-স্কুলে যায় তখন প্রথম সে ফ্লুয়েন্টলি ইংলিশ বলতে শেখে। প্রথম প্রথম যখন সে প্রি-স্কুলে যেত তখন ওর স্কুল টিচার নিজেও একজন হোয়াইট আমেরিকান নারী, তিনি একদিন ই-মেইল করে আমাকে বললেন, ক্লাসে আমার মেয়ের সঙ্গে কমিউনিকেট করা একটু মুশকিল। কারণ সে সব ইংলিশ বুঝতে পারে না। তোমরা যদি ওর সঙ্গে বাসায় একটু ইংলিশে কথা বলো তাহলে আমাদের সুবিধা হবে, ওরও ক্লাসে সুবিধা হবে বুঝতে। তখন আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম, কেন আমি বা ওর বাবা ওর সঙ্গে ইংলিশে কথা বলি না এবং ওর পেডিয়াট্রিশিয়ান এ ব্যাপারে আমাদের কী বলেছেন। আমার খুব ভালো লাগল যে উনি সেটা বুঝতে পারলেন এবং বললেন আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে আর কিছু বলার নেই, সে ইভেনচুয়ালি শিখবে। চার বছর বয়সে সে ফ্লুয়েন্টলি ইংলিশ বলতে শেখে। তা দেখে একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান আমাকে বললেন বাবা-মায়ের ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজটা ওকে শেখাতে। এ দেশে এই ডাইভারসিটিকেই আমার স্ট্রেন্থ মনে হয় এবং সেটা তাদের সবচেয়ে বড় স্ট্রেন্থ। শিশুরা যখন বড় হবে তখন কিন্তু ওরাও এ জিনিসটা আত্মস্থ করবে। তারা বুঝবে আমরা আমেরিকান হলেও আমরা বাই লিনিয়েজ বাংলাদেশী। আমার বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছিল। মানে আমাদের রুটস আছে অন্য কোথাও, অন্য কোনো দেশে। আর সেটা সে অ্যাপ্রিশিয়েট করা শিখবে।
আমেরিকাকে বলা হয় স্যালাড বোল। সালাদের বোল যে কারণে বলা হয়, সালাদের মধ্যে অনেক অনেক উপাদান থাকে—ফ্রুটস, ভেজিটেবল, পাস্তা, মিট। কিন্তু সালাদ রান্না করা হয় না। রান্না করলে একটা জিনিসের টেক্সচার বদলে যায়, রঙ বদলে যায়, কোনো একটা কিছু গলে যাওয়া, মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সালাদে সব জিনিস স্বতন্ত্র থাকে। প্রতিটা ইনগ্রেডিয়েন্ট তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে সালাদে উপস্থিত থাকে। আমেরিকা হলো সেই জিনিস, এখানে তুমি যেকোনো জায়গা থেকে আসতে পারো, কিন্তু তোমার মতামত, তোমার গায়ের রঙ, তোমার ভাষা সব ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দিনের শেষে আমরা আমেরিকান। আমেরিকান হওয়ার জন্য তোমাকে তোমার কোনো কিছু বিসর্জন দিতে হবে না। আমরা ভিন্ন থেকেও অভিন্ন। এসব কারণেই আমেরিকাকে সালাদ বোল হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়া হয়। আমার বিশ্বাস, আমাদের সন্তানরা এই কনসেপ্টটা নিয়েই বড় হবে। স্কুলেও ওদের এসবই শেখানো হয় যে তুমি তোমার স্বতন্ত্র পরিচয়, তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে থাকবে এবং সেটাতে কিন্তু তুমি কোনো অংশে কম আমেরিকান হবে না।
এ দেশে আমি দেখেছি, আমার পরিচিত যারা আছেন তারা বাড়িতে সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখান, বাংলাদেশী খাবার খেতে শেখান এবং ওরা ভালোও বাসে বাংলাদেশী খাবার খেতে। বাংলাদেশের গান, কবিতা আবৃত্তি, ছড়া আবৃত্তি করতে শেখান। বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করতে শেখান, ধর্মীয় উৎসব বা জাতীয় যেসব দিবস রয়েছে সেগুলো এখানে উত্যাপন করা হয়, পুরো আমেরিকায়ই উদযাপন করা হয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে করে আবার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বড় আকারেও হয়। এখানে আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছে, এখানে যখন এমন কোনো অনুষ্ঠান উৎসব আয়োজন করতে যাবেন তখন এখানকার যে লোকাল পাবলিক স্কুলগুলো রয়েছে তার অডিটরিয়াম ভাড়া করা যায়। এখানকার সরকারও বলছে, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবসসহ যেসব উৎসব তুমি আয়োজন করতে চাও, তুমি কিন্তু আমাদের সরকারি স্কুলগুলোর ফ্যাসিলিটি ব্যবহার করতে পারো। আর ফি যে খুব বেশি তাও নয়। খুব কম খরচেই স্কুলের অডিটরিয়াম, ফ্যাসিলিটিসগুলো ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করা যায়। এভাবেই আয়োজন করা যায়।
আমাদের সন্তানরাও এসব দেখে দেখেই বড় হচ্ছে। তাদের বাবা-মা যে দেশ থেকে এসেছে অরিজিনালি তারাও সেগুলো অ্যাপ্রিশিয়েট করতে শেখে। আমাদের দেশে ভাষা, কালচার, হিস্ট্রি এত রিচ যে আপনি যদি আপনার সন্তানকে পরিষ্কারভাবে বা সুন্দরভাবে বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে সে এটাকে ভালো না বেসে পারবেই না। এখানে যেমন আমি বাংলাদেশী আমেরিকান এবং আমি মুসলিম। নিউইয়র্ক সিটিতে সব স্কুল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের সময়ে বন্ধ থাকে। আমি ক্যালিবারিতে থাকি। এখানে সরকারিভাবে স্কুল বন্ধ থাকে না। তবে আপনি চাইলে রিলিজিয়াস গ্রাউন্ডে স্কুলে আবেদন করতে পারেন ছুটির জন্য। তখন স্কুল থেকে অনুমতি দেবে সন্তানকে স্কুলে না আসার জন্য। আমরা সেটাই করি। ঈদুল আজহা বা ঈদুল ফিতরের সময়ে আমরা স্কুলের প্রিন্সিপালকে চিঠি লিখে ছুটি নিই। এসবই অ্যাকোমোডেটিং। ইউ ক্যান বি ইউরসেলফ ইন দিস কান্ট্রি। আমেরিকান হওয়ার জন্য আপনাকে কোনো কিছু ত্যাগ করতে হবে না, বিসর্জন দিতে হবে না, যেটা আপনি ভালোবাসেন। আমাদের সন্তানরা এসব দেখেই বড় হচ্ছে আর ওরা যত বড় হবে তখন ওরা ওদের বাবা-মায়ের হিস্ট্রি, কালচার এগুলো ভালোবাসতে শিখবে আরো বেশি বেশি করে। আমেরিকা একটি ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্টস। সবাই মিলেই আমেরিকা ইজ আমেরিকা। দেশটির এমন আকাশচুম্বী সফলতার পেছনে রয়েছে অভিবাসীদের ভূমিকা এবং কেউ কারো মতো না হওয়ার বিষয়টা। সবাই বিভিন্ন দেশ থেকে এসে এ দেশটাকে গড়ে তুলেছে। আমার বিশ্বাস, এ ধারা অব্যাহত থাকবে। কারণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ডাইভারসিটি।
ওয়ারা করিম: কলামিস্ট, ডেইলি স্টার; কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, গল্প পাঠের আসর। যুক্তরাষ্ট্রের ডেলওয়্যারের বাসিন্দা





