লস অ্যাঞ্জেলেসের পাশেই কোরিয়া টাউনের থার্ড স্ট্রিট থেকে নাকে এসে লাগছে মশলাদার গরম গরম পাথর স্যুপ আর কোরিয়ান বারবিকিউর সুবাস। খাবারের জন্য বিখ্যাত এ কোরিয়া টাউনের পূর্ব পাশেই রয়েছে লিটল বাংলাদেশ নামে খ্যাত পাড়াটি। এখানে রয়েছে কয়েকটি বাজার। স্বল্প পরিচিত বাংলাদেশী সম্প্রদায়টি আট বছর আগে নিজেদের দেশের নামে এ পাড়াটির নামকরণ করে লিটল বাংলাদেশ। আর সে পাড়া থেকে ধেয়ে আসছে মশলাদার কারি ও মত্স্য বিরিয়ানির খুশবু।
ভেরমন্ট ও নরম্যান্ডি স্ট্রিটের মাঝ বরাবর শহরের চারটি ব্লকেই লিটল বাংলাদেশ। এটি মূলত লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত বাঙালিদের সংস্কৃতি ও রন্ধন কেন্দ্র। এর আশপাশে রয়েছে কোরিয়ান ডাম্পলিং হাউজ, মেক্সিকান ট্যাকো জয়েন্টস ও ডোনাট শপ। এ স্থানে বাংলাদেশী রেস্তোরাঁগুলোতে ঘরে তৈরি বিভিন্ন বস্তু দেদারসে বিক্রয় হয়। একই সঙ্গে এখানে উপমহাদেশীয় খাবারের একটা মিশ্রণ পাওয়া যায়।
আপন বাজার ও রেস্তোরাঁর চিকেন টিক্কার মসলার সুবাসে কেনমোর অ্যাভিনিউ ম-ম করে। সেখানকার এক দোকানি হয়তো বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করছে। থার্ড স্ট্রিটের দেশী মার্কেটের ক্যাফেটেরিয়াগুলো থেকে মাছ আর বেগুনের তরকারির সুবাস ছড়াচ্ছে।
২০১০ সালে লিটল বাংলাদেশ তার অফিশিয়াল স্বীকৃতি পায়। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলে লবিং করতে নেতারা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে আসছে। ফলে লিটল বাংলাদেশ নামটি অনুমতি পায় এবং ২০১১ সালে সাইনবোর্ডটি সেখানে স্থাপিত হয়। এভাবেই সিটি হলের অনুমতিক্রমে কোরিয়া টাউনের বাংলাদেশী কমিউনিটি মানচিত্রে স্থান পায় এবং এর মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশী বাসিন্দাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি বৈধতা লাভ করে।
জিয়া ইসলাম এখানে বসবাসরত এক বাংলাদেশী। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি লেফটেন্যান্ট এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশী ইউনিটি ফেডারেশনের একজন সদস্য। তিনি ওই নামকরণকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের নবযাত্রা বলে বিশ্বাস করেন। লিটল বাংলাদেশ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন শহরের মেয়র ছিলেন আন্তোনিও ভিলারাইগোসা। ১৯৭০ সালের দিকে এখানে বাংলাদেশীরা আসতে শুরু করে। শহরটির বুকে থাকা বিভিন্ন দেয়ালচিত্রের অনেক লম্বা ইতিহাস রয়েছে। মেক্সিকান ও চিকানো আর্টিস্টদের দ্বারা এসবের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অতঃপর সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিল্পী দেয়ালচিত্র তৈরি করেন। এসব দেয়ালচিত্রে তাদের সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও জনগণের ইতিহাস অঙ্কিত হয়। দেয়ালচিত্র জনগণকে শক্তি দান করে, যার মাধ্যমে তারা আশপাশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। দেয়ালচিত্র শিল্পী ইউডিথ বাকার মতে, দেয়ালচিত্র কেবল দর্শনযোগ্য স্থানকে উপস্থাপিত করে না, বরং এর মাধ্যমে আত্মিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানও উপস্থাপিত হয়।
প্রতিটি দেয়ালচিত্রেরই একটি গল্প থাকে, যার মাধ্যমে তা সমাজের কিছু না কিছু বার্তা দেয়। থার্ড স্ট্রিট ও সেরানো এভিনিউর ওপরে একটি দেয়ালচিত্র আছে, যা ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এর ঠিক পাশেই দ্য লস অ্যাঞ্জেলেস ইসলামিক সেন্টার, যা মূলত লিটল বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই বাংলাদেশী জনগণ সম্প্রদায় গঠন করে সবার সঙ্গে একত্রিত হয়। থার্ড স্ট্রিট ও হবার্ট এভিনিউর ওপরে দাঁড়িয়ে আছে দ্য বাংলাদেশ একাডেমি। একাডেমির পাশেই চারটি নতুন দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস ইসলামিক সেন্টারের মতো এটি একটি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। একাডেমিটির ওপরের দেয়ালে বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার পাশেই রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দেয়ালচিত্র।
১৯৬০-এর দশকে এ কোরিয়া টাউনে বাংলাদেশীরা বসবাস করতে শুরু করে। এর আশপাশেই কলেজ ও এ এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটি ঘিরে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ইসলামিক সেন্টারটি। এভাবে আরো আরো বাঙালি এসে এখানে জড়ো হতে থাকে। তারা বাংলাদেশী বিভিন্ন জিনিস দিয়ে দোকান খুলে বসে। নতুন যারা আসতে থাকে তারা এসব দোকানের কাছাকাছি বসবাস করতে শুরু করে। বর্তমানে ছয় হাজারের অধিক বাংলাদেশী অভিবাসী লিটল বাংলাদেশে বাস করছে। তবে জিয়া ইসলামের অনুমান, সংখ্যাটা ২০ হাজারের মতো।
১৯৮০ বা ’৯০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে যারাই লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছত তারা নিজের লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরত আর তার চালককে বলত, লিটল বাংলাদেশে নিয়ে চলুন। লিটল বাংলাদেশ কোথায় ট্যাক্সিচালকরা সবাই কিন্তু জানত। এ স্থানে এখন যেমন বাংলাদেশী খাবার-দাবারের আয়োজন থাকে, তেমনটা আগেও থাকত।
অদিতি মাহমুদ এ স্থানেই বেড়ে ওঠা এ ক’জন আমেরিকান-বাংলাদেশী। তার মতে, লিটল বাংলাদেশের এ সাইনবোর্ড মানে কেবল জায়গাটার একটা নামকরণ তা নয়। বরং এ নামকরণ মানে হলো বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের দায়িত্ববোধ আরো বাড়ানো। এ প্রসঙ্গে আলোচনায় অদিতি স্থানটিকে জাতিগত বৈচিত্র্যসম্পন্ন এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে ফিলিপাইন ও লাতিন আমেরিকার লোকেরা খুব সহজেই ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার লোকেদের সংস্পর্শে আসতে পারবে। অদিতির সঙ্গে কথোপকথনে আরো অনেক সত্য উঠে আসে। ’৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এখানে মাত্র দুটি মুদি দোকানে বাংলাদেশের জিনিস পাওয়া যেত। তখন অভিবাসী হয়ে যারা আসত, তাদের অনেকেই ভাষা সমস্যার শিকার হতো। এর ফলে অভিবাসন ব্যবস্থায় বেশ জটিলতাও সৃষ্টি হয়েছিল। বাড়ির মালিকরা অনেক অভিবাসীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দিত। এর মধ্যে ২০০৮ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার যুবকদের একটি আর্ট প্রজেক্টে যুক্ত হন। তাদের উদ্যোগে বাঙালি আর্ট ব্যানার নির্মিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশীদের পরিচয়ের প্রশ্নে লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। সে সময়ের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা আসলে কোন ভূমিকে বহন করছি সে চিন্তাটা আমার মাথায় কাজ করে। এর পর মনে হয়, আমাদের আসলে কোনো পরিচয়ই নেই।
এলাকাটির আশপাশে থাকা কয়েকটি বাংলাদেশী দোকানের মালিকরা ব্যানারটিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। মূলত অদিতির অনুপ্রেরণায় বাঙালিরা নিজেদের পরিচয়ের ব্যাপারে উদ্যমী হয়ে ওঠে। মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে সেখানে কুচকাওয়াজ হয়েছিল, স্থানীয় শিল্পীদের আয়োজনে লিটল বাংলাদেশে লাইভ মিউজিক কনসার্ট হয়েছিল। এদিন বাংলাদেশী খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে ভোজসভাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আরজিন কামাল নামে একজন গায়ক এ সম্প্রদায়েরই একজন। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। উচ্চশিক্ষার্থে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেছিলেন। কামাল সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের আশপাশের বিভিন্ন গানের উৎসবে তিনি বাংলাদেশের লোকগান গেয়ে থাকেন। এ গানগুলোর মাধ্যমে আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশীরা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারেন। এভাবে নিজের সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজস্বতার অনুভূতি পোক্ত হয়। শিল্পী কামাল আরো বলেন, এখানে বাংলাদেশী সম্প্রদায়টা ছোট। আমি চাচ্ছি তাদের আমার গানের মাধ্যমে আরো সামনে নিয়ে আসা। সামনে চলে এলেই ভীতি কেটে যাবে। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশীরা এখন তাদের একপাশে পড়ে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এখন তারা শিক্ষিত, আত্মপ্রত্যয়ী। সন্ত্রাসী বা ধর্মীয় উগ্রপন্থী হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকেদের যে বদনাম তা মুছতেই এ প্রজন্ম বেশি উদ্যোগী হয়েছে। কামালের মন্তব্য হলো, মুখ বন্ধ থাকলেই কিন্তু পৃথিবী বদলে যাবে না। অন্যরা আমাদের যে খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করছে সবাই মিলে তার প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে।
লিটল বাংলাদেশ উপাধিটি জিতে নেয়ার বিষয়টিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল ওই এলাকায় থাকা কোরিয়ানরা। বাঙালিরা এ নামের জন্য আবেদন করার আগে কোরিয়ানরা মোটেই নিজের জন্য কোনো নামের আবেদন করেনি। ২০১০ সালে এ নিয়ে সিটি কাউন্সিল ভোট হলে থার্ড স্ট্রিটের ফোর-ব্লকটি বাংলাদেশীরা অর্জন করে। স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রে দুটি সম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতা বিষয়টি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা নির্দেশ করে। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনেক জাতির মানুষের বসবাস। এখানে লিটল বাংলাদেশের বাসিন্দারা মানসম্পন্ন সাশ্রয়ী মূল্যের অপর্যাপ্ত আবাসন, উচ্চ ভাড়া, কম মজুরি প্রভৃতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
কোরিয়া টাউনে সর্বদাই বহুজাতিক সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। তাদের জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও বটে। গুয়াতেমালা, মেক্সিকো, এল সালভাদর, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে এখানে তারা সহাবস্থান করে। লিটল বাংলাদেশ বিলবোর্ডের ঠিক পাশেই থার্ড ও নিউ হেমস্ফািয়ার এভিনিউর কাছে হুয়ান এসপিনোজা ওয়াক্সাকান নামে একটি মুদি দোকান পরিচালনা করেন। মেক্সিকোর বিভিন্ন বিখ্যাত খাবার যেমন তরতিলা, মটরশুঁটি, অ্যাভোকাডো ও মরিচ বিক্রি করে থাকেন তিনি। তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমার দোকানে আমি বাঙালিদের আকর্ষণ করতে চাই। কিন্তু জানি না তাদের কাছে এমন কী বিক্রয় করব। আমিও কিন্তু তাদের দোকান থেকে কিনতে চাই। কিন্তু জানি না, তারা কী খায়।’
জিয়া ইসলাম অবশ্য এর উত্তরে বলেন, বাংলাদেশীদের খাবারের ৮০ শতাংশই তো আমিষ। এক কথায় মাছ। মাছের মাধ্যমেই বাংলাদেশীদের হূদয়ে পৌঁছানো যায়। তিনি আরো বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশ ইউনিট ফেডারেশনের অফিসের কাছে লাতিন আমেরিকার একটা বাজার রয়েছে। ওখানে শুঁটকি বিক্রি হয়। বাংলাদেশীরাই ওখানকার সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
থার্ড স্ট্রিটে অবস্থিত অনেক দোকানের মধ্যে এসপিনোজার দোকান অন্যতম একটি। এটি মূলত লাতিন ও কোরিয়ান অভিবাসীদের বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য সরবরাহ করে। এখানেই প্রায় বারোর মতো দোকান রয়েছে, যেগুলো মূলত বাংলাদেশী অভিবাসীদের সেবা দেয়।
জিয়া ইসলাম বলেন, বাংলাদেশী খাবারের বাজার সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে এবং এখানে বাংলাদেশীদের দ্বারা আরো অধিক ব্যবসা পরিচালিত হবে। লস অ্যাঞ্জেলেসে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েই চলছে। তবুও জিয়া ইসলামের মতে, বাংলাদেশীরা এখানে জড়ো হয়ে দেশের সঙ্গে সংযোগ উত্তরোত্তর বাড়াবে। এভাবে লিটল বাংলাদেশ নামে ছোট এক টুকরো বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তেই থাকবে।
মার্টিন ম্যাকিয়াসের In LA’s Koreatown, Little Bangladesh Stakes Its
Claim ও সেয়ান মাউসের The Pepole and Murals of L.A.’s of Little
Bangladesh অবলম্বনে





